পৃষ্ঠাসমূহ

শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ-দ্বিতীয় পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)
ছলেমানের মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। সে ভেবে পাচ্ছে না - এটা কিভাবে সম্ভব? ত্রিশ বছর পর তালেব ব্যাপারীর লাশ কিভাবে অবিকৃত রইল? অথচ এই ত্রিশ বছরে তার কোন অস্তিত্বই থাকার কথা না। পন্ঞ্চ ভুতের উপাদানে তৈরী এ মানব দেহ মৃত্যু নামক বিষয়টির সাথে জড়িত। প্রতিটি ভুতের ভৌত উপাদানগুলো সেই ভুতের সাথে মিশে যাবার কথা। অথচ তা না হয়ে হলো উল্টাটা। সেই দেহটি রইল অবিকৃত। এটা কিভাবে সম্ভব হলো ?

চিন্তায় বিভোর ছলেমান কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অথচ সে তার মাথা থেকে সম্পূর্ণ চিন্তাটি মুছে ফেলতে পারছে না। সে তার দোকান সাদিয়া জুয়েলার্স থেকে বের হয়ে পাশের টং দোকানে চা খেতে গেল। দোকানী রহিম ব্যাপারী জানে ছলেমান ভাই সবসময় হাসি খুশি মানুষ। দেখা হলেই সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করে। জানতে চায় সার্বিক অবস্থা। সেই ছলেমান ভাই আজকে কেমন যেন মন মরা লাগছে। কোন কথাই বলছে না। সে চা দিতে দিতে বললোঃ

- কি ব্যাপার ছলেমান ভাই? কেমুন জানি দেহাইতাছে আপনারে? কি হইছে? শরিলডা কি খারাপ?

- না রে ভাই। সেইরকম কিছু না। মনডা একটু খারাপ।

-মনের আবার কি অইলো?

-আরে ভাই সকালে নামাজ পইর‌্যা দোকানে আহনের সময় সুরুজ বাইয়ের লগে দেহা। হেয় কইলো মোতালেব ব্যাপারীর বাপ তালেব ব্যাপারীর লাশ নাকি বাইর অইছে। আর হেই লাশ নাকি একটু্ও পঁচে নাই।

-কও কি? ওর বাপতো মারা গেল না অইলেও বিশ পঁচিশ বৎসর অইলো। হেই লাশ পঁচে নাই-এইডা কেমুন কথা?

-আরে বাই আমিওতো হেই কতা ভাবতাছি। এইডা কেমতে সম্ভব?

-আরে আল্লাহয় চাইলে কি না অয়? মালিকের দয়া অইছে। হের লাইগ্গ্যা হয়তো অয় নাই...

-অইবার পারে। কিন্ত্তু..তারপরও 

-তুমি কি দেকছো?

-না। আমি দেহি নাই। তয় হুনছি গ্যারামের বেবাকতে দেকছে। 

-হুনছি সাংবাদিকও নাকি ঢাকা থিক্কা আইছিল। হেরা বেবাক খবর লইয়্যা গেছে। বিষয়ডা বড়ো আচানক ঠেকতাছে...এমুন একটা খবর আর আমি দেকতে পারি নাই?

তাদের কথা বার্তার মাঝে কবির সিকদার এসে উপস্থিত হয়। সে এসেই রহিমের কাছে পানি চায় আর একটা সিগারেট চায়। পানি পান করে সে সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলে

-ছলেমান রাইতে বারিত আহিস। আমাগো পীর সাহেব আসবো...

-তাইলে তো ভালয় অয়। একটা জিনিস জাননের আছে। হের কাছ থিক্কা জানতে পারমু।

-কি জানতে চাস?

-আরে ঐ যে হেই ঘটনাটা..

-কোনডা...

-মোতালেইপ্যার বাবার ঘটনাডা

-ও। আরে আমি গেছিলাম দেকতে..যাউগ্যা তুই রাইতে বারিত আহিস। কতা আছে তোর লগে... আমি যাইগ্যা। সবাইরে দাওয়াত দেওন লাগবো।

কবির সিকদার হন হন করে হেঁটে চলে যায়। ছলেমানের মনে কি যেন একটা চিন্তা আসে। সে বেশ খুশি হয়। তার মনে হয় সে তার চিন্তার একটা কুল কিনারা করতে পারছে..তার ভাবনার বিষয়টি হয়তো সে জানতে পারবে...এ আনন্দে তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ-প্রথম পর্ব

কার্তিক মাসেই শীতের আগমণ ধ্বনি শুনা যাচ্ছে। চারিদিকে কুয়াশার একটা পাতলা চাদর ইতিমধ্যেই বিছিয়ে দিতে শুরু করেছে। গাছের ডগায় শিশির বিন্দু জমে জমে তা টিনের চালায় পড়ে বেশ আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। সবুজ ঘাসের উপর পড়ে তা বেশ মনোরম অবগাহন করে নিচ্ছে। শীতের আবহ তৈরী হওয়ার ছলোমান তার কাঁথাটি বেশ করে গায়ে জড়িয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকে। তার বৌ সকিনা তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে চেষ্টা করছে।

-এ্যাই হুনছো। আজান হইছে। ওঠো...ফজরের নামাজ পড়বা না? 

ছলেমান কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে আযান দিচ্ছে কি-না? সে কাঁথার ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছে দুরে কোথাও মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছে। "আস সালাতো খাইরাম মিনান নাউম।" ঘুম হতে সালাত উত্তম। সে উঠি উঠি করেও উঠছে না। তাকে মনে হয় আলসিতে পেয়ে বসেছে। সে শুনেছে - ভোর রাতে শয়তান মানুষের পা টিপে দেয়। যাতে সে আরামে ঘুমাতে পারে। ফজরের নামাজ যাতে না পড়তে পারে। মনে হচ্ছে তাকে সেই শয়তানই পেয়ে বসেছে। উঠি উঠি করেও উঠছে না। 

-কি অইলো? ওডো না ক্যান? নামায পড়বা না?

