পৃষ্ঠাসমূহ

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৫

পাখিদের কথোপকথন-পন্ঞ্চম পর্ব


(পূর্ব প্রকাশের পর)
-দ্যাখেন শামস তাব্রীজ শোকর গোজার করছেন এই বলে যে - আলহামদুলিল্লাহ তু মেরি মোহাম্মদ কা খোদা হে...
সকল প্রশংসা হে আল্লাহ  যে তুমি আমার মোহাম্মদের প্রভুএখানে যে মোহাম্মদের কথা বলা হয়েছে তার স্বরুপ কি?
-তিনিতো আমাদের মতোই মানুষ। রহিম সাহেব বলেন।
রহিম সাহেবের কথা শুনে সোবহান সাহেব হাসতে হাসতে বিষম খেলেন। তিনি বললেনঃ
-অধিকাংশ মানুষের তথা সাধারণ মুসলমানদের ধারণা তাই। সেই সাধারণ মুসলমানের মতোই আপনি উত্তর দিলেন। সাধারণ মানুষের মতোই তিনি জীবন-যাপন করেছেন। ব্যবসা বাণিজ্য করেছেন। বিয়ে থা করে সংসার করেছেন। আবার নির্দিষ্ট সময়ে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছেন। পার্থক্য হলো – তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল এবং কলেমা তৈয়ব্যায় তার নাম আছে এবং কলেমা শাহাদাতে বা সাক্ষ্যমুলক বাক্যে তাতেও তার নাম আছে। প্রশ্নটা হলোঃ যে মুহাম্মদের কথায় আপনি আল্লাহ সর্ম্পকে জানতে পারছেন হাসর-নসর-বেহেস্ত দোযখ সবই চিনলেন, তাকে আপনি নিয়ে আসলেন আমাদের মতো সাধারণ পর্যায়ে। অথচ কোরআন বলছে – “ লাওলাকা লামা খালাকতু আফলাফ ”। আরো বলছেঃ ইন্নালাহা ওয়ামালাইকাতাহু ইউসাল্লুনা আলান নাবী ইয়া আয়ুহাললাযিনা আমানু ইউসাল্লুনা ওয়া তাছলিমা। আরো আছেঃ ওয়াইউরেদুনা আইয়্যু ফারক্কু বাইনাল্লাহি ওয়া রাসুলিহি উলাইকাহুমুল কাফেরুনা হাক্কা। এছাড়া ইয়ানজুরুনা ইলাইকা লাহুম ইউবসিরুন। সাধারণ মানুষ হলে তিনি মেরাজে যান কিভাবে? মেরাজে যেতে হলে কয়টি স্তর পাড়ি দিতে হয়? জানেন? দ্যাখেন প্রথমে তিনি ছিলেন উম্মে হানীর ঘরে। সেখান থেকে তিনি যখন বোরাকে চরে আরশে মোয়াল্লার দিকে যাত্রা করেন তখন জিব্রাইল বোরাক বলে সে আর যেতে পারবে না। এরপর রফরফ নামক আরেকটি যানে চড়ে যখন সপ্তম আসমানে আসেন তখন জিব্রাইল বলেন তার আর যাওয়ার অনুমতি নাই। এরপর মুহাম্মদ আরশে মুয়াল্লায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন। কি বুঝলেন?

প্রথম যাত্রায় তিনি ছিলেন মানবীয় স্বত্ত্বাধিকারী। এরপর যখন তিনি ফেরেস্তাদের জগতে যান তখন তিনি হন মালাইকা স্বত্তাধিকারী । পরবর্তীতে তিনি মালাইকার স্বত্তা হারিয়ে তিনি হয়ে যান আল্লাহময় তথা নুরিল্লাহর স্বত্ত্বাধিকারী। এ ঘটনাটা শামস তাব্রীজ বলেছেন-
পৌঁছে মেরাজ মে আরশে তক মুস্তফা
তাব মাবুদ না বান্দা মে পর্দা রাহা
তাব মালায়েকনে হযরতছে ঝুঁককার কাঁহা 
ছারি মাখলুকমে হকনোমা তুহি তু
অর্থঃ মেরাজে যখন পৌঁছলেন হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তখন মাবুদ আর বান্দার মাঝখানে কোন পর্দা ছিল না। তখন মালাইকা (ফেরেস্তা) হযরতের সামনে মাথা নত করে বললেনঃ সারা মাখলুকাতে সত্যই হচ্ছেন - তুমি। তার মানে তিনি আল্লাহকে দেখেছেন। তার সান্নিধ্য লাভ করেছেন। এছাড়া হযরতকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে - রহমাতুলিল আলামিন হিসেবে। তিনি বলেছেন-"অামি তোমাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছি উত্তম গুণাবলী ফুটিয়ে তোলার জন্য " কারণ, ফিতাতুল্লাতি ফাতারান নাসা আলাইহা - আল্লাহর সেই স্বভাব যৎদ্বারা মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টির পরবর্তী পর্যায়ে মানব জাতি সেই স্বভাব বা গুণাবলী হারিয়ে পশু স্বত্তার গুণাবলী ধারণ করে আছে। আলমে নাসুতের কারণে দৃষ্টিভ্রমে পতিত মানব জাতি নফসে আম্মারার গুণগুলো ধারণ করায় স্রষ্টার স্বভাব হারিয়ে ফেলেছে। বলা হয়েছে-ইন্নামাল নাফসুল আম্মারা বিসসুয়ে। 
-তার মানে নফসে আম্মারার গুণাবলীর কারণেই মানুষ পশুস্বত্তায় পরিণত হয়? রহিম সাহেব বললেন
-অবশ্যই। কেননা আত্তার যে সাতটি স্তরের কথা বলেছেন সেই সাতটি স্তর অতিক্রম করা তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা নফসে আম্মারার আদেশ লংঘন করে থাকে। তাই দেখা গেছে সুফীরা তাদের পার্থিব চাহিদার চেয়ে অপার্থিব বিষয়েরই প্রতি বেশি মনোযোগী ছিলেন
-হুম। তাহলে দেখা যায় যারা পশু সত্ত্বা লালন করছে তারা পারতঃপক্ষে নফসে আম্মারার হুকুমই তামিল করছে
-অনেকটা তাই
-ভাই একটা কথা বলি?
-বলেন
-একই স্রোতধারা থেকে উৎসরিত আমরা সবাই। কিন্ত্তু তারপরও দেখা যায় যে কাজে কর্মে কথা বার্তায় চাল চলনে কারো সাথে কারো মিল নেই। এটা কেন?
-কারণ কোন খরস্রোতা ঝর্ণার প্রবাহিত পানি যখন প্রবাহিত হয় তখন প্রবাহিত পানির গুণাবলী বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়। যখন তা খালে থাকে বলি খালের পানি। বিলে বিলের পানি। নদীতে নদীর পানি। সাগরে সাগরের পানি। এই পানিই আবার তার পূর্বস্থানে ফিরে যায় পরিশুদ্ধ হয়ে। অর্থাৎ যতদিন সেই পানি তার উৎপত্তিমুলে ফিরে যেতে না পারছে ততদিন সে যে স্থানে আছে সেই স্থানেরই গুণগুলো ধরে রাখে। একারণেই আত্তার সাতটি স্তরের কথা বলেছিলেন। কি বুঝলেন রহিম সাহেব?

