পৃষ্ঠাসমূহ

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৫

চর্যাপদ-প্রখম পর্ব

খ্রীষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে লুই,কুক্কুরী, বিরুবা, গুণ্ডরী, চাটিল্ল, ভুসুকু, কাহ্ন, কাম্বলাম্বর, ডোম্বী, শান্তি,  মহিণ্ডা, বীণা, সরহ,শবর, আজদেব, ঢেন্ঢণ, দারিক, ভদ্র, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তান্তী,লাড়ীডোম্বী প্রভৃতি চব্বিশ জন সহজিয়া বৌদ্ধ  সিদ্ধাচার্য বৌদ্ধ ধর্মের সাধন তত্ত্বের প্রকৃত গূঢ় তত্ত্বগুলিকে সাংকেতিক রূপকের আশ্রয়ে সঠিক রূপে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে তৎকালীন প্রাকৃত বাংলা ভাষাতে কতগুলি পদ রচনা করেছিলেন পদ  গুলিতে পদকর্তা দের নামের সঙ্গে বিভিন্ন রাগ-রাগিনীর উল্লেখ থাকায় বোঝা যায় পদগুলিকে সুর সহযোগে গাওয়া তো যে প্রাচীন পুঁথি তে পদগুলি সঙ্কলিত হয়েছিল তার  নামচর্যাচর্যবিনিশ্চয়’, তাই গান বা পদগুলিকে গবেষক রাচর্যাগীতিবাচর্যাপদ  নামে অভিহিত করেন চর্যাপদ গুলি সৃজ্যমান বাংলা ভাষার এক মূল্যবান নিদর্শন বর্তমান কাল পর্যন্ত আবিস্কৃত বাংলা ভাষার সমস্ত নিদর্শনের মধ্যে চর্যাপদের বাংলা ভাষাই প্রাচীনতম চর্যাপদ গুলিতে সন্ধ্যা ভাষার আবরণে দ্বৈত অর্থ সম্বলিত উচ্চ স্তরের ধর্মতত্ত্ব সাধনতত্ত্বের চর্চা করা তো চর্যাপদ গুলির বাহ্যিক রূপ সাদামাটা অনাড়ম্বর হলেও ভাবগত অর্থ ছিল কাব্য সুষমা সম্পন্ন বৌদ্ধ সাধন তত্ত্বের নানা দিগদর্শনে পরিপূর্ণ

সহজিয়া বৌদ্ধ তান্ত্রিক বা সিদ্ধাচার্য রা চর্যাপদের মধ্যে তাদের তন্ত্র সাধনার মন্ত্র গোপনে বেঁধে রাখতেন। যারা তান্ত্রিক সাধনা করেন, কেবল তারাই সেই মন্ত্র বুঝতে পারতেন। অন্যদের কাছে সেই গান ভিন্ন অর্থবহ মনে তো। যোগ সাধনা বলে কুলকুণ্ডলিনী কে জাগরিত করতে পারলে যে অজর অমর হওয়া যায় সেই বিষয়ে সিদ্ধাচার্য  বিরুবা একটি অদ্ভুত চর্যাপদ রচনা করেন, যার সাধারণ অর্থ ভাবগত অর্থ উভয়ই ভীষণ জটিল অর্থবহ।

বিরুবাপাদানাম্
রাগগবড়া

এক সে শুণ্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলঅ বারুণী বান্ধঅ।।
সহজে থির করি বারুণী সান্ধঅ।
জেঁ অজরামর হোই দিঢ় কান্ধঅ।।
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখইআ।
আইল গরাহক অপণে বহইয়া।।
চউশটি ঘড়িএ দেল পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা ।।
এক সে ঘরলী সরুই নাল
ভণন্তি বিরুআ থির করি চাল।।

[শব্দার্থ : শুণ্ডিনি = মদ্য বিক্রেতা স্ত্রী লোক, সান্ধঅ = প্রবেশ করলো,চীঅন =চিক্কণ/সূক্ষ্ম, বাকলঅ = বল্কলের দ্বারা,বারুণী = মদ, বান্ধঅ = বানালো/তৈরী করলো, থির= স্থির, অজরামর = জরাহীন মৃত্যুহীন, হোই = হয়, দিঢ়কান্ধঅ = দৃঢ়স্কন্ধ, দশমি দুয়ারত = দশমী দ্বারে, দেখইয়া = দেখে, আইল = এলো, গরাহক = গ্রাহক/খরিদ্দার, অপণে = নিজে, বহইয়া = পথ বেয়ে, চউশটি = ৬৪ চৌষট্টি, ঘড়িএ = ঘড়ায়, দেল= দেখালো,পসারা = পসরা/বিক্রয় যোগ্য দ্রব্যাদি,পইঠেল = প্রবেশ করলো, নিসারা = নিষ্ক্রমণ, ঘরলী = ছোট ঘড়া, সরুই= সরু, ভণন্তি = বলেন, চাল = চালো/ চালনা করো ]

প্রাকৃত সন্ধ্যা ভাষায় লিখিত এই চর্যাপদ টি কে বিশুদ্ধ বাংলায় রূপান্তর করলে সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় :-
একই মদ বিক্রেতা শুণ্ডিনি দুইটি ভিন্ন ঘরে প্রবেশ করলো আর সূক্ষ্ম বল্কলের সাহায্যে মদ চোলাই করলো। সহজে চিত্ত স্থির করে মদ চোলাই করো,যেন মদ্য পানকারী জরাহীন অমর দৃঢ়স্কন্ধ হয়। দশমীর দুয়ারেতে আমন্ত্রণের সঙ্কেত দেখে গ্রাহক নিজেই পথ বেয়ে চলে এলো। মদ বিক্রেতা শুণ্ডিনি চৌষট্টি টি ঘড়ায় সাজানো মদের পসরা গ্রাহক কে দেখালো। খরিদ্দার ভিতরে প্রবেশ করার পরে আর বের হবার নাম নেই। একটাই ছোট ঘড়া, তার মুখ সরু। বিরুবা বলেন,ধীরেধীরে চালনা করো।

