পৃষ্ঠাসমূহ

রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৪

মানব জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শ



আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায়
ভগবান শিব বলেছেন মানব জীবনের লক্ষ্য আদর্শ হল-“আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় মানুষ যা- করুক না কেন, তা করা উচিত আত্মমোক্ষের জন্যে- তার নিজের মোক্ষের জন্যে, আর করা উচিত জগতের কল্যাণের জন্যে, সমস্ত বিশ্বের উন্নতির জন্যে। এটাই তার ধর্ম। তাই যে কর্ম তার আত্মমোক্ষের সহায়ক নয় বা যে কর্মের দ্বারা অপরের কল্যাণ হয় না, জগতের হিত হয় না, তা ধর্ম নয়। মহান দার্শনিক তথা ধর্মগুরু শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী বলেছেন যে, ‘মানব ব্জীবন একটা আদর্শের ধারা প্রবাহ, একটা ব্রত তাই মানুষের এই দুটো কাজই করা উচিত অর্থাৎ মানুষের ব্রত এই দুটো কাজ
আত্মমোক্ষার্থং এই পৃথিবীর সব কিছুই চলমান, বিশ্বের সব কিছুই চলে চলেছে। একে চলতেই হবে। কেউ যদি বলে, ‘আমি চলব না’, তবুও সে স্থির থাকতে পারে না, পতনের দিকে চলতে হবে তার মনের কামনা-বাসনা, ষড়রিপু-অষ্টপাশ তাকে পিছনের দিকে, পতনের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে। সেই জন্যে মানুষের উচিত সামনের দিকে এগিয়ে চলা, তা না হলে পিছনের দিকে চলতে হবে। কারণ পৃথিবীর কোন কিছুই স্থানু বা স্থির নয়, সব কিছুই চলে চলেছে, সব কিছুই চলমান। যদি কেউ উপরের দিকে না যায় তাহলে তাকে নীচের দিকে যেতে হবে। তাইআত্মমোক্ষার্থং যে যা- করুক না কেন তা মোক্ষের জন্যে করতে হবে। মোক্ষ মানে চিরকালীন মুক্তি
তারপরজগদ্ধিতায় মানুষ সব কিছুই তার নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যে, নিজের মুক্তির জন্যে করছে- এটা ভাল কথা; কিন্তু মানুষ কী স্বার্থপর? সে সব কিছু তার নিজের নিজের মুক্তির জন্যে করবে, অন্যের জন্যে কিছুই করবে না, এটা কী ঠিক? মানুষ তো তাহলে স্বার্থপর হয়ে গেল। আমরা এই জগতে, সমাজে সকলে একে অপরের কাছে ঋণী। জন্ম থেকেই আমরা পিতা-মাতা, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ তথা জীব জগতের সাহায্য-সহযোগিতায় বেঁচে থাকি। আমরা খাদ্যের জন্যে, পোষাকের জন্যে, জীবনের নিরাপত্তার জন্যে, উন্নতির জন্যে, নিজের সুখ ভোগের জন্যে অপরের সাহায্য গ্রহণ করি। তাই আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের উন্নতি একে অপরের সাহায্য-সহযোগিতায় হয়ে থাকে। আমরা সবাই একে অপরের কাছে ঋণী। এই ঋণ শোধ না করতে পারলে কোন মানুষের মুক্তি বা মোক্ষ হতে পারে না। একমাত্র জগতের সেবার মাধ্যমেই এই ঋণ পরিশোধ হতে পারে। তাই নিজের মুক্তির জন্যে কোন কিছু করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যের সেবাও করতে হবে
সেবা চার প্রকারেরঃ শূদ্রোচিত সেবা, ক্ষত্রিয়োচিত সেবা, বৈশ্যোচিত সেবা বিপ্রোচিত সেবা
শূদ্রোচিত সেবাঃ শূদ্রোচিত সেবা হল শরীর দিয়ে কারো সেবা করা। শারীরিক সেবা, অসুস্থকে সেবা করা। শূদ্রের যে সেবা তা শূদ্রোচিত সেবা।
ক্ষত্রিয়োচিত সেবাঃ ক্ষত্রিয়োচিত সেবা নিরাপত্তা দেওয়া, দুর্বলদের সাহায্য করা।
বৈশ্যোচিত সেবাঃ বৈশ্যোচিত সেবা আর্থিক ভাবে কারো সেবা করা। ক্ষুধার্তকে অন্ন দান, ত্রাণকার্য , দরিদ্র নারায়ণের সেবা তথা প্রয়োজনে কাউকে সাহায্য করা।
বিপ্রোচিত সেবাঃ বিপ্রোচিত সেবা নীতি-শিক্ষা দেওয়া, শিক্ষাদান, আদর্শের প্রচার, ধর্ম প্রচার
যদিও সব সেবাই সমান মানের- কিন্তু বিপ্রোচিত সেবা চিরকালীন আর বাকী তিন ধরণের সেবা- শূদ্রোচিত, ক্ষত্রিয়োচিত বৈশ্যোচিত সেবাই ক্ষণকালিক। এদের গুরুত্ব কিন্তু কম নয়, শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক স্বভাবের। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সর্বোত্তম সেবা- তাকে খাওয়ানো। এই সেবা চিরন্তন প্রকৃতির না হলেও সেই সময়ে সেটি সবচেয়ে মূল্যবান। কেউ হয়তো ক্ষুধার্ত, সে কাঁদছে, মরতে বসেছে, তখন তাকে ধর্ম কথা না শুনিয়ে খেতে দিতে হবে। এর তাৎক্ষণিক গুরুত্ব আছে। কিন্তু বিপ্রোচিত সেবার গুরুত্ব চিরন্তন। তাই একে সর্বোত্তম সেবা বলা হয়
এই চার প্রকারের সেবাইহিতেরমধ্যে পড়ে। তাই বলা হয়েছেজগদ্ধিতায় জগৎমানে পৃথিবী, ‘হিতমানে কল্যাণমূলক সেবা। যা কিছু মানুষ করুক না কেন তা নিজের মুক্তির জন্যে করবে- ‘আত্মমোক্ষার্থং তারপরজগদ্ধিতায় ’- জগতের হিতের জন্যে করবে। শূদ্রোচিত, ক্ষত্রিয়োচিত, বৈশ্যোচিত বা বিপ্রোচিত- এই চার প্রকারের সেবাই হিতের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মানুষকে মনে রাখতে হবে যে বিপ্রোচিত সেবা চিরকালিক। একজন ভাল মানুষকে এই নীতি মেনে চলতে হবে অর্থাৎ তার জীবন হবে আত্মমোক্ষ জগত হিতের জন্যে- এটাই ভগবান শিবের শিক্ষা
[তথ্যসুত্র সংগ্রহ : দি নিউজ]

শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৪

শরীরের তেজ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল

মনিপুর চক্রঃ
মনিপুর চক্রে রয়েছে ১০টি বৃত্তি। এই চক্র দেহের তেজস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এখানেই সবচেয়ে আবেগময় বৃত্তিগুলির অবস্থান। এই চক্রে বৃত্তিগুলি ,-
১।মোহ (Infatuation)- কারোর প্রতি বা কোন কিছুর প্রতি অন্ধ আকর্ষণ। অধিকাংশ মানুষই হয় তাদের প্রিয়জন বা পোষা প্রিয় জন্তু বা বাড়ী, গাড়ী ইত্যাদি কোন না কোন কিছু নিয়েই সব সময় ব্যস্ত আছে। কোন কিছুর সাথে এই ভাবে অহরহ যুক্ত থাকার ফলে তারা সেই বস্তুর প্রতি একটা নিয়ন্ত্রণহীন তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে। এই তীব্র আকর্ষণ মানুষের মনকে বিষয়ের দিকে অন্ধভাবে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। যেমন কোন মানুষের এইমোহছোটে অর্থের দিকে বা ক্ষমতার দিকে। কোটিপতি John Gettyবলতেন-“যদি লক্ষপতি হতে চাও তবে আমার মত সব সময় টাকার চিন্তা কর”।
২।তৃষ্ণা (Craving or thirst)- কোন কিছু পাবার তীব্র ইচ্ছা। এই তৃষ্ণা বৃত্তিই মানুষের মোহ বৃত্তিকে জাগিয়ে দেয়। এই তৃষ্ণা কেবল ধন-সম্পদ পাবার তীব্র ইচ্ছাই নয়, এ নাম-যশ-প্রতিপত্তি ইত্যাদি পাবারও ইচ্ছা। এই তৃষ্ণা বৃত্তি প্রবল হয়ে উঠলে এই চক্রের অন্যান্য ঋণাত্মক বৃত্তিগুলিকেও সক্রিয় করে তোলে। যেমন- ঈর্ষা, ঘৃণা, ভয় ইত্যাদি।
৩।ঈর্ষা (Jealousy) - পরশ্রীকাতরতাজনিত সন্দেহ। কারো ভালো দেখতে না পারা।
৪।ঘৃণা (Hatred) - কোন ব্যষ্টি, বস্তু বা স্থানের প্রতি তীব্র অপছন্দ প্রকাশ করা।
৫।ভয় (Fear) - বিপদ, গুরুতর ক্ষতি বা যন্ত্রণা থেকে উদ্ভূত মানসিক অস্থিরতা বা দুশ্চিন্তা।
৬।লজ্জা (Shyness) - লোকাপবাদের ভয়। অন্যের সামনে সহজ হবার আড়ষ্টতা। “করিতে পারিনা কাজ   সদা ভয় সদা লাজ   পাছে লোকে কিছু বলে”। পাছে লোকে কিছু বলতে পারে এই ভয়টাই লজ্জা।
৭।পিষুণতা (Sadistic tendency) - হৃদয়হীনতা, অন্যের দুঃখ কষ্টের প্রতি উদাসীন থাকা।
৮।সুষুপ্তি (Staticity, sleepiness) - সর্বদাই ক্লান্তির ভাব। শারীরিক, মানসিক বা আধ্যাত্মিক সর্বক্ষেত্রেই কাজে অনীহা। সব সময়ই তন্দ্রার ভাব।
৯।বিষাদ (Melancholia) - চরম হতাশা, জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন বা ব্যর্থ হয়ে গেছে এমন ভাবনা।
১০।কষায় (Peevishness )- খিটখিটে মেজাজ। এই কষায় বৃত্তির প্রভাবে মানুষ সহজেই উত্তেজিত হয়, সর্বদাই উত্তেজনার ভাব প্রকাশ করে। এটা হতাশা বা অসহিষ্ণুতা জনিত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। আর এই বৃত্তি স্পষ্টতঃই এড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এড্রিনালিন হর্মোনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যখন কোন মানুষ চাপের (Stress) ফলে তার মনিপুর চক্রের সন্তুলন হারিয়ে ফেলে তখন সে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। কেউ এই বৃত্তির দ্বারা অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লে সে একটা আভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ভুগতে থাকে।এই অবস্থায় স্নায়বিক দুর্বলতার জন্যে প্রায়ই সে টেবিল চাপড়িয়ে মনের অধৈর্য্য ভাব প্রকাশ করে। এরা সহজেই রেগে যায় আর অন্যের সঙ্গে অশিষ্ট, রূঢ় ব্যবহার করে। এই অবস্থায় তারা স্নায়বিক দুর্বলতার জন্যে অজীর্ণ, অম্ল ইত্যাদি উদর সংক্রান্ত রোগেও ভুগতে থাকে।