রহিম সাহেব কিছু না বলে মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন। আমি আত্তারের ভাষ্য পড়ে সত্য-সী মোরগের কথা জানতে চাচ্ছিলাম। আর উনি কি-না আত্তারের কথাটির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা শুরু করে দিল। শিক্ষকতার এই এক দোষ। তারা সবাইকে ছাত্র মনে করে। সুযোগ পেলেই উপদেশ দেয়া শুরু করে
-ভাই আমি আপনার কাছে আসছিলাম সত্য-সীমোরগের কথা জানতে। আর আপনি দেখি আত্তারের উক্তিটির ব্যাক্ষ্যা বিশ্লেষণ দেয়া শুরু করে দিয়েছেন?

-তা যথার্থই বলেছেন। কেন করেছি? তাও বলি। সত্য সী-মোরগ থাকে দেহের অন্তঃকরণে। দেহের অন্তঃকরণে যে বসে আছে তার কথা শুনতে হলে তাকে বুঝতে হলে নুরে মুহাম্মদীকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে আপনার আপন দেহকে। চিনতে হবে তাকে। স্বামী বিবেকানন্দ যখন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে গিয়ে জিগ্যেস করেন-প্রভু, আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন? উত্তরে পরমহংসদেব বলেন-দেখেছি কি রে? তার সাথে কথা কয়েছি। এই যেমন তোর সাথে কথা বলছি। তখন স্বামীজি জিগ্যেস করলেন-ঈশ্বর এক না বহু? উত্তরে তিনি বললেন-যদি সমাধির দৃষ্টিতে দেখিস তাহলে এক আর যদি সেইদৃষ্টি ভিন্ন অন্য দৃষ্টিতে দেখিস-তাহলে বহু। উপনিষদে ঋষি আরণি তার পুত্র শ্বেতকেতুকে বললো-বাবা, তুমিতো অনেক বিদ্যান হয়েছে। কিছু গর্বও তোমার হয়েছে। তুমি কি তোমার সেই বিদ্যা দিয়ে ঈশ্বরকে উপলব্দি করতে পেরেছো? উত্তরে শ্বেতুকেতু বললো-সেটা কি সম্ভব? ঋষি আরণি তার পুত্রকে একগ্লাস জল আর একটু লবন আনতে বললেন। পুত্র নিয়ে এল। এরপর তিনি পুত্রকে বললেন-এটা কি? পুত্র স্ফটিক তথা দানাদার লবনের কথা বললেন। পিতা সেই লবন জলে ফেলে পানির সাথে মিলিয়ে ফেললেন। তার পর বললেন-লবন কোথায়? লবনতো মিশে গেছে। পিতা পুত্রকে পানির স্বাদ নিতে বললেন। স্বাদ নিয়ে পুত্র বললো-লবনের স্বাদতো ঠিকই আছে। তার মানে তুমি তাকে দেখছো না। কিন্ত্তু তার উপস্থিতি টের পাচ্ছ। তাই না? ঠিক তাই। মহাবিশ্বে তার সর্বোময় উপস্থিতি। 

তদ্রুপ আপনার দেহেও তার সর্বোময় উপস্থিতি। অাপনার কি কখনো মনে হয় না-যখন কোন গর্হিত কাজ করতে যান তখন কে যেন আপনার ভেতর থেকে বলে-খবরদার ওটা করিস না। বলে কি-না? যদি না বলে তবে ধরে নিতে হবে আপনার জমির মৃত। আর যদি বলে-তাহলে ধরে নিতে হবে-এটা সে যাকে আপনি সী-মোরগ বলেন। যাকে আপনি জানতে চাচ্ছেন। তো সেই ব্যাপারটাই আমি আপনাকে ভাগে ভাগে আলোচনার মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছি। এখন আপনিই বলুন-এ আলোচনা চলবে না বণ্ধ করে দেব?
(চলবে) 
 

