পৃষ্ঠাসমূহ

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০১৫

ভাবনার বিষয়-পর্ব তিন


 (পূর্ব প্রকাশের পর)

মাহিনের নিঃস্তব্ধতা নীরবতা দেখার মতো। কেমন যেন অবিচল অটল হয়ে বসে আছে। কি ভাবছে কে জানে? আমি শুধু জানি আমার ভাবনাগুলো কেমন যেন জড়তায় আষ্টে পিষ্টে বাঁধা পড়ে আছে। কিছুতেই সেই জট ছাড়াতে পারছি না। আর তার জন্যই আমি ব্যাকুল হয়ে আছি শাহ্ সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্ত্তু বিধাতার লীলা বোঝা বড়ো কঠিন। যতবারই যেতে চেয়েছি তত বারই একটা বাঁধার সম্মুখীন হয়েছি

নীরবতা ভংগ করে মাহিন হটাৎ বলে উঠলোঃ

-চল বেড়িয়ে পরি

- কোথায় যেতে চাচ্ছিস এই পড়ন্ত বিকেলে?

-কোন পার্কে

-কেন? আমি জানতে চাইলাম। বললো

-কারণ আছে। আর তোর উত্তরটা সেখানে বসেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকেই দিতে চাই

আমি আর কথা বাড়ালাম না। তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম একটা উদ্যানের উদ্দেশ্যে। আমার বাসা থেকে রমনা পার্ক কাছে। কাজেই আর কোন দিকে না যেয়ে সরাসরি রমনা পার্কে গিয়ে হাজির হলাম। পার্কে গিয়ে দেখলাম কোন বেন্ঞ্চই খালি নেই। কপোত-কপোতীরা জোড়া বেঁধে বসে আছে। আরো দুরে দেখলাম ডায়বেটিস রোগীরা শরীরকে সুস্থ্য সবল রাখার জন্য হেঁটে বেড়াচ্ছে। অনতিদূরে দেখলাম একজন পাগল গোছের একটা লোক বেন্ঞ্চের উপর বসে কি যেন করছে। আর তার সামনের দিকে একটা বেন্ঞ্চ খালি পড়ে আছে। হয়তো পাগলের কাছে কেউ থাকতে চায়নি বলে সেটার ধারে কাছে কেউ নেই। আমরা সেটাতে বসে পড়লাম। আমরা সেখানে বসতেই সেই পাগল লোকটা আমাদের দিকে কেমন করে যেন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। আমরা কোনরুপ ভ্রুক্ষেপ না করেই আমাদের কথা চালিয়ে যাবার জন্য জন্য প্রস্তুতি নিলাম। আমাদের কথা বলার জন্য এই স্থানটাই উপযুক্ত। আমি মাহিনকে উদ্দেশ্য করে বললামঃ

-নে শুরু কর। কি পেলি?

-শোন তুই বলেছিলি মনা পাগলা বলেছিল শুন্য অর্থ অস্তি। অর্থাৎ নাই অস্তিত্ব যার। কিন্ত্তু তুই দেখ। শুন্য আঁকতে হলে তাকে একটা আকার দিতে হয়। অর্থাৎ কেন্দ্র থাকা বান্ঞ্চনীয়। নয়তো শুন্য আঁকা যায় না। যাকে আমরা বিন্দু বলতে পারি। একটা বিন্দু কেন্দ্রে অবস্থান করে। সেই বিন্দুটা বৃহত্তর হতে হতে আমাদের দৃষ্টি সীমা ছাড়িয়ে যায়। আবার সেটা ছোট হতে হতে আমাদের দৃষ্টিতে ধরা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। কাজেই শুন্যস্থান বলতে কিছুই নেই। 

-তার মানে শুন্য হচ্ছে একটা স্থান। পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায়ঃ যার আকার আছে স্থান দখল করে যার ওজন আছে সেটাকে আমরা পদার্থ বলতে পারি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে শুন্যস্থান বলতে বুঝি সেটা আসলে শুন্য নয়। তার মানে সেস্থানে কোন কিছু জায়গা দখল করে আছে। অর্থাৎ শুন্যস্থানে বায়বীয় পদার্থ দ্বারা পূর্ণ থাকে। তাইতো?

-হ্যাঁ তাই। কিন্ত্তু সাধনার ক্ষেত্রে এই শুন্যস্থানতে লা মোকাম বলা হয়। মোকাম অর্থ ঘর। অর্থ শুন্য ঘর। এই শুন্য ঘরে অর্থাৎ যারা কেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে আছে তারা এই বৃত্তের মাঝে বন্ধী। কোরআনের দৃষ্টিতে যদি আমরা নবী শব্দটি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাইঃ নু, বে। নবী। অর্থাৎ কেন্দ্রের সহিত। কেন্দ্রে যিনি অবস্থান নিয়েছেন তিনি নবী। কেন্দ্রে কোন কর্ম নেই। ধর্ম নেই। অর্থাৎ সংস্কার শুন্য