এই মনিপুর চক্রের সঙ্গেই এড্রিনাল (Adrenal) গ্রন্থি ও প্রোষ্টেট (Prostrate) গ্রন্থি সম্পর্কিত। কিডনীর উপরে আর অগ্নাশয়ের (Pancreas) ঠিক পাশেই এড্রিনাল গ্রন্থি। হঠাৎ কোন বিপদের ফলে চাপের (stress) মুখে পড়ে শরীরে কোন তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হলে এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হর্মোন তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিপদের সময় এই গ্রন্থি থেকে এড্রিনালিন (Adrenaline) হর্মোন নিঃসৃত হয়ে সমস্ত শরীরকে প্রভাবিত ও প্ররোচিত করে এই বিপদের বিরুদ্ধে লড়তে বা তার থেকে পালিয়ে বাঁচতে।
প্রাচীন কালে   মানুষ হঠাৎ কোন বিপদের ফলে চাপের (stress) মুখে পড়লে, যেমন কোন মানুষকে হিংস্র বাঘ আক্রমন করলে তৎক্ষনাৎ সে এই বাঘের বিরুদ্ধে শারীরিক শক্তি দিয়ে লড়তো অথবা পালিয়ে যেত। এই ভাবে সে চাপ (stress) থেকে মুক্ত হতো । কিন্তু আধুনিক যুগের শিক্ষিত, সভ্য মানুষ প্রায়ই বিভিন্ন ভাবে চাপের সন্মুখীন হচ্ছে, কিন্তু আদিম মানুষের মত শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে বা সেই পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে এই চাপকে সরাতে পারছে না। যেমন,- যে লোকটা তার অফিসের ঊর্ধ্বতন অফিসারের দ্বারা প্রায়ই ভর্ৎসিত হচ্ছে বা যে ছাত্র লেখাপড়ার জন্যে তার শিক্ষকের দ্বারা প্রায়ই দন্ডিত হচ্ছে– তারা এদের বিরুদ্ধে না দৈহিক শক্তি দিয়ে লড়তে পারছ, না এদের থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারছে। ফলে এই চাপ তাদের মধ্যে জমা হতে থাকে । এই অবস্থায় তাদের দেহের এড্রিনাল গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত এড্রিনালিন হরমোন নিঃসৃত হয়ে শরীর ও মনকে উত্তেজিত করে রাখে।ফলে,-
  • হৃদপিন্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়।
  • রক্তের চাপ বেড়ে যায়।
  • সঞ্চিত সুগার রক্তে মিলিত হয় দ্রুত শক্তি পাবার জন্যে।
  • পরিপাক শক্তি কমে যায়।
আজকাল তাই দেখা যায় বহুলোক এই চাপ জনিত রোগে ভুগছে আর মৃত্যুবরণও করছে। বিভিন্ন রোগের কারণ চাপকে যুঝতে জৈব মনস্তত্ত্ব আমাদের গভীর ভাবে সাহায্য করে। আমরা ঘরে, বাইরের কোলাহলপূর্ণ দুষিত পরিবেশে সর্বদা বিভিন্ন ধরণের চাপের মধ্যে থাকি যা আমাদের মনে একটা চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই মানসিক উত্তেজনার কারণে আমাদের মনিপুর চক্রের সন্তুলন নষ্ট হয়ে যায়, ফলে এই চক্রস্থিত কষায় বৃত্তি খুব সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। আর এই বৃত্তি তখন অনুকূল স্নায়ুতন্তুকে উত্তেজিত করে। এই উত্তেজিত স্নায়ুতন্তু এড্রিনাল গ্রন্থিকে সক্রিয় করে তোলে, ফলে এড্রিনালিন হর্মোন নিঃসৃত হতে শুরু করে। এই এড্রিনালিন গ্রন্থিরস রক্তে মিশে শরীরকে উত্তেজিত করে ‘লড়ো নতুবা পালাও’ ভাবে সাড়া দিতে। তাই এই ধরণের অত্যধিক এড্রিনালিন রস ক্ষরণ আমাদের হঠাৎ বিপদে ছুটে চলতে শক্তি জোগায়।
আমাদের অধিকাংশ চাপগুলি তখনই আসে, যখন আমাদের অহংবোধ কোন সত্যিকারের বা কাল্পনিক বিপদের সংকেত পায়। যখন অপমান, সমালোচনা বা অন্যের রক্তচক্ষু ইত্যাদি মানসিক আঘাতের ফলে আমাদের আত্মসন্মানবোধ আহত হয়। তখন আমরা এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে হয় পালিয়ে যেতে চাই নতুবা এসবের বিরুদ্ধে লড়ে বদলা নিতে চাই। আর তা করতে পারলেই আমরা এই চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি। কিন্তু আধুনিক সভ্য জগতে সাধারণতঃ আমরা দৈহিক ক্রিয়া-কলাপের মাধ্যমে এই চাপ থেকে মুক্ত হতে পারি না, এগুলো আমাদের ভিতরে জমা হতে থাকে। ফলস্বরুপ আমাদের রক্তের চাপ বেড়ে যায়, হৃদকম্প শুরু হয়, শরীরের মাংস পেশী উত্তেজিত হয়, পাকস্থলী আলোড়িত হয়। কিন্তু আমরা আমাদের এই অনুভূতিগুলি কাউকে প্রকাশ করিনা, লুকিয়ে রাখি। আমাদের রাগ, হতাশা সব সব কিছু দমন করে রাখি। বাইরে এমন ভাব দেখাই যেন কিছুই হয়নি, সব কিছুই ঠিকঠাক চলছে।