প্রাকৃত বাংলায় রচিত চর্যাপদটি এমনই অদ্ভুত যে, এর সাধারণ অর্থের ক্ষেত্রে যেমন কঠিন সব ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই সহজিয়া বৌদ্ধ সাধন পদ্ধতির ভাবগত অর্থেও দুর্বোধ্য সব ইঙ্গিত রয়েছে। বিশুদ্ধ বাংলা রূপান্তরের প্রতিটি ছত্র কে বিশ্লেষণ করে দেখানো হলো, যেন পাঠকেরা দ্বৈত অর্থ সম্বলিত চর্যাপদের স্থূল বাহ্যিক সূক্ষ্ম বৌদ্ধ সাধন তত্ত্বের মাধুর্য রস উপলব্ধি করতে পারেন।

একই মদবিক্রেতা শুণ্ডিনি দুইটি ভিন্ন ঘরে প্রবেশ করলো আর সূক্ষ্ম বল্কলের সাহায্যে মদচোলাই করলো” - মদ বিক্রেতা শুণ্ডিনি দুইটি ভিন্ন ঘরে প্রবেশ করলো, কারণ দুই ঘরে তার দুইটি পেশা একসঙ্গে চলছে। একটা ঘরে সে বকযন্ত্র বা চোলাই যন্ত্র দিয়ে উত্তম মদ  প্রস্তুত করে এবং তা সাজিয়ে রাখে। সহজ আনন্দ লাভের আশায় যারা আসেন, তাদের মদের যোগান দিয়ে উচ্চ মার্গের তুঙ্গ আনন্দ দেওয়াই তার প্রধান পেশা। অপর ঘরে সে গ্রাহক কে দেহ মিলনে তৃপ্ত করে, এটি তার দ্বিতীয় পেশা।

সহজিয়া বৌদ্ধ সাধন তত্ত্ব মতে মানব দেহে মেরুদণ্ডের নিম্ন দেশে গুহ্য লিঙ্গের মধ্য স্থলে কুন্দস্থানে রয়েছে মূলাধার চক্র। এই মূলাধার চক্র সুষুম্না নাড়ীর একটি গ্রন্থি। বৌদ্ধ তান্ত্রিক শাস্ত্রে সুষুম্না লো নৈরামণি বা নৈরাত্মা, বোধিচিত্ত, অবধূতী বা যোগীনির প্রতীক। সুষুম্না নাড়ীর বাম দিকে ইড়া ডান দিকে রয়েছে পিঙ্গলা নামক আরও দুইটি নাড়ী। ইড়া পিঙ্গলা যথাক্রমে শক্তি শিবের প্রতীক। মানব দেহে সঞ্চারমান  প্রাণবায়ূ ইড়া পিঙ্গলা নাড়ীর মধ্য দিয়ে সতত চক্রাকারে আবর্তিত হয়। ইড়া পিঙ্গলাকে সংযত করার সাধনাই তন্ত্র সাধনা। ইড়া পিঙ্গলাকে সাধনার মাধ্যমে সুষুম্না তে মিশিয়ে দিতে পারলে সাধনা বলে সুষুম্না পরিণত হয় সহস্রায় বা মহাসুখ চক্রে, সেখানেই আছে মহা সহজানন্দ, অর্থাৎ সেখানেই শক্তি শিব রূপী জীবাত্মা পরমাত্মার মিলনে নির্বাণ সুখ লাভ হয়। সুষুম্নাই হলো স্থলে শুণ্ডিনি। তার একটি ঘর হলো ইড়া অপর ঘরটি হল পিঙ্গলা। সাধনতত্ত্বের রসে আপ্লুত সাধক কে সুষুম্না প্রথমে ইড়া তে সাধনার সুরায় আসক্ত করে,তারপরে পিঙ্গলাতে মিলন সুখে তৃপ্ত করে। কাম প্রবৃত্তি থেকে যে যৌন শক্তির উদ্ভব হয় তাকে সাধকেরা কুম্ভক প্রক্রিয়ায় ইড়ার মাধ্যমে উর্ধ্ব পথে মস্তিস্কে পাঠায়। মস্তিস্কে সঞ্চিত যৌন শক্তি সাধনার প্রভাবে ওজঃ বা আধ্যাত্মিক শক্তিতে পরিণত হয়ে পিঙ্গলার পথে মূলাধার চক্রে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়ায় সমস্ত যৌন শক্তি ওজঃ শক্তিতেরূপান্তরিত হলে মোহ মুক্তি ঘটে এবং সহস্রায় জীবাত্মা পরমাত্মার মিলনের ফলে মহা সহজানন্দ লাভ হয়।

 সহজে চিত্ত স্থির করে মদ চোলাই করো,যেন মদ্য পানকারী জরাহীন অমর দৃঢ়স্কন্ধ হয়” – মদের চোলাই যত ভালো হয়, গ্রাহকেরা তত বেশী তৃপ্ত হয়, তাই মন স্থির করে মদ চোলাই করতে বলা হয়েছে, যেন মদ্য পানকারীরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়।
আসলে বৌদ্ধ সাধকদের বলা হয়েছে, তারা যেন একাগ্র চিত্তে কুম্ভক সমাধির মাধ্যমে মূলাধার চক্রে কুল কুণ্ডলিনী কে জাগ্রত করে সাধন পর্ব সমাধা করেন, যাতে তারা জরা হীন মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারেন।