-তোর কথা ঠিক বুঝলাম না। একটু বুঝিয়ে বল

-শোন। বিন্দু অখন্ডিতভাবে বিস্তৃত হয়ে রেখা হয়। রেখা অখন্ডিত হয়ে বিস্তৃত হলে দুই মাত্রার সমতল হয় এবং তদ্রুপ দুই মাত্রার সমতল অখন্ডিত হয়ে তিন মাত্রার ঘন বস্তু বা ভলিয়ম হয়। আদিতে মাত্রাহীন একবিন্দু। বিন্দুকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সরলরেখা, বৃত্ত এবং অপরাপর সবকিছু। বিন্দুকে বাদ দিয়ে এদের স্বতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তাই বিন্দুর বর্ধিষ্ণু অবস্থাই যেন সমগ্র বিশ্ব জগত। শিরিক থাকলে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা,ঘনত্ব ইত্যাদি হয়। অর্থাৎ আকার প্রাপ্ত হবে এবং পৃথক পৃথক নাম অথবা পরিচয় থাকবে। সর্বকালে, সর্বযুগে এবং সর্ব অবস্থায় রবরুপে যিনি আছেন তিনিই বিন্দু,তিনিই গুরু। তিনিই আল্লাহ তিনিই সাহেব তিনিই আত্মা। এই হলো এর ব্যাখা। শুন্য হলো লা মোকাম। হলো এর কেন্দ্রে রব-এর অস্তিত্ব। আর হলো কেন্দ্রস্থলে আশ্রিত কোন ব্যক্তি। যিনি এই কেন্দ্রে আশ্রয় পেতে আগ্রহী-তিনি। এতে হলো অালিফ এবং মিম। তাদের প্রেমের ফসল হলো লাম। অর্থাৎ কোন আমানু। যিনি গুরুর আশ্রয় প্রশ্রয়ে লালিত পালিত হন। তার আদেশ নির্দেশ মেনে চলেন। সর্ব কালে সকল যুগে গুরুগণ জীন থেকে ইনসান পর্যায়ে আনার জন্য আমানুগণকে উপদেশ নির্দেশ দান করেন। তাতেই কোরআনের আদেশ নির্দেশ কেবল এই আমানুগণের জন্যই প্রযোজ্য। অালিম লাম মিম। অানা লতিফা মুনজিল। আমি, তুমি সে। অন্য অর্থে আলে মুহাম্মদ। অর্থাৎ মুহাম্মদের বংশধরগণ। ব্যক্তি মুহাম্মদ থেকে এই আলে মুহাম্মদ থেকে অনেক উর্ধ্বস্তরে অবস্থান করে। বরং ব্যক্তি মুহাম্মদ এর থেকে সৃষ্ট। স্রষ্টা আলে মুহাম্মদকে বুঝানোর জন্য জগতে ব্যক্তি মুহাম্মদকে এবং তার বংশধরকে সৃজন করেছেন। যেন ইনসান এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। দৃষ্টান্ত না দিলে উপমা না দিলে সহজে বুঝা যায় না। তাই দৃষ্টান্ত স্থাপনের উদ্দেশ্যে মহান গুরু ব্যক্তি মুহাম্মদকে সালাতী প্রকৃয়ায় অর্থাৎ ধ্যানের আশ্রয়ে রেখে রবকে ফুটিয়ে তুলে অন্যন্য দৃষ্টান্ত জগতে রেখে গেছেন। যাতে সালাত গুরুত্ব পায়। কিন্ত্তু আফসোস! সেই সালাত ক্রিয়া ভুলে নামাজের আনুষ্ঠানিকতাকেই তারা বড়ো করে দেখছে। ফলে কোরআনে বর্ণিত সালাত গুরুত্ব হারিয়ে অনুষ্ঠান সর্বোস্ব হয়ে উঠেছে

মাহিনের কিছু কথা বোধগম্য হচ্ছে। আবার হচ্ছে না। মনে হয় বুঝতে পারছি আবার মনে হয় পারছি না। দ্বৈত্ত্ববাদের শিকারে পরিণত হচ্ছি। বিষয়টি জানার আগ্রহে মাহিনকে প্রশ্ন করলামঃ

-এই যে তুই বললি সালাতের কথা যাকে প্রচলিত ভাষায় নামাজ বলা হয়। সেই নামাজ আর সালাতের পার্থক্যটা একটু বুঝিয়ে বলবি কি?

(চলবে)

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০১৫

ভাবনার বিষয়-পর্ব দুই

(পূর্ব প্রকাশের পর)

-তুই বলছিস? মাহিন বললো।

-কেন? তোর কি সন্দেহ আছে?

-থাকতেই পারে। থাকাটা কি স্বাভাবিক নয়?

-তর্ক করার জন্য তোকে ডেকে আনিনি। যে জন্য আসছিস চল সেটা নিয়েই ভাবি। একটা কাজের কাজ হবে।

-ঠিক আছে। তুই ভালো করে চা বানা। আমি এই ফাঁকে একটা সিগারেট ধরাই।

মাহিন সিগারেট নিয়ে বারান্দায় বসে আরাম করে টানছে। অামি চুলায় পানি বসিয়ে অপেক্ষা করছি চা বানানোর জন্য। অবশেষে সেই মহেন্দ্রক্ষণ এল। চা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি মাহিন অপলক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে ঊর্ধ্ব গগণে। আর বিড় বিড় করে গাইছে নজরুল সংগীতঃ

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে
বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা
নিরজনে প্রভু নিরজনে।।
শূণ্যে মহা আকাশে
তুমি মগ্ন লীলা বিলাসে
ভাঙ্গিছ গড়িছ নীতি ক্ষণে ক্ষণে
নিরজনে প্রভু নিরজনে।।
তারকা রবি শশী খেলনা তব হে উদাসী
পড়িয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে রাশি রাশি।
নিত্য তুমি হে উদার
সুখে-দুখে অবিকার।
হাসিছ খেলিছ তুমি আপন সনে
নিরজনে প্রভু নিরজনে।।

মাহিনের গলায় গানটি বেশ মানিয়ে গেল। বিশেষ করে এই আবহাওয়ায়। চা নিয়ে ঠায় দাড়িয়ে ছিলাম। একটুও বিরক্ত করিনি। পাছে রেশ কেটে যায় এই ভয়ে। গানটি শুনতে বেশ লাগলো। মাহিনকে বললামঃ

-তুই গান কবে শিখলি?