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৫

পাখিদের কথোপকথন-চতুর্থ পর্ব

চা খেতে খেতে সোবহান সাহেব রহিম সাহেবকে বললেনঃ
- দেখুন রহিম সাহেব। কথাটা ছিলঃ "হে সত্যন্বেষী পথিক, তোমরা দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখছো, আমি দর্পন, সত্য সী-মোরগ তোমাদের অন্তরে। দৃষ্টিভ্রমে তোমরা এক কে বহু রুপে দেখছো। পরম সত্য এক"।
বাক্যটাতে ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন বলা হয়েছে-"হে সত্যান্বেষী পথিক "- তার মানে কি? যে সত্যকে জানতে চায়। বুঝতে চায়। সত্য কি? সত্য হচ্ছে - সেই চিরন্তন সত্ত্বা যা রয়েছে অন্তঃকরণে। কারণ অন্তঃকরণই হচ্ছে স্রষ্টার আবাসস্থল। কারণ "কুলুবুল মো'মেনিনা আরশু আল্লাহ "। মোমিনের কলবেই আল্লাহর আরশ।
এর পর বলা হয়েছে-"তোমরা দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখছো অামি দর্পণ। কথাটার অর্থ কি? দর্পণ বলতে আমরা বুঝি আয়নাকে। যেটার দিকে তাকালে তার প্রতিবিম্ব দেখা যায়। অর্থাৎ যে দেখে সে দর্শক। যাকে দেখে সে প্রদর্শক। মানে হলো-যে দর্শক সেই প্রদর্শক। আপনি যদি আপনার চেহারাটা আয়নায় দেখেন তখন আয়নাটা হয়ে যায় প্রকাশের মাধ্যম। প্রতিবিম্বিত হবে আপনারই প্রদর্শিত চেহারা।
-ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না? একটু বুঝিয়ে বলুন।
-শুনেন, পুরো জগতটাই আল্লাহময়। কারণ আল্লাহ কুলিশাইয়িন মুহিত। সেই মুহিততো আপনার মাঝেও আছে। যে আয়নাটায় দেখছেন সেটার মধ্যেও সে মুহিত অবস্থায় আছে। এজন্যই বলা লা মওজুদা ইল্লাল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন কিছুই নেই। সর্বত্র আল্লাহময়। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হলো- জগতে সাধারণ্যের কাছে আল্লাহর ধারণা আর সুফীদের আল্লাহর ধারণার মধ্যে পার্থক্য আছে। সাধারণ্যের আল্লাহ জগতের বাহিরে এক অতিইন্দ্রিয় স্বত্তা। যিনি  কাহির (কঠোর মনোভাব সম্পন্ন) এবং কঠিন বিচারক। বলা যেতে পারে আল-আদিল তথা সূক্ষ্ম বিচারক। কিন্ত্তু সুফির কাছে তিনি ওয়াদুদ। তিনিই সাকী। এই মুলস্বত্তা কারো কাছে ধরা দেয় পরম প্রেমাষ্পদরুপে।
আজকে আপনার কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি শুনুনঃ
যে নামের মধ্যে আল্লাহ্ তা’য়ালার সমস্ত গুণাবলি এবং পূর্ণতা বিদ্যমান, তা আল্লাহ সত্তাগত বা মূল নাম। যথা ‘আল্-ইলাহু’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ আল্লাহু। আল্লাহু-এর সংক্ষেপ হল ‘হু’। ‘হু’-এর সংক্ষেপ হল এর মর্মার্থ। মর্মার্থে কোনো শব্দ বা ধ্বনি নেই। কিন্তু হু-এর পেশ-এর স্থলে যের এবং যবরও ব্যবহৃত হয়। যেমন হাঃ হিঃ হু। কোনো কোনো কিতাবে ‘আল্লাহু’ এর সংক্ষেপ ‘আহ্’ও করা হয়েছে। আল্লাহু শব্দের প্রথম অক্ষর ‘আলিফ’ এবং শেষ অক্ষর ‘হু’। এ উভয় অক্ষর মিলে যের, যবর ও পেশ সংযোজনে আহ্, ইহ্ এবং উহ্ গঠিত হয়। অনুরূপভাবে যে কোনো যিকিরের শব্দের সংক্ষেপায়নে কোনো দোষ নেই। যথা ‘নামাযে বেলায়েত’-এ উল্লেখ আছে যে, ‘আল-ইলাহু’ সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘ইল্’ হয়েছে। অর্থাৎ হামজাতে যের আর লাম যযমের সাথে এসেছে। সুফীদের যিকির দ্বারা কখনো ‘ইল্’ এর হামজাকে হা-এ-হাউওয়াজ দ্বারা বদল করে হেল্ হেল্ শব্দে যিকির করে থাকেন। এ পদ্ধতিতে প্রত্যেক ধ্বনির মধ্যে আল্লাহ্ নাম পাওয়া যায়। কারণ, এমন কোনো ধ্বনি নেই, যার মধ্যে ‘হু’ এর লেশ নেই; বরং সব ধ্বনির শেষে ‘হু’-এর সংক্ষিপ্তরূপ অনিবার্য। অতএব, তাঁর নাম ব্যতীত কোনো শব্দ বা ধ্বনি নেই। এজন্যই আল্লাহ্ বলেন, يسبح لله ما فى السموات وما فى آلارض (ইউছাব্বিহু লিল্লাহি মাফিস্ সামাওয়াতি ওয়া মা-ফিল্ আরদি) অর্থাৎ, “আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে সবই আল্লাহকে স্মরণ করছে।” এর দ্বারা সমস্ত সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা প্রত্যেক বস্তু এবং জীবের সাথেই মূল সত্তা সম্পৃক্ত। যে কোনো আওয়াজের সাথেই আল্লাহ্ নাম রয়েছে।