আজকাল আমরা, ঘরে বা বাইরে কাজে সর্বদা এত বেশী চাপজনিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হই যে এই ধরণের উত্তেজনা সহ্য করা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সব সময় একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করি, দুশ্চিন্তায় থাকি কিন্তু এই ভিতরে জমে থাকা চাপা উত্তেজনাকে বার করার কোন রাস্তাই খুঁজে পাই না। আমরা সব সময়‘Red alert’ থাকি আর আমাদের সহানুভূতি সম্পন্ন স্নায়ুতন্তুও সর্বদা উত্তেজিত থাকে। আমরা সর্বদা কেমন যেন খিটখিটে, দ্বিধাগ্রস্থ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে থেকে থেকে আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলি। ফলে ক্রমেই আমরা কাজের অযোগ্য হয়ে পড়ি আর অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের জীবনকে উপভোগ করার সমস্ত শক্তিই যেন শেষ হয়ে যায়।
এই অবস্থায় আমরা প্রায়ই দ্রুত সমাধান খুঁজি মদ-গাঁজা-হেরোইন-সিগারেট-কফি-ড্রাগ ইত্যাদির মাধ্যমে। আমরা এই ভাবে নেশাগ্রস্থ হয়ে নিজেকে ভুলতে চাই, চাপকে ক্ষণিকের জন্যে দূরে সরিয়ে রেখে মনের শান্তি পেতে চাই। কিন্তু কালক্রমে এগুলিই আমাদের চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কফির caffeine আমাদের রক্তের চাপ ও হৃদস্পন্দনকে বাধা দেয়, সিগারেটের নিকোটিন (nicotine) হার্ট ও ফুসফুসের রোগ তথা ক্যানসার তৈরী করে। আর মদ তৈরী করে লিভার, হার্ট ও মস্তিষ্কের রোগ।
আবার এই সব সঞ্চিত আবেগময় চাপা উত্তেজনা আমাদের দেহে স্থায়ী হয়ে গেলে বিভিন্ন ধরণের psychosomatic লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন-ক্ষুধামন্দ, অনিদ্রা, স্মরণ শক্তি কমে যাওয়া বা শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি। এই সাইকোসোমাটিক লক্ষণগুলি তখন শরীরের কোন একটা দুর্বল অঙ্গে ঘনীভূত হয়ে বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে, যেমন হার্টের ধড়ফড়ানি, অম্লরোগ বা শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট। পরিশেষে এগুলি মারাত্মক ধরণের শারীরিক রোগে পরিণত হয়, যেমন-হৃদরোগ, আল্‌সার, শ্বাসরোগ। এইগুলি আবার আরও অধিক মাত্রায় নতুন চাপের সৃষ্টি করে এই রোগগুলিকেই বাড়িয়ে দেয়।
ডাক্তারেরা আজকাল জানতে পেরেছেন যে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট চাপগুলি, ছোট ছোট সমস্যা আসলে জীবনের অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থেকেও আমাদের বেশী অসুস্থ করে তোলে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, ক্রমাগত অসুস্থ আত্মীয়, অফিসের সহকর্মীদের দুর্ব্যবহার, দেরীতে বাস বা ট্রেন আসা বা ট্রাফিক জ্যাম ইত্যাদি সাধারণ চাপগুলি স্বাস্থের পক্ষে তেমনই মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে, যেমন হতে পারে বিবাহ বিচ্ছেদ, পরিবারের কারো মৃত্যু বা চাকরী হারানোর মত আবেগাহত অভিজ্ঞতার দ্বারা।
কিছু কিছু লোক অবশ্যই আছে যারা অপরের থেকে এই চাপগুলির প্রতি বেশী সংবেদনশীল। অধুনা গবেষণায় দেখা গেছে, যে লোকগুলি খুবই খিটখিটে মেজাজের আর ঝগড়া বা যুদ্ধ প্রিয় তারা খুব সহজেই এই সহানুভূতিসম্পন্ন স্নায়ুতন্তুর ‘লড়ো নতুবা পালাও’ ভাবের শিকার হয়। এই ধরণের লোককে ‘Type A’ ব্যষ্টিত্ব বলা হয়। এই ‘Type A’ ব্যষ্টিরাই সাধারণ লোকের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশী হার্টের রোগে ভুগে থাকে। কারণ তাদের এই খিটখিটে ভাব বা ঝগড়া বা যুদ্ধপ্রিয়তা যা কিনা মনিপুর চক্রের কষায় ও ঘৃণা বৃত্তির সমন্বয়- তা তাদের এড্রিনাল গ্রন্থিকে সর্বদা অত্যধিক উত্তেজিত করে রাখে। ফলে অতিরিক্ত এড্রিনালিন হর্মোন রক্তে মিশে তাদের রক্তের চাপকে বাড়িয়ে দেয় আর তাদের লিভার থেকে চর্বি নিঃসৃত হয়ে রক্তে মিশতে থাকে। সুতরাং তাদের রক্তের Cholesterolএর পরিমানও বাড়তে থাকে। আর