পৃষ্ঠাসমূহ

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

সারমাদ দারদী আজাব সিকাস্তা কারদী তুনে-পর্ব আট

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ঘুম হতে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে সকালের নাস্তা করলাম। চায়ের পানি চুলায় বসিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। তারপর কালকে যে লেখাটা লিখেছিলাম সেটার উপর চোখ বুলালাম। দেখলাম কতোটুকু কি লিখেছিলাম।পড়া শুরু করলাম-আচ্ছা তাহলে আজকে বায়াত বা অঙ্গিকার সর্ম্পকে কেস স্ট্যাডি করতে হবে।তার আগে চা খেতে হবে। চা বানিয়ে মাহিনকে কল করবো কি-না ভাবছি। মাহিনতো সুফী সাহেবের কাছে বায়াত নিয়ে ছিল। তো বায়াত বিষয়ে মাহিনকে জিগ্যেস করলেইতো হয়? তার আগে দেখতে হবে কয়টা বাজে? মাহিন আছে নাকি অফিসে চলে গেছে।পার্ট টাইমের চাকরী আর ভাল লাগছে না। সেটা আমি ছেড়ে দেব। প্রয়োজনে টিউশনী করবো।পড়া শোনা শেষ করেই চাকুরী করবো-চিন্তা করছি। চা খেতে খেতে দেখলাম আটটা দশ বাজে। তার মানে মাহিন এখনো অফিসে যায় নি। বাড়ীতেই আছে। কল করবো কি-করবো না ভাবছি। কেননা মাহিন যদি আসে তো আমার কেস স্ট্যাডি করতে বেশ বেগ পেতে হবে।এসেই গল্প জুড়িয়ে দেবে। তারচেয়ে আগে যেটা ইমপোট্যান্ট সেইটাই করি।কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসলামঃ

বায়াত-অঙ্গিকার করাঃ

বায়াত মানে কি? কেন বায়াত হতে হবে? বায়াত সর্ম্পকে কোরআন হাদীসে কি বলা হয়েছে

বায়াত-আরবী শব্দটি অভিধানিকে দৃষ্টিতে "বাইউন" শব্দের অনুরুপ যার অর্থ বিক্রয় করা। বিক্রয় ক্ষেত্রে ক্রয়ও হয়। একপক্ষ হতে বিক্রয় অপর পক্ষ হতে ক্রয়। উভয়ের কার্যকে আরবীতে "মোবায়াআৎ" বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় বায়াত বলা হয়। কোন মহানের হস্ত ধারণ করে বিশেষ প্রতিজ্ঞা বা অঙ্গিকারের উপর দীক্ষা গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে দুটি পক্ষ। হস্ত থারণকারী, অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞাকারী, অপরপক্ষ হলো যার হস্ত ধারণ করা হয়, যার কাছে অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা করা হয়। এক্ষেত্রে উভয়ের কাজ "মোবায়াত" বলা হয়। ক্রিয়াপদও ঐরুপ হবে। ইসলামে যে বায়াত হয় সেই বায়াত কোনো মহান মানুষের হস্তেই ধারণ করা হয়। তার মানে বায়াত মানে অঙ্গিকার করা। অঙ্গিকার করা – দুই প্রকার।
এক. লিখিত অঙ্গীকার
দুই. মৌখিক অঙ্গিকার।
অঙ্গিকার এক প্রকার ওয়াদা। আর ওয়াদা পালন করা ওয়াজিব তথা অবশ্য করনীয়। ওয়াদার বরখেলাপ করা মানে তা ভংগ করা। সেটা এক ধরণের অপরাধ। অঙ্গিকার করার সময় স্বেচ্ছা সায় থাকতে হবে। জোর পূর্বক অঙ্গিকার বা সায় আদায় করা অপরাধ এবং তা চুক্তি আইনে বৈধ নয়।চুক্তি আইনের () ধারায় বলা হয়েছে-স্বেচ্ছায় সায় ব্যতীত চুক্তি সম্পাদন হয় না এবং তা বৈধ নয়। তার মানে কি? তার মানে অঙ্গিকার করার জন্য আমাকে অবশ্যই নিজের ইচ্ছায় যেতে হবে। এখানে জোর যবর দস্তি খাটবে না। এর অর্থ দাঁড়ালো আমি যদি কারো কাছে অঙ্গিকার করি, তাহলে সেই দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে কর্তব্য পালন করাও জরুরী। অর্থাৎ আমাকে তার গোলামী খাটতে হবে। সে যা বলবে আমাকে তাই করতে হবে। যদি না করি তাহলে ওয়াদা বা অঙ্গিকার ভংগ হবে। আর অঙ্গিকার ভংগ করলে তো তার শাস্তি অনিবার্য

বায়াত কেন হতে হবে?

