পৃষ্ঠাসমূহ

রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৫

গাছ ও মানুষের কথা

অর্থি দৌড়ে এসে তার বাবাকে বললো - বাবা, বাবা দেইখ্যা যাও কি হইছে?

অর্থির আব্বু জামিল সাহেব একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। ইতিহাসের শিক্ষক হলেও দর্শন শাস্ত্রে তার অগাধ জ্ঞান। তিনি মনোযোগ সহকারে একটি বই পড়ছিলেন।সুফীবাদ চার তরীকার পীর অধ্যাপক খলীলুর রহমানের লেখা বড়ো আয়েশের ভংগিতে তিনি কেদারায় হেলান দিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে বই পড়ছিলেন। মেয়ের ডাক চিৎকার শুনে তিনি বইটি বুকের উপর রেখে তাকালেন

-কি রে মা ?

-বাবা আমি যেই গাছটা আনছিলাম, যে জলপা্ই গাছটা। ওইটাতে না ছোট ছোট দানা বাইর হইছে। মনে হয় এইবার অনেক জলপাই হইব। অর্থি দু হাত দিয়ে অনেক বড় ভংগিটা দেখালো

জামিল সাহেব মেয়ের আহ্ণাদ দেখে আনন্দিত চিত্তে মাথায় হাত রাখলেন। সামান্য একটি ঘটনা অথচ কতো আনন্দিত চিত্তে মেয়েটি তাকে দেখাতে নিয়ে যেতে চাইছে। তার এই মেয়েটি অল্পতেই আনন্দিত হয়। টানাটানির সংসারে মেয়ের সব আহ্লাদ পূরণ করতে পারেন না। রিপাদের বাড়ীতে জলপাই গাছ দেখে তার মনে শখ হয়েছে সেও একটা জলপাই গাছ কিনে এনে লাগাবে। জামিল সাহেব হারতার হাট থেকে একটা জলপাই গাছ কিনে এনেছেন তা প্রায় সাত/আট মাস হবে। তিনি ঠিক মনে করতে পারলেন না। সেই গাছটা কবে যে বড় হয়েছে সে খেয়ালও তার নেই। এরই মধ্যে ফল ধরেছে। শুনে তিনিও যেন আনন্দিত হলেন। তিনি আনন্দিত চিত্তে বললেন

-তাই না-কি? অনেক গুলা, এই এত্ত গুলা। তিনিও তার দু হাত প্রসারিত করে দেখালেন

দু'হাত প্রসারিত করায় অর্থি তার বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি বললেন

-চল মা। দেইখ্যা অাসি কত্ত গুলা জলপাই ধরবো?

অর্থি তার বাবা দু'জনেই সেই জলপাই গাছটি দেখতে যায়। গাছটি দেখে জামিল সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। তার ধারণাও ছিল না এতোটুকুন গাছে কিভাবে এত তাড়াতাড়ি বোল বের হতে পারে? অবশ্য গাছটি কেনার সময়ই মনির তাকে বলেছিল-স্যার এইগাছটা নিয়া যান। এইডা ভালো জাতের গাছ। ফল দিবো তাড়াতাড়ি
গাছটি নিয়ে তিনি যখন বাড়ীর পথ ধরছিলেন, সেই সময় পথে দেখা হয় ফজলু স্যারের সাথে। ফজলু স্যার হাবিবপুর কলেজে ইসলামী শিক্ষা পড়ান। দু'জনই একই কলেজে শিক্ষকতা করেন। গাছ দেখে তিনি বললেন

-কি ব্যাপার জামিল সাহেব? হটাৎ গাছ কেনা? তাও আবার জলপাই গাছ?

-মেয়ের বায়না। তার একটা জলপাই গাছ লাগবে। তাই কেনা? তা আপনি হটাৎ এদিকটায়? কি মনে করে?

-আসলাম শরীফ ভাইয়ের কাছে। খবর পাঠিয়েছে

-তাই?

-যাবেন নাকি ঐদিকটায়? অনেকদিন কোন কথা হয় না। তাছাড়া চিশতী সাহেবের কাছে গেলে ভালো লাগবে

-এই গাছ নিয়ে?

-তাতে কি? আরে চলেন ভাই। একা যেতেও ভালো লাগছে না। দুজনে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে

জামিল সাহেব আর না করতে পারলেন না। তিনি জলপাই গাছের চাড়া নিয়ে অগ্যতা রওনা হলেন শরীফ সাহেবের উদ্দেশ্যে। শরীফ সাহেব বারাহিগুণী দরবার শরীফের মুরিদ। চিশতী স্টোর নামে একটি বইয়ের লাইব্রেরী দিয়েছেন। কোনমতে এই দিয়েই তার সংসার চলে যায়। অত্যন্ত অমায়িক লোক। সকলেই তাকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে। কথা বার্তায় অসাধারণ
শরীফ সাহেব তার লাইব্রেরীতেই বসা ছিলেন। তিনি জামিল সাহেব ফজলু সাহেবকে দেখে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে সালাম দিলেন। কুশল বিনিময়ের পর তাদের বসার জন্য চেয়ার দিলেন। চায়ের কথা বলেই তার নযর পড়লো জামিল সাহেবের হাতে থাকা জলপাই গাছটির দিকে। তিনি জামিল ভাইকে গাছটির কথা জিগ্যাসা করায় ফজলু সাহেবই তার উত্তরটা দিয়ে দিলেন। জামিল সাহেব অপ্রস্তুত বোধ করায় শরীফ সাহেব বললেন

-আরে ভাই অাপনার মেয়েতো ভালো জিনিসই পছন্দ করেছে। জানেন গাছ সর্ম্পকে রাসুলে  পাক (সাঃ) কি বলেছেন? রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ" যে কোন মুসলমান বৃক্ষ লাগায় কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি বা মানুষ কিংবা চতুষ্পদ জন্ত্তু খায় তবে তা তার পক্ষ থেকে ছদকাস্বরুপ "[ (বুখারী শরীফ-পৃষ্ঠা নং৩৫১)] আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন শরীফে বলেছেনঃ" এবং আমি সৃষ্টি করি এক বৃক্ষ যা জন্মায় সিনাই পর্বতে, এতে উৎপন্ন হয় আহারকারীদের জন্য তেল ও ব্যন্ঞ্জন।" [সুরা মমিনুন আয়াতঃ২০]। 