-গান? মাহিন যেন বেশ আশ্চর্য্য বোধ করলো। যেন এ ধরণের প্রশ্ন সে জীবনেও শুনেনি।

-এই যে একটু আগে তুই গাইলি। বেশ লাগলোরে...সত্যি বলছি।

আমি ওর দিকে চায়ের কাপটি এগিয়ে দিলাম। চায়ের কাপটি হাতে নিতে নিতে বললো

-ও কিছু না। জাষ্ট মনের মধ্যে গানটি গেঁথেছিল সেটা ঝেড়ে ফেললাম। আর কি...আচ্ছা ভালো কথা...তোর সেই মনা পাগলার নাম্বারটার অর্থ বোধ করি ব্যাখ্যা করতে পারবো। নাম্বারটা হাতে নিয়ে নাড়া চাড়া করার সময় খেয়াল করে দেখলাম সেখানে একটা ঐক্যতান আছে। তুই ভালো করে দেখ।

মাহিনের কথা শুনে আমি মনোযোগ দিয়ে নাম্বারটা দেখতে লাগলাম। ০১২৩৫৭১২১৯৩২...কিন্ত্তু কোন ঐক্যতান খুঁজে পেলাম না। ওকে প্রশ্ন করলামঃ

-তুই কোথায় ঐক্যতান পেলি বলতো? আমিতো পাচ্ছি না...

-আরে বোকা..ভালো করে দ্যাখ। ০১২৩...এভাবে বাড়তে বাড়তে অর্থাৎ ১+২=৩ আবার ৩+২=৫ আবার ৫+২=৭

-কোন্ সুত্র ধরে পেলি বলতো? জ্যামিতিক হারে না গাণিতিক হারে অর্থাৎ সুত্র উল্লেখ কর।

-তা বলতে পারবো না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে যা তাই তোকে বললাম।

-শোন। মনা কিন্ত্তু বলেছিল- প্রথমে আছে "০"। শুন্য অর্থ ন অস্তি। অর্থাৎ যার কোন অস্তিত্বই নাই। সেই শুন্য থেকে এক - এর উৎপত্তি। অর্থাৎ 'আমি'র উৎপত্তি। এরপর সে যখন ভাবে মত্ত হলো তখন তার থেকে আরেকটি অস্তিত্বের উৎপত্তি হলো। সেইটা তুমি। অর্থাৎ আমি এরপর তুমি'র উৎপত্তি। তখন সৃষ্টি হলো দুইভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ দুইয়ের সৃষ্টি হলো।

-হুম। বিষয়টা সত্যিই ভাববার মতো। আমিতো ভেবেছিলাম অন্য কিছু। এখনতো দেখছি এটি আমার চিন্তা চেতনারও বাইরে।

-আরে আমি ভেবে পাইনি বলেইতো  তোকে খবর পাঠিয়েছি।

-আরেকটু ভাবতে দে। মনে হচ্ছে এটি সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ক কোন জটিল অথচ সহজ সমীকরণ।

চা খেয়ে কখন যে খালি কাপটি হাতে ধরে রেখেছি তা বলতে পারবো না। মাহিন দেখছি সত্যিই ভাবে ডুবে গেছে। চা পানের পর ও সিগারেট ধরায়। এখন খালি কাপটি হাতে রেখেই হিসাব কষতে শুরু করে দিয়েছে। ভাবুক মনে  উদিত প্রশ্নের সমাধান খুঁজছে উদাস ভংগীমায়। দুর হতে ওকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হচ্ছে। আকাশটা যেন নীলিমার রংয়ে রঙিন হয়েছিল সেটিও এখন বিলীন হতে শুরু করেছে। কোন এক আধারের চাদর যেন গ্রাস করতে চাইছে এই নীলিমার রং। অদ্ভুত সব বিষয় আশয় নিয়ে চিন্তা করতে মনে হয় প্রয়োজন গভীর নীরবতা। এই নীরবতাই যেন বিধাতার ভাষা। তাই বিধাতার সেই ভাষা বোঝার জন্য ওকে বিরক্ত করতে চাইলাম না। ভাবুক । ভেবে বলুক মনা পাগলার মোবাইল নাম্বারটি।

(চলবে)

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০১৫

ভাবনার বিষয়-পর্ব এক

মনটা বিশেষ ভালো নেই। ইচ্ছে ছিল শাহ্ সাহেবের সাথে দেখা করবো। কিন্ত্তু তা আর হলো কই? পথে দেখা হলো মনা পাগলার সাথে। কি একটা নাম্বার দিয়ে বলে এটা জানলে না-কি একটা চরম সত্যকে জানা যাবে? সেই চরম সত্যটা কি-সেটা জানার জন্য মনটা আনচান করছে। নাম্বারটা মনে আছেঃ ০১২৩৫৭১২১৯৩২। কিন্ত্তু এর আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। কি করি? চিন্তায় পড়ে গেলাম। হটাৎ মাহিনের কথা মনে হলো। ওর কথা মনে হওয়ায় খুশিতে প্রাণটা চনমন করে উঠলো। ভাবলাম ওকে সাথে নিয়ে যদি গবেষণা করি হয়তো সত্যটা উদ্ধার করা সহজ হবে। যেই ভাবা সেই কাজ।
মাহিনকে কল করলাম। পেয়েও গেলাম। ওপাশ হতে মাহিনের কন্ঠ ভেসে এল। বললোঃ
-কি রে কেমন আছিস? প্রতি উত্তরে জানালামঃ

-ভালো নেই।

-তার মানে?