শেখ সাদী (রহঃ) বলেন,
“বাজিকিরাশ হরচে বিনি দর খোরাশাস্ত
ওয়ালী দানাদ্ দর ইঁ মা’না কেহ্ গোশ আস্ত।”
অর্থাৎ, অন্তরে যা থাকে, আওয়াজে তা-ই আসে। এ অর্থের প্রতি কান রেখে ধ্যান করলে, সব আওয়াজেই আল্লাহ্ নাম পাবে। আত্মিক শব্দে ‘হু’ ও আত্মিক-ই হবে। সব কথায় আল্লাহ্ নাম থাকাটা একটা জ্ঞান রহস্য। অনুরূপভাবে সকল কাজেও রহস্য আছে। যেমন চোরের চুরির মধ্যে দিয়ে আল্লাহ্ কাজই সম্পন্ন হয়। কিন্তু রূপক অর্থে অপরাধী হয় চোর। যেমনঃ দাবা খেলার সময় কোনো গুটির চাল যদি ভুল হয়, তখন সে গুটিটি সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, যেন গুটিটিই অপরাধী। আল্লাহ্ কোনো কাজই নিরর্থক নয়। এর রহস্যের প্রেক্ষিতে সব কাজই ভালো। কটূক্তি কখনো দোয়াতুল্য হয়। যেমন, আল্লাহ্ অলিগণ কটূক্তির মাধ্যমে কোনো কোনো বিপদাপদ অপসারণ করে থাকেন। কোনো সময় চুরিও আশীর্বাদস্বরূপ হয়। সময় বিশেষে মাল চুরি হলে ভালো হয়। যেমনঃ হযরত খিজির (আঃ) নৌকা চুরি করাতে মালিকের উপকার হয়েছে। তবে মানুষের অপরাধী হওয়াটা ভাঙা অলংকার এবং অস্ত্রের মতো। খরিদ্দারের কাছে এগুলো ভালো নয়। কিন্ত্তু স্বর্ণকার এবং কামারের কাছে এগুলো ঠিকই আছে। কারণ এর দ্বারা অন্য জিনিস তৈরি হবে। তেমনি মন্দ কথা এবং অশ্লীল শব্দেরও একই অবস্থা। কেউ যখন কাউকে কোনো অশ্লীল কথা বলে, তাতেও আল্লাহ্ ইচ্ছাই কার্যকরী হয় এবং তারই নাম ও কাজ সম্পন্ন হয়। আল্লাহ্ কোনো ব্যক্তির মুখ দিয়ে কোনো বিশেষ সময়ে, যে সমস্ত কথা বলাবার ইচ্ছা করেন, তখন সে সব কথার একটি জগৎ সৃষ্টি করা হয়। আর সে অনুযায়ী ব্যক্তির মুখ থেকে তা নিঃসৃত হয়।
সুতরাং আপনি যে দর্পণের কথা বলছেন-সে দর্পণ সে নিজেই। সমগ্র জাহান "সে" ময়। কালামে শামস্ তাব্রীজে বলা হয়েছেঃ-
মালেকুল মুলুক  লা শারীকালাহু
ওয়াহ্ দাহু  লা ইলাহা ইল্লাহু শামস তাব্রীজ গার খুদাতালাহ ই  
খুশবু কা লা ইলাহা ইল্লাহু
কো আনাইন কা মসজুদ হ্যায় মাবুদ হে তু
অওর জো তেরি শাহিদ হে কে মশহুদ হে তু
অওর এক কি লপ্পর হে তেরি হামদ ও সা'না
হর সোওজ মে হর সাঁঝ মে
তেরে হি নামছে অওর ইফতেদা হে
তেরেহি নাম তক হর ইনতেহা হে
তেরি হামদ ও সা'না আলহামদুলিল্লাহ 
তু মেরি মোহাম্মদ কা খোদা হে...আল্লাহু.
(চলবে)

পাখিদের কথোপকথন-তৃতীয় পর্ব

সোবহান সাহেব ঘরেই ছিলেন। তিনি একটি চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে চা খাচ্ছিলেন। আর গজল শুনছিলেন। অনুপ জালোটার গাওয়া -
 মেহেফিলে হুসনে সাজাও তো কয়ি বাত বানে....
দওলতে ইশক লুটাও তো কয়ি বাত বানে....
জাম সাগারছে গাওয়া নেহি পিনা মুঝকো..
আপনি আখোছে পিলাওতো কয়ি বাত বানে...
সকালটা তার কাছে বেশ উপভোগ্যই মনে হচ্ছিল। কিন্ত্তু হটাৎ কলিংবেলের শব্দে তার মেজাজটা বিগড়ে যায়। কে এলো এই সকাল বেলা....তিনি বেশ বিরক্ত হয়েই উঠে গেলেন দারোজার কাছে। যেয়ে দেখলেন রহিম সাহেব কেমন গোমড়ামুখো হয়ে তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে। চোখের কোণে ক্ষানিকটা ময়লা জমে আছে। তার বুঝতে বাকী রইলো না যে কিছু একটা হয়েছে। কিন্ত্তু কি হয়েছে? সেটাতো জানা গেল না। যাই হোক..সোবহান সাহেব দরোজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে রহিম সাহেবকে ভেতরে আসতে বললেন। রহিম সাহেব কোন কথা না বলে ভেতরে প্রবেশ করলেন।

সোবহান সাহেব দরোজাটা লাগিয়ে দিয়ে রহিম সাহেবকে বসতে বললেন। রহিম সাহেব বসতেই সোবহান সাহেব তাকে জিগ্যেস করলেনঃ
-কি ব্যাপার রহিম ভাই? আপনাকে কেমন যেন বিষর্ম মনে হচ্ছে? কোন সিরিয়াস কিছু?
রহিম সাহেব সোবহান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ
-তেমন সিরিয়াস কিছু না? আবার সিরিয়াসও।
-কি রকম? পুরো ব্যাপারটা খুলে বলুনতো?
রহিম সাহেব সমস্ত ঘটনা আদ্যপান্ত খুলে বললেন। ঘটনাটা শুনে সোবহান সাহেব অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন-এই ঘটনার জন্য আপনি এত পেরেশান হয়ে গেছেন। আপনারতো উচিত ছিল সমস্ত ঘটনার পেছনে যে কার্যকারণটা রয়ে গেছে সেটা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা।