বউয়ের ঠেলায় সে কাঁথা ছেড়ে ওঠে বসে। তারপর বউকে বলেঃ

-কি সন্দোর একটা ঘুম আইছিলো। দিলাতো সব মাটি কইর‌্যা। মাত্রতো আযান হইছে। নামাযের তো এখনো অনেক দেরী আছে। 

-কি কও। তাই বইল্যা কি ওঠবা না?

-উডুম না কেডা কইলো?  

-যাও। হাত মুখ ধুইয়্যা ওযু কইর‌্যা মসজিদে যাও। জমাতে নামায পর। জমাতে নামায পড়লে অনেক সোয়াব। 

বউয়ের প্যান প্যানানি শুনতে ইচ্ছে করছে না। তার চোখে মুখে এখনো ঘুমের ছোয়া লেগে আছে। সে আর দেরী করলো না। ঘর হতে বের হয়ে প্রাতঃরাশ সেরে ওযু করে মসজিদের দিকে রওনা দেয়। 

ইমাম সাহেব মুসল্লিদের বলছেনঃ আপনারা যারা সুন্নাত আদায় করেননি তারা তাড়াতাড়ি সুন্নাত পড়ে নিন। জামাতের আর মাত্র মিনিট পনের বাকী আছে। ছলেমান তাড়াতাড়ি করে সুন্নাত আদায় করে। যথারীতি ফরয নামাজ শেষ করে। মসজিদ হতে বের হতে গিয়ে দেখে - সবে মাত্র পুব আকাশে সুয্যিটা আলো ছাড়তে শুরু করছে। সে সে আলোয় নিজেকে অবোগাহন করার জন্য নদীর ধারে হাঁটতে বের হয়। নদীর পাড়ে উত্তুরি বাতাসে সে কিছুটা শীতের আবেশ পায়। কিন্ত্তু তার হাঁটতে বেশ লাগছে। 

পথে দেখা হয় সুরুজ মিয়ার সাথে। সুরুজ মিয়া পেশায় একজন বর্গাচাষী। চাষের কারণেই সে খুব ভোরে জমির ধারে যায়। সারাদিনমান কাজ করে। দুপুরে খেয়েই আবার ছোটে জমির ধারে। সন্ধ্যা নাগাদ আসে। ছলেমান একজন স্বর্ণকার। গঞ্জে তার সাদিয়া জুয়েলার্স নামক একটি স্বর্ণের দোকান আছে। সেই সুত্র ধরে সকলেই তাকে চেনে। সুরুজ মিয়া ছলেমানকে দেখে সালাম দেয়ঃ

-আসসালামু আলাইকুম ছলোমান ভাই।

-ওয়ালাইকুম আস সালাম।

-কি অবস্থা তোমার? ছলেমান জানতে চায়।

-অার অবস্থা। আছি কোন রকম। আপনের খবর কি?

-আর খবর? কেউ আর আগের মতো জিনিস পত্র বানাতে দেয় না। 

-খবর হুনছেন নি? 

-কি খবর?

-আরে ঐ পাড়ার মোতালেব ব্যাপারীর বাবা তালেব ব্যাপারী যে মারা গেছিল আজ থিক্ক্যা প্রায় ত্রিশ বচ্ছর আগে। হের লাশ নাকি বাহির হইছে। লাশের একটুও কিছু অয় নাই।

-কও কি? কেমতে বাইর অইলো?

-আরে অগো বাড়ীতো নদীর ধারেই। নদীতে ভাংগনের সুময় বাইর হইছে। হারা গেরামের বেবাকতে দেকতে গেছে।

-আরে কও কি? আর এই খবরডা আমি জানলাম না?

(চলবে)

আল হাক্কু মুরুনঃ মনা পাগলার ভাষণ

মনা পাগলা একটা করোল্লা হাতে নিয়ে বেশ চেঁচিয়ে বলছেঃ -আল হাক্কু মুরুন। আল হাক্কু মুরুন।। আল হাক্কু মুরুন।।। সত্য বড়ো তিতা। সত্য বড়ো তিতা। সত্য বড়ো তিতা।

তার হাঁক ডাক শুনে লোকজন জড়ো হতে আরম্ভ করলো। তারা এক পর্যায়ে সবাই মনাকে ঘিরে ফেললো। আর মনা সবাইকে সেই করোল্লা দেখিয়ে দেখিয়ে বলছেঃ আল হাক্কু মুরুন। সত্য বড়ো তিতা। করোল্লা তো তিতাই। সেটাকে এতো স্বরবে প্রচার প্রচারণা করার অর্থটা সাধারণ্যের কাছে কেমন যেন বোধগম্য হচ্ছে না। তারা বেশ উৎসুক্যবোধ করছে। দেখতে চাচ্ছে পাগলটা কি করে?