শরীফ সাহেবের কথা শুনে ফজলু সাহেব বলে উঠলেন

আল্লাহ বলেন ‘এবং আমি সৃষ্টি করি এক বৃক্ষ যা জন্মায় সিনাই পর্বতে, এতে উৎপন্ন হয় আহারকারীদের জন্য তেল ও ব্যঞ্জন।’ (সূরা মমিনুন : ২০)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে গাছের নামে শপথ করেছেন এবং তদানুসারে সূরাটির নামকরণও করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, ত্বিন (এক জাতীয় বৃক্ষ) ও জায়তুনের (জলপাই জাতীয় এক ধরনের ফল) শপথ! (সূরা আত ত্বিন : ১)। - See more at: http://www.alokitobangladesh.com/islam/2013/09/11/21761#sthash.5eTt9r6c.dpuf
আল্লাহ বলেন ‘এবং আমি সৃষ্টি করি এক বৃক্ষ যা জন্মায় সিনাই পর্বতে, এতে উৎপন্ন হয় আহারকারীদের জন্য তেল ও ব্যঞ্জন।’ (সূরা মমিনুন : ২০)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে গাছের নামে শপথ করেছেন এবং তদানুসারে সূরাটির নামকরণও করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, ত্বিন (এক জাতীয় বৃক্ষ) ও জায়তুনের (জলপাই জাতীয় এক ধরনের ফল) শপথ! (সূরা আত ত্বিন : ১)। অতএব গাছপালা, বৃক্ষলতা আল্লাহ সুমহান কুদরতের অপরূপ নিদর্শন। - See more at: http://www.alokitobangladesh.com/islam/2013/09/11/21761#sthash.5eTt9r6c.dpuf
আল্লাহ বলেন ‘এবং আমি সৃষ্টি করি এক বৃক্ষ যা জন্মায় সিনাই পর্বতে, এতে উৎপন্ন হয় আহারকারীদের জন্য তেল ও ব্যঞ্জন।’ (সূরা মমিনুন : ২০)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে গাছের নামে শপথ করেছেন এবং তদানুসারে সূরাটির নামকরণও করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, ত্বিন (এক জাতীয় বৃক্ষ) ও জায়তুনের (জলপাই জাতীয় এক ধরনের ফল) শপথ! (সূরা আত ত্বিন : ১)। অতএব গাছপালা, বৃক্ষলতা আল্লাহ সুমহান কুদরতের অপরূপ নিদর্শন। - See more at: http://www.alokitobangladesh.com/islam/2013/09/11/21761#sthash.5eTt9r6c.dpufশরীফ সাহেবের কথা শুনে ফজলু সাহেব বললেন
- আরে ভাই আপনিতো বোখারী শরীফের হাদিসের কথা বলছেন? পবিত্র কোরআন শরীফেইতো আছে-জলপাই গাছ মানে জয়তুন বৃক্ষ। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন শরীফে সুরা নুর নামে যে সুরা নাযিল করেছেন তার ৩৫ নং আয়াতেইতো জয়তুন বৃক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত সুরায় বলা হয়েছেঃ" আল্লাহু নুরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্মাসালু নূরিহি কামিশকাতিন ফীহা মিস্বাহ ; আল মিসবাহু ফী যুজাজা।আযযুজাজাতুকা আন্নাহা কাওকাবুন দুর্রি-উই ইয়ু কাদু মিন শাজারাতিম মুবারকাতিন যাইতুনা।লা শারকিয়্যাতিন ওয়ালা গরবিয়্যাহ; ইয়া কাদু যাইতুহা ইয়ুদি~~ ওয়ালাও লাম তামসাসহু নার।নূরুন আলা নূর।ইয়াহদি আল্লাহু লিনুরিহী মাইয়্যাশা~~ ; ওয়া ইয়াদরিবুল্লাহুল আমসালা লিন্নাস; ওয়াল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িন আলীম। " অর্থ হচ্ছেঃ-"আল্লাহ হচ্ছেন আকাশ/স্বর্গ  পৃথিবীর আলো/নূর তাঁর নূরের উদাহরনটা যেন এরকম যে-  দেয়ালের একটি তাকের ( niche)  মধ্যে একটি ল্যাম্প ( প্রদীপ) আছে, প্রদীপটি আছে কাঁচের ভিতর।কাঁচটা ঠিক যেন একটি চকচকে উজ্জ্বল নক্ষত্র, এবং ( প্রদীপটিকে) জ্বালানো হয়েছে পবিত্র জলপাই গাছের তেল থেকে, যে তেল পূর্ব বা পশ্চিম কোন যায়গাতেই পাওয়া যাবেনা এই তেলটা এমন যে আগুনের সংস্পর্শ  না পেলেও এটি প্রায় (almost) প্রজ্বলিত হয়ে উঠে এবং আলো দেয়। আলোর উপর আলো ( Light Upon Light) আল্লাহ তাঁর নূরের দিকে তাঁর যাকে ইচ্ছা, বা যে তাঁর কাছে চায়,  পথ দেখিয়ে দেন। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরন/ উপমা ( Parable) দেন, আল্লাহ সব ব্যাপারে সব কিছু জানেন।
  
শরীফ সাহেব ইতিমধ্যে সবাইকে চা খাওয়ালেন। চা পানের পর ফজলু সাহেব কিছুটা বিশ্রাম পেয়ে আবার বলা শুরু করলেন
-দেখেন সুরা নুরে আল্লাহ পাক কতো সুন্দরভাবে নিজেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি হচ্ছেন "নুরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ" আসমান এবং জমিনের নুর। নুর মানে আলো। তার মানে আসমান এবং জমিনের আলো। কি বুঝলেন, জামিল সাহেব?
-শুনেন, আপনি বলছেন আল্লাহ আসমান এবং জমিনের নুর। মানলাম আপনার কথা। কিন্ত্তু কোরআন শরীফ আল্লাহ পাকের একটি বিজ্ঞানময়গ্রন্থ। এই গ্রন্থ সর্ম্পকে জানতে হলে আপনাকে পূর্বাপর বিষয়সমুহ ভাবতে হবে। যেমন ধরুন এই গ্রন্থ নাযিল হবার পূর্বে রাসুলে পাক হেরা গুহায় ধ্যান মগ্ন ছিলেন। সেই ধ্যানময় অবস্থাতেই কিন্ত্তু কোরআন নাযিল হয়। যে আয়াতগুলো নাযিল হতো তা রাসুলে পাকের (সাঃ) সাহাবারা লিখে রাখতেন। সেটাই যে আপনি পাচ্ছেন তার নিশ্চয়তা কি?

- আরে এটা আপনে কি বললেনরে ভাই? তার মানে আপনি এই কোরআনের উপর সন্দেহ প্রকাশ করছেন? আপনি জানেন-আল্লাহ পাক নিজেই এই কোরআন নাযেলকারি এবং তিনিই এর হেফাযতকারী। ফজলু সাহেব কিছুটা উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বললেন

-আরে না। আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি না। সংশয় প্রকাশ করছি। কারণ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিচার করতে গেলে দেখা যায় হযরত ওসমান (রাঃ) কর্তৃক প্রকাশিত কোরআন দেখে হযরত আলী (আঃ) বলেছিলেনঃ"হাযা কুরআনুস সামিত ওয়া আনা কুরআনুন নাতিকইহা নির্বাক (মতলেক) কোরআন আর আমি হলাম সবাক (নাতেক) কোরআন।ইতিহাসইতো বিভ্রান্তির জালে আমাদের আবদ্ধ করে রেখেছে

-ভাই, আপনি ইতিহাস মানবেন না আল্লাহ পাকের কালাম মানবেন? সুরা বাকারার ২নং আয়াতেইতো আল্লাহ পাক বলেছেনঃ আলিফ-লাম-মীম। যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফিহী হুদাল্লিল মুত্তাকিন। আলিফ-লাম-মীম ওটা সেই কেতাব যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ [ভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা, ভুল ধারণা] নেই। একটি পথ নির্দেশক (হুদা) আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সচেতনদের (মুত্তাক্বী) জন্য।”  ( সুরা বাকারা, আয়াত ) তো আপনি যদি মুত্তাকী হন, তাহলে তার প্রতি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকা উচিত নয়