-মানে আর কিছু না। দোস্ত তুই আমার এখানে চলে আয়। একটা বিষয় নিয়ে বড়ো চিন্তার মধ্যে আছি। দেরি করিস না। তাড়াতাড়ি চলে আয়।

-তাতো বুঝলাম। কিন্ত্তু কি নিয়ে এতো টেনশনে আছিস তাতো জানালি না?

-সেটা জেনে তোর কাজ নেই। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়।

-ঠিক আছে আসছি।

এই বলে মাহিন কলটা কেটে দিল। বুঝলাম কাজ হয়েছে। একটু রহস্য করায় ও হয়তো জানার আগ্রহে তাড়াতাড়ি চলে আসবে। আর আমার সত্যটাও জানা হবে। খুশিতে প্রাণটা নেচে উঠছে। আমি ওর অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম। ওর বাসা আমার বাসা থেকে খুব একটা দুর না। আসতে যেতে আধ ঘন্টা লাগে। কিন্ত্তু এখন মনে হচ্ছে এই আধ ঘন্টা আমার জন্য আট ঘন্টার মতো। অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না। বারান্দায় আমি ওর অপেক্ষায় থেকে একটা চেয়ারে বসে সিগারেট ধরিয়েছি। আর বসে বসে ভাবছি মনা পাগলার রসায়ন নিয়েঃ

মনা পাগলা। মন+না=মন্না নাকি ম+না=মনা। পাগলার সন্ধিবিচ্ছেদ কি হবে? পা+গল=পাগল নাকি প+আ+গ+অ+ল। বুঝতে পারছি না। তবে মনা পাগলা বলতে যেটা বুঝায় বা বুঝতে পারছি তাহলোঃ মনের পাগল। অর্থাৎ মনের বিকারগ্রস্থ কোন ব্যক্তি। কিন্ত্তু আসলেই কি সে বিকারগ্রস্থ? যে লোক এত গুছিয়ে বলতে পারে দিতে পারে ভাবনার খোরাক, সে কি করে বিকারগ্রস্থ হয়? আর যদি বিকারগ্রস্থই হয় তাহলে মনের মধ্যে উদিত প্রশ্নবানে সে জর্জরিত। চিন্তার রাজ্যে সে হারিয়ে যায়। কেননা একজন সুস্থ সবললোকের মনে তো এ ধরণের প্রশ্ন উথ্খাপিত হয় না। চিন্তা চেতনায় যে প্রভুর সান্নিধ্য লাভে ব্যাকুল সেই কি মনা পাগলা?
হটাৎ কলিং বেলের শব্দে আমার চিন্তা রাজ্যের ছন্দ পতন ঘটে। সিগারেটটা শেষ করে দরোজা খুলেই দেখি মাহিন হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে বললোঃ-

-কি রে তোকে এত বিষন্ন লাগছে কেন? 

আমি বললামঃ

-ভেতরে আয়। তারপর বলছি। 

মাহিন ভেতরে ঢুকলো। তারপর জানতে চাইলো কি হয়েছে? অামি মাহিনকে আদ্যপান্ত খুলে বললাম। শুনে সে অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো। ওর অট্রহাসি দেখে আমিও হেসে উঠলাম। হাসি থামিয়ে মাহিন বললোঃ

-কোন্ একটা পাগল তোকে কি বললো আর ওমনি তুই সেটাকে সিরিয়াস নিয়ে ভাবতে বসলি। শেষ মেশ তুই আমার শরণাপন্ন হলি যে কি-না কিছুই জানে না?

-এটা তোর ভুল ধারণা। তুই ক্ষেত্র বিশেষে আমার চেয়েও ভালোতো জানিস।

(চলবে)

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০১৫

মনা পাগলার সাথে কখোপকথন

অনেক দিন হলো সুফী সাহেবের ওখানে যাওয়া হয় না। বারবার মাহিনের সাথে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়েছি। তাছাড়া শ্বেতাকেও আগের মতো পাচ্ছি না।  মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। চিন্তা করছি একবার সুফী সাহেবের ওখান থেকে ঘুরে আসবো কি-না? কারণ মাসটা হচ্ছে রমজান। এমাসে চারদিকে চলে ইফতার পার্টির আয়োজন। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। চট করে রেড়ী হয়ে বের হয়ে পড়লাম সুফী সাহেবের আস্তানার উদ্দেশ্যে।

রমজান মাস। সংযমের মাস। সংযম মানে কি? আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিমরা জানে বলে মনে হয় না। চারদিকে একটা গলা কাটা ভাব বিরাজ করে। রিক্সাওয়ালা থেকে আরম্ভ করে মুদির দোকানদার সবাই একটা বাড়তি দাম রাখার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যার বলী হচ্ছে সাধারণ জনগণ। দশ টাকার কাঁচা মরিচ বিক্রি হয় একশ দশটা দামে। বিশ-ত্রিশ টাকার বেগুন বিক্রি হয় একশ বিশ টাকায়। জানে ইফতারে বেগুণী লাগবেই। তরকারী হতে আরম্ভ করে সব কিছুতেই কাঁচা মরিচ পেঁয়াজ লাগবেই। তাই দামেরই উম্মত্ততা। সরকার বলছে বাজার স্থিতিশীল আছে। যোগান আছে। কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্ত্তু বাস্তবে দেখা যায় তার উল্টাটা। পন্ঞ্চাশ টাকার ভাড়া চাচ্ছে আশি টাকা। কি যে করি...
অানমানে ভাবছি হাঁটবো কি-না?