মনা তার স্বভাব সুলভ আচরণ করছে আর বলছেঃ আল হাক্কু মুরুন। সত্য বড়ো তিতা। যেমন করোল্লা। একথা বলেই সে করোল্লা দিব্যি চিবিয়ে খাচ্ছে আর উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে সকলের দিকে তাকাচ্ছে। একটা পাগলকে নিয়ে যে আগ্রহ সাধারণ্যের কাছে ছিল তা ধীরে ধীরে বেশ বড়ো হতে চলেছে। মনে হলো মনা পাগলা সেটাই চাইছিল। সে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললোঃ

-যে করোল্লা এত তিতা তার চাইতেও বেশি তিতা ইতিহাস। আর ইসলামের ইতিহাসতো আরো বেশি তিতা। আরো বেশি মর্মান্তিক। ইসলামের ইতিহাস রক্তাক্তের ইতিহাস। ইসলামের ইতিহাস বেদনার ইতিহাস।

একটা পাগলের মুখে ইসলামের ইতিহাস শোনার জন্য কেউ নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবে না। যারা একটু বেশি উৎসুক ধরণের তারাই থাকলো। আর যারা পাগলের ইতিহাস শোনার চেয়ে সময়ের মুল্য অনেক বেশি মনে করলো তারা কেটে পড়লো। আমি নেহায়েত গোবেচারা ধরণের। কোন কাম কাজ নেই। থাকলেও কেউ দেয় না। টোটো কোম্পানীর ম্যানেজারের চাকরিটাতো আছেই। কাজেই আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম পাগলের সেই করোল্লা মার্কা ইসলামের ইতিহাস শোনার জন্য। আমার মতো দুই চারজন লোকও সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছি মনা পাগলার সেই করোল্লা মার্কা ইতিহাস। মনা পাগলা সমানে বলেই চলেছেঃ

- আশ্চর্য ! দেড় হাজার বছর অতিক্রম হয়ে গেলো, তবু কারবালার মহাত্ম্যটাই নির্বোধ এ জাতির মাথায় ঢুকলো না। ওরা মনে করছে বছরে নির্দিষ্ট একদিন বা কয়েকদিন মর্সিয়া, মাতম, হা-হুতাশ আর ক্রন্দনের মাধ্যমে আশুরা উদযাপন করলেই বুঝি নবী-পরিবার খুশিতে গদগদ হয়ে উঠবে এবং তাতেই কারবালার সকল দায়-দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলো ।
আচ্ছা, হা-হুতাশ আর মাতম করলেই কি কারবালার প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেলো? এবং নবীবংশের এত বড় আত্মোৎসর্গ স্বার্থক হয়ে গেলো ? বোকারা বোঝে না যে, কারবালার এই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। তারপর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মোহাম্মদী ধর্মদর্শনকে পুণঃজাগরণের মাধ্যমে কারবালার প্রতিশোধ নিতে হবে । কেননা, মওলা হোসাইন (আঃ) যেটা চেয়েছিলেন, সেটাই যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা না গেলো এবং এজিদী ইসলামই যদি সমাজে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো, তাহলে মওলা হোসাইনের (আঃ) জীবন বিসর্জন দেয়ার কি মানে রইল? যদি আমরা এখনও ইয়াজিদেরই দাসত্বই করি, তাহলে কারবালায় এতগুলো জীবন বলিদানের তো কোন অর্থই রইল না। তারাও তো সেটা করলেই পারতো, যা এখন আমরা করছি !!

-বন্ধুগণ, কারবালার এ দুঃখকে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে লাগিয়ে গাদিরে খুমের সেই বেঈমানীর প্রতিশোধ নিতে হবে।

যে সকল সাহাবারা পাহাড়ের উপর থেকে পাথর নিক্ষেপে মহানবীকে মেরে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছিল, সেটারও তদন্ত করতে হবে। জানতে হবে কারা কারা এ কার্য্যটি করেছিল?

উম্মতের কপাল খাওয়া বৃহস্পতিবারের বদলা নিতে হবে। জানতে হবে ইয়াওমাল খামিস কি? কেন বৃহসপতিবার আসলেই ইবনে আব্বাস (রাঃ) আক্ষেপ করে বুক চাপড়িয়ে কাদতেন আর বলতেন ” হায় ইয়াওমাল খামিস?”

রসুলের লাশ অদাফনকৃত অবস্থায় তিন দিন পর্যন্ত কেন রেখে দেয়া হয়েছিল? সেটার জবাবদিহিতা করতে হবে। সে সময় রসুলের যে চারজন সাহাবারা ছিলেন তারা কে কোথায় কোন্ কোন্ স্থানে ছিলেন? তারা থাকতে কেন রাসুলের লাশ মোবারক অদাফনকৃত তিনদিন পর্যন্ত থাকবে? বাকী সাহাবারা কোথায় ছিলেন?

রসুলের মৃতলাশকে ফেলে রেখে বনি সাকিফায় সাহাবাদের অবৈধ নির্বাচনের বিচার চাইতে হবে। খিলাফতকে কেন্দ্র করে যে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে কে কে উপস্থিত ছিল? কার নেতৃত্বে সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল? এর উদ্দেশ্য কি ছিল? কেনই বা রাসুল সে সময় জীবদর্শায় থাকতে তার উত্তোরাধিকার নির্বাচিত করে যাননি?

মওলা আলীকে গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নেয়ার সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে। রাসুলের প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমা (আঃ) এর জামাতা আলী (আঃ) কে কেন অপমান অপদস্ত হতে হয়েছিল? কে এসবের নেতৃত্ব দিয়েছিল?