দশমীর দুয়ারেতে আমন্ত্রণের সঙ্কেত দেখে গ্রাহক নিজেই পথ বেয়ে চলে এলো” - মানব দেহে দশটি ছিদ্র বর্তমান, যাদের দশ দুয়ার বলা হয়। দুইটি চক্ষু ছিদ্র, দুইটি কর্ণ ছিদ্র,দুইটি নাসিকা ছিদ্র, একটি গ্রাস নালী ছিদ্র, একটি পায়ু ছিদ্র, একটি রেচন ছিদ্র একটি জনন ছিদ্র মিলিয়ে মোট দশটি ছিদ্র লো দশ দুয়ার। দশমীর দুয়ার অর্থাৎ যৌনাঙ্গে আমন্ত্রণের সঙ্কেত পেয়ে গ্রাহক নিজেই শুণ্ডিনির কাছে এলো।
বৌদ্ধ ধর্মমতে জগতের কল্যাণ সাধনের জন্য যিনি স্বয়ং নির্বাণ লাভ থেকে বিরত থেকে অপরকে নির্বাণ লাভে সহায়তা করেন, তাকে বলা হয় বোধিসত্ত্ব। বুদ্ধত্ব লাভেরজন্য বোধিসত্ত্বগণকে জন্ম জন্মান্তরে দশ পারমী পূর্ণ করতে হয়। এই দশ পারমী হলো - দান,শীল, নৈষ্কম্য,ক্ষান্তি, বীর্য, সত্য, অধিস্থান, মৈত্রী, উপেক্ষা প্রজ্ঞা। সাধকেরা বুদ্ধত্ব লাভের জন্য সাধনা করতে গিয়ে জানতে পারলেন এই দশ পারমীর কথা, এবং এই দশ পারমী লাভের উপায় সুষুম্না তে নিহিত আছে জানতে পেরে সাধকেরা নিজেই সুষুম্নার শরণাপন্ন লেন।

মদ বিক্রেতা শুণ্ডিনি চৌষট্টি টি ঘড়ায় সাজানো মদের পসরা গ্রাহক কে দেখালো” - নর নারীর যৌন জীবন কে সুখী, তৃপ্তিকর সন্তোষজনক করার জন্য নারীদের কণ্ঠ সঙ্গীত, যন্ত্র সঙ্গীত, চিত্রাঙ্কণ, নৃত্যকলা, কেশ শয্যা, হস্ত শিল্প, রন্ধন প্রভৃতি চৌষট্টি প্রকার গুণে দক্ষ হতে হয়। এদের বলা হয় চৌষট্টি কলা। এই চৌষট্টি কলার কয়েক টি তে পারদর্শিনী হলেই নারী রা পুরুষ দের হৃদয়ে গভীর অনুরাগের সৃষ্টি করতে পারেন। শুণ্ডিনি কে  পুরুষের মনোরঞ্জন করতে হয়, তাই শুণ্ডিনি গ্রাহকের মন বুঝে এই চৌষট্টি কলার কোন না কোন একটির সাহায্যে তার মন জয় করে।
আসলে এখানে বলা হয়েছে, নারীদের চৌষট্টি প্রকার কাম কলার সবগুলি থেকে মুক্ত হতে না পারলে সাধনায় সিদ্ধি লাভ অসম্ভব। সুষুম্নার সহায়তায় কুলকুণ্ডলিনী কে জাগ্রত করে দীর্ঘ সাধনায় এক একটি করে কাম কলার মোহ হতে মুক্ত হতে হয়। সুষুম্না রূপী নৈরাত্মা সাধকদের এক এক করে চৌষট্টি প্রকার কাম কলা হতে মুক্ত করে।

খরিদ্দার ভিতরে প্রবেশ করার পরে আর বের হবার নাম নেই” - শুণ্ডিনির সান্নিধ্য পেয়ে গ্রাহকেরা এতই মত্ত যে আর বাইরে আসার নাম নেই।
আসলে বলা হয়েছে উপযুক্ত সাধন পথের সন্ধান পেয়ে সাধকেরা একবার যদি নৈরাত্মার সাহচর্যে সহজানন্দের সন্ধান পান, তবে আর গৃহী জীবনে ফিরে আসেন না।

একটাই ছোট ঘড়া, তার মুখ সরু। বিরুবা বলেন,ধীরে ধীরে চালনা করো ” – মিলনের পথ সংকীর্ণ, তাই অহেতুক তাড়াহুড়ো অনুচিৎ।
সুষুম্না নাড়ী মানব দেহের একটি ক্ষুদ্র অংশ। সুষুম্নার সূত্রাকার পথ অতিসূক্ষ্ম। এই সূক্ষ্ম পথেই জীবাত্মা পরমাত্মার মিলন ঘটে তাই বিরুবা উপদেশ দিচ্ছেন অতি ধীরে ধীরে সাধনার পথে এগিয়ে চলো।

এই ভাবে আমরা যদি ক্রমাগতঃ ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের সমস্ত চর্যাপদগুলিকে বৌদ্ধশাস্ত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে, সব গুলিতেই সাধন তত্ত্বের কোন না কোন গূঢ় রহস্য দক্ষতার সঙ্গে মানব জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলির আবরণে সুন্দর কাব্যিক রূপে বর্ণিত

বৌদ্ধ সহজপন্থী সাধকেরা মনে করতেন ললনা রসনার মিলনে সংবৃত বোধি চিত্ত উৎপন্ন হয় তা নির্মাণ কায়ে অবস্থান করে। নির্মাণ কায়ে অবস্থান কালে সংবৃত বোধি চিত্ত নিচের দিকে ধাবিত হতে চায়। কিন্তু যোগ সাধনা বলে একে উর্ধ্বগামী করতে পারলে তা রূপান্তরিত  হয় পারমার্থিক বোধি চিত্তে। এই পারমার্থিক বোধি চিত্তকেই চর্যাপদে নৈরামণি বলা হয়। চর্যাপদের আদি কবি শবরপাদ একটি চর্যাপদ রচনা করেন, যা তে এই নৈরামণির উল্লেখ আছে। আাপাতদৃষ্টিতে একে নর নারীর প্রেম মিলন চিত্র মনে হলেও, এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান সাধন পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।
[তথ্যসুত্রঃ সমর কুমার সরকার / শিলিগুড়ি ]


সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০১৫

নিঃসঙ্গ একাকীঃ চিন্তার ডানাগুলো উড়ছে একাকী

ঘরের ভেতর অন্ধকারে বসে আছি একাকী। বিদ্যুৎ চলে গেছে। হাতের কাছে কোথাও কোন মোমবাতি পাচ্ছি না। মোবাইল ফোনটি বের করে সারা ঘরময় খুঁজলাম। না কোথ্থাও মোমবাতির নাম নিশানা খুঁজে পেলাম না। হয়তো আনা হয়নি। এই অন্ধকার ঘরে বসে থেকে কিছু চিন্তা মাথায় ঢুকলো। যেমনঃ মানুষ অন্ধকারে থাকতে চায় না। সব সময়ই চায় আলোকের সংস্পর্শ। কিন্ত্তু কেন? মানুষ কি জানে তারা একসময় অন্ধকার জগতের বাসিন্দা ছিল। সে সময় কেমন ছিল তারা? কিভাবে তারা পার করেছে অনন্ত সময়গুলি? 

সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থার কথা যদি চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাবো-এক সময় আমার কোন অস্তিত্বই ছিল না। অামি ছিলাম অনস্তিত্বশীল জড় পদার্থ। সারা বিশ্বময় অামি বিরাজিত ছিলাম। কিভাবে? এই যে জমি যার উপর দিয়ে আমরা হেঁটে চলি সেই জমির ফসল আমরা খাই।  তার থেকে তৈরী হয় বীর্য। স্থান নেয় জননন্দ্রিয়ে। তার পর একটা ক্রিয়া, কাল কর্তার উপর প্রভাব পড়ায় আমার স্থান নেয় একটি বিশেষ স্থানে। সেখানেই আমি বেড়ে উঠি। অতঃপর একটা সময় অতিক্রান্ত করে আমি আমার রুপ লাভ করে ভুমিতে স্থান নেই। তার আলো বাতাসেই আমার বেড়ে চলা। এরপর একটা নাম ধরি। একটা রুপ নিয়ে সেই রুপের নাম নিয়েই আমি বেড়ে উঠি। তারপর একটা সময় আমার স্থান ছেড়ে দিয়ে অন্যকে জায়গা করে দেয়ার জন্য প্রস্থান করতে হয়। সেটাকে আমরা মৃত্যু বলি। এই জন্ম-মৃত্যূর খেলা প্রতিনিয়তই হচ্ছে। প্রশ্নটা হলোঃ এই জন্ম মৃত্যু নামক খেলায় অামার লাভ কোনটি? নানা রুপ ধরে জগতে বিচরণ করতে হয়। কেন? শুনেছি চুরাশি যোনি ভ্রমণের কথা। তাহলে বর্তমানে আমার যে অবস্থান তা কতোতম যোনির ফল? কর্মের উপর কর্তার প্রাধান্য থাকে। কর্তার ক্রিয়ার ফল হচ্ছে কর্ম। কর্মটিকে আবার দু'ভাগ করে দেখানো হয়েছে। নিষ্কাম কর্ম এবং স্বকাম কর্ম। নিষ্কাম কর্মে কর্তা কোন ফল লাভের আশা না করে কর্ম করে যায়। অার স্বকাম কর্মে কর্তা ক্রিয়ার ফল আশা করে। অথচ এমন বোকা কে আছে যে কর্মের ফল আশা করে না? শুনেছি যারা মহাপুরুষ তারা নাকি তাদের জীবন অতিবাহিত করেছেন নিষ্কামব্রত পালন করে। কারণ তারা কর্মফল আশা না করে স্রষ্টার সান্নিধ্যকেই বেশি পছন্দ করতেন। সেটাই যদি হয় তাহলে তো সেখানেও একটা উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। তা হল তার সান্নিধ্য লাভ। তাহলে কি নিষ্কাম কর্মই জগতে শ্রেষ্ঠ? স্বকাম কর্মের কোন দাম নেই? স্বকাম কর্ম না করলে খা'ব কি করে? কোন কিছু খেতে হলেতো টাকার প্রয়োজন। টাকা পেতে হলে কর্মের প্রয়োজন। তা সেটা ভিক্ষাবৃত্তিই হোক না? না খেলে তো বাঁচার প্রশ্নই আসে না। টিকে থাকতে হলে স্বকাম কর্মেরও প্রয়োজন আছে। আর সেটা লক্ষ্য করেই বোধ করি ডারউইন নেচারেল সিলেকশনের কথা বলেছিলেন। প্রকৃতি তাদেরই নির্বাচন করে যারা বিরুপ প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পারে। আর না পারলে তার পুরস্কার মৃত্যু। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো?

অন্ধকারে থাকতে থাকতে আমার ভাবনাগুলোও কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্ন আছে অনেক। উত্তরও অনেক। মানা না মানা ব্যক্তির পছন্দ। কি সব আবোল তাবোল ভাবছি। নাহ আর ভাল লাগছে না। মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে। 
অামি অন্ধকার ছেড়ে হটাৎ আলোক ঝলকানিতে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। উঠে দাঁড়ালাম। বারান্দায় ক্ষাণিকটা আলো আছে। আমি সেদিকটায় গেলাম। আবিস্কার করলাম। নিজেকে নতুনভাবে। কারণ অন্ধকারে অামি আমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আলোতে এসে সেটা প্রত্যক্ষ করলাম। ভাবনার ডানাগুলো খুজতে লাগলাম...কোথা কোন্ সুদুরে হারিয়ে গেল..