এর ফলে ধমনীতে মারাত্মকভাবে চর্বি জমে তাদের ধমনীর গতি বন্ধ হয়ে যায়। এই বর্ধিত Cholesterol জনিত উচ্চ রক্তচাপই হৃদরোগাক্রান্ত হবার কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে এই ‘Type A’ ব্যষ্টিরা অধিকাংশই ধূমপায়ী, অতিরিক্ত মদ্যপায়ী আর অতি ভোজনের ফলে অতিরিক্ত মোটা। কারণ তাদের মনিপুর চক্র সন্তুলিত না থাকার ফলে ‘তৃষ্ণা’ বৃত্তি সব সময় খুবই সক্রিয় থাকে, তাই তারা সব কিছুই অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করে থাকে। এটা তাদের হার্ট এটাকের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দেয়। আর অতিরিক্ত এড্রিনালিন হর্মোন তাদের রোগ প্রতিরোধকারী ব্যবস্থাকেও (immune system) অবদমন করে রাখে। তাই এই লোকগুলির এই সব রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনা সব সময় বাড়তেই থাকে।
ডাক্তারেরা বলেন যে, ‘Type A’ ব্যষ্টিরা যাদের সহানুভূতি সম্পন্ন স্নায়ুতন্তু সব সময় ‘red alert’থাকে তারা প্রায়ই খুব ক্ষমতা লোভী হয়। এও তাদের মনিপুর চক্রস্থিত ‘তৃষ্ণা’ ও ‘মোহ’ বৃত্তির অতিরিক্ত সক্রিয়তার ফলে হয়ে থাকে। যখন তারা এই ক্ষমতা অর্জন করতে গিয়ে হতাশাগ্রস্থ হয়, তখন তাদের মধ্যে একটা শত্রুতাভাব জেগে ওঠে। ফলে তাদের এড্রিনালিন হর্মোন অতিরিক্ত পরিমানে নিঃসৃত হতে থাকে আর তাদের রক্তের চাপ আরও বেড়ে যায়।
এই মনিপুর চক্রের সঙ্গে প্রোষ্টেট (Prostrate) গ্রন্থিও যুক্ত। প্রোষ্টেট গ্রন্থির বিকাশের সাথেই লজ্জা বৃত্তি জেগে ওঠে ও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৩/৪ বৎসরের ছেলেমেয়েদের মনে কোন লজ্জাবৃত্তি থাকে না, কেননা তখনও তাদের এই গ্রন্থি বিকশিত হতে শুরু করে নি। এই বৃত্তি জন্মগত নয়, বয়সের সঙ্গে এই বৃত্তি শিশুদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যেমন একটা শিশু ৩/৪ বৎসর বয়স পর্যন্ত উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে, তার মধ্যে কোন লজ্জা বৃত্তি নাই। বাবা-মা ই তার মধ্যে লজ্জাবৃত্তি ঢুকিয়ে দেন, কাপড় পরতে বাধ্য করেন। কিন্তু শিশু একটু বড় হ’লে তার প্রোষ্টেট গ্রন্থি বিকশিত হয়, ফলে কাপড় না পরিয়ে কোথাও তাকে বের করা কঠিন।
মনিপুর চক্রের এই উপগ্রন্থির স্বাভাবিক রসক্ষরণের ফলে-
*লজ্জাবৃত্তি জেগে ওঠে।
কিন্তু এই গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত রসক্ষরণ হলে তখন তার মধ্যে একটা-
*মানসিক বিষাদের (Melancholia) ভাব জেগে ওঠে।
এই বিষাদ গ্রস্ত লোকেরা ভাবে- এখানে শুধু দুঃখই আছে, বেঁচে থাকার প্রয়োজন কী? কেউ আমার বন্ধু নয়, আত্মীয় নয়। এটা এক ধরণের মানসিক রোগ, একে Melancholia বলে। আবার এই গ্রন্থি থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে কম হর্মোন নিঃসৃত হলে তার মধ্যে সব সময় একটা-
*ভীত-সন্ত্রস্ত ভাব জেগে ওঠে।
একটু ভয় পেলেই তার মানসিক ভ্রান্তিদর্শন হয়, সে মনে করে সে ভুত দেখছে।
তাই আমরা এখানে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নালীবিহীন গ্রন্থি, আবেগজনিত সমস্যা তথা বিভিন্ন রোগের সঙ্গে বৃত্তি ও চক্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এখন এই জৈব মনস্তত্ত্ব (Bio-Psychology) শুধু আমাদের রোগের কারণ নির্নয়েই সাহায্য করে না, আমাদের রোগ সারাতেও সাহায্য করে। যেমন, ধনুরাস্‌ন, ময়ুরাসন, চক্রাসন, ও আগ্নেয়ী মুদ্রা এড্রিনাল গ্রন্থির ওপর সরাসরি চাপ দিয়ে এই গ্রন্থির হর্মোন ক্ষরণকে সন্তুলিত করে, যা চাপ (Stress) মুক্ত করতে সাহায্য করে।
তাছাড়া যোগ সাধনা (Meditation) ও শবাসনের মাধ্যমেও
*চাপ (Stress) দূর হয়।
*হৃদযন্ত্রের গতি স্বাভাবিক হয়,
*শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ধীর হয়,
*মাংসপেশী ও স্নায়ুতন্তুকে আরাম দেয়।

শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

তকদীর




















তকদির অর্থ কি? তকদির অর্থ কেউ কেউ বলে থাকেন ভাগ্য বা নিয়তি। এ তকদির সর্ম্পকে কোরআনে বলা হয়েছে বিশ্বাস রাখার জন্য। কারণ বিশ্বাস হচ্ছে অন্ত:করণ দ্বারা উপলব্ধি করা। আমরা যা চিন্তা ভাবনা করি তা সবই আমরা উপলব্ধি করি অন্ত:করণ দ্বারা। আর চিন্তা-ভাবনা করি বিবেক বা বুদ্ধি দ্বারা। আর প্রজ্ঞার দ্বারা সর্বোত্তমটি বেছে নেই। প্রজ্ঞার অভাবে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক বিষয়টি বেছে নিতে ব্যর্থ হলে পরিণতিতে ভোগ করি সীমাহীন র্দুভোগ। বুদ্ধি আমাদের চলার পথে সাহায্য না করলে আমরা সঠিক পথটি হারিয়ে দুরে সরে যাই। অন্ত:করণ সাহায্য না করলে তা কঠোর মন-মানসিকতার পরিচয় বহন করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে তকদির বলতে এ তিনটি বিষয়েরই উপর নির্ভরশীলতাকে বোঝায় যার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে। কিন্ত্তু আপনি একটু লক্ষ্য করলেই এর বাস্তবতা উপলব্দি করতে পারবেন। দেখতে পারবেন এমন সবকিছু যা আপনার বিশ্বাসের ভিত্তিকেই নড়বড় করে দেবে। যেমন সাধক ইসমাইল শাহ তার ইসমাইল গীতিতে বলেছেন-
ভাগ্যের লিখন যায় না খন্ডন
সুখে কি দুঃখে থাকি
আমার পাওনা আমি পাব
পূর্বে যাহা করেছি।।
অর্থ - ভাগ্যের লিখন খন্ডানো যায় না। আমি সুখে থাকি কি দু:খে থাকি আমার পাওনা আমাকেই পেতে হবে। যা আমি পূর্বে করেছি। পূর্বে আমি কি করেছি তা কি আমার মনে আছে? আমি কোথায় ছিলাম? কার কাছে কোথায় জন্ম নিয়েছিলাম? কে ছিল আমার পিতা? কে ছিল আমার মাতা? তা আমি বিসৃত হয়েছি। এ জগতে আমি যাকে বাবা বা আমার জন্মদাতা বলে জানছি, মা বলে জানছি ভাই বা বোন বলে জানছি তারা আমার পূর্ব জনমে ছিল না। আমি ছিলাম হয়তো এরচেয়ে ভালো নয়তো এরচেয়ে মন্দ। ভালোতো নয়ই। বরং মন্দ ছিলাম। না হলে কেন আবার বাকী পাওনা মিটিয়ে দেয়ার জন্য এ পৃখিবীতে অন্য আরেক জগতে পাঠানো হলো? সাধক ইসমাইল শাহ এ বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। অবতার মহারাজ আনন্দ স্বামী বলেছেন - গর্ভস্থ হইবার পূর্বে " বিশেষরুপে তোমার কাজ করিব "  এই প্রতিজ্ঞা করিয়া জীব সংসারে আসে। জন্মিবামাত্র ওনা ওনা  বলে পূর্বের প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া যায়।
একই দিনে এই ভ্রমে
কত শিশু জন্ম নিচ্ছে
কেহ্ রাজা কেহ্ প্রজা
নাপিত ধোপা চামার মুচি।।
নব শিশু হওয়ার পরে
নিস্পাপী বলে তাহারে
পূর্বে কি করেছো ওরে
কপালকে করেছি দোষী।।
অর্থ - এই বিশ্ব ব্রক্ষান্ডে নানা দেশে নানান বেশে কত শিশু জন্ম নিচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে কেহ রাজা কেহ প্রজা কেহ নাপিত ধোপা চামার মুচি হচ্ছে। অথচ জন্মের সময় প্রতিটি শিশুই নাকি নিষ্পাপ থাকে। যদি নিষ্পাপই থাকে তবে কেন আবার এ ধরাতে আগমণ করতে হলো? কেন অাবার ক্ষেত্র বিশেষে আমাতে জন্মলাভ করতে হলো অর্থাৎ আমি যদি রাজা হই আমার ঘরে যে সন্তান জন্ম নেবে সে রাজপুত্র, আমি নাপিত হলে আমার সন্তান হবে নাপিত আমি যদি মুচি হই আমার সন্তান হবে মুচির সন্তান। তার অর্থ আমি যা আমার সন্তান যে হবে সে তাই হবে। এটাই নিয়তি আবার এ নিয়তির উপর বিশ্বাস রাখা ঈমানের অংগ। এ প্রসংগে হযরত খাজা আবুল হাসান খেরকানী (রহ:) বলেছেন - অদৃষ্টের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এক হাজার মকবুল উপাসনা অপেক্ষা উত্তম। শুধু শুধু কপাল বা নিয়তিকে দোষ দিতে তিনি নিষেধ করেছেন। কেননা পূর্বের কৃত কর্মের ফলেই এ জন্মলাভ। তার অর্থ - পিতা-মাতার খেসারত দিতে হবে সন্তানকে। সন্তানরা হচ্ছে খেলার পুতুল। যে আমি আজকে জন্ম লাভ করেছি সেই আমিই আমার কর্ম দোষে অন্য কোন জায়গায় অন্য কারো ঘরে জন্মলাভ করে সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছি।
নিজের দোষে নিজে দোষীজেল খাটে এই হাজতবাসী
কারো গলায় পরে ফাঁসি
হাকিম থাকে নির্দোষী।।
অর্থ - পাপ হচ্ছে ভ্রান্তি বা ভুল। এ ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে ধরা পড়তে হচ্ছে দেহঘরে। বন্ধী হতে হচ্ছে খাচায়। দু:খ কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। জ্বালা সহ্য করতে হচ্ছে আমি রুপী আত্মার। পাপের ফলে ক্ষেত্র বিশেষে অনেক বড় মাশুল দিতে হয়। বার বার এ দেহরুপ ঘরে লক্ষ লক্ষ যোনী ভ্রমণ করতে হয় যা অত্যন্ত দু:খকর। অথচ আত্মা সৃষ্টিকারী রায় প্রদানকারী থাকে নিদোর্ষী। কেন নিজেকে হাকিম নিদোর্ষী বলে দাবী করছেন? কারণ আমি নিজেই নিজের দোষে দোষী।
ইসমাইল শাহ্ ভেবে বলে
মানব জনম যায় বিফলে
এবার জন্মে কি করিলে
সাধন ভজন হয় নাই সুচি।।
অর্থ - এখানে ইসমাইল শাহ নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করছেন - এবার তুমি জন্মে কি করছো? তুমি তোমার পূর্ব ভুল আবারো করতে চাও? আবারও কি যোনী ভ্রমণ করতে চাও? কেন সাধন ভজন কর না? কেন তোমার সাধন ভজন সুচি অর্থাৎ শুদ্ধ করো না? মানবরুপে জন্মেছো। অথচ সাধন ভজন না করলে তোমার মানব জনমই বিফলে যাবে। সুতরাং শুদ্ধ সাধন ভজন কর। অর্থাৎ যোনীভ্রমণ রোধ কর।