-শুনেন, আপনি কিন্ত্তু আলিফ-লাম-মীম এর অর্থ না করেই এর অর্থ বিকৃত করলেন। অর্থাৎ আলিফ-লাম-মীম দ্বারা আল্লাহ পাক কি বুঝাতে চেয়েছেন, তার কোন ব্যাখ্যা দেননি। আলিম-লাম-মীম অর্থ আলে মীম। অর্থাৎ মুহাম্মদের বংশধর। সৃষ্টির শুরুই হয় মুহাম্মদী নুর হতে। এখানে মুহাম্মদের বংশধর বলতে নুরী বংশধর বোঝায়। কারণ আল্লাহ পাক দেহধারী কোন পুত্র সন্তান নেন না। যেটা আমরা সুরা ইখলাসে পাই। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ"আউয়ালা খালাক্কাল্লাহু নুরী ; আনা মিন নুরুল্লাহি ওয়া কুল্লু শাইইম মিন নুরী"। অর্থাৎ সর্বপ্রথম আল্লাহ আমার নুর সৃষ্টি করেন; আমি আল্লাহর নুর হতে এবং বিশ্বজগৎ আমার নুর হতে। এই নুর সর্ম্পকে জিলি তাঁর বিখ্যাত  "ইনসানুল কামিল" গ্রন্থে বলেছেনঃ"মুহাম্মদের হাক্কীকত এই যে, তাঁর এক নাম "আমারুল্লাহ (আল্লাহর হুকুম)" মহত্ত্ব পদবীতে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁকেই কেন্দ্র করে সকল সৃষ্টি আবর্তন করছে। বস্তুুতঃ তাঁর সত্তাই সকল সত্ত্বার ধারক বাহক। তাঁর প্রকৃত নামঃ "মুহম্মদ" পৈতৃক নামঃ আবুল কাসিম। তাঁর বর্ণনাঃ আবদুল্লাহ, তাঁর খিতাবঃ শামসুদ্দীন। জিলি আরো বলেছেনঃ আল্লাহ মুহাম্মদের রুপকে তাঁর স্বীয় নাম "বদীউল-ক্কাদীর ( সর্বশ্রেষ্ঠ স্রষ্টা)' নামের নুর হতে সৃষ্টি করে উক্ত রুপকে তাঁর অন্য নিজস্ব অন্য নাম 'মা্ন্নানুল-কাহির(মুহ্যমান দাতা)' নামের দ্বারা ধ্যান করেন। অতঃপর আল্লাহ রাসুলুল্লাহর রুপের উপর তাঁর অন্য নিজস্ব নাম 'লাতিফুল-গাফ্ফির  (ক্ষমাশীল প্রশ্রয়দাতা)' নামের আলোকপাত করেন। এই আলোক প্রক্ষেপণের ফলে 'মুহাম্মদ' নাম দ্বিখন্ডিত হয়। উহার এক অংশে বেহেশত এবং অন্য অংশে দোযখের সৃষ্টি হয়। তো আপনি সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশের অর্থ না করেই আপনার মতো করে ব্যাখ্যা করে দিলেন? আপনিতো আল্লামা ইকবালের কথা শুনে থাকবেন? তিনি কি বলেছেন? তিনি বলেছেনঃ
"তেরে যমীরপর যবতক না হো নুযুলে কিতাব
শেরা কে শাহে রাজী না সাহেবে কাশশাফ।"
অর্থঃ যতক্ষণ পর্যন্ত তব অন্তরে কেতাব অবতীর্ণ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বিখ্যাত তফসীরকার আল্লামা রাজীই আর বিখ্যাত তফসীরকার আল্লামা যামাকসারীই হোন কেউ এর মর্মগ্রন্থী খুলতে পারবে না
তাছাড়া আপনি যে আয়াতের অর্থ করলেন-তার দার্শনিক মতবাদ তুলে ধরতে আপনি ব্যর্থ হয়েছেন?
কথাগুলো বলে জামিল সাহেব একটু থামলেন। তিনি দেখলেন ফজলু সাহেব একেবারেই চুপ করে বসে আছেন। কিন্ত্তু শরীফ সাহেব মিট মিট করে হাসছেন। তিনি শরীফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন 

-কি শরীফ সাহেব? আমি কি কথাগুলো খারাপ বলেছি?

-কি যে বলেন, আপনি? সবইতো আমি শুনলাম। কিন্ত্তু আমি ভাবছি অন্য কথা

-আপনি আবার কি ভাবছেন? বিজয়ীর বেশে মুখে হাসি নিয়ে জামিল সাহেব জিগ্যেস করলেন?

-আমি ভাবছি যে জয়তুন গাছ নিয়ে এত কথা হলো সেই গাছটি দেখে আমার ভেতরের কথা মনে পড়লো

-সেটি কি রকম? জামিল সাহেব জিগ্যেস করলেন

-সেটা হলো আমাদের দেহগত বিষয় নিয়ে। আমাদের দেহে নফস,ক্কলব, রুহ,সির খফি, আগফা নামক ছয়টি লতিফা আছে। মেরুদন্ডকে কেন্দ্র করে এই ছয়টি লতিফা দুদিক দিয়ে বেঁকে গিয়ে উপর দিকে উঠে গিয়েছে। গাছটির দিকে লক্ষ্য করেন। দেখেছেন

শরীফ সাহেবের কথা শুনে জামিল সাহেব গাছটির দিকে ভালো করে তাকালেন। সত্যিই তো। শরীফ সাহেব আবার বলতে শুরু করেছেন

-দেখেন আমাদের দেহের দিকে। এখানে নফস, ক্কলব, রুহ, সির,খফি আগফা। ছয়টা পাতা। ছয়টা লতিফা। কোরআনে বর্ণিত যে গাছের কথা বলা হয়েছে সেটা আমাদের এই দেহের ভেতরই অবস্থিত। আল্লাহর কোরআন এই দেহেই নাযিল হয়। সেটার কথাই কোরআনে রুপকভাষায় বর্ণিত হয়েছে। রুপক না বুঝলে আসল কোরআন বুঝা মুশকিল। কারণ আমার বাবাজান তাঁর চিশতী উদ্যানে বলেছেন-

তোমাকে বুঝাইবার তরে
এই সকলই পয়দা করে
সকলরুপই তুচ্ছ জান 
তার রুপেরই ছামনা। 

তিনি আরো বলেছেনঃ
কেতাব তো ভাই মানুষ নয়
নিত্য নতুন কথা কয়
ভবের ভাবুক হইয়া কেন
কেতাব দেখনা।

যখন এই গাছটিকে লালন পালন করা হয় তখন সেখানে বাসা বাঁধে অচিন পাখি। নানান ভাষায় কথা কয়। গান গায়। সেই গান শোনা যায়। সেই কথা সেই গান শোনার জন্য চাই একাগ্রচিত্তে শ্রবণ করা। নীরবে নিঃশব্দে শুনতে হয় সেই গান
হৃদয় বনে অতি গোপনে
একার বাঁশি শুনেছি প্রাণে
জামিল সাহেব অবাক দৃষ্টিতে একবার শরীফ সাহেবের দিকে আরেক বার জলপাই গাছটির দিকে তাকিয়ে রইলেন

-এ্যই বাবা কি হইছে? তুমি কথা বলছো না কেন?

অর্থির ধাক্কায় জামিল সাহেব চমকে উঠেন। সেই কবে এই গাছটি তিনি মেয়ের জন্য কিনে এনেছিলেন। আনার পথে কতো কথা কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই গাছটির সাথে। মেয়ের মমতায় স্বস্নেহে গাছটি আজ ফল দিতে শুরু করেছে। প্রতিদিন সকালে পানি দিতে দেখেছে মেয়েকে। যত্ন নিতে দেখেছে গাছটির। তিনি কি পারবেন সেই ভাবে শরীফ ভাইয়ের মতো করে তার দেহের এই জয়তুন বৃক্ষের যত্ন নিতে। সে প্রশ্নটাই এখন তাকে ভাবিয়ে তুলছে

শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৫

নৌকা ও মাছ শিকার

চারদিকে শীতের তীব্র প্রকোপ। কুয়াশার চাদরে ঢাকা। গাছের পাতায় শিশির বিন্দু জমে জমে টিনের চালে পড়ছে। টুপ টুপ শব্দ হচ্ছে। নিশুঁতি রাতের আঁধারভেদ করে জমির মিয়ার ঘরে জ্বলছে মিটি মিটি হারিকেনের আলো। জমির মিয়া দেখলেন কাঁথা মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন শহিদা। তিনি আস্তে আস্তে শহিদাকে ডাকলেন

-ও শহিদা, শহিদা..