বায়াত কেন হতে হবে-বিষয়টি নিয়ে যথেস্ট বিতর্ক আছে। কেননা একদল মানবে আরেক দল মানতে চাইবে না। কিন্ত্তু কোরআন হাদীছ কি বলে বিষয়ে সেটা জানা জরুরী। কেননা যারা মানবে না তারা কোরআনে থাকলে কি আর না থাকলে কি - কোনটাই তারা মানতে চাইবে না। কিন্ত্তু যারা মানতে চাইবে তারাতো কোরআন-হাদীস দেখালেও মানবে। কারণ ঈমান বলে কথা। বিশ্বাস করাটা না করাটা যার যার এখতিয়ার। কিন্ত্তু বুদ্ধিমানের লক্ষণ হচ্ছে বির্তক পরিহার করা এবং উত্তম পন্থা গ্রহণ করা। তাই বিষয়ে সর্বপ্রথম গুরুত্ব দেব কোরআন শরীফের দিকে
. আয়াতঃ"লাক্কাদ রাদি আল্লাহু আনিল মুমেনিনা এজ ইউবা ইউনাকা তাহ্ তাস সাজারাতে ফা আলেমা মাফিকুলুবিহিম ফাআন জালাচ্ছাকিনাতা আলাইহিম ওয়া আছাবাহুম ফাতাহান কারিবা "- সুরা ফাতাহ আয়াত-১৮
অর্থ:নিশ্চয়ই  আল্লাহ মুসলমানদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যখন তারা নবী (সাল্লাল্লাহুআলাইহিস সালাম)এর হাতে গাছের নিচে বায়াত গ্রহণ করছিল। ফলত: তিনি তাদের অন্ত: করণে যে সততা কৃতজ্ঞতা বিরাজ করছিল তা অবগত হয়েছেন। অত:পর তাদের প্রতি তিনি শান্তি অবতরণ করেছেন এবং তাদেরকে শীঘ্রই বিজয় দানে পুরস্কৃত করেছেন
.অায়াতঃ"ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানোত্তাকুল্লাহা ওয়াবতাগু  ইলাইহিল ওয়াছিলাতা ওয়া জাহিদু ফি ছাবিলিল্লাহি লায়াল্লাকুম তুফলেহুন"- সুরা মায়েদা আয়াত-৩৫।  অর্থ: হে আমানুগণ। আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং আল্লাহকে চেনার জন্য ওছিলা তালাশ কর। এবং আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ কর। এতেই তোমাদের সাফল্য
.আয়াতঃ "ইন্নাল্লাজিনা ইউবায়ি উনাল্লাহা ইয়াদুল্লাহে ফাউকা আইদিহিম"- সুরা ফাতাহ আয়াত-১০
অর্থ: যারা আপনার হাতে হাত দিয়ে বায়াত হয়েছে হে রাসুল(সাল্লাল্লাহুআলাইহিস সালাম) অবশ্যই তারা  আল্লাহর হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহণ করেছে। তাদের হাতের  উপরআপনার হাত
. আয়াতঃ"মাই ইউতের রাসুলা ফাক্কাদ আতা আল্লাহ"- সুরা নেসা আয়াত-৮০
অর্থ : যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করলো সে আমারই (আল্লাহর) আনুগত্য করলো
.আয়াতঃ"কুল ইনকুনতুম তুহিব্বুনাল্লাহে ফাত্তাবেউনি ইউবিকুমুল্লাহ"-সুরা আল এমরান আয়াত-৩১
অর্থ: তোমরা যদি আমাকে ভালবাসিতে চাও তবে আমার নবীকে ভালবাস। নবীকে ভালবাসলেই আমাকে ভালবাসা হবে
.আয়াতঃ"ওয়া আতিউল্লাহা  ওয়া আতিউর রাসুলা ওয়া উলিল আমরি মিনকুম"- সুরা নিসা আয়াত-৫৯
অর্থ: আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসুলের এবং তার প্রতিনিধির
মহিলাদিগকে বায়াত করার দলিল
"ফাবায়হুন্নাআস্ তাগফেরলা হুন্নাল্লাহা"-সুরা মোমতাহেনা আয়াত-১২
অর্থঃ হে নবী(সাল্লাল্লাহুআলাইহিস সালাম) আপনি মহিলাদিগকে বায়াত করুনএবং তাদের নিকট থেকে অংগিকার নিন
এবার আসি অন্যান্য গ্রন্থপন্ঞ্জীতে। দেখি কি বলা হয়েছে বায়াত সমন্ধে?