-কিরে ভাই কি ভাবছস?

পাগল গোছের একটি লোক আমাকে জিগ্যাসা করলো। আমিও তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম

-আপনি কি ভাবে জানলেন যে আমি কিছু ভাবছি?

-আমি চেহারা দেখেই বলবার পারি।

-তাই? তাহলে তো দেখছি আপনি বিরাট সাধু। এমনলোকও অাছে যে চেহারা দেখেই সব কিছু বলে দিতে পারে?

- পারে। বিশ্বাস থাকলেই পারে।

-তাই? তা বিশ্বাসটা কিভাবে করবো?

-এই যেমন ধর তুই আল্লাহকে না দেখে বিশ্বাস করস সেই রকম আর কি?

লোকটির কথায় আমি ভালো করে লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। পড়নে ময়লা নোংরা কাপড়। দাঁতগুলো হলুদ। মাথার চুলগুলো  উসকো খুসকো। তালি দেয়া কোট গায়ে। দাঁড়ি-গোঁফে একাকার। পড়নে লুংগি। পকেটে বাঁ হাত ঢোকানো। ডান হাতে সিগারেট। ধুমছে সিগারেট টানছে আর ফুস ফুস করে ধুয়া ছাড়ছে। লোকটাকে দেখে কেমন যেন কৌতুহল হলো। আমি লোকটির নাম জানতে চাইলাম। বললাম

-কি নাম আপনার?

-আমার নাম মনা পাগলা।

-তা মনা ভাই আপনি আমার কাছে কি চান?

-তোর কাছে চাওয়ার মতো আমার কিছুই নাই। তারচেয়ে তুই আমার কাছে চা। আমি তোকে একটা জিনিস দিব যা তুই জীবনে কোনদিনও পাস নাই।

একথা বলে মনা পাগলা তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আমার হাতে দিল। সেখানে একটি মোবাইল নাম্বার দেয়া। আর নিচে লেখা। এই নাম্বারে ডায়াল করলে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে তার সাথে কথা বলা যায়। নাম্বারটি হচ্ছেঃ ০১২৩৫৭১২১৯৩৩-৩৪। সত্যিইতো। এ রকম নাম্বার তো কখনো পাইনি। তাছাড়া গ্রামীন কিংবা বাংলা লিংক বা এয়ারটেল বা রবি নাম্বারও নয়। তাহলে এই নাম্বারটার অর্থ কি? আর এরকম কোন নাম্বার আছে বলেতো আমার জানা নেই। আমি তাকে বললামঃ

-এই নাম্বারতো গ্রামীণ রবি কিংবা এয়ারটেলের নয়।

-আরে ব্যাটা এইটা হইলো আল্লাহর নাম্বার। আমি এই নাম্বারে ডায়াল করে আল্লাহর সাথে কথা কই।

তার কথা শুনে আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। বলে কি লোকটা? সে এই্ নাম্বারে ডায়াল করে আল্লাহর কথা বলে। একমাত্র পাগল ছাড়া এই কথা কেউ এমন করে বলতে পারে না। আর লোকটি তো দেখছি সত্যিই পাগল। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ

-এই নাম্বার আপনি কোথা হতে পেলেন?

-সাধনা করে পাইছি।

-তো সেই পাওয়া নাম্বারটা আপনি আমাকে কেন দিচ্ছেন?

-কারণ তুইও পাগল।

বলে কি লোকটা। আমি পাগল। কি রকম পাগল?  আমি বললামঃ

-কিভাবে বুঝলেন আমি পাগল?

-শোন আমরা সবাই পাগল। আমরা সবাই মনা পাগলা। মন নামক যে বস্তুটা আছে সেটা সবাইকে পাগল করে রেখেছে। কেউ ভবের পাগল। কেউ ভাবের পাগল। ভব হচ্ছে দুনিয়া। আর ভাব হচ্ছে মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত কেন্দ্রবিন্দু। যা সুখ দুঃখের অনুভুতিতে কাজ করে। তোরে যেই নাম্বারটা দিচ্ছি তা নিয়া একটু চিন্তা ভাবনা কর। তাহলে তুই জানতে পারবি একটি সত্য। যে সত্য সকলের জন্যই প্রযোজ্য। শোন নাম্বারটা দেখ। প্রথমে আছে "০"। শুন্য অর্থ ন অস্তি। অর্থাৎ যার কোন অস্তিত্বই নাই। সেই শুন্য থেকে এক - এর উৎপত্তি। অর্থাৎ 'আমি'র উৎপত্তি। এরপর সে যখন ভাবে মত্ত হলো তখন তার থেকে আরেকটি অস্তিত্বর উৎপত্তি হলো। সেইটা তুমি। অর্থাৎ আমি এরপর তুমি'র উৎপত্তি। তখন সৃষ্টি হলো দুইভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ দুইয়ের সৃষ্টি হলো। কি বুঝা গেল কিছু?