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০১৫

দেহ নৌকা


শ্রাবণের বারিধারায় সিক্ত করিম মাঝি তার নাও খান নিয়ে প্রতিদিনের ন্যায় পদ্মায় যাত্রী পারাপার করে। যাত্রীরা তাকে যা দেয় তাতে তার সংসার কোনরকম চলে যায়। সংসার বলতে তার এক মেয়ে দুই ছেলে এবং তার স্ত্রী জমিলা খাতুন। পাঁচ সদস্যের সংসার। সংসারে রোজগার পাতি বলতে ঐ নৌকাখানিই তার ভরসা। মালিকের দয়ায় কোন রকম চলে যায়। কিন্ত্তু টানাটানি লেগেই থাকে। এ নিয়ে সংসারে মাঝে মধ্যে তার স্ত্রীর সাথে কথাকাটি হয়। কিন্ত্তু কি করবে? সেতো নৌকা চালানো ছাড়া অন্য কোন কাজই জানে না। আর এই যান্ত্রিক যুগে সবাই বোটে চড়েই নদী পার হয়। আগে যা আয় হতো এখন তাও হয় না। ভাবনায় করিম মাঝি একপ্রকার হারিয়ে যায় অদুর ভবিষ্যৎ নিয়ে। কি করবে সে? তার ভাবনায় ছেদ পড়ে যখন কবির সিকদার ডাক দেয়। কবির সিকদার গ্রামে বিচার আচার করে। সিকদার বংশের মান রক্ষা করা যেন তার দায় হয়ে পড়েছে। সে দায় সে যথাযথভাবেই পালন করছে। দু'চার গ্রামের মানুষ এখন তাকে চেনে। তার ডাক শুনে করিম মাঝি সাড়া দেয়।

-আরে ভাই আপনি সাত সকালে কি মনে কইর‌্যা?

-তোমার নাও লইয়া আমি রহিমপুর যামু। আমার পীর সাহেব আসবে। সে নৌকা নিয়ে আসতে বলেছে। তাই ভাবলাম তোমারে লইয়া যাই। তাছাড়া তুমিতো আমাগো গেরামেরই মানুষ। তোমারে লইয়া গেলে আমি নিশ্চিত থাকতে পারি আর কি? এই জন্যই তোমার কাছে আইছি। তুমি কি যাইব্যা?

করিম মাঝি যেন অকুল দরিয়ায় কুলের সন্ধান পেয়েছে। সে সানন্দে রাজি হয়ে যায়। বলে

-কখন যাইবেন ভাই?

-এই ধরো সাতটার দিকে।

-ঠিক আছে। আমি নাও লইয়্যা তৈরী থাকুম নে। আপনে আইস্যা সবকিছু রেড়ী পাইবেন।

কবির সিকদার যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। সে জানে করিম ভাই ভালো মানুষ। সব কিছুতেই তার আগ্রহ। তাছাড়া সে গুরু ধরা মানুষ। তার সাথে দু'চার কথা শোনাও যেতে পারে। তিনি আর দাঁড়ালেন না। হন হন করে হেঁটে বাজারের দিকে চলে গেলেন। তখন বাজে প্রায় সাড়ে ছয়টা। বাজার থেকে কিছু খাবার কিনলেন। পথে খিদে লাগলে খেয়ে নেবেন। তাছাড়া তার পীর সাহেব আসছেন। তাকেতো আর উপোষ রাখা যায় না। তাই তাড়াতাড়ি খাবার কিনে তিনি ঘাটে আসলেন। এসে দেখেন করিম ভাই নৌকাটা ভালো ভাবে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে রাখছে। ঝক ঝক করছে নৌকাটি। কবির সিকদার আর অানোয়ার তার নৌকায় উঠলেন। করিম মাঝি গুরুকে স্বরণ করে নৌকাখানি ছাড়লেন।

নৌকাটি রহিমপুর আসতে ঘন্টা তিনেক লেগেছে। প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। রহিমপুরে তার পীর সাহেব দবির শাহ্ ও তার চারজন সংগী অপেক্ষা করছে। কবির সিকদারকে দেখে তারা আনন্দে উদ্দেলিত হয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। এরপর তারা নৌকায় উঠলেন।

করিম মাঝি দবির শাহ্ কে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাকে ভক্তিভরে কদমবুছি করলেন। তারপর তাকে বললেনঃ

-হুজুর আমার জন্য দোয়া করবেন। আমার নাম করিম মাঝি। অামি এই নাও চালাইয়া সংসার চালাই।

-ফি আমানিল্লাহ। আল্লাহ কারিম। তোমার নাওখানতো বেশ পরিপাটি দেখছি।

-হুজুর আপনে আসবেন শুইন্যা নৌকাটা ভালোভাবে ধুইয়্যা পরিস্কার করছি।

-তা বেশ।

-তা তোমার সংসারে ছেলে মেয়ে কয়জন?

-হুজুর, দুই ছেলে এক মেয়ে। মাইয়্যাটা বড়।

-হুম। ভালো।

করিম মাঝি সেখান থেকে উঠে নৌকা ছাড়লেন। নৌকাখানি স্রোতের টানে তর তর করে এগিয়ে চলছে।  বৈঠার শব্দ আর জলতরংগের শব্দ ছলাৎ ছলাৎ শুনতে দবির শাহ্ কি যেন চিন্তা করলেন। গভীর ধ্যানের মতো তন্ময় হয়ে চোখ বুজেঁ রইলেন। ক্ষাণিক বাদে তিনি তাকিয়ে করিম মাঝিকে বললেনঃ

-ও মিয়া। নুহ নবীর কিস্তির কাহিনী জানো?