সারমর্ম - ইসমাইল গীতির এ গানটি পর্যালোচনা করলে দেথা যায় - একই দিনে এই ব্রক্ষান্ডে নানান দেশে নানান জাতের শিশু জন্মগ্রহণ করে থাকে। যারা হীন দরিদ্র তার ঘরে যে শিশুটি জন্মালো সে দারিদ্রতার করাল গ্রাসে পতিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করবে। যে শিশু ধনীর ঘরে জন্মালো সে ধনীর দুলালী হিসেবে কালাতিপাত করবে। একই স্রষ্টা যদি তাদের সৃষ্টি করে থাকে তাহলে ক্ষেত্র বিশেষে কেন এ বৈষম্য সৃষ্টি হয়? কেহ হয় রাজা, কেহ প্রজা আর কেহ নাপিত, ধোপা, চামার, মুচি হয়? এর কারণ কি? অথচ প্রতিটি শিশুই নাকি নিষ্পাপ থাকে? কি এমন দোষ করেছিল যার কারণে তাদের এ পরিণতি ভোগ করতে হয়? বলা হয় পূর্ব জনমের কর্মের ফল ভোগ করার জন্যই নাকি এ পরিণতি তাদের ভোগ করতে হচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে কর্মফল পাপ-পুণ্যের বিচারে যার যার প্রাপ্য তা  সে ভোগ করবে। অর্থাৎ ফল ভোগ করার জন্যই তাকে পুনরায় এ জগতে আবার পাঠানো হয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে পাপ বা ভ্রান্তি হচ্ছে মনের ক্রিয়া যা সে করেছিল। সে ভুলের ক্রিয়ায় তাকে আবার  পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। বিষয়টি যদি একটু চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব - পাপ হচ্ছে দু'প্রকার। অর্জিত পাপ এবং সন্ঞ্চিত পাপ। অর্জিত পাপ - যা সে এ পৃথিবীতে এসে অর্জন করছে। আর সন্ঞ্চিত পাপের পরিণতিতেই তাকে আবার এ জগতে আসতে হয়েছে। কিন্ত্তু তারপরও কথা থেকে যায়। সেটা হলো যে দেশে যেটা পাপ বলে পরিগণিত হচ্ছে অন্য দেশে তা পূণ্য বলে গণ্য হচ্ছে। দেশের ক্ষেত্র বিশেষে আইনের সমাজের পারিপার্শ্বিক সবদিক থেকেই ভিন্নতা আছে। আছে ধর্মের ভিন্নতা। আছে বিশ্বাসের ভিন্নতা। সেক্ষেত্রে সবার জন্যইতো বিচার বা আইন স্রষ্টার জন্য এক হওয়ার কথা। তারপরও কেন এ বিশৃংখলা? কেন এ ভিন্নতা? কারণ সবার জন্যইতো একই স্রষ্টা। হযরত ইসমাইল শাহ এর সহজ উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
নিজের দোষে নিজে দোষী
 জেল খাটে এই হাজতবাসী।
কারো গলে পড়ে ফাঁসি। 
হাকিম থাকে নিদোর্ষী। 
অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে আমি আমার নিজের দোষেই দোষী। আর এ কারণেই আমি জেল হাজত খাটছি। তার মানে নিজের অজ্ঞতাই আমার পাপের কারণ। আমকে দেহ বন্ধী করার মুল কারণ হচ্ছে আমার অজ্ঞতা। এখানে হাকিমকে দোষ দেয়া যায় না। কারণ তিনি রায় দেয়ার মালিক। পাপ - পুণ্যের পাল্লায় যেটা ভারী সেদিকেই তিনি রায় দিয়ে থাকেন। রায় দেয়ার পূর্বে তিনি সমস্ত বিষয় সমুহ পুংখানুপুংখরুপে যাচাই বাছাই করে তবেই রায় প্রদান করেন। তা সে যে দেশেরই হোক না কেন? শাস্তি হয় সেদেশের প্রচলিত আইনেরই আওতায়। সে দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেকই। এ ব্যাপারে কারো আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ অন্যায় করলে তার বিচার প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই করা  হয়। উকিল মোখতার সবই সে দেশের আইন মোতাবেকই হয়। বিধি বিধান স্রষ্টা প্রথম থেকেই দিয়ে আসছেন। এখনো দিতেছেন এবং এ ধারা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। আর এজন্যই প্রতিটি ধর্ম গ্রন্থের মুল কথা হলো - আত্মানং বিধি। আত্মানং বিধি হলেই হাকিমের রায় দেয়ার বিষয়টি বোধগম্য হবে। জন্মরোধ হবে। আর এ ধরাতে আসতে হবে না। তখন আমি হয়ে যাব লীন। তথা মহা আত্মার সাথে সম্মিলন হবে। এতেই পরম শান্তি নিহিত। এটাই মানব জনমের স্বার্থকতা।