" সিয়ারুল আসরার" কিতাবে হযরত বড়পীর (রহঃ) সাহেব লিখেছেন-"কলব জিন্দা করার জন্য পীর বা আহলুত তালকীন অন্বেষণ করা ফরয " হযরত মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি (রঃ) বলেছেন-"আল ফেকাউ লে ছালাহির জাহেরে আল তাসাউফ লে এছলাছির বাতেনে" অর্থাৎ ফেকাহ শাস্ত্র মানুষের শরীয়তকে শুদ্ধ করে আর তাসাউফ মানুষের অন্তরকে পরিস্কার করে। মাওলানা রুমী (রহঃ) বলেছেন-"কোনবীয়ে ওয়াক্ত খেসাশত আয় মুরিদ তাকে নুরে নবী আমাপদীদ" অর্থাৎ তোমার পীরকে জামানার নবী মনে কর। তিনি আরো বলেছেনঃ" খোদ--খোদ কামেল না-শোদ মাওলানায়ে রুম-তা-গোলামে শামসের তাবরেজী না-শোদ" অর্থাৎ আমি কখনো নিজে কামেল হতে পারি নাই যতক্ষণ না আমি শামশের তাবরেজীর গোলাম হয়েছি। হযরত হাফেজ সিরাজী  (রহঃ) বলেছেন-" বকোয়ে এশক সানেহ বে-দলীল রাহকদম কেমান বখশ নমুদাম ছদ এহতেশাম না-শোদ" অর্থাৎ পথ প্রদর্শক পীর ছাড়া এশকের গলীতে পা রেখো না কারণ আমি শত চেষ্টা করেও কিছুই হইনি। কোনো শয়ের বলেছেনঃ" একভি আগর  তরকহো তুজছে হাবীব! তো উঠে শাহেশর মে আমা বে নছীব" অর্থাৎ শরীয়ত মারেফত এই দুইটি এলমের একটিও যদি ত্যাগ কর তবে কেয়ামতের দিন অন্ধ হয়ে উঠবে। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রহ:) বলেছেনঃ" গার-তুই খাওয়াহী হাম নিশানী বা খোদাতু-নিশানী দর হুজুরে আওলিয়া " তুমি যদি আল্লাহর সংস্পর্শে বসতে ইচ্ছা কর তবে কোন আওলিয়ার সংস্পর্শে বস। "গারতু চাহে আছলে হখ আয় বে-খবর কামেলোকা খাকে পাহো ছর বছর।" অর্থাৎ হে বে-খবর তুমি যদি আল্লাহর হুজুরে পৌছতে ইচ্ছে কর তবে অবশ্যই কোন কামেল অলির পদধুলি হয়ে যাও।" ছবছে হো আজাদ উনকে হো গোলাম গারমেলে দ্বিনক্কা মজা তুঝকো তামাম।" অর্থাৎ সবকিছু ত্যাগ করে তুমি কোন কামেল অলির গোলাম হয়ে যাও তবেই ধর্মের স্বাদ গ্রহণ করতে সমর্থ হবে। "কাবা বুনিয়াদে খলিলে আজর আস্ত দিল গুজার গাহে জলীলে আকবর আস্ত"অর্থাৎ আজর পুত্র ইব্রাহিম (:) তৈয়ার করেছেন পাথরের কাবা আর আল্লাহ স্বয়ং তৈয়ার করেছেন মানুষের দিল। খাজা মঈন উদ্দিন চিশতী (:) বলেছেনঃ" তুমি যদি আল্লাহর মুখ দর্শন করতে চাও তবে আমার চেহারার দিকে তাকাও আমি তার দর্পণ সে আমা হতে পৃথক নয়।" হাদিস শরীফে আছেঃ" মানরাণী ফাক্কাদ রায়াল হাক্কা" যে আমাকে দেখলো সে আল্লাহকে দেখলো
এছাড়া আরোও অন্যান্য সর্বজন মান্য সর্বজন স্বীকৃত ইমাম মুজতাহিদ আওলিয়া কিরামগণ (রহঃ) পীর সাহেবদের নিকট বায়াত গ্রহণ ফরয বলে ফতওয়া দিয়েছেন। যেমন হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) তার ইহইয়াউল উলুমুদ্দীন কিমিয়া সায়াদাত কিতাবে হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী আজমেরী (রহঃ) তার লিখিত আনিসুল আরওয়াহ কিতাবে ইমামুশ শরিয়াত ওয়াত তরীকাত শায়েখ আবুল কাশেম কুশাইরী (রহঃ) রিছালায়ে কুশাইরিয়া কিতাবে হযরত মাওলানা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপাথি (রহঃ) মালাবুদ্দা মিনহু এরশাদুত্তালেবীন কিতাবে শাহ আব্দুল আজিজ মোহাদ্দিস দেহলভী(রহঃ) তফসীরে আজিজ নামক কেতাবে হাফিজে হাদিসে আল্লামা রুহুল আমীন (রহঃ) তাছাউফ তত্ত্ব বা তরীকত দর্পণ নামক কিতাবে, আল্লামা শামী (রহঃ) রদ্দুল মুহতার কেতাবে, ইমাম ফকরুদ্দীন রাজী (রহঃ) তার তাফসীরে কবীর কেতাবে, কাইয়্যুমে আউয়াল আফজালুল আউলিয়া হযরত ইমাম মোজাদ্দেদ আলফে ছানী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত আলোড়ন সৃষ্টিকারী মকতুবাদ শরীফে,হযরত ইমাম আহমদ রেফায়ী (রহঃ) তাঁর বুনইয়ানুল মুশাইয়্যদ কেতাবে, হযরত ইসমাঈল হাক্কি (রহঃ) তাফসীরে রুহুল বয়ানে সরাসরি পীর গ্রহন করা ফরজ বলে ফতুয়া দিয়েছেন প্রসঙ্গে হাদিয়ে বাঙ্গাল মুজাহিদে আজম শায়খুল মাশায়েখ আল্লামা কারামত আলী জৌনপুরী (রহঃ) তাঁর যদুত তাকাওয়াতে লিখেছেন যে এলমে তাছাউফ ব্যতিত ইলমে শরীয়তের উপর যথাযথ আমল করা কিছুতেই সম্ভব নহে
তার মানে বিখ্যাত বিখ্যাত সব অলিগণ মাশায়েখগণ বায়াত নিয়েছিলেন