শহিদা তার স্ত্রী। গ্রামের বাড়ী মান্ডা। তাদের পাশের গ্রাম। তার বাবা মজিদ ভান্ডারী। বেশ নাম ডাক রয়েছে লোকটার। শক্ত পোক্ত দেহের গঠন। দেখলেই বোঝা যায় কঠোর পরিশ্রমী একজন মানুষ। শখ করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন জমিরের সাথে। জমিরের বাবা মোসলেম ফকিরের সাথে তার অনেক মিল। দুজনেই যেন দু'জনার। সময় সুযোগ পেলেই খোশ গল্পে মেতে ওঠেন। প্রায়ই তাদের মধ্যে দেহতত্ত্ব নিয়ে কথা হয়। বিনিময় হয় ভাবের। কিন্ত্তু এসব ব্যাপারে জমিরের তেমন কোন আগ্রহ নেই। সে জানে নৌকা বাইতে আর মাছ শিকার করতে। আজো যাবার জন্য তিনি ব্যস্ত হয়েছেন। সারা শরীরে সরিষার তেল মালিশ করেেছন। বুকে ভালো করে মালিশ করেছেন।যাতে ঠান্ডা বসে না যায়। ভালো করে মাথায় উলের টুপি পড়েছেন। গায়ে দিয়েছেন সোয়েটার আর চাদর। চাদর ভালো করে পেঁচিয়ে হাতে মাছ ধরার জালটা নিয়ে বের হবেন ঠিক তক্ষুণিই মনে পড়লো বৈঠার কথা। তিনি আবারো শহিদাকে ডাকলেন-

-শহিদা ও শহিদা....

শহিদা কাঁথার ভেতর থেকে মাথা বের করে বললো-

-কি হইছে? এমুন রাইত দুপুরে চিল্লাইতাছো ক্যা?

-আরে বৈঠাটা কই রাকছো?

-বৈঠাতো দাওয়ায় আছে। ভালো কইর‌্যা খু্‌ইঁজ্যা দেহো?

জমির আর দেরী না করে তাড়াতাড়ি দাওয়ায় যায়। যেয়ে দেখে বৈঠাটা একটা কোণের কাছে রাখা। বৈঠা হাতে নিয়েই জমির রওনা দেয় মাছ ধরতে। বাড়ীর দরজাটা আস্তে করে ভিড়িয়ে দিয়েই সে হাঁটা শুরু করলো।

জমিরের অপেক্ষায় থাকা হরিধর পাল তখন নৌকার সামনে ঘাটে অপেক্ষা করছে।জমিরের আসতে দেরী দেখে সে ম্লান মুখে বসে রইল। তার সাথে আসা কিষান বললো

-শালার পুতে কি করে এতক্ষণ ধইর‌্যা? হেই কহন থিক্যা বইয়্যা রইছি?

-কে জানে? মরছে নি? হরিধর পালের জবাব।

-কি যে কওনা দাদা...ঐ হালায় মরলে ওর বউয়ের কি অইবো?

-হেইডা লইয়া তর চিন্তা করা লাগবো না?

হরি আর কিষাণের কথোপকথনের মাঝে জমির এসে উপস্থিত হয়। জমিরকে দেখেই হরিধর পাল বলে ওঠে

- কি রে আ্যতো দেরী করলি ক্যা।

- কি আর কমু দাদা বৈঠা পাইতাছিলাম না। খুঁজতে যাইয়্যাইতো দেরী অইয়্যা গেল।

-অইছে। আর কওন লাগবো না। নে তাড়াতাড়ি নৌকা ছাড়। আরে ঐ কিষাইন্ন্যা কই গেলি? তাড়াতাড়ি আয়।

হরিধর পালের গলার আওয়াজ পেয়ে কিষাণ তাড়াতাড়ি প্রসাবের কাজ সেরে নৌকায় ওঠে।

-নে নৌকা ছাড়...

হরিধর আর কিষাণ মাছের জাল গুছিয়ে নিচ্ছে। জালের ভাঁজগুলো ঠিক মতো পড়লে মাছ ধরে বেশি। ঠিক মতো না পড়লে ফাঁকে ফোঁকে মাছ বেড়িয়ে যায়। জমির নৌকা বাইতে বাইতে পদ্মার মাঝ বরাবর চলে গেল। পদ্মায় শীত কালে তেমন তেজ থাকে না। কিন্ত্তু তারপরও পদ্মা বলে কথা। শীতের কুয়াশায় পুরো গাঙ্গে তখন চাদর মুড়ি দেয়া। ঢেউ নেই বললেই চলে। তারপরও হাল্কা ঢেউ এসে নৌকাটা দেলাচ্ছে। ঢেউয়ের স্রোতে যখন নৌকায় এসে বারি খাচ্ছে তখন ছপাৎ ছপাৎ করে শব্দ হচ্ছে। সেই শব্দে কেমন যেন মনটা চনমন করে ওঠে।

আকাশে আধো জোস্নায় ভরা পুরো পদ্মা তখন এক মায়াজাল তৈরী করেছে। জমির নৌকার হাল ধরে আছে শক্ত করে। বৈঠাটা তখন তার হাতের মুঠোয় থাকে। সে যেদিকে বৈঠা ঘোরায় নৌকাটা সেদিকেই মোড় নেয়। জমির মুগ্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জোস্না দেখছিল। চারদিকটায় ভালো করে তাকিয়ে দেখে তার মনটা কেমন যেন করে উঠলো। হরিধর পাল আর কিষাণ কাছা মেরে নদীতে জাল ফেলতে লাগলো। জমির তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো তাদের দুজনকেই। কেমন যেন অপরিচিত লাগছে। কিষাণ গুণ গুণ করে গান গাইছে.....তোমারও লাগিয়ারে সদাই প্রাণ আমার কান্দে বন্ধুরে প্রাণ বন্ধু কালিয়ারে.... কিষাণের গানের গলা খারাপ না। কিন্ত্তু সেই গানটায় যেন প্রাণ পেয়েছে....সেই প্রাণের ছোঁয়ায় জমির হারিয়ে যায় তার অতীত স্মৃতিতে...

জমিরের বাবা মোসলেম ফকির আর শহিদার বাবা মজিদ ভান্ডারীর সাথে বেশ মিল ছিল। তারা প্রায়ই একে অপরকে পেলে হারিয়ে যেত গভীর তত্ত্ব কথায়। তাদের কথা জমির প্রায়ই শুনতো কিন্ত্তু কিছুই বুঝতো না। তার এখনো মনে আছে মজিদ ভান্ডারী যখন কথা বলতো তখন মনে হতো সে যেন কোথায় হারিয়ে যেত। বুজলেন বিয়াই...মরা গাঙ্গে মিন থাকে না। জোয়ারের টানে মিন আসে। সেই মিন ধরতে অয় বরশি দিয়া। বরশি দিয়া মিন শিকার করতে পারলেই কেল্লা ফতে...যখন নদীতে বান ডাকে তখন নৌকা চালাইলে ডুইব্যা যাইবার ভয় থাকে। নৌকা তখন তীরে ভিরাইয়্যা রাখতে হয়। কি বুঝলেন বিয়াই সাহেব? হুনেন বিয়াই সাব...নৌকা হইলো এই দেহটা আর বরশি হইলো পুরুষের বিশেষ অংগ। হেই বরশি দিয়া মিন শিকার করা লাগে.....আরেকটা কথা। আপনে যখন বরশি দিয়া মাছ ধরতে যান, তার আগে কি করেন? পরথমে বরশিতে আদার দেন। তারপর বরশি ফালান। বরশিতে যে টুনি থাকে হেডার দিকে চাইয়্যা থাকেন। যেই টুনি তলার দিকে যায় অম্মনিই আপনে বরশি টান দেন। আর টানের চোটে আদার খাওয়া মিন উইঠ্যা আহে। এইহানে এই যে আপনে টুনির দিকে তাকাইয়্যা রইলেন এইডাই অইলো মুরশিদের বরযোখ। মুরশিদের বরযোক বিনা মিন ওডে না। মুরশিদের বরযোক দিয়াই মাছ শিকার করা লাগে...টুনিডাই অইলো মুরশিদ....