খলিফা ওমর-আবুবকর-উসমান এ তিন জনের একজনও কেন রসুলের লাশ দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন না, সেটার কৈফিয়ত চাইতে হবে।

খলিফা আবুবকর কেন নবী পরিবারের সম্পত্তি বাগে ফিদাক জোর করে কেড়ে নিয়ে নবী কন্যা মা ফাতেমার পরিবারকে না খাইয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল সেটার বিচার চাইতে হবে।

মা ফাতেমাকে পেটে লাথি মেরে গর্ভে সন্তান সহ হত্যার সেই প্রতিশোধ নিতে হবে।

ওয়ায়েছ করণীকে দান করা রসুলের জুব্বা মোবারক প্রদানে খলিফা ওমর কেন এত বছর বিলম্ব করলো- সেটার জবাবদিহিতাও করতে হবে।

সরকারী দল কর্তৃক মদীনার দশ হাজার কুমারী মেয়েদের ধর্ষণে গর্ভবতী করানোর বদলা নিতে হবে।

বিষপ্রয়োগ ও গুপ্তঘাতক দিয়ে যে সব ইমামদের হত্যা করা হয়েছে, সেটারও প্রতিশোধ নিতে হবে…!!!

সুতরাং শুধু ঘরে বসে বসে কাঁদলে আর রাস্তায় রাস্তায় হা-হুতাশ করলে চলবে না । কারবালার বেদনাকে বুকে লালন করে সমাজে হোসাইনী ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে । তবেই কারবালায় এতগুলো প্রাণের আত্মোৎসর্গ স্বার্থক হবে…!!!

আমি মনোযোগ সহকারে শুনছি সেই মনা পাগলার করোল্লা মার্কা ভাষণ। মন্ত্রমুগ্ধ ছিলাম। তাই কিছুই খেয়ালই করিনি। আশে পাশের মানুষ যে কখন সরে গেছে টেরই পাইনি। তাকিয়ে দেখি আমি আর মনা পাগলা ছাড়া আর কোথাও কেউ নেই।

মনে মনে ভাবলামঃ ইয়াজিদি ইসলাম যদি সত্যিই দুনিয়াতে এখনো জীবিত থেকেই থাকে তাহলে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর নানাজান অর্থাৎ ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) যে ইসলাম আল্লাহর তরফ হতে প্রচার করেছিলেন সেই ইসলাম কোথায় গেল? তাহলে কি ইমাম হোসাইন বিন আলী (আঃ) ইয়াজিদের সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে যে কথাটি বলেছিলেন “আলাম তাসমাও আলাইসা ফি কুম মুসলিম? আমার কথা কি শুনতে পাও না? তোমাদের মাঝে কি একটি মাত্র মুসলমানও নাই?” অথচ এজিদ সৈন্যবাহিনীতে একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদি অথবা অন্য কোনো ধর্মের লোক ছিলো না। সবাই ছিল মুসলমান। তাহলে তারা কেন তার ডাকে সাড়া দিল না? তারা কি কেবল সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান নামধারী লেবাসযুক্ত মোনাফেক ছিল?

একটা পাগলের মনের মধ্যে যে ইতিহাস খস খস করছে বিদ্যান জাহেরী লেবাসধারী মুসলমানের মধ্যে সেই বোধ কাজ করছে না। তারা সবাই সটকে পড়ছে যে যার মতো করে। পাগলের প্রলাপ কে শুনতে চায়? আমার মতো যাদের খেদে দেয়ে কোন কাজ নেই তারাই হয়তো পাগলদের ভক্ত হয়ে ভাবুকের মতো ভাবতে বসে। আমি চেয়ে রইলাম মনা পাগলার দিকে। আর মনা পাগলা আমার দিকে। সবাইকে চলে যেতে দেখে মনা আক্ষেপ করে বলছেঃ “ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ।”

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৫

লেজওয়ালা মানুষ-শেষ পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

-কিন্ত্তু জীবন ধারণের প্রয়োজনে আমাকে তো সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তাই না ?

-তাই বলে কি ঐ পশুর পথ ধরে? সালাতে তুই কি বলিস সুরা ফাতেহায়?
এহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম। মুস্তাকামাত তথা মস্তানী সাহায্য চাস। সহজ সরল সুন্দর পথে চলতে চাস। গায়রিল মাগদুবি আলাইহিম এর পথেতো চলতে চাস না। নাকি চাস?

-না তা চাই না।

-না চাইলে তোকে সিরাতুল মোস্তাকীমের পথ অনুসরণ করতে হবে।

-তা নাইলে করলাম। কিন্ত্তু লেজওয়ালা মানুষের কথা জানার জন্য তো আপনি আমাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসছিলেন। তো সেই লেজওয়ালা মানুষের কথাতো কিছুই বলছেন না?