-আরে ভাই সেটা পারছি না  বলেইতো আপনার কাছে আসা.. 
-ভালোই করেছেন। সমস্যা নেই। সব বলবো। তার আগে চলেন বারান্দায় যেয়ে বসি। চা খাই আর আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজি। যদিও আমি স্বপ্ন বিশারদ নই

বারান্দায় সোবহান সাহেব একটি লাইব্রেরী তৈরী করেছেন। চার দিকে বইয়ের সারি। আলমিরার তাকে থরে থরে সাজানো বই। সেখানে চেয়ার পাতানো আছে। অবসর সময়ে তিনি এইখানে বসে বই পড়েন আর গজল শোনেন।বারান্দায় এসে তিনি রহিম সাহেবকে বসতে বললেন। রহিম সাহেব বসতেই সোবহান সাহেব বললেনঃ
আত্তার যে গল্পটি লিখেছেন-তা মুলতঃ সাধনার জগতে সাতটি স্তর। সাধনার সাতটি স্তর হলোঃ সন্ধান, প্রেম, জ্ঞান, নির্লিপ্ততা, একত্ব, বিষ্ময় ও আত্মবিনাশ। আত্তার মুলতঃ যা দেখাতে চেয়েছিলেন তাহলো মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন। আর আত্তারের গল্পটি পড়ে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী বলেনঃ “আত্তার সাধনার সাতটি রাজ্য ভ্রমণ করেছেন। আর আমি এখনও আঁধারের গলিতেই ঘুরে মরছি।“ মজার কথা হলোঃ ফরিদউদ্দিন আত্তার একবার তার দোকানে বসে আছেন। এমন সময় এক ভিক্ষারী এলো তার দোকানের সামনে। আত্তার তাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিলেন না। তখন ভিক্ষারী তাকে বলছেন, "আশ্চর্য লোকতো আপনি। আমার দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না। খোদা জানেন, কিভাবে আপনার মৃত্যু হয়।" আত্তার ভিক্ষারীকে জবাব দিলেন, "তোমার যেভাবে মৃত্যু হয়, আমারও সেভাবে মৃত্যু হবে।" জবাবে ভিক্ষারী বললেন-"আপনি কি আমার মতো মরতে পারবেন?" একথা বলেই ভিক্ষারী ভিক্ষার পাত্রটি একপাশে রেখে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। তারপর আল্লাহ উচ্চারণ করে ভিক্ষারী মারা গেলেন।এঘটনা আত্তারকে ভাবিত করে তোলে। পরবর্তীতে আত্তার সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে সাধনা করা শুরু করেন। এতো গেল আত্তারের কথা।
এবার আসি আপনার কথায়। আপনি তার বইটি পড়ে নিজেকে নিয়ে যেতে চাইছেন – সেই ফানার জগতে। তাই আপনি নিজেকে দেখেছেন বন-মোরগ হিসেবে।পুরো বিষয়টি ছিল আপনার অতিন্দ্রিয় চিন্তার ফসল। যেমন ধরুন আপনি জানেন ভাবী সবসময় আপনার কাজের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে এবং আপনার সাথে সবসময় একটা না একটা বিষয় নিয়ে কলহে লিপ্ত থাকে। তাই তাকে দেখেছেন দাঁড়কাক হিসেবে। আর আপনার ছোট মেয়েটি যেহেতু চন্ঞ্চলমতি তাই তাকে দেখেছেন টুনটুনি হিসেবে। 
আর বাজারে যাদের দেখলাম-তাদেরকে কেন ঐ অবস্থায় দেখলাম? রহিম সাহেব বললেন।
-পুরো ঘটনাটাই আপনার মস্তিষ্কের খেলা। আমাদের মস্তিষ্কে নিউরোন নামক যে স্নায়ুকোষটি আছে তা এক একটা সুপার কম্পিউটারের চেয়েও বেশি গতিতে কাজ করে। সেই সুপার কম্পিউটারটিই আপনার পুরো ঘটনাটা এভাবে সাজিয়ে আপনাকে দেখিয়েছে। যেমন ধরেন - গোস্ত বিতানের কথা। সেখানে আপনি দেখলেন একটা শকুন বসে আছে। আপনি জানেন – শকুন মরা গরু খেতে পছন্দ করে। যে বিক্রেতা মাংস বিক্রি করছিলো তাকে শকুনরুপে দেখার কারণ হলো - আপনি নিজেও জানেন না যে গরুটি জবেহ করা হয়েছে তা বিধিমোতাবেক জবেহ করা হয়েছে কি-না? সে সন্দেহ থেকেই আপনার এরুপ ধারণা হয়েছে।
- কিন্ত্তু বাজারে মাছ বিক্রেতাদের ঐরুপ দেখার কারণ কি?
- সেটাও আপনার অতিচিন্তনীয় বিষয়ের ফল। আপনি জানেন-মাছ বক পাখি, চিল কিংবা বাজ পাখিদের প্রিয় খাদ্য। সেই চিন্তা থেকেই আপনি তাদের দেখেছেন বক, চিল আর বাজ পাখিরুপে।
কথা বার্তার একফাঁকে আট-দশ বছরের একটি ছেলে ট্রেতে চা বিস্কুট আর পানি নিয়ে এল। সোবহান সাহেব তা টেবিলের পাশে রেখে রহিম সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন-রহিম ভাই চা খান।
আনমনা রহিম সাহেব ভাবছিলেন তিনি সোবহান সাহেবের কাছে আধ্যাত্মিক টাইপের কিছু শুনবেন। কিন্ত্তু সেটা হলো না দেখে রহিম সাহেব খানিকটা মিয়্রমান হয়ে গেলেন। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তিনি বললেন
-কিন্ত্তু আত্তারের একটি বিষয় আমার মাথায় ঢুকছে না। সেটা হলোঃ তারা যখন শেষ স্তরে যায় তখন তারা ভাষাহীন এক ঐশী বাণী শুনতে পেলো "হে সত্যন্বেষী পথিক, তোমরা দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখছো, আমি দর্পন, সত্য সী-মোরগ তোমাদের অন্তরে। দৃষ্টিভ্রমে তোমরা এক কে বহু রুপে দেখছো। পরম সত্য এক"।