মানুষ থেকেই মানুষ আসে
বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায়
আমরা মানুষ তোমরা মানুষ
তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়।

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

দারোয়ান

 


















বিশাল এপার্টমেন্ট এর সামনে বিডিআর কিংবা র‌্যাবের পোষাকের অনুরুপ কিছুলোককে পাহাড়া দিতে দেখা যায়। ভাব ভাষায় আধুনিকতায় এরা প্রাচীন কালের পাহাড়াদারের আধুনিক সংস্করণ। যাদের বলা হয় হাই ডেড হাই মাম সোসাইটির ভাষায় গার্ড। তাদের ভাব ভংগীতে দেখে মনে হয় চোর ধরার ব্যাপারে এরা অনেকটা পারঙ্গম। কারণ তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে বিভিন্ন সেন্টার বা প্রতিষ্ঠান। বেতন ভোগী এসব কর্মচারীরা তাদের কাজের ব্যাপারে কতোটা আন্তরিক, তা তাদের চেহারা, ভাব এবং ভাষা দেখলেই যে কারোর বোঝার কথা। 
একবার ভেবে দেখুন তাদের কারণেই আপনি আরাম আয়েশে নিরাপত্তায় ঘুমুতে যেতে পারছেন। আবার এদের কারণেই আপনি দুঃচিন্তাগ্রন্থ। কারণ আপনার কাজের মেয়ে সুযোগ পেলেই তার সাথে আড্ডায় মেতে ওঠে। খোঁজে আদিম সুখের আবিরতা। ক্ষেত্র বিশেষে এরও ব্যতিক্রম দেখা যায়। সেটা হতে পারে কারো কিশোরী বা যুবতী কন্যা। অথবা কারো স্ত্রী। তারপরও আপনি কিছুটা হলেও নিশ্চয়তাতো পাচ্ছেন। তার কারণেই আপনার বাড়ীতে ছেচড়া চোরের আনা-গোনা নেই। নেই কোন উৎপাত। তাকে পাহাড়ায় রেখে আপনি যে কোন অবৈধ কাজ করতে পারছেন অনায়েসে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকা আপনার বাড়ীতেই আছে। বেতনের টাকা ড্রয়ারে আছে। স্বর্ণালংকার পড়ে আছে আলমিরার নিজস্ব ড্রয়ারে। চাবিও আছে। কিন্ত্তু চুরির ভয় নেই। কারণ পাহাড়াদার আছে। তাই পাহাড়ারও প্রয়োজন আছে। এটাতো আপনাকে স্বীকার করতেই হবে। যেটুকু ভুল চুক আছে তা যদি আপনি সেরে তুলতে পারেন অথবা কোন নামী-দামী প্রতিষ্ঠান যদি আপনাকে নিশ্চয়তা দেয় যে-যে কোন অনাকাংখিত ঘটনা তারা খতিয়ে দেখবে এবং আপনাকে এ নিশ্চয়তা দেয় যে তার দেয়া বেতনভুক্ত কর্মচারীরা যদি কোন অপরাধ করে তার জন্য তারা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। তাহলে আপনি সারা দিন খেটে খুটে অফিস থেকে ফিরে অনায়েসে ঘুমুতে যেতে পারেন। নিশ্চিতে আপনার কাজের মেয়েকে দোকানে পাঠাতে পারবেন। রাখতে পারবেন আপনার দামী জিনিসপত্র অনায়েসে। তাহলে আপনি স্বীকার করলেন যে আপনাকে সে প্রকার নিশ্চয়তা দেয়া হলে আপনি পাহাড়াদার রাখতে আপনার কোন আপত্তি নেই। তাইতো? যদি তাই হয় তাহলে তাকান আপনার নিজের দেহের দিকে।
পন্ঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বার দ্বারা আমাদের মন-মস্তিষ্কে যা কিছু প্রবেশ করে তাই ধর্ম। ধর্ম ধৃ ধাতু হতে এসেছে। যার অর্থ ধারণ করা। প্রতিটি বস্তুুই জগতে কোন না কোন কিছু ধারণ করে আছে। সেগুলো আমাদের মন-মস্তিষ্কে স্থায়ী ছাপ ফেলতে চায়। ফলে জীব সৃষ্টির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর এ আবদ্ধ হওয়ার ফলে সে মুক্তজীব হিসেবে বাস করতে পারে না। তার কাজ কারবারে দুনিয়ার প্রতি আসক্তির সৃষ্টি হয়। আর এর থেকে মুক্তির উপায় হলো সালাত করা। একজন সম্যক গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে সালাত কর্ম করতে হয়। এখানে পন্ঞ্চ ইন্দ্রিয় পথে পাহাড়াদার নিযুক্ত করলে এই ইন্দ্রিয় পথে আগত বস্তুুটি কি, তা সালাতের গভীর নিরীক্ষণে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে হয়। আর এর ফলে আপনার সালাত প্রক্রিয়া গভীর হতে গভীরতর হবে। একাগ্র চিত্তে আপনি সালাত সমাধা করতে পারবেন। এতে আপনার দেহের মূল্যবান সম্পত্তি সুরক্ষিত থাকবে। ভাবছেন নিশ্চয়তা কে দেবে? ঐ যে বললাম - গুরুর কথা। একজন সম্যক গুরুই পারে আপনাকে নিশ্চিত নিরাভরণ সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন করার বিধান দিতে। গ্যারান্টি। ১০০% গ্যারান্টি। এখন আপনি মানবেন কি-মানবেন না সেটা আপনার এখতিয়ার।