এবার আর তাকে পাগল বলে মনে হচ্ছে না। তাই কাগজটাতে আবার চোখ বুলালাম। দেখলাম ০১২.... আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকাতেই দেখি সে নাই। হন্ হন্‌ করে হেঁটে চলে যাচ্ছে...আমি তাকে পিছন থেকে বার বার ডাকার চেষ্টা করলাম। কিন্ত্তু কিছুতেই সে আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। দৌড়ে তাকে ধরার চেষ্ট করলাম। লাভ হলো না। বললো-জানার চেষ্টা কর। সত্যটা পেয়ে যাবি।

আমি সুফী সাহেবের ওখানে যাওয়া বাদ দিয়ে সেই নাম্বার নিয়ে ভাবা শুরু করলাম। কিন্ত্তু কিছুতেই মেলাতে পারছি না। নাম্বারটা দেখছি আর ০১২ পর্যন্তই দেখতে পাচ্ছি...

রবিবার, ২৮ জুন, ২০১৫

মনা পাগলা ও ভবা পাগলার কথোপকথন

মনা অনেক ক্ষণ ধরে গভীর মনোযোগের সাথে কি যেন পড়ছে? তাকে পড়তে দেখে ভবা জিগ্যেস করেঃ

- কিরে মনা কি পড়স?

- কি আর পড়মুরে ভাই? একটা লেখা দেইখ্যা মনডা বড়ো উদাস হইয়্যা গেল। মনা উত্তর দেয়।

- কি দেহি?

মনা কাগজটি ভবার হাতে ধরিয়ে দেয়। কাগজটি দেখে ভবাও অবাক হয়ে যায়।
সেখানে লেখাঃ " ০১৩৫৭১২১৯৩২৩৩ এই নম্বরের অর্থগুলো যে জানতে পাড়বে সে একটি সত্য আবিস্কার করতে পারবে।" কখনো মনে হয় এটি একটি মোবাইল নাম্বার । আবার কখনো মনে হয় এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোন একটি কিন্ত্তু অাছে। কিন্ত্তু কি কিন্ত্তু আছে তা ধরা যাচ্ছে না। দুজনেই বেশ গভীর আগ্রহ নিয়ে লেখাটি দেখছে আর ভাবছে।

হটাৎ নীরবতা ভংগ করে মনা উচ্চ স্বরে হাসতে আরম্ভ করলো। তাকে হাসতে দেখে ভবা জিগ্যেস করেঃ

- কি রে কিছু পেলি?

-আরে না পাইলে কি আর হাসি?

- কি পেলি?

- ঘোড়ার ডিম।

-ধুর ব্যাটা ফাইল্যামি ছাড়। বিষয়ডা যে লেকছে হেয় খুব ভাইব্যা চিন্তাই লেকছে। এইডা বুঝবার পারছি।

- শোন হাসলাম এই কারণে যে এই সংখ্যাগুলো দ্বারা যে বিষয়গুলা বুঝাইছে হেইডা বড় মামুলি ব্যাপার। দেক ভালো কইর‌্যা দেখ -  প্রথম '০' অর্থ কিছুই নাই। মানে অস্তিত্বহীন। ন অস্তি। অর্থাৎ ঘোড়ার ডিম। তারপরে ১। এর মাইনে হইলো - সৃষ্টি কর্তা একজন।

- কেমতে বুঝলিরে মনা?

-আরে ব্যাডা মোবাইলের নাম্বার অইলে কেউ এই কতা কইতো না যে এইডার মইধ্যে একটা সত্য আছে? তহনই আমার মনে অইলো এইডা দিয়াতো সৃষ্টি তত্ত্বের কতা কয় নাইতো? পরে ভাল কইর‌্যা দেইখ্যা সিওর অইছি।  

-তার মানে তুই কইতে চাস তুই সৃষ্টিতত্ত্ব বুঝতে পারছস?

- না পারলে কেমতে কইতে পারলাম?

-তাইলে তুই পুরাডা ব্যাখ্যা কর দেহি?

- হ আমি কই আর তুমি শিক্ষা লও আর কি? তোমার চালাকি আমি বুঝবার পারছি।

-ক্যা তুই ভাবছস তুই একলা জানস? আর আমি কিছু জানি না? আমার গুরু কি আমারে শিক্ষা দেয় নাই?

- কি শিক্ষা দিছে পারলে ক দেহি?

 -তোমার চালাকিও আমি বুঝবার পারছি। অামি কই আর তুমি হেইডা শিক্ষা লও আর কি?

 -তর্ক বাদ দে। আসল কথায় আয়। তুই এইডা কই পাইলি?

-আমার গুরু আমারে দিছে আর কইছে এই নাম্বারে ডায়াল করলে আল্লাহরে পাওয়া যায়। তাই আমি হেইডা নিয়া ভাবতাছি আর এই সুময়  তুই আইলি।

-তাইলে আয় দুজনে মিললা বাইর করার চেষ্টা করি এই লেখাটার মধ্যে কি আছে?