একটানা লিখে ক্লান্ত বোধ করছি। আরো কিছুক্ষণ চিন্তা করা প্রয়োজন। তার আগে আমাকে একটু বিরতি দেয়া প্রয়োজন। আমি আর দেরী করলাম না। লেখাটা রেখে উঠে ওয়াস রুমে গেলাম। একটু ফ্রেস হয়ে চায়ের পানিটা আবার গরম করতে দিলাম। ভাবছি মাহিনকে ফোন করবো কি-না? যেই ভাবা অম্মনি শুনতে পেলাম কলিংবেলের আওয়াজ। অামি মোবাইলটা হাতে নিয়েই দরজাটা খুললাম। খুলেই দেখি মাহিন

-কি রে, তুইতো দেখি বইয়ের দোকান পাট খুলে বসছিস

-নারে। একটা বিষয়ে একটু কেস স্ট্যাডি করছি

-কোন্ বিষয়ে?

-আরে ঐদিন সুফী সাহেবর সাথে ওখান থেকে আসার পর হতেই। মাথার ভেতর কেমন যেন পোকা ঢুকে গেল। তাই তার কথার সুত্র ধরে এগুনোর চেষ্টা করছি

- দেখি কি লিখেছিস? হুম বায়াত মানে কি? কেন বায়াত হতে হবে? বায়াত সর্ম্পকে কোরআন হাদীসে কি বলা হয়েছে? এব্যাপারে  তুইতো আমাকে ডাকলেইতো পারতি। তোকে বেশ কিছু ঘটনা শোনাতাম

-তোর ঘটনা পরে শুনবো। তার আগে চা নিয়ে আসি। চা খাব আর আয়েশ করে তোর কথা শোনা যাবে
আমি রান্না ঘরে গেলাম। আর মাহিন আমার লেথা পড়তে শুরু করেছে। যাক ভালোই হলো। ভুল থাকলে ধরতে পারবে। আর ওর কথা শুনলে হয়তো আরো কিছু তথ্য পাবো। আমি দু'কাপ চা নিয়ে মাহিনকে বললাম
-বারান্দায় আয়। আরাম করে বসি। মাহিন আসতেই ওর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে বললাম শুরু কর তোর কথা। মাহিন চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চেয়ার টেনে বসলো আমার কাছে। তাহলে শোন

(চলবে)

সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

সারমাদ দারদী আজাব সিকাস্তা কারদী-পর্ব সাত

(ষষ্ঠ পর্বের পর)
সুফী সাহেবের কাছে আসার পর রুমে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দিলাম। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। কিছু না ভেবেই অলস শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। মোবাইলটা বের করে দেখলাম কেউ কল করেছে কি-না? সাইলেন্ট মুডে থাকায় টেরই পাইনি শ্বেতা কল করেছিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সোয়া চারটা বেজে গেছে। চোখে রাজ্যের ঘুম চলে আসছে। বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন। আমি সিগারেটটা শেষ করেই সটান শুয়ে পড়লাম।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুম ভাংলো সাড়ে আটটার দিকে। খিদেই পেট চো চো করছে। খাওয়ার জন্য হোটেলে গেলাম। খাওয়া শেষ করে এক প্যাকেট সিগারেট কিনলাম। তারপর রুমে এসে দরজা লাগিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম সুফী সাহেবের কথাগুলো। মোবাইল বন্ধ করে দিলাম। খাতা কলম নিয়ে বসলাম। আমাকে কেস স্ট্যাডি করতে হবে। পুণঃ পুণঃ চিন্তা করতে হবে। প্রথমেই আসি কলেমা তায়্যিবা সর্ম্পকে। শিরোনাম দিলামঃ

কালিমা তায়্যিবাঃ লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ।

সুফী সাহেব বলেছেনঃ লা+ইলাহা+ইল্লা+আল্লাহ+হু+মোহাম্মদ+রাসুল+আল্লাহ।
লা-অর্থ শুন্যাবস্থা তথা মহাশুন্য। ইলাহা=উপাস্য। ইল্লা=ব্যতীত ।আল্লাহ=আল+ইলাহ। মোহাম্মাদুর রাসুল্লাহ=মোহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। ইলাহ=উপাস্য। উপাস্য বলতে আমরা কি বুঝি? আমরা বুঝি যার উপাসনা করা হয়। কার করা হয়? আল্লাহর। আল্লাহ কি? আল+ইলাহ। আল=প্রতিষ্ঠিত উপাস্য। অর্থাৎ যাকে আমি প্রতিষ্ঠিত করলাম। কাকে করলাম? যে আমার মনের রাজ্যে বিরাজিত। কারণ আল বলতে সর্ব প্রকার বা সমগ্র বুঝায়। আর্দ ও সামার কেন্দ্র বিন্দুই আল্লাহ। আল্লাহু নুরুন সামাওয়াত ওয়াল আর্দ। আল্লাহ আসমান এবং জমিনের নুর। তাহলে নুর কি? নুর অর্থ অালো। আলো কি? শক্তি। সত্যিকার অর্থেই কি শক্তি বোঝায়? নাকি অন্য কিছু বোঝায়? ধরি শক্তিই বোঝায়। তাহলে এই শক্তির আলোকে আমি চলা ফেরা করি। খাই দাই ঘুমাই। সব কিছুই করি। কিন্ত্তু তিনি বলেছেন কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানরত। তাহলে শক্তির কেন্দ্র বিন্দুতে তো কি কিছু অবস্থান করছে? কি অবস্থান করছে? বিজ্ঞানীরাতো শক্তি ছাড়া আর কিছুই পাননাই। জগত চলছে শক্তির দ্বারা। তার মানে কি? এই শক্তিই কি সেই মহা শক্তিরই অংশ? তাহলে কি 'হু' দ্বারা সেই মহাশক্তির দিকেই ইংগিত করা হয়েছে? সেই হু'কে তো পরক্ষণেই মোহাম্মাদুর রাসুল্লাল্লাহ বলা হয়েছে। বলা হয়েছে নুরী মোহাম্মদই সৃষ্টির বিকাশ ও প্রকাশ। নুরী মোহাম্মদীই সৃষ্টির প্রকাশ হয়ে চলছে।স্বয়ং হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেছেনঃ আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নুরী। আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার নুর সৃষ্টি করেছেন।  আনা মিন নুরুল্লাহি ওয়া কুল্লু শাইইম মিন নুরী। আমি আল্লাহর নুর হইতে এবং বিশ্বজগত আমার নুর হইতে। তার মানে কি? সৃষ্টির প্রকাশ ও বিকাশ হচ্ছে মুহাম্মদী নুরের ধারা হতে?
আমিতো তাই দেখছি। কিন্ত্তু আমার মনের মধ্যে যদি শয়তানী থাকে তাহলে প্রতিষ্ঠিত আল হিসাবে তাকেই উপাস্য হিসাবেই তারই ইবাদত বন্দেগী করছি না? তাহলে উপাস্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত কোন কিছুই স্হায়ী হচ্ছে না। কেননা মন সর্বদাই পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল মন নিয়া কিভাবে আল ইলাহ প্রতিষ্ঠিত করা যায়? এ ব্যাপারটা জানা জরুরী। এই জরুরী বিষয়টিতে একটি মার্ক করা দরকার। কেননা এখানে যাকেই প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে সেই ইলাহ রুপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে কলেমার মধ্যে তথা তৌহিদে অবস্থান করছে।