-শোন লেজওয়ালা মানুষ চিনতে হলে তোকে তো কুরআন বুঝতে হবে। জানতে হবে। দর্শন করতে হবে। তবে তো চিনবি। দর্শন না হলে না চেনালে কিভাবে তুই চিনবি? শোন্ মানুষের জন্মবীজ যখন মাতৃজঠরে প্রবেশ করে তখন সেই বীজগুলো থাকে ব্যাঙাচির মতো লেজওয়ালা। সেগুলো সাঁতার কাটে। ভেসে বেড়ায়। সেখান থেকে সে একটি বীজ মাতৃবীজের মধ্যে প্রবেশ করে। প্রবেশ করার সাথে সাথেই তার লেজটি বিলীন হয়ে যায়। সে শুন্যের সাথে মিশে শুন্য তথা গোলাকার পিন্ডে পরিণত হয়। এরপর ধাপে ধাপে মানব আকারে পৃথিবীতে আসে। যে বীজটির কথা বলা হলো তা অনেক সাধনার পথ ধরে মানব আকার প্রাপ্ত হয়। সনাতন ধর্ম মতে চুরাশি লক্ষ যোনী ভ্রমণের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যোনী ভ্রমণ করার অর্থ হলো অধঃস্তন পথ হতে উর্ধ্ব স্তরে উত্তোরণ করা। জন্মান্তর মতবাদ প্রতিটি ধর্ম গ্রন্থের মধ্যেই উল্লেখ আছে। কোরআনে আছে প্রচ্ছন্নভাবে। কোরআনের ভাষা মাধুর্য্যে তা উদ্ধার করা সহজসাধ্য কাজ নয়। অনেক গভীর স্তরের চিন্তা ভাবনার কাজ। যেমন ধর বলা হয়েছেঃ “ফেতরাতাল্লাহিল্লাতি ফাতারান্নাসা আলায়হা” তার সেই স্বভাব বা প্রকৃতির উপর – এখানে তার সেই স্বভাব কথাটি দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত কোন কার্য যা অতীত কালে সংঘটিত হইয়াছে সেই কথাটিই পুণঃব্যক্ত করা হয়েছে এবং সেই স্বভাবেই তাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। অর্থাৎ তার কর্ম যদি সৎকার্য হয় সেটিই তাকে প্রতিদান রুপে দেয়া হবে। এজন্যই পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে “লাতাবাদিলা লিখালক্বিল্লাহ” অর্থাৎ তার কোন পরিবর্তন বা রদ নেই। অর্থাৎ যেমন কর্ম তেমন ফল। তার জন্যই সৎগুণাবলী অর্জনের উপদেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “তাখালল্লাখু বি আখলাখিল্লাহ” অর্থঃ আল্লাহর গুণে গুণাম্বিত হও। আর রাসুল বলছেনঃ ইন্নামা বুইছতু লি-উতামমিমা মা কারিমাল আখলাখ। “নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি স্বভাবের উৎকৃষ্ট গুণসমুহকে ফুটিয়ে তোলার জন্য।

যারা আল্লাহর গুণে গুণে গুণাম্বিত নয় তারা কার গুণ অর্জন করেছে? তারা নিঃসন্দেহে খারাপ গুণগুলোই অর্জন করেছে। অার অসৎগুণের কারণে তারা তাদের স্বীয়রুপে সৃষ্টি হবে। এইটাই সৃষ্টির বিধান। এর কোন ব্যত্যয় নেই( লাতাবাদিলা লিখালক্বিল্লাহ )। কারণ সৎ এবং অসৎ গুণ উভয়ই মানবের মধ্যে দেখা যায়। অসৎ গুণের কারণেই তাকে পশুতুল্য বিবেচনা করা হয়। আকারে প্রকারে মানুষ। কিন্ত্তু আচার আচরণে পশু। তার কাঠামো ফি আহসানে তাকবীম হলেও সে মুলতঃ অদৃশ্যলেজওয়ালা একটি পশুসদৃশ্য মানব। এরাই সমাজে বিশৃংখলার সৃষ্টি করে। সমাজকে কলুষিত করে। মানবতাকে হত্যা করে। তাদের অদৃশ্য লেজ থাকায় মানব সমাজে বিচরণ করা থাকা সত্ত্বেও তাদের ধরা যায় না। তাদের ধরতে হয় আচার আচরণ দেখে। কারণ তার আচার আচরণই পশুবৎতুল্য।

একটা পাগলগোছের মানুষ। যিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফেরেন। তাড়া খান কোন লেজওয়ালা মানুষের। যিনি খুঁজে ফেরেন কোন অচেনা অজানা কোন একটা কিছুকে। যিনি কাছের কোন প্রিয় মানুষকে পেলে মেলে ধরেন তার দর্শন, তার চিন্তা-চেতনা। সভ্যসমাজ যাকে আদর করে ডাকেন পাগলের প্রলাপ বলে। অথচ সেই পাগলই আজকে পরিচয় করিয়ে দিল একটা অচেনা অদৃশ্য লেজওয়ালা মানব সমাজের। কি বিচিত্র তার সৃষ্টি রহস্য।

হে জগদীশ!
এ বিশ্বে তোমার, মানুষই সৃষ্টির মাঝে সার।
আছে তার জ্ঞানের অপার ভান্ডার।

ওমর খৈয়ামের কবিতাটি পাঠ করে ভবার দিকে তাকালাম। বেলা পড়ে আসছে। নিলীমার নীল বিলীন হতে চলেছে। পাখিরাও নীড়ে ফেরতে শুরু করেছে। আমাদের ফিরতে হবে। বললামঃ

-চলুন ওঠা যাক।

ভবা তার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে চটের ছালাটি কাঁধে চড়িয়ে চলা শুরু করলো। যেতে যেতে বললোঃ

রাতি জাগেঁ তে শেখ সদা ওয়েঁ
পর রাত নু জাগন কুত্তে তেঁ থি উতহে।
রাতি ভোকন বাস না করদে
ফ্যয়র যা লারান ভিচ সুতে, তেঁ থি উতহে।
য়ার দা বুহা মুল না ছাড়-দে
পাওয়েঁ মারো সও সও জুতে, তেঁ থি উতহে।
বুল্লে শাহ উঠ য়ার মানা লে
নাই তো বাযি লে গ্যায়ে কুত্তে তেঁ থি উতহে।

শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৫

লেজওয়ালা মানুষ-তৃতীয় পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ

-আপনি এভাবে হাসছেন কেন?

-হাসির কথা বলছো। তাই হাসলাম। শোন,  তোমাকে চিড়িয়াখানায় আনছি দুটি কারণে। প্রথম কারণ হলোঃ পশু-পাখিদের আচার আচরণ প্রত্যক্ষ করার জন্য। আর দ্বিতীয় কারণ হলোঃ তাদের সাথে মানুষরুপী জীবদের তুলনা করার জন্য। কারণ  প্রতিটি জীবই স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্টের অধিকারী। তা সে মানুষ হোক আর প্রাণীই হোক। স্রষ্টার মহত্ত্ব এইখানেই। তিনি কাউকে সমান বৈশিষ্ট্য দিয়ে তৈরী করেননি। তাই পশুদের মাঝেও কম-বেশি আচার আচরণে পার্থক্য দেখা যায়। যা তুমি ইতঃপুর্বে দেখেছো। ঠিক বলছি কি-না?