মনা আর ভবা দুইজনে গভীর ভাবে ভাবতে লাগলো কি আছে ঐ লেখাটার মধ্যে। চারদিকে একটা গভীর নীরবতা বিরাজ করছে। সেই নীরবতা ভংগ করে দুর হতে শোনা যেতে লাগলো পাখির কিচির মিচির।

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০১৫

দর্জির দোকান

ঈদকে সামনে রেখে ধুমছে চলছে পোষাক তৈরী করা। প্রতিটি দর্জির দোকানে কাপড় সেলাইয়ের ঘটর ঘটর শব্দ শুনতে শুনতে মনা পাগলা বিরক্ত হয়ে বলছেঃ

"বানাও বানাও মেশিনতো একটা পাইছো । পোষাক বানাও। সুই দিয়া ঘাই দিবা আর পোষাক বানাইবা। কার পোষাক বানাইলা হেইডা তো দেকলা না। ঐ পোষাকে বন্দী আছে সাঁই রাব্বানা। তোমাগো কান্ড কারখানা আমি কিচ্ছু বুঝি না।"

অতিথি টেইলার্সের মালিক হাতেম আলী সওদাগর। একজন পরহেজগার লোক হিসেবেই সকলে জানে। কিন্ত্তু মনা পাগলা তাকে দেখলেই ক্ষেপে যায়। লম্বা টুপি পড়া, গোফ-দাঁড়ি আছে। আর  চেহারার মধ্যে একটা শান্ত স্নিগ্ধভাব আছে। মাঝে মাঝে পান খায়। গায়ের রং ফর্সা উজ্জ্বল বলে পান খাওয়া ঠোট দুটি লাল টকটকে দেখায়। দেখতে বেশ। কিন্ত্তু মনা পাগলা তাকে ডাকে মিচকা শয়তান । বলে হাতেইম্যা অইলো গিয়া বদের বদ। বশং বদ।  ঐ হালায় জানে এই এলাকার কোন মাইয়্যার বুকের মাপ কার কতো?

লোকজন যখন হাতেম ভাইকে জিগ্যেস করে তখন সে মিষ্টি করে হেসে বলে পাগলের কথায় কান দিলে চলে? পাগলতো পাগলই। ওর কথার কোন মুল্য নাই।

-কিন্ত্তু ওতো মিথ্যেও বলে নাই। সোলেমান জিগ্যেস করে।

-আরে ভাই মাইয়্যা মানুষ অইলো গিয়া মায়ের জাত। মায়ের পোষাক আষাক বানাই তাতে লজ্জার কি আছে?

-না লজ্জার কিছু নাই। কিন্ত্তু আপনে যা করেন তাতে লজ্জার অনেক কিছুই আছে। কথায় কথায় যারা আল্লাহ রসুলের কথা বলে তাদের থেকে যতোটা দুরে থাকা যায় ততো নিরাপদে থাকা যায়। কারণ মিথ্যা কসম খায় শয়তানে। আপনে সত্য কইর‌্যা কনতো? যহন কোন মাইয়্যার বুক মাপের তখন কি আপনার মনে একবার অইলেও খান্নাস ভর করে নাই?

সোলেমানের কথার কোন জবাব না দিয়ে হাতেম আলী তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সোলেমান বলে "শোনেন - মনা পাগলা হইলেও ও আপনের মতো রং ধরা লোক না।" 

-কি কইলা মিয়া? হাতেম আলী ক্ষেপে যায়।

কিন্ত্তু দুর হতে মনা পাগলাকে আসতে দেখে সে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে সোলেমানকে চলে যেতে বলে। সোলেমানের সাথে পথেই দেখা হয় মনা পাগলার সাথে। মনা পাগলা বলেঃ

সোলেমান ভাই এই কথার মানে নাই
আছে মাইনে দর্জির দোকানে
যেমতে পারে বোনে কাপড়
দেহায় তারে রং বেরং।।

-কথাটার অর্থ ধরতে পারলাম না। একটু বুঝাইয়া কও। সোলেমান বলে।

-ভাইরে সব কথার মাইনে ধরতে নাই। তোমারে তো প্রথমেই কইলাম এই কথার কোন মাইনে নাই। তারপরও কই। হোন দর্জির দোকান বলতে বুঝান হইছে - জনন ইন্দ্রিয় যেইখানে দেহ পয়দা হয়। যেমতে পারে বোনে কাপড় - মানে অইলো যে যে ভাব লইয়া দেহবীজ বোপন করে কারিগর সেই ভাবে সেই রং মিশাইয়্যাই দেহ পোষাকটা বানায়। বুঝবার পারছো ??? এই অইলো মাইনে....

দর্জির দোকানের অন্য কোন মানে থাকতে পারে তা আজ প্রথম এই পাগলের কাছ সে জানতে পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো....

বুধবার, ২৪ জুন, ২০১৫

মনা পাগলার পোষাক ভাবনা

আজ সকালে মনা পাগলা একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে বসেছে। সে তার জামা-কাপড় খুলে দিগম্বর হয়ে পুরোনো কাপড় চোপড়ের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর বলছে...ও এই তাহলে আত্মার রহস্য।
তার কথা বার্তার মাথা মুন্ডু কেউ কিছু বুঝছে না। সবাই তাকে ঘিরে একটা জটলা তৈরী করে বসে আছে। বাচ্চা-কাচ্চারা তাকে দিগম্বর দেখে হাসছে। মহিলারা লজ্জায় মাথা হেট করে কোন দিকে না তাকিয়ে সিটকে পড়ছে। লোকজন বলাবলি করছে - এইটা আবার কোথ্থ থেকে আমদানী হলো ? চারদিকে জটলা দেখে এসআই মতিন সাহেব কনস্টেবল জহিরকে সাথে নিয়ে হাজির হলেন। ভিড় ঠেলে জনতাকে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন যাতে কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তিনি যেয়ে দেখলেন-মনা পাগলা সম্পুর্ণ দিগম্বর হয়ে বসে আছেন। তার জামাটা মেলে ধরা। নিচে পেন্ট। সেটা দেখে মনা পাগলা খিল খিল করে হাসছে আর বলছে-

"আমি আমার আত্মার থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমি দেখছি আমার পুরোনো পোষাক।"

কনস্টেবল জহির বললোঃ

-স্যার পাছার মইধ্যে দুইড্যা লাথ্থি দিয়া ওর আত্মার পোষাক পড়াইয়্যা দেই। হুকুম দেন স্যার।

-আরে রাখো তোমার লাথি মারা। আগে দেখি ব্যাপারটা কি?