জমির যেন সেই কথার মানে খুঁজে পাচ্ছে আজ। এই পরিবেশে তার কাছে তখন স্পষ্ট হতে শুরু করছে নৌকা, মাছ ধরা আর মাঝি মাল্লাদের, জাল দ্বারা মাছ শিকার করার তাৎপর্য।

সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৫

বোয়াল মাছের গল্প

রহিম সাহেবের বেয়াল মাছ খুব পছন্দ। মাছ হিসেবে বোয়াল মাছ রাক্ষুসে প্রজাতির। কিন্ত্তু তাতে কি? মাছ রাক্ষুসী হোক কিংবা খোক্ষসী হোক-খেতে স্বাদ হলেই হলো। তাতে আর কি যায় আসে। তাছাড়া অনেকদিন থেকেই তার ইচ্ছে যে দিন পেনশনের টাকা পাবেন সেদিন নিজে গিয়ে বড় দেখে একটা বোয়াল মাছ কিনবেন। আকলিমাকে বলবেন-খুব সুন্দর করে পাকানো (রান্না)র জন্য। আজ তার সেই দিন এসেছে।গতকালকে তিনি পেনশনের টাকা তুলেছেন। অফিসের কলিগদের মিষ্টি কিনে খাওয়ালেন। বাড়ীর জন্য মিষ্টি কিনেছেন। নাতিদের জন্য হরলিক্স, দুধ আর চকলেট কিনেছেন। কিন্ত্তু মাছ কেনা হয়নি। আজ কিনবেন। তাই খুব সকালে ভোরে উঠে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন। ফযরের নামায পড়েছেন। নামায শেষ করেই সকালে হাঁটতে বেড়িয়ছেন। পুব আকাশে তখনো খানিকটা লাল আভা রয়ে গেছে। মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। হাঁটতে তার বেশ লাগছে। পদ্মার পাড় ঘেঁষে ভাগ্যকুল বাজার। সেই বাজারে পদ্মা থেকে ধরে আনা নানান প্রজাতির টাটকা মাছ পাওয়া যায়। অনেক দুর দুরান্ত থেকে লোকজন এই বাজারে সদায় করতে আসে। হাঁটা শেষ করেই তিনি মদনলালের দোকানে ঢুকলেন সকালের নাস্তা করার জন্য। নাস্তা হিসেবে সকালে রুটি আর ভাজি খারাপ না। সাথে এককাপ চা। তিনি দোকানে ঢুকতেই মদনলাল বললোঃ

-দাদা নমস্কার।

-নমস্কার। কেমন আছ মদন? সব ভালোতো?

-হ দাদা। ভাল আছি। তয় আপনে এত সকালে কি মনে কইর‌্যা আইলেন?

-আসছি মাছ কিনতে। এখানে বোয়াল মাছ পাওয়া যাবে না?

-দাদা বোয়াল মাছতো পাওয়া যাইব কি-না কইতে পারমু না।

-কেন। জামাল না বড় বড় মাছ আগে বিক্রি করতো? ওর কাছে গেলে পাওয়া যাবে না?

-জামাইল্যা তো হুনছি অনেক পদের মাছ বিক্রি করে। ওর কাছে যাইয়্যা দেকতে পারেন দাদা।

-ঠিক আছে।যাব। এখন তুমি আমাকে রুটি আর ভাজি দাও।

-দিতাছি দাদা।

মদন দ্রুত পায়ে চলে গেল নাস্তা আনার জন্য। রহিম সাহেব তাকিয়ে আছেন পদ্মার দিকে। পদ্মার এক সময় ভয়ংকররুপ দেখে অনেকেরই ভয়ে প্রাণ কাঁপতো। আজ আর পদ্মার সেই বিশালতা নেই। নেই তর্জন গর্জন। আছে কেবল হাড্ডি কংকালসার জরাজীর্ণ শীর্ণ দেহটা। দেখলে মনে হয় অনাহারে আছে। অথচ এক সময় এই প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে বয়ে যেতো পাল তোলা নৌকা। বড় বড় স্টীমার, জাহাজ।আরো কতো কি? বিশেষ করে গুণটানা নৌকা। নৌকায় একজন হাল ধরে বসে আছে আর দুই তিন বা চারজন দাঁড় টানছে। কেউবা মনের সুখে গান গাইছে। দেখতে কতো ভাল লাগতো। আজ আর সেই যুগ নেই। যুগ পাল্টেছে। এখন চলে যন্ত্রচালিত সব নৌযান। ভট ভট করে চলে নদীর বুক চিরে......

-দাদা এই নেন নাস্তা। চা দিমু?

-একটু পরে দাও।

রহিম সাহেব দ্রুত নাস্তা শেষ করলেন। চা-টা একটু দ্রুত খাবার চেষ্টা করছেন। চা-টা শেষ করেই তিনি দ্রুত জামালের কাছে যাবার চেষ্টা করছেন।খাবারের বিলটা দেবার জন্য তিনি পকেট থেকে টাকা বের করলেন। বিল চুকিয়ে দিয়েই তিনি মদনকে বললেনঃ

-মদন আসিরে।পরে দেখা হবে।

-ঠিক আছে দাদা। আবার আইসেন।

কথা না বাড়িয়ে রহিম সাহেব বের হয়ে আসলেন। বাইরে তখনো পুরোপুরি রোদ তার পাখা মেলতে শুরু করেনি। আস্তে আস্তে পেখম তুলছে। নরোম রোদের হাল্কা ছোঁয়া ভালোই লাগছে তার। তার উপর সকালের নদীর দৃশ্যটা মনোরোম দেখায়। গাংচিলের হুড়োহুড়ি...নানা পাখ-পাখালির কল-কাকলি দৃশ্যটাকে উপভোগ্য করে তোলে।দুর থেকে দেখতে পেলেন জেলেরা মাছ ধরে নৌকাগুলো কূলে ভেরাচ্ছে। রাশি রাশি ইলিশ মাছ। মাছের উপর হাল্কা রোদ পড়ায় কেমন চকচক করছে রুপালী ইলিশ।

রহিম সাহেব হাঁটতে হাঁটতে সেদিকটায় গেলেন। জেলেরা আড়তে মাছ উঠাতে ব্যস্ত। মাছের খাঁজি মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে আড়তের দিকে। আড়তের মহাজন শ্যামলাল আড়ষ্ট ভংগিতে বসে আছেন গদীতে। পাশেই তার ক্যাশিয়ার মধুমিয়া মাথা নুইয়ে লেখায় ব্যস্ত। অন্য দু'জন মাছ গণনায় ব্যস্ত। তিনি উঁকি ঝুঁকি দিয়ে জামালকে খোঁজার চেষ্টা করছেন। কিন্ত্তু জামালকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি মহাজন শ্যাম লালের আড়তে ঢুকে জামালের কথা জিগ্যেস করলেন। শ্যামলাল রহিম সাহেবকে দেখে বললেনঃ

-আদাব দাদা। কেমন আছেন?

-ভালো। মাছের আমদানীতো বেশ ভালেই মনে হচ্ছে।

-আছে আপনাদের দোয়ায়। তয় আগের মতো না। আগেতো অনেক মাছ পাওয়া যাইতো। এহনতো আর আগের মতো পাওয়া যায় না।

-যা পাওয়া যায় তাই বা খারাপ কি?