-নাহ্ হুজুর। তয় ভাসা ভাসা হুনছি।

-শুন মিয়া। হযরত নুহ নবী (আঃ) আল্লাহর পয়গাম যখন দুনিয়াতে তার কওমের কাছে পৌঁছাইলেন তখন তার কওমের লোকেরা তার কথা না শুনে অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকলো। অনেক বলা কওয়ার পরে কিছু লোক তার উপর এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনলো। আর বাকী যারা তারা যখন আল্লাহর পয়গাম গ্রহণ করতে চাইলো না, তখন নুহ (আঃ) আল্লাহর কাছে এর প্রতিকার চাইলেন। আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তাকে জানাইলেন যে খুব শীঘ্রই তিনি প্লাবন দিবেন। অর্থাৎ দুনিয়া তলাইয়া দিবেন। আর নুহ নবী(আঃ) কে হুকুম করলেনঃ জোড়ায় জোড়ায় প্রত্যেকটি জীব জন্ত্তু তার নৌকায় উঠানের জন্য। নুহ(আঃ) সেই বার্তাও তার কওমের লোকদের জানাইলেন। কিন্ত্তু তারা তার কথা যথারীতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলো। বুঝছো নি মিয়া?

এরপর আল্লাহ যথাসময়ে প্লাবণ দিলেন। দুনিয়া তলাইয়া দিলেন। সমস্ত কিছু পানির নীচে তলাইয়া গেল। চল্লিশ দিন তামাক বৃষ্টি বাদলায় পুরা দুনিয়া তখন পানির নিচে। যখন পানি নামলো তিনি ও তার সাথীরা নৌকা থিক্কা নামলেন। আবার দুনিয়া আবাদ করলেন। এজন্য নুহ নবীরে কয় সানি আদম। সানি আদম বুঝনি ও মিয়া?

-জ্বে না হুজুর। করিম মাঝি মাথা নেড়ে জানায়।

-সানি আদম হইলো দ্বিতীয় আদম। প্রথম আদম দুনিয়া আবাদ করছেন। এরপর নুহ নবী দ্বিতীয়বার আবাদ করলেন। এইজন্য নুহ নবীকে দ্বিতীয় আদম বা সানি আদম কয়। মিয়ারা তোমাগে যে এই তাজকেরাতুল আম্বিয়ার কথা হুনাইলাম তাতে তোমরা কিছু বুঝবার পারছো নি?

-জ্বে না হুজুর। কেমতে জানমু? কেউ কি আমাগো ধারে কিছু কয়?

-আরে মিয়া। নৌকা বলতে রুপকার্থে এই দেহরে বুঝাইছে। আর তার সংগীসাথী বলতে তার ভেতরের বস্তুরে বুঝাইছে। চল্লিশদিন বলতে গন্ঞ্জে মুখফিরে বুঝাইছে। এই গন্ঞ্জ এ মুখফির গোপন ইরাদায় সৃষ্টি হয়। আর বৈঠা বা লগি বলতে পুংলিংগরে বুঝাইছে। নৌকা তথা দেহখানি কে বায়? মালেক সাঁই তিনিইতো সব। সবই তিনি। তিনার দয়া না হইলে ঐ প্লাবনের মাঝে ডুব্ব্যা মরতে অয়। কামকামিনীগণ সদাই নৌকাখানি ডুবানোর জন্য তৎপর থাকে। তয় যারা গুরুর কাছ থিক্কা গোপন মন্ত্র নিয়া ঐ নদীতে নৌকা বাইতে যায় তারা নুহের কিস্তির মতোই ভাইস্যা বেরায়। তাগো ডুবার ভয় নাই।

-হুজুর, তাইলে এইহানে সানি আদম কেডা ? মাইনে আমি...

-বুঝবার পারছি তুমি কি কইবার চাও? হুন মিয়া। তুমি যখন দীক্ষা না নিছ তখন তুমি তোমার দেহের রত্নভান্ডার চিনতা? চিন্তা না। যখন তুমি দীক্ষা নিয়া জানছো তোমার দেহখানিরে তহনই তুমি দ্বিতীয় আদম অর্থাৎ সানি আদম হইছো। বুঝাবার পারছো?

-জ্বে হুজুর।

দবির শাহের নুহের গল্প শুনে করিম মাঝির যেন অন্তঃদৃষ্টি খুলে গেল। সে যেন সবকিছুই দেখতে পাচ্ছে। তার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে সবকিছু। সে কোন দিকে না তাকিয়ে বাউল আব্দুল করিমের গানটি গাইতে আরম্ভ করেছে।

কোন মেস্তরি নাও বানাইলো এমন দেখা যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।
চন্দ্র-সূর্য বান্ধা আছে নাওয়েরই আগায়
দূরবীনে দেখিয়া পথ মাঝি-মাল্লায় বায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।
রঙ-বেরঙের যতো নৌকা ভবের তলায় আয়
রঙ-বেরঙের সারি গাইয়া ভাটি বাইয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।
জারি গায়ে ভাটি বায়ে করতাল বাজায়
মদন মাঝি বড়ই পাজি কতো নাও ডুবায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।
হারা-জিতা-ছুবের বেলা কার পানে কে চায়
পাছের মাঝি হাল ধরিয়ো ঈমানের বৈঠায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।
বাউল আব্দুল করিম বলে বুঝে উঠা দায়
কোথা হইতে আসে নৌকা কোথায় চলে যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।

নৌকাখানি আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছে। পানির স্রোতে আর বৈঠার তালে তালে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এক অভাবনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হলো। পড়ন্ত বিকেলে নরোম সুর্যের আলো নদীর পানিতে পড়ায় আলোর ঝর্ণাধারা সৃষ্টি হলো। আর সেই পরিবেশে করিম মাঝির গান...এ এক অভাবনীয় স্বর্গীয় অনুভুতির সৃষ্টি করছে সবার মনে।

রবিবার, ২ আগস্ট, ২০১৫

ভবা পাগলার সাথে কথোকথন-পর্ব দুই

(পূর্ব প্রকাশের পর)

-বাজান আমি সব হুনছি।

-তাই? আমিও দেখেছি আপনি আমাদের ফলো করছিলেন। কিন্ত্তু পরে যখন আপনে লাফ দিয়ে এসে দোতারা বাজিয়ে গান শুরু করেছিলেন সেসময় ভয়ও পেয়েছিলাম। আমার বন্ধুটিও ভয় পেয়েছিল। কিন্ত্তু আপনার দোতারার আওয়াজে ভয় কিছুটা হলেও কেটে গিয়েছিল।