তিনি মনা পাগলাকে হাত ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে গাড়ীতে ওঠালেন। আর জহিরকে বললেন তার কাপড় চোপরগুলো নিয়ে আসতে। গাড়ীতে তোলার সময় সেই কাপড় পড়ে নিতে বললেন। কিন্ত্তু মনা পাগলা অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তার কথাঃ

-ঐ পুরান পোষাক আমি আর পড়ুম না। আমি আমার মতো থাকতে চাই।

অগ্যতা মতিন সাহেব তাকে গাড়ীতে করে থানা হাজতে পাঠালেন।

ওসি জহিরুল হক সাহেব মাইজভান্ডারী তরীকার লোক। তিনি এসআই মতিন সাহেবের কাছ থেকে মনা পাগলার ঘটনা জানতে চাইলেন। মতিন সাহেব আদ্যপান্ত সমস্ত ঘটনাই খুলে বললেন। ওসি সাহেব মনা পাগলার সাথে কথা বলতে চান। তিনি বিষয়টাতে কৌতুহল বোধ করছেন।

দিগম্বর মনাকে হাজির করা হলো ওসি সাহেবের রুমে। তিনি মনার কাছে এর রহস্য জানতে চাইলেন। মনা প্র্রথমে ইতঃইস্ত করেও শেষে তার কথা বলা শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ

-স্যার গীতায় আছেঃ
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরণি, যথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী । (২/২২) অর্থঃ নরঃ(মনুস্য) যথা (যেমন) জীর্ণানি বাসাংসি (ছিন্ন বস্ত্র সকল) বিহায় (পরিত্যাগ করিয়া) অপরাণি নবানি(অন্য নতুন বস্ত্র সমুহ)গৃহ্নাতি(ধারণ করে) তথা (তদ্রুপ) দেহী (আত্মা) জীর্ণানী (জরাগ্রস্ত) শরীরানি (শরীর সকল) বিহায় (পরিত্যাগ করিয়া) অন্যানি নবানি (অন্য নতুন শরীর সমুহ) সংযাতি(পরিগ্রহ করে)।।
ভাবার্থঃ মানুষ যেমন পুরাতন কাপড় পরিত্যাগ করে নতুন কাপড় পরিধান করে, আত্মাও পুরাতন দেহ পরিত্যাগ করে নতুন দেহে প্রবেশ করে ।।


-তাই? আর এজন্য আপনি আপনার পোষাক খুলে ফেলেছেন?

-জ্বি স্যার। আমি দেখাতে চেয়েছি-এই যে আমি যে পোষাক পড়ে আছি, সেটা হচ্ছে আমার দেহ। আমার এ সত্যিকারের পোষাকটাকে সেদিনই খুলে যাবে যেদিন আমি এ দেহের মধ্যে থাকবো না। তার মানে আমার আমিকে ধারণ করার জন্য প্রয়োজন হয়েছে পোষাকের।

-ইন্টারেষ্টিং..

-স্যার খালি কি ইন্টারেষ্টিং? অামি যদি আত্মহত্যা করি পরক্ষণেই অন্য একটা পোষাকে পরিধান করে আমাকে আবার পূর্বের স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি আবার অন্য কোন গর্ভে জন্মলাভ করবো।

-ব্যাটা কয় কি?

- কেন স্যার? আপনি কি কোরআন পড়েন নাই? সুরা আনকাবুত আয়াত নং ৫৭ তে বলা হয়েছেঃ
كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٥٧
আরবি উচ্চারণঃ কুল্লু নাফ্সিন্ যা-য়িক্বাতুল্ মাউতি ছুম্মা ইলাইনা-র্তুজাঊন্।
বাংলা অনুবাদ
২৯.৫৭ প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। আর অন্য আয়াতে সুরা আলে এমরানের ২৭নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ
 تُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَتُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَتُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَتَرْزُقُ مَنْ تَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
আরবি উচ্চারণ
৩.২৭। তূলিজ্জুল লাইলা ফিন্নাহা-রি অতূলিজুন নাহা-রা ফিল্লাইলি অতুখ্রিজুল্ হাইয়্যা মিনাল মাইয়্যিতি অতুখ্রিজ্বুল্ মাইয়্যিতা মিনাল্ হাইয়্যি অর্তাজুকু মান্ তাশা - উ বিগাইরি হিসা-ব্।
বাংলা অনুবাদ
৩.২৭ ‘আপনি রাতকে দিনের মাঝে এবং দিনকে রাতের মাঝে প্রবেশ করান আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে ইচ্ছা বিনা হিসেবে রিজিক দান করেন’।


মনার কথা শুনে ওসি সাহেব ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন মনা পাগলার দিকে। পোষাক নিয়ে এমন করে তো কখনো ভেবে দেখেননি। আজ একটা দিগম্বর পাগল এ কি বলছে? তিনি একবার মনার দিকে তাকাচ্ছেন আরেক বার নিজের পোষাকের দিকে তাকাচ্ছেন....কেন যেন তার মনে হচ্ছে নিজের পোষাকটা খুলে ফেলতে....