আমার মাথায় আর কিছুই ধরছে না। এ পর্যন্ত লিখে একটা সিগারেট ধরালাম। মনে মনে চিন্তা করলাম-সুফী সাহেব এ ব্যাপারে আর কি কি বলেছেন? হটাৎ আমার মনে পড়লো- একজন মোমিনের কথা। কারণ মোমিনের জন্য কোন আদেশ নাই। মোমিন দ্বারা পরিচালিত হলে তিনিই পথ দেখাইতে পারবেন। আমি আর দেরী না করেই আবার লিখতে বসলাম।

তৌহিদ সাগরে অবস্থানের জন্য প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে মুসলিম হওয়া। মুসলিম হলেই মোমিনের নির্দেশেই কাজ করলে আমানু হওয়া যায়। আমানু হলেই আদেশ-নির্দেশ কোরআন মজীদেই পাওয়া যাবে। কেননা তিনি বলিয়াছেন - কোন একজন নবীর প্রচারিত নীতিকে স্বীকার করিয়া তাহার নিকট অথবা তাহার নীতির অনুসারী প্রতিনিধির নিকট আত্মসর্মপণ করিলে তাহাকে বলা হয় মুসলিম অর্থাৎ আত্মসমর্পণকারী। মোমিন হওয়ার জন্য ঈমানের কাজ করিতে থাকিলে তাহাকে বলা হয় আমানু। আর ঈমান অর্জনের পথে পূর্ণ সফলতা যখন অর্জিত হইয়া যায় তখন আমানু মোমিন হইয়া যান। তাছাড়া কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার যে পদ্ধতি তাহা যিনি নিজের জীবনে পদ্ধতিস্থ করিয়াছেন তিনিই রসুল। রসুল অর্থ প্রতিনিধি। কোরানের পরিভাষাগত অর্থে আল্লাহর প্রতিনিধি অথবা কোন নবীর মনোনীত প্রতিনিধি নবীর প্রতিনিধিত্ব করা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের শামিল। তার মানে কি দাঁড়ালো? তার মানে দাঁড়ালো কেবলমাত্র রসুল পর্যায় যারা তারাই কেবল তৌহিদ সাগরে অবগাহন করতে পারবে। মোহাম্মাদুর রাসুল্লাল্লাহ মানে তো তাহলে মোহাম্মদ আল্লাহর মনোনীত রসুল। কেননা আর্দ ও সামা দৈহিক ও মনোজগতে তিনিইতো কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। নুরে মোহাম্মদী সর্ম্পকে তিনি বলিয়াছেনঃ যে কোন একজন মোহাম্মদ দ্বারা অর্জিত স্বর্গীয় চরিত্র এবং গুণাবলীকেই 'নুরে মোহাম্মদী' বলে। নুরে মুহাম্মদীর বিকাশ লাভের জন্যই সমগ্র সৃষ্টির প্রয়োজন হইয়াছে। অথচ 'নুরে মোহাম্মদী' শব্দটি কোরনে কোথাও একত্রে নাই। একই রুপে দেখা যায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ" কথাটি কোরনে একত্রে উল্লেখিত নাই অথচ ইহা সকল ধর্মের এবং কোরানের মুলমন্ত্র।

তার মানে কি? এজন্যই কি মানসুর হাল্লাজ বলিয়াছিলেনঃ"আনাল হক্ক।" আমিই সত্য। হযরত খাজা বায়জীদ বোস্তামী বলিয়াছিলেনঃ"আনা সুবহানী আজিমুশশানী। আমিই সোবহানের শান। জুনায়েদ বোগদাদী বলিয়াছিলেনঃ"লাইছা ফি জুব্বাতি ছেওয়া আল্লাহ তায়ালা"। এই জুব্বার ভেতর আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কিছুই নেই। হযরত খাজা সামস তাব্রীজীি বলিয়াছিলেনঃ" জামালে খুদ জামালে ইয়ারে দিদাম (আমার পীরও আমি আবার আমার মুরিদও আমি;) বা শাকালে শায়েখে দিদাম মোসতফারা, না দিদাম মোস্তফারা বালকে খোদারা (পীরের সুরতে নবীকে দেখলাম ওটা নবি নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ)"। এছাড়া  হাজা হাবিবুল্লাহ মাতা ফি হুব্বুল্লাহ শাহেন শাহে ওলি আফতাবে অলি সুলতানুল হিন্দাল অলি, আতায়ে রসুল ইয়া বাবা সাইয়্যেদ মাওলানা মইনুদ্দিন হাসান সান্ঞ্জারী আল হোসাইনি ওয়াল হাসানী বলেছিলেনঃ ই-মানাম ইয়ারাম কে আন্দার নুরে হক ফানী শুদাম, মাতলায়ে আনোয়ারে জাতে সুবহানি শুদাম। অর্থাৎ আমার ভেতর আমার বন্ধুটির হকে ফানা হয়ে গেছি,তাই যে নুরের বিকিরণ হচ্ছে সেই নুর কেবলমাত্র সোবহানীর। তার মানে কি তারা সবাই রসুল ছিলেন। তৌহিদ সাগরে অবগাহন না করলে তো এসব কথা বলা যায় না ?