আমার কথা শুনে ভবা পাগলা কিছু বললো না। শুধু নীরব সম্মতিতে মাথা নাড়লো। দেখে মনে হলো সে যেন ইচ্ছে করেই কিছু বলতে চাইছিল। কিন্ত্তু আমার কথায় সে শুধু হাসলো। আমি তাকে আবারো প্রশ্ন করলামঃ

-আপনি যে গানটি গাইছিলেন সেটির অর্থ জানার উদ্দেশ্যেই কিন্ত্তু আমি আপনাকে খুঁজছিলাম।

-বাজান গানের মাইনে খুঁইজ্যা কোন লাব নাই। সব গানের মাইনে জানতে চাইলে বিপদ।

-সমস্যা নাই। আপনি বলেন। বিপদ আপদ পড়ে দেখা যাবে।

-তাইলে হুন। বাবা বুল্লে শাহ্ পাকিস্থানের পান্ঞ্জাবের একজন নাম করা সাধক। পান্ঞ্জাবী ভাষায় এইডা তারই লেখা। গানডা আমার ওস্তাদে গাইছিল। তার কাছ থিক্কা সংগ্রহ করছি। হে যা কইছিল হেইডাই তোমাকে কইতাছি।
  
পড় পড় ইলম তে ফাজিল হোয়ে 
মানে পইড়্যা পইড়্যা তুমি ফাজিল ডিগ্রী লাভ করতে পারবা
তে কাদে আপনে আপনু পড়েই নে
তুমি তোমার নিজেরে পড়ো নাই।
বাজ বাজ ওয়ার না এই মান্দির মাসজিদি
তুমি দৌড় দিয়া মসজিদ মন্দিরে যাইতে পারো
তে কাদে মান আপনে উচ ওয়ারনে না।
কিন্ত্তু তুমি তোমার অন্তরের ভিতর কহনো যাইতে পারো নাই।
লারনা এই রোজ শাইতান দি নাল
প্রতিদিন তুমি শয়তানের সাথে যুদ্ধ কর
তে কাদি নাফস আপনে নাল লাড়ইয়ে না
কিন্ত্তু তুমি তোমার নিজের সাথে কহনো যুদ্ধ করো নাই। 
বুল্লে শাহ আসমানি উড় দিয়া পারোনদা ইয়ে
বুল্লে শাহ চেষ্টা কইর‌্যা দেহ যে আসমানে উইড়্যা যায়
তে যারা গার বিঠা আপন পারইয়া না
কিন্ত্তু তুমি তারে তোমার অন্তরে ধইর‌্যা রাখবার পারো নাই
বাস কারো ইয়ার
বন্ধ কইর‌্যা দেও হে বন্ধু
ইলমু উন বাস কারো ইয়ার
এই ধরণের বিদ্যা খোঁজা বন্ধ কইর‌্যা দেও।
 
তোমাগো কতা বার্তা হুইন্যা আমার এই কতা মনে অইছে। যেই বিদ্যা তোমারে তোমার ভিভর লেহা পড়া হিগায় না, জানায় না, হেই বিদ্যা দিয়া তুমি দুইন্ন্যায় খ্যাতি পাইতে পারো। কিন্ত্তু পরকালে হেই বিদ্যা কোন কামে লাগবো না

এক আলিফ তারে দারকার
একটা আলিফই দরকার
আল্লাহ শাইয়ান আল্লাহ শাইয়ান।
আল্লাহ সর্বশক্তিমান আল্লাহ সর্বশক্তিমান
নে মান জান জোগি দি নাল
অামি জোগী(সাধু/সন্ন্যাসী/সুফী)র পথে চলি।
যো না জানে হাক্ক কি তাকাত
যে সত্যের শক্তি সমন্ধে জানে না
রাব্ব না দেবে উচকো হিম্মত
রব তারে সাহস দিবো না।
হামমান কি দারইয়া মে ডুবে
আমরা আমাগো দুনিয়ার জ্ঞানেই ডুইব্যা আছি
কেইছে নাইয়ে? ক্যা মানদার
নৌকা এবং পানির স্রোতধারা যাই হোক না কেন?
বাস কারো ইয়ার
বন্ধ কইর‌্যা দেও হে বন্ধু
ইলমু উন বাস কারো ইয়ার
এই ধরণের বিদ্যা খোঁজা বন্ধ কইর‌্যা দেও।
 
-এইবার বুঝতে পারছি আপনি কেন সেই সময় এই গানটা গাইছিলেন?
 
ভবা পাগলা আর কিছু না বলে তার পুঁটলি গোছাতে লাগলো। তার দোতারাটা একবার পরীক্ষা করে নিল। তারপর টুনটুন করে বাজাতে লাগলোঃ
 
জো না জানে হাক্ক কি তাকাত
রাব্ব না দেবে উচকো হিম্মত
হাম্মাম কি দারিয়া মে ডুবে
কেইছে নাইয়্যা? ক্যা মানদার
বাস কারো ও ইয়ার
ইলমু উন বাস কারো ও ইয়ার।
তার বাজানোর সুর ও ছন্দে এতোই বিভোর ছিলাম যে, সে যে চলে যাচ্ছে তা টেরই পাইনি। কারণ আমি তখন গানের অর্থ বুঝে মেলাতে ব্যস্ত ছিলাম। 