সোবহান সাহেব রহিম সাহেবের কথাটা শুনে কিন্ঞ্চিৎ নড়ে চড়ে বসলেন। চশমার গ্লাসটা পরিস্কার করে আবার তা পড়লেন। এরপর আড়চোখে তাকালেন রহিম সাহেবের দিকে। ক্ষানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝতে চেষ্টা করলেন - রহিম ভাই কি সত্যিই বিষয়টি উপলব্ধি করতে চায়? না-কি জানার আগ্রহ থেকে জানতে চাচ্ছে?
তিনি লক্ষ্য করলেন-রহিম সাহেব কেমন যেন ভাবিত হয়ে বসে আছে। তিনি তাকে বললেন-চা খান তারপর বলছি।
(চলবে)

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৫

পাখিদের কথোপকথন-দ্বিতীয় পর্ব

রহিম সাহেব চিন্তিত মনে বারান্দার রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেখলেন দুর আকাশে কিছু পাখি উড়াউড়ি করছে। বইটা তিনি আবারো পড়ার চেষ্টা করলেন। কিন্ত্তু কিছুতেই তার মন বসছে না। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তার মনে কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল - "হে সত্যন্বেষী পথিক, তোমরা দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখছো, আমি দর্পন, সত্য সী-মোরগ তোমাদের অন্তরে। দৃষ্টিভ্রমে তোমরা এক কে বহু রুপে দেখছো। পরম সত্য এক"।
চিন্তিত মনে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সোজা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বাগানের দিকটায় গেলেন। দেখলেন-ছোট্ট একজোড়া টুনটুনি পাখি এ ডাল  ও ডাল করছে আর খুনখুটি করছে। পুকুর পাড়ে হাঁসেরা জলকেলি করছে। গাছের ডালে একটি শালিক পাখি কি যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাচ্ছে। দুর আকাশে উড়ে যাচ্ছে চিল। বাড়ির চালায় একটি কাক বসে থেকে থেকে ডাকছে কা... কা...।
পাখিদের নিয়ে তিনি একমনে ভাবা শুরু করলেন। তার আর কোন দিকে খেয়াল রইল না। বাগানের ভেতরটায় প্রবেশ করতেই দেখলেন কতোগুলো চড়ুই পাখি ফুরুৎ করে উড়ে চলে গেল। কিন্ত্তু কাকটি তার দিকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকিয়ে রইল আর শব্দ করে ডাকতে লাগলো কা ... কা...। 
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। চারদিকে হাল্কা একটা অন্ধকারের চাদর কে যেন বিছাতে শুরু করেছে। তাকে ওভাবে হাঁটতে দেখে জমিলার খানিকটা ভয় হলো। তিনি ভাবলেন-লোকটার হটাৎ কি হলো? কি যেন অানমনে চিন্তা করছে আর পায়চারি করছে? এ সময়তো তার এমন করার কথা না। এসময় লোকটা চা না পেলে পাগলের মতো হয়ে যায়। চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়ি মাতিয়ে তোলে। অথচ আজকে তাকে অন্যরকম লাগছে। কোন চিৎকার চেঁচামেচি নেই। নেই কোন সাড়া শব্দ? ঘটনাটা কি? 
তিনি হাঁটতে হাঁটতে রহিম সাহেবের পাশে এসে দাঁড়ালেন। রহিম সাহেব দেখেও না দেখার ভান করে কোন কথা বললেন না। তিনি ভাবতে লাগলেন সী-মোরগের কথা। জমিলা জিগ্যেস করলেন-কি হয়েছে তোমার? কোন কথা বলছো না? কি যেন চিন্তা করছো?
-ও তুমি বুঝবে না। আর তোমাকে বলেও কোন লাভ নেই।
-কি হয়েছে শুনি?
-তুমি কি সী-মোরগ চেন?
-সী-মোরগ? এটা আবার কি? কোথায় দেখলে সী-মোরগ?
-বইতে। 
-বইতে? তো সেটা নিয়ে ভাববার এতো কি আছে?
-কি আছে মানে? তুমি কি জানো তোমার ভেতর একটা সী-মোরগ লুকিয়ে আছে। সেই সী-মোরগ রোজ ভোররাতে তোমাকে ডেকে তোলে। তোমাকে নীরবে নিভৃতে গান শোনায়। তোমার সাথে কথা বলে।
-আমার সাথে কথা বলে? কই আমিতো কখনো শুনিনি।
-তুমি কিভাবে শুনবে? তুমিতো জানোই না। আর শোনার মতো তোমার কান কোথায়?
-আমার শোনার দরকার নেই। তুমি শুন। তোমার সী-মোরগের কথা।
জমিলা বুঝলেন। তার সাথে কথা বলে কোন লাভ নেই। তিনি আর কিছু না বলে শুধু বললেন-সন্ধ্যা হয়েছে। চলো ভেতরে চল। 
এ কথা বলেই জমিলা হন হন করে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করলেন। রহিম সাহেবও আর কিছু না বলে তার পিছু পিছু ছুটলেন। রাতে খাওয়া দাওয়া করে রহিম সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে তিনি স্বপ্নে দেখলেন- তিনি বাজারে গেলেন। বাজারে যেয়ে দেখলেন - সব চিল কাক শকুনগুলো জড়ো হয়েছে। সবাই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তিনি তার পরিচিত দোকানে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন একটা বাজ পাখি বসে আছে। তিনি থতমত খেয়ে গেলেন। আরে তিনিতো এসেছেন - জনতা স্টোরে। এই দোকানের মালিকতো জহির সাহেব। বাজারে তিনি একটি বড়ো দোকান দিয়েছেন। তার বন্ধুমানুষ। কিন্ত্তু তিনি কাকে দেখছেন? তিনি সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন গোস্তবিতানে। এই দোকানে কচি গরু ছাগল জবেহ করে বিক্রি করা হয়। দোকানী তার পরিচিত। সেই দোকানে ঢুকতেই তিনি হতচকিত হয়ে গেলেন। দেখলেন-একটা শকুন বসে আছে। তিনি ভয়ে সেখান থেকে সরে এসে গেলেন মাছের বাজারে। বাজারে ঢুকতেই দেখলেন কতোগুলো কাক বক আর চিলের মিলন মেলা। তিনি আর ভেতরে প্রবেশ করলেন না। তিনি সোজা বাড়ির পথ ধরলেন। বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখলেন তার ছোট্ট টুনটুনিটা তার কাছে দৌড়ে এসে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। আর একটা দাঁড় কাক তাকে জিগ্যেস করলো-কি বাজার এনেছো? না বলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন। হাত মুখ ধোয়ার জন্য তিনি ওয়াশ রুমে গেলেন। ওয়াশরুমে পানির ঝাপটা দিতেই দেখলেন তার পালকগুলো ভিজে একাকার হয়ে গেছে। মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন-তিনি একটি বন-মোরগ। 
ধড়মড় করে তিনি ওঠে বসলেন। তার ঘুম ভেংগে গেল। পাশেই দেখলেন তার স্ত্রী অঘোড়ে ঘুমাচ্ছে। আর তার বাচ্চা মেয়েটাও হাত পা ছড়িয়ে কেমন আয়েশের ভংগিতে ঘুমাচ্ছে। তিনি আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্ত্তু কিছুতেই তার ঘুম হলো না। তিনি মনে মনে ভাবলেন-সকাল হলেই তিনি সোবহান সাহেবের সাথে কথা বলবেন। তিনি আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলেন। চোখ বুঁজে পড়ে রইলেন।