কিন্ত্তু কলেমায় তো অংশীদার করা মানে শিরিক করা। তারা কি শিরিক করছেন না? যদি তারা শিরিকই করে থাকেন তো প্রচলিত মতে তাদের কি বলা যায়? তাহলে তারা কি জানতেন না যে শিরিক করা আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন না? শিরিক করা জঘণ্যতম অপরাধ? তারা কি কোরআন জানতেন না? না তারা পড়তে পারতেন না? নাকি তারা না জেনেই এই জঘন্য(?) অপরাধটুকু(?) করে ফেলেছেন(?)-ব্যাপারটা তো আমাকে ভাবিয়ে তুললো? তারা কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরণের অপরাধ(?) করতে পারেন(!)?-বিষয়টা জানা জরুরী।

এতটুকু লিখে আমি একটি সিগারেট ধরালাম। তারপর চিন্তা করতে লাগলাম। আসলে ব্যাপারটা কি হতে পারে? শিরক শব্দ টির অর্থ হচ্ছে - অংশীদার করা। ভাগীদার করা। অংশীদার হয় মনে। দেহে নয়। কেননা দেহ দ্বারা অংশীদার করা যায় না। মনের গতি-প্রকৃতিই ইবাদতে অংশীদারীত্বের সৃষ্টি করে। এজন্যই কি সুফী সাহেব বলিয়াছিলেন ইবাদতের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে - ইশক বা প্রেম। কিন্ত্তু নিরাকার খোদার সাথে কি প্রেম করা সম্ভব? বস্তু আকারে না আসলে তো জ্ঞান লাভ হয় না। জ্ঞান লাভ না হলেও তা অলীক বস্ত্তু। তথা ঘোড়ার ডিম ব্যতীত আর কিছুই নহে। তার মানে কি? আমি আর দেরী না করে লিখতে শুরু করলামঃ

অংশগ্রহণকারী বা অংশীবাদীকে মোশরেক বলে। অদৃশ্য এক আল্লাহকে সর্বময় কর্তা স্বীকার করিয়াও যাহারা অন্যান্য সৃষ্টির কর্তৃত্ব এবং অধীনতা মানিয়া লয় তাহারা মোশরেক। কোন বস্তু বা বিষয়ের প্রতি দেহেরে নয় মনের অংশগ্রহণের ভাবকে তথা মোহকেই শেরেক বলা হয়। বস্তু জগতের সংগে শেরেক করা বিষয়টি দুনিয়াবাসী মানব মনের স্বভাব ধর্ম। সৃষ্টিতে শেরেক নাই। শেরেক মানব মনের রচিত এক ব্যাপক ও সূক্ষ্ম অপরাধ। মোমেন ব্যক্তির জীবনাদর্শ গ্রহণ করিয়া এই অপরাধ মন হইতে ত্যাগ করিতে পারিলেই মনে তৌহিদের প্রতিষ্ঠা হইয়া থাকে। এজন্যই কি সুফী সাহেব পুরুষ ইলাহর কথা বলিয়াছিলেন?

উপরোক্ত বিষয় হইতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে যে, কোন একজন মোমিন ব্যক্তির নিকট আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবেই মুসলিম বলে পরিচয় দিতে পারবো। তার মানে কি আমি এখনো মুসলিম নই? নইতো। কেননা মহাপুরুষদের জীবনী লক্ষ্য করলেইতো বিষয়টি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। জগত বিখ্যাত সবাই গুরু তথা মুর্শিদ ধরেই প্রথমে মুসলমান হয়েছেন। অতঃপর আমানু হতে মোমিন হয়ে তৌহিদ সাগরে ডুব দিতে পেরেছেন। আমাকে সেই সাগরে অবগাহন করতে হলে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে। তথা বায়াত নিতে হবে। কিন্ত্তু বায়াত সমন্ধে কোরআনে কি কোন ইংগিত আছে? এ বিষয়টি নিয়ে পরে ভাববো। আজ এ পর্যন্তই।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় পৌনে দুইটা বাজে। আর দেরি করলাম না। লেখা বন্ধ করে ঘুমানোর আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। (চলবে)

রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

সারমাদ দারদী আজাব সিকাস্তা কারদি তুনে-পর্ব ছয়

(পূর্ব প্রকাশের পর)
তোমাকে বলিয়াছিলাম - ইবাদতের জন্য প্রয়োজন হইতেছে প্রেম। প্রেম ব্যতীত ইবাদত শুস্ক। তোমাকে আজকে বলিব কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। যা তুমি পূর্বে শোন নাই। যদিও শুনিয়া থাকো তাহা হইলেও উহা উপলব্দি করো নাই। কোরআন নাযিল হইয়াছে কেবল আমানুদের জন্য। জগতে যত আমানু আছে তাহাদের দিক-নির্দশন হিসাবে কোরআন আসিয়াছে। কেননা কোরআনের ভাষ্য মতে-বলা হইয়াছেঃ "ইয়া আইয়্যুহাল লাজিনা আমানু " কোথাও বলা হয় নাই " ইয়া আইয়্যুহাল লাজিনা মোসলিমু" কেন বলা হয় নাই তাহা তোমাকে উপলব্দি করিতে হইবে। ইনসান উন্স হইতে আসিয়াছে। উন্স অর্থ প্রেম। ইনসান পর্যায় হইতেছে আমানু পর্যায়ে আসার প্রথম ধাপ। কোন একজন নবীর প্রচারিত নীতিকে স্বীকার করিয়া তাহার নিকট অথবা তাহার নীতির অনুসারী প্রতিনিধির নিকট আত্মসমর্পণ (বায়াত গ্রহণ) করিলে তাহাকে বলা হয় মুসলিম অর্থাৎ আত্মসমর্পণকারী। ইহার পর মোমিন হওয়ার জন্য ঈমানের কাজ করিতে থাকিলে তাহাকে বলা হয় আমানু। কোরানের সকল নির্দেশ আমানুগণকেই দেওয়া হইয়াছে। যেহেতু ইহারা ঈমান লাভের জন্য সকল প্রকার (মানসিক দৈহিক) সৎ কাজে ব্যস্ত আছে। ঈমান অর্জনের পথে পূর্ণ সফলতা যখন অর্জিত হইয়া যায় তখন আমানু মোমিন হইয়া যান। মোমিনকে লক্ষ্য করিয়া কোরানে একটি নির্দেশও দেওয়া হয় নাই। কারণ তাহার জন্য তখন নিষ্প্রয়োজন। মোমিনগণ পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়া তাহাদের নবীর প্রকৃত প্রতিনিধি বা নায়েবে রসুল হন। এই পর্যায়ে আসার জন্য প্রয়োজন স্রষ্টার সহিত প্রেমপূর্ণ সর্ম্পক গড়িয়া তোলা। তাই তোমার স্বত্তা হইতে উদগত প্রেমই তোমাকে রক্ষা করিবে। পার্থিব এবং জৈবিক প্রেমও তুচ্ছ নহে। বরণ্ঞ্চ উহা ঐশী প্রেমের পাদপীঠ এবং উহাই তোমাকে প্রেমমার্গে উত্তোলন করিবে। আলিফ, বে অক্ষর না শিখিলে তুমি কিরুপে মহাক্কোরআন পড়িবে? সাবধান, কথা বলিও না যে, আল্লাহ সৌন্দর্যময় এবং তুমি তাহার প্রেমিক। তুমি মুকুর সদৃশ্য। যাহাতে আল্লাহর রুপের ছায়া পড়ে। পবিত্র-প্রেম আল্লাহ হইতেই নিসৃত হইয়া তোমার মধ্যে প্রকাশিত হয়। 'আমি এবং তুমি' একটা কল্পনামাত্র। সঠিকভাবে দেখিতে পারিলে বুঝা যাইবেঃ তিনিই দর্শক, তিনিই দৃশ্য, তিনিই মুকুর, তিনিই ধন, তিনিই ধনাগার। সংক্ষেপে তোমাকে ইস্কে হাকিকী ইস্কে মাজিজী বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছি। তো এখন বল তোমার কি ইচ্ছা?

তিনি আমার দিকে ইংগিত করে বললেন। আমি কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। তার কথাগুলো ভাববার চেষ্টা করছি। ফিলোসফিতে একটি কথা আছেঃ সংশয় দ্বারা সমাধানে পৌঁছানো। অথচ বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতির প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে সংশয়। ভাববাদ নামক যে দর্শন আছে তা কেবল মনের গহীনে অবস্থান করা ভাব। অর্থাৎ মনের গতি প্রকৃতি দ্বারা নির্ণয় করা। ভাববাদীরা সবকিছুই ভাবের মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করে। সুফী সাহেবের মতবাদ অনেকটা সেই ভাববাদীদের মতোই মনে হচ্ছে। ইসলামী সুফী সাহিত্য সর্ম্পকেও আমাদের পাঠ্যসুচীর অর্ন্তভুক্তি ছিল। সেইখানেও পড়েছি-ইমাম গাজ্জালী সাহেব একটি হাদীছে উল্লেখ করিয়াছেনঃ ইন্নালাহা সাবঈনা আলফা হিজাবুম মিন নুরী ওয়া যুলুমাত। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর জন্য সত্তর হাজার নুর অন্ধকারের পর্দা আছে। এই পর্দার বাইরের অর্ধাংশকে অন্ধকার এবং ভিতরের অর্ধাংশকে আলো বলে। আল্লাহর সান্নিধ্যে যেতে আত্মাকে এই অন্ধকার আলোর সাতটি স্তর অতিক্রম করতে হয়। সাতটি স্তরে দশ হাজার পর্দা আছে। তাছাড়া সুফীরা মনে করেনঃ পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বরুপ প্রকাশের সময় আল্লাহকে কতোগুলো স্তর অতিক্রম করতে হয়। নিম্নতম হতে উচ্চতম স্তরে যখন সুফীর অগ্রগতি হয়, তখন ঐশী স্বরুপ পরিবর্তনের ক্রম অনুসারে তাকে উপরের স্তরগুলি পরিভ্রমণ করতে হয়। আল্লাহর নিম্নগামী ভ্রমণকে সফরাতুল-হাক্ক এবং উর্ধ্বগামী ভ্রমণকে সফরাতুল-আব্দ বলে। কিন্ত্তু এগুলোতো সবই পড়া। ব্যবহারিক দিকতো আমাদের ছিল না। পরীক্ষায় পাস করার জন্য পড়া। মোটা মোটা বই পড়ে বিদ্যান হয়েছি। অহংকার করতে কেবল এটুকুই করতে পারি-আই এম ফিলোসোফার। কথায় পান্ডিত্য দেখাতে পারি। লোকজনের বাহবা কুড়াতে পারি। কিন্ত্তু ব্যবহারিক দিক থেকেতো একেবারেই শুণ্যকোঠা। কি করি?আমি সুফী সাহেবকে ইমাম গাজ্জালীর হাদিসটি শুনিয়ে দিয়ে জানতে চাইলাম এর প্রকৃত ব্যাখ্যাা কি? আমার প্রশ্ন শুনে তিনি বললেনঃ-