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০১৫

ভবা পাগলার সাথে কথোপকথন-পর্ব এক

শ্রাবণের ঝর ঝর বৃষ্টিধারা কবি মনে ভাবের উদ্রেক করে। সাহিত্যিক মনাদের সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করে। প্রেমিক-প্রেমিকাকে মিলনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। আর ব্যাকুলচিত্তের মানুষগুলোকে আকুলতায় আপ্লুত করে। তারা আক্ষেপ করে বাহিরে বের হবার আশায়। বদ্ধঘরে তারা আর থাকতে চাইছে না। কিন্ত্তু কি করবে? বৃষ্টিনামক বারিধারায় সিক্ত হতে কেউ চাইবে না। আমার অবস্থাও ঐ অস্থির চিত্তের মতোই। ঘরে থাকতে মন চাইছে না। চাইছে কোথাও চলে যাই অজানার উদ্দেশ্যে। মাহিনের সাথে কথা বলার পর ভবা যে গানটি গেয়েছিল সেটার কয়েকটি চরণ মনে আছে। সেটাই গুণ গুণ করে গাইতে ইচ্ছে করছেঃ

পড় পড় ইলম তে ফাজিল হোয়ে 
তে কাদে আপনে আপনু পড়েই নে
বাজ বাজ ওয়ার না এই মান্দির মাসজিদি
তে কাদে মান আপনে উচ ওয়ারনে না।
লারনা এই রোজ শাইতান দি নাল
তে কাদি নাফস আপনে নাল লাড়ইয়ে না
বুল্লে শাহ আসমানি উড় দিয়া পারোনদা ইয়ে
তে যারা গার বিঠা আপন পারইয়া না
বাস কারো ইয়ার
ইলমু উন বাস কারো ইয়ার।
গানটি কোন্ ভাষায় গাওয়া? অর্থাৎ গানটি কথা কোন্ ভাষায় রচিত? বুল্লে শাহ্ কে? আর কেনই বা ভবা পাগলা ঐসময় ঐগানটি গাইলো? তার মানে নিশ্চয়ই ভবা পাগলা কোন কিছু মিনিং করতে চাইছিল। আচ্ছা কি মিনিং করে ভবা পাগলা গানটি গাইলো? জানা দরকার। আমাকে ভবা পাগলার খোঁজে বার হতে হবে। জেনে নিতে হবে তার অর্থ। যেই ভাবা সেই কাজ। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়বো বলে সিধান্ত নিয়েছি। থাকবো নাকো বদ্ধঘরে দেখবো এবার পাগলটাকে...এই দর্শন মাথায় নিয়ে বৃষ্টির সময় বেরিয়ে পড়লাম।

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে মৃদু মন্দ বাতাসের ঝাপটা এসে গায়ে লাগছে। মাথার চুলগুলো ভিজে একাকার হয়ে গেছে। জামাটাও প্রায় পুরোটাই ভিজে যাচ্ছে। বাতাসের চোটে এখন কেমন যেন শীত শীত লাগছে। মনে মনে মাহিনকে গালি দিলাম। ঐ ব্যাটার জন্য ভবার সাথে কথা বলতে পারলাম না। গানের অর্থটাও জানা হলো না। এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় খুঁজে পাই ভবা পাগলাকে-সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়। চলে গেলাম পার্কে। পার্কের আনাচে কানাচে খুঁজতে লাগলাম ভবাকে। সেখানে খুঁজতে গিয়ে পড়লাম বিপাকে। আমার খোঁজার ধরণে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করছে। আড়চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। তাদের ধারণা আমি হয়তো নরোম মাংসের স্বাদ নিতে ব্যাকুল হয়ে খুঁজছি কোন ঊর্বশীকে। যেমনটা খুঁজে বেড়ায় ক্ষুধার্ত বাঘ। তাদের চাহনীতে সন্দেহের উদ্রেক করছে। আমি তা অগ্রাহ্য করে আমার কাজ চালিয়ে গেলাম। কিন্ত্তু দুঃখের বিষয় পেলাম না। কোথাও নেই সেই ভবা পাগলা। 

পার্ক থেকে বের হতেই শাহ্ বাগের মোড়ের রাস্তার উল্টা দিকে শিশুপার্কের বাস ছাউনীতে দেখতে পেলাম কে যেন গুটি শুটি মেরে বেন্ঞ্চিতে শুয়ে আছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। উল্টাদিকে মুখ করে শুয়ে আছে। আমি আর দেরি করলাম না। সেইখানটায় গিয়ে হাজির হলাম। দেখলাম যাকে আমি খুঁজছি সেই ভবা পাগলা শুয়ে আছে নিঃচিন্তে। আমি তাকে ডাকলাম না। তার পাশেই বসে অপেক্ষা করছি কখন তার ঘুম ভাংগে।

মনে হয় কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে সে উঠে বসলো। আমার দিকে তাকিয়ে ঘুম ঘুম দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলোঃ

-কি চাই? তার কথা শুনে আমি বললামঃ

-তেমন কিছু না। আপনার সাথে কথা বলার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছি।

-আমার সাথে কি কথা? 

-না মানে ঐযে সেইদিন আপনি একটা গান গেয়েছিলেনঃ
পড় পড় ইলম তে ফাজিল হোয়ে 
তে কাদে আপনে আপনু পড়েই নে
বাজ বাজ ওয়ার না এই মান্দির মাসজিদি
তে কাদে মান আপনে উচ ওয়ারনে না।
মনে আছে আপনার? সেই গানটার অর্থ জানার জন্যই আপনাকে খুঁজছি।

ভবা পাগলা মনে হয় জীবনেও আমার মতো এমন লোক পায়নি যে তার গানের অর্থ খোঁজার জন্য এই বৃষ্টি বাদলা মাথায় নিয়ে তার কাছে আসতে পারে। সে অবাক করা দৃষ্টি নিয়ে বললোঃ

-মানে জেনে কি করবেন? 

-দরকার আছে। গানটি আপনি এমন এক সময় গেয়েছেন যে সময় আমি ও আমার বন্ধু একটা কথার মানে খোঁজার জন্য ব্যস্ত ছিলাম। ব্যস্ত ছিলাম দার্শনিক আলোচনায়।
(চলবে)