জমিলার ডাক চিৎকার চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেংগে গেল। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন-সাড়ে আটটা বেজে গেছে। তিনি কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। (চলবে)

বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৫

পাখিদের কথোপকথন-প্রথম পর্ব

রহিম সাহেবের বাড়িটি ভারী সুন্দর। চার শতাংশের একটি জায়গার মধ্যে তিনি তার বাড়িটি তৈরী করেছেন। বাড়ির চতুর্দিকে তিনি নানা প্রকার গাছ গাছালি লাগিয়েছেন। বাড়িটির প্রবেশ পথের দু'ধারে তিনি ফুলের বাগান তৈরী করেছেন। বাড়িটির মুল গেটটিতে গেটফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন। সেটি কালে ভদ্রে বড়ো হয়ে গেটটিকে পেঁচিয়ে দুধার দিয়ে উঠে গেছে। যখন ফুল ফোটে তখন পুরো বাড়িটি ফুলের ঘ্রাণে মম মম করে। এমন একটি বাড়ির বারান্দার একধারে তিনি একটি টেবিল ও তার বই পত্র রেখেছেন। অবসর সময়ে তিনি বই পড়ে সময় কাটান। তার বইপত্রগুলোর মধ্যে অধিকাংশই সুফী সাহিত্যে ভরা। সুফীদের জীবন-যাত্রা ও তাদের সাধন পদ্ধতি জানার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ আছে। তিনি প্রায়ই সোবহান সাহেবের সাথে কথা বলেন সুফীমতবাদ নিয়ে। সোবহান সাহেব হাবিবপুর ডিগ্রি কলেজের দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি প্রায়ই রহিম সাহেবের বাড়ীতে বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সেই দিন তিনি একটি বই পড়ছিলেন। বইটির নাম মনতাকুত তয়ের বা পাখিদের কথোপকথন। লিখেছেন ফরিদ উদ্দিন আত্তার। তিনি বইটি হাতে পেয়ে ভাবলেন - পাখিদের কথোপকথন আর কি হতে পারে? পাখিরা চিকির মিচির করে ডাকাডাকি করে। তাদের ভাষা কি আমরা বুঝতে পারি? আর পারলেই বা আমরা কিভাবে তাদের জীবন পদ্ধতি বুঝতে পারি? আমরা যেভাবে সংসার করি পাখিরাও কি ঠিক সেই ভাবে সংসার করে ? যাক দেখি বইটিতে কি লিখেছে? অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি বইটি পড়া শুরু করলেনঃ
বনের সকল পাখি এক হয়ে জ্ঞানবৃদ্ধ হুদহুদ পাখির সভাপতিত্বে আলোচনা সভা আরম্ভ করে। পাখিরা একজন বাদশা নির্বাচনের ঐক্যমত্য প্রকাশ করে। হুদহুদ বললো পাখির মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো সী-মোরগ এবং সে সপ্ত উপত্যাকার পরপারে কাফ নামক স্থানে অবস্থান করে। সকল পাখি সী-মোরগকে দেখার অভিলাষ প্রকাশ করলে হুদহুদ জানায় যে সেখানে যাবার পথ অত্যন্ত দুর্গম। আলোচনা শেষে পাখিরা হুদহুদকে পথ প্রদর্শক হিসাবে মনোনীত করে। যাত্রারম্ভ সময় উপস্থিত হলে দেখা গেল প্রায় সকল পাখি মুখ ভার করে বসে রয়েছে। বুলবুল গোলাপ বাগান ছেড়ে যেতে চায় না, তোতা অপরূপ দেহ নিয়ে বিদেশে যেতে নারাজ, হাঁস জলপথ চায়, পেঁচা চায় রাতের অন্ধকার ও ভাঙ্গা বাড়ি এবং বাজপাখি রাজার প্রিয় বলে তার সঙ্গ ছাড়তে চায় না। হুদহুদ যুক্তি দিয়ে পাখীদের আপত্তি খন্ডন করলে হাজার হাজার পাখি যাত্রা শুরু করে। সী-মোরগের কাছে পৌঁছতে যে সাতটি উপত্যকা অতিক্রম করতে হয় তা নিম্নরূপঃ-