-জ্বি। বানরের যে বাঁদরামি তা অন্য প্রাণীর নেই। ময়ুরের যে পেখম আছে তা অন্য পাখিদের নেই।

-কিন্ত্তু কোন পশুর মধ্যে তুমি মানবতা নামক গুণ দেখতে পাবে না। অথচ প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কমবেশি পাশবিকতা দেখতে পাবে। এর কারণ কি?

-মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। তাই। 

-আশরাফুল মাখলুকাত? আশরাফুল মাখলুকাত বলতে যা বোঝায় মানুষরপী জীব কি বোঝে যে সে আশরাফুল মাখলুকাত? সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে যে গুণাবলী অর্জন করতে হয় তাতো অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই দেখা যায় না। সেওতো আকার প্রাপ্ত মানব। তাহলে পাশবিকগুণাবলী নিয়ে সে কি করে দাবী করে যে আশরাফুল মাখলুকাত? ভালো করে লক্ষ্য করো নাই হয়তো। একটু স্বরণ করার চেষ্টা করো। আমরা যে সময় বাঘের খাঁচার সামনে গিয়েছিলাম কি দেখেছি? দেখলাম হিংস্র বাঘটিকে একটি মানুষ আহার দিচ্ছে। তার গায়ে হাত দিচ্ছে। গলায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বাঘটি আরাম পেয়ে হয়তো তার সাথে খেলায় মেতেছে। অথচ বনের ভেতর হলে তা কি সম্ভব হতো? কারণটা কি? কারণ হলো ঐ বনের হিংস্র প্রাণীটি তার হিংস্রতা ভুলে মানবের গুণাবলী অর্জন করছে। তাই সে মানুষের সাথেই খেলায় মেতে উঠেছে। সেই বাঘটিকেই যদি জংগলে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে সে টিকতে পারবে না। কারণ সে যে মানবতার গুণাবলী পেয়েছে তাতে সে শিকার করবে কি করবে না তা নিয়ে সংশয়ে পড়ে যাবে। এমনতো হতে পারে যে তার জীবনও হারাতে পারে।

একটা পাগলের মুখে যুক্তিপুর্ণ কথা শুনে থ মেরে গেলাম। আর কথাগুলো এমনভাবে বলছে যেন সে পরীক্ষা করে দেখেছে। কি অবলীলায় বলে যাচ্ছে। তর্ক করার চাইতে তার কথা শুনতে বেশ লাগছে। 
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ভবা বললোঃ

-আমি কি বলছি তা কি তুমি বুঝতে পারছো?

-জ্বি চেষ্টা করছি।

-অথচ দেখ মানবের ভেতর যে হিংস্রতা আছে তা জানা সত্ত্বেও সে মানবীয় গুণাবলী বর্জন করতে চলেছে। সে বিকারগ্রন্থতায় ভুগছে। সে পশুর জীবনকেই আধুনিকতার সংস্পর্শে এনে তা ভোগ বিলাসে মত্ত হতে চলেছে। যেখানে কোরআন বলছেঃ ফিতরাতুল্লাহি ফাতারনাসা আলাইহা-তার সেই স্বভাব বা প্রকৃতির উপরই তাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। তার দায়িত্ব ছিলঃ তাখাল্লাখু বি আখলাকিল্লাহ - আল্লাহর গুণাবলী অর্জন করা। কারণ ছিবগাতুল্লাহি ছিবগাতান আল্লাহর রংয়ে রন্ঞ্জিত হওয়া। মুল কথা হলোঃ মানবতার গুণাবলী অর্জন করা। তা না করে সে করছে উল্টা।

(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৫

লেজওয়ালা মানুষ-দ্বিতীয় পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চিড়িয়াখানার পাশেই একটা খালি জায়গায় রিক্সাটা থামলো। রিক্সা হতে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ভবাকে বললাম -চলুন আগে কিছু খেয়ে টেনে নেই। তারপর ধীরে সুস্থে যাওয়া যাবে। ভবা মাথা নেড়ে সায় দেয়ায় পাশের একটা টং দোকানে বেন্ঞ্চিতে বসতে বসতে দোকানীকে বললামঃ মামা দুইটা চা আর বিস্কুট দেও। দোকানী আমার দিকে একবার আরেকবার ভবার দিকে আড় চোখে তাকালো। ভবার পোষাক আষাক দেখে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষিত করছে। গলায় ঝুলছে একটি ছবি। থুতনিতে হাল্কা দাঁড়ি। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চুলগুলো উসকো খুসকো। আর গায়ে একটা চটের বস্তা। এককোণে তা চাদরের মতো করে মোড়ানো। লুঙ্গী কখনো ধুয়েছে বলে মনে হয় না। রংচটা হয়ে গেছে। গা হতে বিশ্রী গন্ধ আসছে। কিন্ত্তু আশ্চর্য্য হলেও সত্য যে সেটাতে ঘৃণার উদ্রেক করছে না। কেমন যেন বোটকা গন্ধ। দোকানী চা আর বিস্কুট দিল। খেয়ে শেষ করলাম। তারপর দুজনে সিগারেট ধরালাম। উর্ধ্বগগণের দিকে তাকিয়ে বেশ কায়দা করে সিগারেটটা টানছে ভবা। দেখতে বেশ লাগছে। আশে পাশের লোকগুলো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্ত্তু কেউ সাহস করে কিছু বলছে না বা জানতে চাইছে না। আমিও বেশ ভাব নিয়ে সিগারেট টানছি। সিগারেট খাওয়া শেষ করে টিকেট কাউন্টারে গেলাম। দুটা টিকেট কাটলাম। তারপর লাইন দিলাম। সামনে আমি। পেছনে ভবা। তার পেছনে অনেক মানুষজন দাঁড়িয়ে আছে। গেটের কাছে আসতেই গেটকিপার ভবাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। ধমকের সুরে বলছেঃ

-এ্যাই তুই এইখানে কি করস? বাইরো বাইরো..