যে সাতটি স্তরের কথা বলা হইয়াছে সেই সাতটি স্তর হইলঃউবুদিয়াত (সেবা), ইস্ক (ঐশীপ্রেম)) , যুহদ (পরিহার), ওয়াযদ ( মত্ততা), মারিফাত (জ্ঞান), হাক্কীকাত ( সত্যতা) এবং ওয়াসল (মিলন) অাল্লাহর পথের সাতটি স্তর অতিক্রম করা কালে সাধককে কয়েকটি অবস্থার সম্মুখীন হইতে হয়। এই সকল অবস্থাকে মোকাম বলে। মোকামের মধ্যে প্রথম মোকাম তওবা (অনুতাপ) অতঃপর ইনাবাত (রুপান্তর), যুহদ এবং তাওয়াক্কুল(নির্ভরতা)

-শুন পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বরুপ প্রকাশের সময় আল্লাহকে কতোগুলি স্তর অতিক্রম করিতে হইয়াছে। নিম্নতম হইতে উর্ধ্বতম স্তরে যখন সাধকের অগ্রগতি হয়, তখন ঐশী স্বরুপ পরিবর্তনের ক্রম অনুসারে তাহাকে উপরের স্তরগুলি পরিক্রমক করিতে হয়। উরুযের (উর্ধারোহণ) সময় আত্মাকে চারটি অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতে হয়। 
.নাসুত(মানবতা)-এই স্তরে সাধককে শরীয়ত মানিয়া চলিতে হয়
.মালাকুত(ফেরেস্তায়ী)-এই স্তরে সাধক তরিক্কাতের পথে অগ্রসর হয়
.জাবারুত(শক্তি)-এই স্তরে সাধক মারিফত (জ্ঞান) প্রাপ্ত হয়
.লাহুত(ঐশীত্ব)-এই স্তরে সাধক আল্লাহর মধ্যে বিলীন হইয়া হাক্কীক্কাত(সত্যতা) প্রাপ্ত হয়
আল্লাহর দিকে চলিবার জন্য তিনটি পথ আছে
.সায়ের ইল্লাল্লা (আল্লাহর দিকে ভ্রমণ) - এখানে সৃষ্টির জগৎ হইতে হুকুমের জগতে সাধকের যাত্রা। সাধক এস্থলে ওয়াহিদিয়াতের স্তর পরিক্রমণ পরিভ্রমণ করিয়া "হাক্কীক্কাতে মুহাম্মদীয়াতে" পৌছায়। 
.সায়েরফিল্লাহ (আল্লাহর মধ্যে ভ্রমণ) - এখানে সাধক ঐশী-স্বত্তায় বিলীন হয়। ইহাই আহদিয়াতের মোকাম। এই মোকামে মনসুর হাল্লায "আনাল হক্ক" (আমিই সত্য) বলেন
.সায়ের আনিল্লা (আল্লাহর নিকট হইতে ভ্রমণ) - এই পর্যায়ে সাধক ঐশীগুণ প্রাপ্ত হইয়া প্রকাশমান-জগতে ফিরিয়া আসে। ইহাকেই ফানার পর বাক্কার (অনস্তিত্বের পর অস্তিত্ব) মোকাম বলে
আমার দিকে তাকিয়ে সুফী সাহেব বললেন

-এখন তুমি সিদ্ধান্ত নাও তুমি কোন্ পথে চলবে?

-আমাকে কিছুদিন সময় দেন। আমি চিন্তা ভাবনা করে আপনাকে জানাবো। তবে আমি আপনার কাছে আবার আসবো। সারারাত ঘুমাতে পারিনিতো। তাই মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে।

-ঠিক আছে। তোমার সাথে অনেক কথা বলেছি। তুমি সময় নাও। চিন্তা-ভাবনা কর। আজ আর নয়। আমি উঠি।

সুফী সাহেব ওঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আমি তাকে পা ছুইয়ে সালাম করলাম। আর বললাম 

-আমার জন্য দোয়া করবেন। 

-আমি তোমার জন্য দোয়া করি বাবা। তোমাকে দেখেই আমার খুব ভালো লেগেছে। জানার আগ্রহ আছে তোমার। ফি আমানিল্লাহ।

সুফী সাহেব চলে যেতেই আমি খানকা হতে বের হয়ে এলাম। প্রথমে অফিসে ফোন করে বললাম আমি অফিসে আসতে পারবো না। আমার শরীর খুব খারাপ। দুই-তিনদিন ছুটি দরকার। ফোন করে জানালাম - করিম সাহেবের কাছে। করিম সাহেব বলেছেন তিনি বসকে জানাবেন। আমার কথা হলো-অফিস ছুটি দিক বা না দিক আমি দুইদিন যাবো না। আমাকে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। ভাবনায় ডুবে যেতে হবে - গভীর থেকে গভীরে..