(১) সন্ধানঃ এখানে সঠিকপথ নির্বাচনের জন্য ধৈর্য ধারন করে কতগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয় এবং জড় জগতের আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হয়। অনেক পাখি এসব মেনে চলতে না পেরে এ উপত্যকায় বাদ পড়ে যায়।

(২) প্রেমঃ অবশিষ্টরা এ উপত্যকায় পৌঁছে। কিন্তৃু এটি আরো কঠিন। এখানে প্রেমিকের ধৈর্য,সহনশীলতা,দারিদ্র ও বিশ্বাসের অগ্নি পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেকে প্রান ত্যাগ করে এবং অনেকে সম্মুখে অগ্রসর হতে অস্বীকার করে। ফলে এ উপত্যকায়ও অনেকে পাখি বাদ পড়ে যায়।

(৩) জ্ঞানঃ প্রকৃত প্রেমিক প্রেমিকার আকর্ষনে এ উপত্যকায় উপনীত হয়। এ জ্ঞান ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতামুলক বা প্রজ্ঞামুলক জ্ঞান নয়। এ জ্ঞান হলো হৃদয় ঐশী আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে আত্না পরমাত্মার সন্দর্শন লাভ করে এবং প্রেমিক প্রেমাস্পদের অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করে বেহুঁশ হয়ে পড়ে। যারা এ জ্যোতি বহনের ক্ষমতা লাভ করে না তারা সম্মুখ পানে আর অগ্রসর হতে পারে না।

(৪) নির্লিপ্ততাঃ এ উপত্যকায় সকল প্রকার প্রয়োজনীয়তা, চাহিদা, আশা-আকাঙ্খা, অভাব -অনটন, লোভ-লালসা, মোহ-মায়া থেকে পথিক মুক্ত হয়ে যায়।

(৫) একত্বঃ পার্থিব জগতের সকল আকর্ষন মুক্ত হয়ে পথিক একত্ব উপত্যকায় উপনিত হয়। এখানে সে সকল বৈচিত্র্য ও বহুত্বের মাঝে পরম ঐক্য উপলব্দি করতে পারে।

(৬) বিস্ময়ঃ এ উপত্যকায় পথিক এত বিহবল হয়ে পড়ে যে, আমি, তুমি, এক ও বহু ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করতে পারে না। তারা নিজেরা বেঁচে আছে কিনা তাও জানে না। তাদের প্রেমিকাকে তারা চিনে না এবং কেন ভালোবাসে তাও জানে না। কেন এ পথ অবলম্বন করে পাড়ি জমিয়েছে তাও বোঝে না। তাদের ধর্ম কি সে কথার উত্তর তাদের কাছে পাওয়া যায় না।

(৭) আত্ন বিলোপনঃ এ উপত্যকায় উপস্থিত হয়ে প্রেমিক সকল আত্নচেতন হারিয়ে ফেলে এবং কালা, বোবা, নির্বাক,নিঃসাড় হয়ে পড়ে। প্রেমাস্পদ ছাড়া অন্য সকল সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রেমাস্পদে ফানা হয়ে যায়। এ অবস্থায় প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ এক ও অভিন্ন হয়ে যায়।

যাত্রার প্রতিটি উপত্যকায় বাদ পড়তে পড়তে হাজার হাজার পাখির মধ্যে মাত্র ত্রিশটি পাখি সী-মোরগের সদর্শন লাভ করে। সী-মোরগের সম্মুখে উপস্থিত হলে তারা দেখতে পেলো যে, তারা প্রত্যেকই এক একটা সী-মোরগ। তারা প্রত্যেকেই বিস্ময়ে চিন্তা করতে লাগলো তাহলে প্রকৃত সী-মোরগ কে?  তখন ভাষাহীন এক ঐশী বাণী শুনতে পেলো "হে সত্যন্বেষী পথিক, তোমরা দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখছো, আমি দর্পন, সত্য সী-মোরগ তোমাদের অন্তরে। দৃষ্টিভ্রমে তোমরা এক কে বহু রুপে দেখছো। পরম সত্য এক"। আসলে তুমিই পবিত্র কুরআন। তুমি নিজেই নিজের মধ্যে নিজ প্রকাশভঙ্গী লক্ষ্য কর। তুমিই পরম সত্তার প্রতিরুপ ও বস্তুর আসল স্বরুপের প্রকৃত জ্ঞাতা।

এ পর্যন্ত পড়ে রহিম সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। সাতটি সাধনার স্তর অতিক্রম করার পর পাখিরা দেখতে পেলো যে তারা নিজেরাই এক একেকজন সী-মোরগ। তিনি নিচের লাইনটি আবারো পড়া শুরু করলেনঃ-

তখন ভাষাহীন এক ঐশী বাণী শুনতে পেলো "হে সত্যন্বেষী পথিক, তোমরা দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখছো, আমি দর্পন, সত্য সী-মোরগ তোমাদের অন্তরে। দৃষ্টিভ্রমে তোমরা এক কে বহু রুপে দেখছো। পরম সত্য এক"। আসলে তুমিই পবিত্র কুরআন। তুমি নিজেই নিজের মধ্যে নিজ প্রকাশভঙ্গী লক্ষ্য কর। তুমিই পরম সত্তার প্রতিরুপ ও বস্তুর আসল স্বরুপের প্রকৃত জ্ঞাতা।
তার মানে কি? তার মানে আমার ভেতরই সী-মোরগ রয়েছে? কিন্ত্তু সেটা কোথায়? সেটা কি কথা বলে? যদি বলে থাকে তো কি ভাষায় কথা বলে? তার ভাষা কি আমরা বুঝতে পারি?

রহিম সাহেব বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। (চলবে)