ভবা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। ভড়কে গেলেও সে সাহস নিয়ে বললঃ

-টিকেট কাটছি। ট্যাকা দিছি। চিরাখানা দেখুম।

-তোর চিড়িয়াখানা দেখা লাগবো না। 

ভবাকে বের করার জন্য টানা হেঁচড়া শুরু করে দিল। লাইনটা বড়ো হওয়ায় একটা গোলযোগ সৃষ্টি হলো। লোকজন বলাবলি করছে-ওই ব্যাটা পাগল বলে কি ওর স্বাদ আহ্লাদ বলে কিছু নাই। কোন্ আইনে আছে যে পাগলরা চিড়িয়াখানায় ঢুকতে  পারবো না? ছাড় ওরে। ছাড়। ঐ বাই আপনে ঢুকেন। দেখি কোন হালায় আপনেরে আটকায়...চিৎকার চেঁচামেচিতে দাড়োয়ান বেশি সুবিধা করতে পারলো না। ভবাকে ঢুকতে দিল। যে প্রতিবাদটা আমার করার কথা সেটা করলো জনগণ...

নির্বিকার ভবা বেশ আহ্লাদিত। বেশ খোশমেজাজে আছে বলে মনে হলো। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললোঃ

-যা বলেছিলাম মনে আছেতো?

-হুম।

-তাইলে চলেন শুরু করি। কোন্ দিকটায় যাওন যায়..চলেন ঐদিকটা দিয়া শুরু করি।

ভবা দেখলো যে পুর্বদিকটায় বেশ জটলা পাকিয়ে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। ইশারায় সেই দিকটা দেখিয়ে যেতে বললো। আমি ভবার অনুসরণ করলাম কিন্ত্তু কেন সেদিকটায় যেতে চাইলো সেটা বললো না। 
একে একে ঘুরে ঘুরে বাঘ, ভাল্লুক, উল্লুক, সিংহ, হাতি, উটপাখি,ময়ুর,বানর, শিয়াল ইত্যাদি যাবতীয় প্রাণী দেখা শেষ করলো। বেলা বেশ চড়ে গেছে। সুর্যের আলোর তেজ যেন বর্ধিত হচ্ছে। শরীরে বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। ভবাকে বললামঃ

-চলুন বের হই।

-আরে যাদুঘর দেখুম না? চলেন যাদুঘরে যাই।

আমি আর কি করবো যাদুঘরে গেলাম। সেখানে মৃতপ্রাণীদের সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। প্রতিটি প্রাণীর নাম বাংলা এবং ইংরেজীতে বৈজ্ঞানিক নামসহ কোন্ দেশ হতে আনা হয়েছে, কবে মারা গেছে তার সন তারিখ উল্লেখ করা আছে। অবশেষে সব দেখা শেষ করে বের হলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটা ছুই ছুই করছে। খিদেয় পেটও পোড়াচ্ছে। কি আর করবো শেষ মেশ একটা ইটালিয়ান হোটেলে ঢুকে দুজনেই ভাত আর ডিম-ডাল দিয়ে আহার শেষ করলাম। তারপর চলে গেলাম পাশের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানে একটা গাছের নিচে বসলাম। তারপর চলে এলাম মুল আলোচনায়। ভবাকে বললামঃ

-এবার বলেন কেন আমাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসলেন? আর লেজওয়ালা মানুষতো পুরো চিড়িয়াখানা জুড়ে ঘুরে ঘুরে কোথাও দেখতে পেলাম না। এমন কি যাদুঘরেও নেই। তাহলে লেজওয়ালা মানুষ কই?

আমার এমন কথা শুনে ভবা খ্যাক খ্যাক করে এমন বিচিত্রভঙ্গীতে হাসতে লাগলো যে আমি ভবার দিকে অবাক দৃষ্টিকে তাকিয়ে রইলাম।
(চলবে)

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৫

লেজওয়ালা মানুষ-প্রথম পর্ব

ভবা পাগলা দৌড়াতে দৌড়াতে একটা গলির ভেতর ঢুকে পড়লো। তার পেছনে জনা কয়েক লোক লাঠি নিয়ে তাড়া করছে। চারদিকে একটা শোরগোল পড়ে গেল। ধর ধর শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। কিছুক্ষণ পর দেখলাম লোকগুলো দল বেঁধে আবার তাদের গন্তব্যের দিকে চলে যাচ্ছে। কিন্ত্তু ভবাকে দেখা যাচ্ছে না। একটা অজানা আশংকা নিয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখি ভবাকে দেখা যায় কি-না? চারিদিকে চোখ বোলালাম। না। তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তাহলে সে কোথায় গেল? না-কি তাকে মেরে ফেললো? আর মেরে ফেললে তো তার লাশ থাকার কথা…তাওতো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে লোকটা গেল কোথায় ? ব্যর্থ মনোরথে ফিরে যাচ্ছিলাম। যেই গলির ভেতর ঢুকবো ওম্মনি শুনলাম কে যেন ফিস ফিস করে বলছেঃ 
 
-গ্যাছে?

চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম। কিছু দেখা যায় কি-না? নাহ! কাউকে তো দেখছি না। ঠিক তক্ষুণি আবার শুনলাম সেই আওয়াজ

-গ্যাছে গা সব। ও ভাই কথা কষ না কেন? কুত্তাগুলি গ্যাছে….

খেয়াল করলাম যেখান থেকে আওয়াজটা আসছিল সেইদিকটায়। দেখলাম প্রাচীরের ওপাশ থেকে ভবা পাগলা ক্ষাণিকটা মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিল। আমার মনটা আনন্দে নেচে ওঠলো। যাক্ ভবা তাহলে এ যাত্রা বেঁচে গেল। আমি বললামঃ

-ভয় নেই। চলে আসুন। ওরা সব চলে গেছে।

আমার কথা শুনে কিছুটা আতংক নিয়ে আবারো চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে নিল লোকগুলো আশে পাশে আছে কি-না? সাবধানী চোখে তাকিয়ে ঝপাৎ করে লাফ দিয়ে প্রাচীরের ওপাশ হতে এপাশে এসে দাঁড়ালো। তারপর বললোঃ

-যাক কুত্তাগুলা যাওয়ায় কামড়ের হাত থেকে বেঁচে গেলাম।

-কুকুর দেখলেন কোথায়? ওরা তো মানুষ…

-মানুষ! ভবা বেশ অবাক হলো। 

অবাক করা দৃষ্টি নিয়ে কিছুটা ঝুঁকে আমার দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-মানুষ! তুই কি বুঝিস মানুষ কাকে বলে? হাতে লাঠি সোটা মুখে গালি আর মোটা সোটা দেহ নিয়ে বেড়ে ওঠা ওরা মানুষ? 

বার বার মানুষ মানুষ শুনতে শুনতে কানের ভেতর কোন সমস্যা হচ্ছে না-কি কে জানে? ভবা যেভাবে বলছে তাতে চারদিকে ঘুরে বেড়ানো পরিচিতমানুষগুলোকে দেখে কি মনে হয় কে-জানে? আমি আবার তাকে প্রশ্ন করলামঃ

-তাহলে ওরা কি?

-ওরা কুত্তা। পাগলা কুত্তা।

-তারা আপনাকে তাড়া করছিল কেন?

-কেন আবার। কুত্তার কি কোন অজুহাত লাগেরে ব্যাটা। সামান্য ছুতা পেলেই হলো। ব্যাস্ ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসবে তোর দিকে। তুই কি বললি না বললি সেটাকে তারা থোড়াই কেয়ার করবে। 

কথা বলতে বলতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আর আমার বড্ড জানতে ইচ্ছে করছিল – কেন ভবা পাগলা ঐ মানুষগুলোকে কুকুর বলছিল। আর ঐ মানুষগুলোই বা কেন তাকে মারতে চাইছিল? জানার আগ্রহ থেকে তাকে বললামঃ

-আপনি যদি কিছু মনে না করেন তো সমস্ত ঘটনাটা জানার আগ্রহ প্রকাশ করছি।

-কারণ জানতে চাস, না? ঠিক আছে। চল। তোকে বলি। যেহেতু তুই আমাকে ঐ কুত্তাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিস সেই সুত্র ধরেই তোকে সব বলবো। চেনাবো ল্যাজওয়ালা মানুষগুলো কে। কিন্ত্তু তার আগে আমাকে কিছু কথা দিতে দিতে হবে। 

-কি কথা?

-সেটা হলো তুই আমাকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাবি। কোন প্রশ্ন করতে পারবি না। আমি যা যা বলবো যা যা দেখতে বলবো তুই ঠিক তাই করবি। তারপর তোর কথা শুনবো। উত্তর দেব। তার আগে নয়।

-ঠিক আছে।

লেজওয়ালা মানুষগুলো দেখার আগ্রহটা জন্মে গিয়েছিল। তাই আর না করতে পারলাম না। সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলাম। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে চিড়িয়াখানা খুব বেশি দুরে নয়। রিক্সাভাড়া মাত্র বিশ/ত্রিশ টাকা। একটা রিক্সা ডেকে চিড়িয়াখানার কথা বললাম। রিক্সাওয়ালা ওঠেন বললে আমি আর ভবা পাগলা রিক্সায় ওঠে বসলাম। রিক্সা চলা শুরু করলো। ভবাকে রিক্সায় উঠতে দেখে রিক্সাওয়ালা কেমন করে যেন তাকালো আমার দিকে। সেই কৌতুহলী দৃষ্টিগুলো আরো বেড়ে চললো যখন রিক্সাটা ধীরে ধীরে চিড়িয়াখানার দিকে এগিয়ে চললো। সবাই গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাচ্ছে। আর আমি যাচ্ছি একটা পাগলের সাথে। আমার দিকে তাকিয়ে ভবা মুচকি মুচকি হাসছে। আর কৌতুহলী দৃষ্টিগুলো প্রখরতা নিয়ে আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। কেমন যেন বেক্ষাপ্যা লাগছে নিজেকে। কিন্ত্তু কিছুই করার নেই। কেননা ভবাকে কথা দিয়েছি-কোন প্রশ্ন করবো না। শুধু দেখবো। তাই দেখে যাচ্ছি আর মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে কৌতুহলী মানুষগুলোর দিকে তাকাচ্ছি। 

দেখতে দেখতে চিড়িয়াখানার কাছাকাছি চলে এলাম।

(চলবে)