-মন্দের ভালো। হা ..হা..

শ্যামলাল অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। তার হাসি শুনে আশে পাশের কুলি মজুররা তার দিকে তাকালেন। মাথা উচু করে মধু মিয়াও তাকালো। পরক্ষণেই আবার যার যার কাজে মন দিল। রহিম সাহেব বুঝলেন তার ব্যবসা খুব একটা খারাপ যাচ্ছে না। তিনি মধুকে জিগ্যেস করলেনঃ

-মধু মিয়া জামালকে দেখেছো? আসছে নাকি আজ?

-না ভাই। জামাইল্যারে তো দেকতাছি না। আইবো নে।

-ওহ। রহিম সাহেবের কন্ঠে খানিকটা হতাশার ভাব ফুটে উঠলো।

-দাদা জামাইল্যারে খুঁজতাছেন কেন? কোন দরকার? মধু জানতে চাইলো।

-দরকার আছে।

-বহেন আইবো নে। মধু কিছুটা হলেও আশার বাণী শুনালেন। রহিম সাহেব আড়তে বসেই দেখতে পেলেন জামাল আসছে। কিন্ত্তু তার মাথায় বা হাতে কিছুই নেই। অনেকটা হতাশা নিয়েই বসে আছেন। জামাল আড়তে ঢুকেই শ্যামলালকে দেখেই বললেনঃ

-আদব দাদা। কেমুন আছেন।

-আছি ভালো। তর জন্য রহিম ভাই অনেকক্ষণ ধইর‌্যা অপেক্ষা করতাছে।

 রহিম সাহেবকে দেখে জামাল বললোঃ

-আসসালামুআলাইকুম। দাদা ভালো আছেন?

-আছি ভালো।

-আপনে নাকি আমারে খুঁজতাছেন?

-হ্যাঁ।

রহিম সাহেব কিছুটা হলেও অপদস্ত বোধ করলেন। এই ভাগ্যকুলে এমন কেউ নেই যারা তাকে না চেনে। তিনি হরলাল সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তার অনেক ছাত্র-ছাত্রী এই দেশের অনেক নামী-দামী সরকারী কর্মকর্তা। অনেকেই আবার বিদেশে অাছেন। তাকে আগে সালাম না দিয়ে শ্যামলালকে সালাম দেয়ায় তিনি কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হলেন। প্রথমে ভাবছিলেন কিছু বলবেন না। আবার ভাবলেন এই ভাগ্যকুল বাজারে জামালই সবচেয়ে বড় বড় মাছ ধরে বিক্রি করে। ওর কাছেই সবাই বড় মাছের জন্য অর্ডার দেয়। ওর এই গুণের কদর সর্বত্রই। তাই তিনি তার সিধান্ত পরিবর্তন করে বললেনঃ

-তোমাকে খুঁজছি মাছের জন্য। বোয়াল মাছের জন্য। অনেক দিনের ইচ্ছে একটা বোয়াল মাছ কিনবো। তাই তোমাকে খুঁজছি।

-দাদা এইর লাইগ্যা খুঁজতাছেন? বোয়াল মাছতো খুব বেশি একটা পাওয়া যাইবো না। তয় উত্তর পাড়ায় আইজ একটা ডেংগায় যামু। ঐখানে হয়তো পাওয়া যাইতে পারে।

-কখন যাবে?

-এইতো একটু পরেই যামু। ঘন্টা দুয়েক লাগবো।

-ঠিক আছে। আমি তোমার জন্য ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করবো। তুমি মাছ পেলে আমার বাড়ীতে দিয়ে আসবে।দাম যা হয় দিয়ে দিব।

-হেইড়া আমারে কইতে অইবো না।

-ঠিক আছে। তাহলে আমি অাসি।

রহিম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তাকে উঠতে দেখেই শ্যাম লাল তাকে চা-খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলো। মধুকে চায়ের কথা বললেন। মধু ক্যাশ থেকে টাকা বের করে চা আনতে পাঠালেন। চা খেয়েই রহিম সাহেব বেড়িয়ে পড়লেন। বাজারে গিয়ে বড় দেখে একটা লাউ কিনলেন। লাউ হাতে নিয়ে তিনি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ীর পথ ধরলেন। বাড়ীতে পৌঁছিয়ে তিনি আকলিমাকে ডাকলেন। সুর্য তখন তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। আকলিমা খুব ভোরেই উঠে। ঘর-দুয়ার গোছগাছ করে রাখে। উঠোন ঝাড়ু দেয়। কলপাড়ে গিয়ে থালা বাসনকোষন পরিস্কার করে ধুইয়ে রাখে। চারদিকে বেশ একটা পরিস্কার পরিচ্ছন্নভাব লক্ষ্য করা যায়। এই পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার মাঝেই কেমন যেন একটা প্রশান্তি বিরাজ করে। তিনি আবারো আকলিমাকে ডাকলেন। স্বামীর ডাকের শব্দ পেয়েই আকলিমা উঠে দাঁড়ালেন। দেখলেন তার স্বামী একটি বড় লাউ কিনে এনে বৈঠকখানার মাঝে রেখেছে। অন্য কোন মাছ বা তরিতরকারী না দেখে তিনি খুব আর্শ্চয্য হলেন। আকলিমা তার স্বামীকে জিগ্যেস করলেনঃ-

-কি ব্যাপার? খালি একটা লাউ আনছো? আর কিছু লাগবো না? খালি লাউ দিয়া কি করমু?

আকলিমার গলায় কেমন যেন একটা খেদ মিশানোর ঝাঁজ পেয়ে রহিম সাহেব কিছুটা ইতঃইস্ত করে উঠলেন। খানিকটা ঘাবরিয়ে গেলেন। অতঃপর বললেনঃ-

-মাছের কথা জামালকে বলেছি। জামাল ঘন্টা খানেক পরেই মাছ পাঠিয়ে দেবে।

আকলিমা আর কথা না বাড়িয়ে লাউটা হাতে করে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন। রহিম সাহেব কল পাড় গিয়ে হাত-মুখ ভালো করে ধুলেন। পরে চোখে মুখে বার বার পানির ঝাঁপটা দিলেন। শুনেছেন-চোখে মুখে ভালভাবে পানি দিলে চোখ ভাল থাকে। চোখের ময়লা আবর্জনা দুর হয়ে যায়। মন শান্ত হয়। হাত মুখ ধুইয়ে তিনি কল পাড় হতে বারান্দায় এসে হাত-মুখ মুছলেন। টেবিল হতে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে পত্রিকায় মনোনিবেশ করলেন। অধিকাংশ খবরই বেশ গুরুত্বহীন। দেশে এই হচ্ছে। ঐ হচ্ছে। হামতাম করা মন্ত্রীদের বিরক্তিকর কটুক্তি শুনতে শুনতে দেশের জনগণ অতিষ্ঠ প্রায়।
মাথার উপর রোদ বেশ চড়ে বসেছে। কেমন যেন শরীরে বেশ জ্বালা ধরাচ্ছে। উঠানে রোদের আলো পড়ায় কেমন যেন ঝলমল করছে। মোরগ মুরগীগুলো কেমন যেন খুঁটে খুঁটে খাবার খাচ্ছে। ডালিম গাছের উপর বসা দুটি চড়ুই পাখি খুনসুটি করছে। রহিম সাহেব পত্রিকা বন্ধ করে সেদিকটায় তাকিয়ে রইলেন।

-চাচা বাড়ী আছেননি?

হাশেমের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। রহিম সাহেব বললেনঃ-

-কে হাশেম?

-জ্বে চাচা। আপনের লিগা মাছ পাডায় দিছে।

হাশেমের হাতে একটি বড়ো সড়ো বোয়াল মাছ দড়ি দিয়ে বাঁধা। সাদা পেটটা ঝলমল করছে। উঁচু হওয়া পেটটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন মনটা স্যাঁৎ করে উঠলো।

-কি রে? এত বড় মাছ কোথা থেকে আনলি?

- জ্বে চাচা ওই উত্তরপাড়ার ডেংগা হেচতে যাইয়া পাইছি।

-ঠিক আছে। মাছটা রেখে যা। দাম কতো কিছু বলছে?

-না। কিছু কয় নাই। খালি কইছে মাছটা আপনের কাছে দিতে।

-ঠিক আছে। রেখে যা। আমি জামালের সাথে কথা বলে টাকা দিয়ে দেব। আর শোন্ টাকা নে।  নাস্তা করিস।

-জ্বে আইচ্ছ। বলে হাশেম বেড়িয়ে গেল। 

হাশেমকে বিদায় করে দিয়েই তিনি আকলিমাকে ডাকলেন। আকলিমা তখনো রান্না ঘরে বসে কি যেন কাটাকুটি করছিল। হাশেমের গলার আ্ওয়াজ পেয়ে সেও আসতে চাইছিল। কিন্ত্তু আসতে পারে নাই। হাতের কাজ শেষ করেই সে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বোয়াল মাছ দেখে সে চমকে উঠলো। এত বড় বোয়াল মাছ? সে অনেকটা আর্শ্চয্য হয়েই জিগ্যেস করলো?

-তোমাকে না বলেছিলাম পেনশনের টাকা পেলে বড় দেখে একটা বোয়াল মাছ কিনবো? তাই আনলাম।

-তাই বইল্যা এত বড় বোয়াল লাগে? ছোট দেইখ্যা একটা আনলেইতো পারতেন? খামাখা কতোগুলা টাকা নষ্ট।

-আরে রাখ তোমার টাকা। মাছটা ভাল করে রান্না কর।

আকলিমা মাছটা নিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেল। বটি দিয়ে মাছটি কাটার আগে বেশ করে কয়েকবার ঘষে নিল। আকলিমা মাছ কাটা আরম্ভ করে দিয়েছে। রহিম সাহেব দাওয়ায় বসে মাছ কাটা দেখতে লাগলেন। মাছের পেটটা কাটতে গিয়ে খেয়াল করলেন উঁচু হওয়া মাছের পেটের ভেতর আরেকটা মাছ। বোয়াল মাছটা বোধকরি এই ছোটমাছটিকে গিলে খেয়েছিল। মাছটিতে তেমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলো না। মাছটিতে পচন ধরেনি। হয়তো ধরা পড়ার আগে এই মাছটিকে গিলে খেয়েছিল। প্রাণটা বোধকরি এখনো ক্ষাণিকটা আছে। মাছটির কানসার দু দিকটা একটু আধটু লাফাচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণ পরেই জানটা চলে যাবে। রহিম সাহেব উত্তর পাড়ার মাওলানা সাহেবের ওয়াজে শুনেছিলেন-ইউনুস নবীরে প্রথমে একটা মাছে খাইল। হেইমাছটারে আরেকটা বড় মাছে গিল্ল্যা খাইলো। আশি হাত পানির নিচে। চল্লিশদিন পর্যন্ত মাছের পেটে। উইথআউট অক্সিজেন। বাতাস নেয়ার কোন ব্যবস্থা নাই। কেমতে আল্লায় ইউনুস নবীরে বাচাইয়া রাখলো? কি মিয়া সাব রা? কথা কন না ক্যা? আল্লাহয় ইচ্ছা করলে কি-না করতে পারে। আল্লায় তাকে একটা দোয়া শিখাইয়া দিল। যেইড়ারে আমরা দোয়া ইউনুস কই - " লাইলাহা ইল্লা আনতা ছুবহান্নাকা ইন্নি কুনতু মিনাজজোয়ালেমিন "। এইডা পাঠ কইর‌্যা ইউনুস নবী বাইচ্চ্যা রইলো। কেমতে? এই দোয়া পাঠ করায় মাছের পেটে জ্বালা যন্ত্রণা আরম্ভ অওয়ায় মাছটা বমি কইর‌্যা দেয়। ইউনুস নবী জিন্দা বাইর অইলো ঐ মাছের পেট থিক্কা। পেট থিক্কা বাইর অইয়্যা কি খাইবো? চাইর দিকে চাইয়া দেহে খালি বালি আর বালি। খাওনের কিছুই নাই। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাইলো-মাবুদগো। তুমিতো আমারে বাচাইছো। এহনতো না খাইয়া জানটারে বাচাইতে পারুম না। কি করুম? আমার আল্লায় রহমানের রাহিম। তিনি কাউরে না খাওয়াইয়্যা রাখেন না। তিনি কি করলেন - দুজন ফেরেস্তা দিয়া লাউ গাছের বিচি পাাড়াইয়া দিয়া কইলেন- এই ফেরেস্তা যা তোরা। আমার দোস্তরে এই লাউয়ের বিচি দিয়া কইবি লাগাইতে। হেই লাউ খাইলেই তার শান্তি আসবো।

রহিম সাহেব মাওলানা সাহেবের ওয়াজ শুনে এ ব্যাপারে বিভিন্ন কোরআনের তফসীর পড়েছেন। কিন্ত্তু কোন সদুত্তোর পাননি।তিনি সুজন শাহ্ কে এব্যাপারে জিগ্যেস করেছিলেন। সুজন শাহ তার বন্ধু মানুষ। তিনি লালন শাহের ভক্ত এবং আশেক। তিনি তার গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাকে জিগ্যাসা করায় সে স্মিত হাস্য বদনে বললেন-রহিম ভাই, এ সামান্য ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না? এটাতো খুব সিম্পল ব্যাপার। বোয়াল মাছটা হচ্ছে রুপক ভাষায় আমাদের বাহিরের দেহটা। আর ছোট মাছটা হচ্ছে - আমাদের হৃদপিন্ড আর ইউনুস নবী রুপকার্থে ইনসানুল কামিল। আর লাউ খাওয়ার অর্থ হচ্ছে স্তন পান করা.... এ কথা বলেই সুজন শাহ হাসতে শুরু করে দিলেন। তার হাসির পরিমাণ আরো বিস্তৃত হলো যখন দেখলেন - রহিম সাহেব থ মেরে বসে রইল।

সেই কবেকার ঘটনা। সেটাই আবার নতুন করে মনে পড়লো আকলিমার মাছ কাটতে দেখে। তিনি একবার মাছের দিকে তাকালেন আরেকবার তাকালেন সত্যিকার লাউয়ের দিকে..কেমন যেন মনের মধ্যে ঢেউ খেলে যাচ্ছে।

শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৫

টু-লেট

 টু-লেট
বাসা ভাড়া দেওয়া হইবে।
৪ রুম। ড্রইং,ডাইনিং, প্রশস্ত বারান্দা, এটার্চবাথসহ।
যোগাযোগ করুনঃ-
রোড নং-৭৮৬ হাউস নং-১৫২
মহাখালী,ঢাকা।
টুলেটের এই বিজ্ঞাপনটি দেখে চোখ আটকে গেল আবীরের। সে পাশের দোকান থেকে জেনে নিতে চাইল ঠিকানাটা কোন দিকে। দোকানদার তার পান খাওয়া লাল ঠোঁট দুটি বাঁকিয়ে বললো- ঐ যে দেকাতছেন বড় রোডটা তার ভিতরে গেলেই দেকবেন একটা পাকা মসজিদ আছে। মসজিদের সামনের গলির পরের গলিটায় গেলেই দেকবেন বড় একটা বিল্ডিং আছে। রব সাবের বাড়ী। ঐহানে যাইয়া জিগাইলেই পাইবেন। ঐ গলিতে যারে জিগাইবেন রব সাবের বাড়ী কোনডা তাইলেই সবাই দেহাই দিব। বিরাট পয়সাওয়ালা মানুষ। দীলওয়ালা। সবাই তারে চিনে।
আবীর মনে মনে ঠিকানাটা মুখস্ত করে নিল। রব সাবের বাড়ী।পাকা মসজিদের সামনে। বড় দিলওয়ালা মানুষ। কাউকে কিছু না বলে আবীর ঠিকানা খুঁজে বের করার জন্য হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে সে বড় রাস্তাটা পেরিয়ে পাকা মসজিদটা দেখতে পেল। মসজিদটা দেখেই কেমন যে হা হয়ে গেল আবীর। মসজিদটির মুল ফটকের সামনে বড় করে  লেখা " বায়তুল আতীক" অর্থাৎ প্রাচীন মসজিদ। অথচ মসজিদটিকে তার কাছে কোন মতেই প্রাচীন বলে মনে হচ্ছে না। আধুনিক কারুকাজ করা এ মসজিদটিকে কি কারণে বায়তুল আতীক নাম করা হলো-তার কোন কিছুই আবীরের মাথায় ঢুকছে না। সে মসজিদটি পেরিয়ে সামনের দিকে আসতেই চোখে পড়লো রব সাহেবর বাড়ীটি। পাশে দেখলেন দুটি লোক দাঁড়ানো। আবীর লোক দুটোর সামনে এসে জিগ্যেস করলেন-রব সাহেবের বাড়ী কোন্ দিকে? লোক দুটো অবাক হয়ে জানতে চাইলেন-কোন্ রব সাহেবের কথা বলছেন? আবীরতো হতবাক। কি জবাব দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। দোকানদার বলেছিল রব সাহেবকে সবাই এক নামে চেনে। লোকটির কথা মতো তো সব কিছুই ঠিক ছিল। বড় রাস্তা পেয়েছে। মসজিদও পেয়েছে। বলেছিল মসজিদের সামনে গেলেই রব সাহেবের বাড়ী দেখা যায়। দেখতে পাচ্ছে। অথচ লোক দুটোর কথায়তো রীতি মতো সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। আবীর মনে করার চেষ্টা করলো-দোকানদার আরো কিছু কি বলেছিল না-কি? হ্যাঁ মনে পড়েছে। বড় দিলওয়ালা মানুষ। সে লোক দুটোকে বললো-যে রব সাহেব দিলওয়ালা মানুষ। আবীরের কথা শুনে লোক দুটোর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো। তারা আবীরকে পখটি চিনিয়ে দিল।
আবীর আস্তে আস্তে সেই রব সাহেবের বাড়ীর দিকে হাঁটা শুরু করলেন।বাড়ীটির সামনে নেইম প্লেটে লেখা " বায়তুল রহমান।" তিনি বাড়ীটিতে প্রবেশ করে কলিংবেল চাপলেন। দেখলেন শান্ত,সৌম স্বভাবের একটি লোক এসে দরজা খুলে দিল। লোকটির চেহারার দিকে তাকিয়ে আবীর অবাক হয়ে রইল। অবিকল তার মতোই দেখতে। তার গায়ের রং শ্যামলা। আর রব সাহেবের গায়ের রং উজ্জল শ্যাম বর্ণ। তাকে দেখেই আবীর হা হয়ে গেল।
মিষ্টি হেসে রব সাহেব বললেন
-বলুন আপনার জন্য কি করতে পারি?
কথা শুনেই আবীরের ভীমরি খাবার মতো অবস্থা। এম্মনিতেই কেমন যেন সব গুলিয়ে ফেলেছে। তার উপর ভদ্রলোকের কথা শুনে আরো নার্ভাস হয়ে গেল। নিজেকে যতটা পারলো সংযত করে নিয়ে বললো
-জ্বী। আমি বাসা দেখতে আসছি। রাস্তার ওপাশে আপনি টুলেট টাংগিয়ে ছিলেন। সেটা দেখেই আসছি।
-আচ্ছা। ভেতরে আসুন। দরজা থেকে সরে আবীরকে জায়গা করে দিলেন ভিতরে ঢোকার জন্য।
আবীর ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে টের পেল কেমন যেন তার শরীর হিম শীতল একটা অনুভুতি কাজ করছে।মনটা কেমন যেন ঠান্ডার পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। চোখ আপনা আপনিই বুঁজে যেতে চাইছে।
আবীর ভেতরে ঢুকলো। রব সাহেব তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব কিছু দেখালেন। বাড়ীটা দেখে আবীরের খুবই পছন্দ হলো। কথায় কথায় আবীর রব সাহেবের কাছ থেকে তার ব্যক্তিগত সব কিছু জেনে নিলেন। সে কোথায় কি করে? কিভাবে বাড়ীটি বানালো। রব সাহেবও অবলীলায় সব কিছুই তাকে জানালেন। কথার ফাঁকে আবীর খেয়াল করলো-প্রতিটি কথায় সে শান্ত। কোন উত্তেজনার ভাব নেই। অসম্ভব রকমের সৌম্যভাব বিরাজ করছে। কিন্ত্তু আবীর কিছুতেই তার চোখ খুলে রাখতে পারছে না। বার বার তা বুঁজে যেতে চাইছে। সে গভীর আবেশে চোখ বুঁজে রইল।
-কি ব্যাপার ওমন বেড়ালের মতো বার বার চোখ বুজছো কেন?
শ্বেতার কথায় সে যেন সম্ববিদ ফিরে পেল।
-হ্যাঁ কি যেন বলছিলে?
-বলছিলাম তোমাকে টু-লেট দেখার জন্য। দেখেছো?
-হ্যাঁ দেখেছি। ৪ রুমের ড্রইং,ডাইনিং, কিচেন, এটাচ বাথ, বারান্দা সবই আছে। রব সাহেবের বাসা। বাসার ঠিকানা রোড নং-৭৮৬, হাউস নং-১৫২।মহাখালী, ঢাকা। আবীর গভীর আবেশে চোখ বুঁজে বুঁজে শ্বেতাকে বলতে লাগলো। আবীরের কথা শুনে শ্বেতার বিষ্ময়ের সীমা রইলো না। কথার আগা মাথা কিছুই বুঝলো না। সে আবীরকে আবার ধাক্কা দিয়ে সজাগ করার চেষ্টা করছে।
-এ্যাই তুমি কি যেন বললে? রব সাহেবের বাসা...
শ্বেতার ধাক্কা খেয়ে আবীর ধরমড় করে উঠে বসে। কি বলেছিল আর কি দেখেছিল সব ভুলে গেল।
-রব সাহেবের বাসা? আবীরও অবাক হয়?
-এইতো তুমি একটু আগেই না বললে?
-তাই নাকি? ও তুমি বুঝবে না্ তার চেয়ে তুমি আমাকে চা করে দাও। চা-টা খেয়েই বেড়িয়ে পড়ি। আজ মাসের ২৮ তারিখ। বাসাতো একটা খুঁজে পেতে হবেই।
শ্বেতা চা করে আনে আবীরের জন্য। চা খেয়েই বেড়িয়ে পড়ে আবীর টু-লেট খোঁজার জন্য। আর মনে মনে ভাবতে থাকে তদ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা সেই টু-লেটের রব সাহেবের বাসাটার কথা। বাসার নাম্বার - ১৫২ রোড নাম্বার - ৭৮৬। মহাখালী। ঢাকা। কাউকে জিগ্যেস করতে হবে - এই ঠিকানাটা কেউ চেনে কি-না?