পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৫

মনা পাগলার খোঁজে-দ্বিতীয় পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

মনা পাগলা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললোঃ তুই কি জানিস কোন্ কথাটি বলার জন্য আল্লামা ইকবালকে একশত আলেম কাফের ফতুয়া দিয়েছিল?

-না। আমিতো সেই রকম কিছুই জানি না।

-শোন তাহলে। আল্লাহকে লক্ষ্য করে আল্লামা ইকবাল বলেছিলঃ "আল্লাহ তুমি দয়ালু নও।" একই ধরণের কথা বাট্রেন্ড রাসেলও বলেছিলঃ গড ইজ অলমাইটি টাইরেন্ট। ঈশ্বর হচ্ছেন জালিমের বাদশাহ। কিন্ত্তু মজার ব্যাপার কি জানিস? দুইজনের দৃষ্টি ভিন্ন। দুইজনের দর্শন ভিন্ন। এই উক্তি ঈশ্বর বা আল্লাহকে কে করতে পারে? সাধারণের দৃষ্টিতে অনেকেই বলবে-কাফিররা। অনেকেই বলবে মুরতাদরা। কিংবা যারা ধর্ম সর্ম্পকে অজ্ঞ তারাই একথা বলতে পারে। এই উক্তিটি যদি বিশ্লেষণ করতে হয়-তাহলে তাদের দর্শন তথা তাদের চিন্তা-ধারা সর্ম্পকে জানতে হবে আগে। কিংবা তাদের নিকট এর ব্যাখ্যা চাইতে হবে। কেন তারা এ ধরণের উক্তিটি করেছিল? কিন্ত্তু তাদেরকে কোন সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। 
মনার এ কথা শুনে হয়তো অনেকেই ভুল বুঝতে পারে। যেহেতু তারা মনা পাগলাকে চেনে না। তার সাথে কথা বলেনি। এমনকি তার দর্শনও জানে না। আমি এদিক থেকে লাকি বলতে পারি। অামি মনাকে চিনি। তার সাথে কথা হয়েছে। সে মাঝে মধ্যেই আমার সাথে কথা বলতো। আমিও তার সাথে কথা বলে মজা পেতাম। তাই তার সাথে দেখা করার আরেকবার স্বাদ হলো। 

হাঁটতে হাঁটতে কখন যে হাইকোর্ট মাজারের মুল গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি তা খেয়ালই করিনি। মাজারের মুল গেটে সামনের দুধারে সারি করে অনেকেই খয়রাত করছে। কেউ বা বেশ ভুষায় পরিবর্তন এনে নিজেকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। আমি তাদের মধ্যে মনাকে খুঁজলাম। নাহ! মনা সেখানে নেই। কোথায় থাকতে পারে মনা? হয়তো ভিতরেই থাকতে পারে। আমি মৃদু পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মাজারের দিকে রওনা হলাম। সেখানেও সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে ফকির মিসকিনরা। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে মনাকে খোজার চেষ্টা করলাম। নাহ্! সেখানেও নেই।
আমি ওযুখানা হতে ওযু করে মাজারের ভেতর প্রবেশ করলাম। মাজারের মুল ফটকের সামনে লেখাঃ বাংলা ওলি। হযরত খাজা শরফু উদ্দিন চিশতী (রহঃ)।

অনেকেরই হয়তো জানা নেই হযরত খাজা শরফ উদ্দিন চিশতী (রহঃ) ছিলেন সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর মেজ ছেলে। বিভিন্ন সুত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে সুনিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, ওলী--বাংলা হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতী (রহঃ) সুলতানুল হিন্দ খাজা গরীব উন নেওয়াজ হযরত খাজা মইনুদ্দিন হাসান চিশতী (রহঃ) এর ২য় পুত্র ছিলেন হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর ২য় স্ত্রী হযরত বিবি ইসমত - এর গর্ভে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর ঔরসে ৬২৮ হিজরী মোতাবেক ১২৩০ খৃষ্টাব্দে আজমীর শরীফে জন্মগ্রহণ করেন।তার ওফাত দিবস ৯৯৮ হিজরি।

বিগত ৭৫০ বৎসর ব্যাপী লিখিত বিভিন্ন মালফুজাত, তাজকিরাত, মাকতুবাদ বিশেষ করে হযরত খাজা গরীব উন নেওয়াজ মইনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর দ্বিতীয় প্রধান খলিফা হযরত হামিদউদ্দিন সাভালী (রহঃ) কর্তৃক ১২৫০ খ্রীষ্টা্ব্দ রচিত "সুরুবাস সুদুর" - তথ্য প্রদত্ত হয়েছে হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহঃ) রচিত "ফাতেয়াইদুল ফুয়াদ" এবং তার খলিফা হযরত নাসিরউদ্দিন চেরাগী রচিত "খায়রুল মন্ঞ্জিলপুস্তকের বর্ণনায় এই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।ওলী--বাংলার পিতৃপ্রদত্ত প্রকৃত নাম ছিল খাজা হুসামউদ্দিন আবু সালেহ চিশতী (রহঃ) এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত খাজা ফখরউদ্দিন আবুল খায়ের চিশতী (রহঃ) হযরত খাজা গরীব উন নেওয়াজ (রহঃ) এর ১ম স্ত্রী বিবি আমাতুল্লাহর গর্ভজাত একই মাতার গর্ভে তার একমাত্র ভগ্নী হযরত বিবি হাফেজা জামাল (রহঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তার কনিষ্ঠভ্রাতা হযরত খাজা গিয়াস উদ্দিন আবু সাইয়েদ চিশতী (রহঃ) তার গর্ভধারিণী মাতা বিবি ইসমত এর গর্ভজাত ছিলেন। পিতৃকুলে এই ওলী মহান ওলী সাইয়েদ ছিলেন এবং বংশধারা পিতা হযরত খাজা গরীব উন নেওয়াজ (রহঃ) মাধ্যমে রাসুল কারীম (সাঃ) এর রক্তধারার সাথে সংমিশ্রিত ছিল।তিনি হযরত শাহ্ জালাল(রহঃ)-এর সাথে ই বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচার করার উদ্দেশ্যে আগমণ করেছিলেন। হযরত শাহ্ জালাল(রহঃ)সুলতানের সেনাবাহিনীর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের বাহিনীর সাথে হুশামউদ্দিন শাহ্ জালাল (রহঃ) এর ৩৬০ জন ওলী দরবেশ হিজরী ৭০১ মোতাবেক ১৩০৩ খ্রীষ্টাব্দে বিজয়ীর বেশে শ্রীহট্টে প্রবেশ করেন। অতঃপর শ্রীহট্ট বা সিলেট হযরত শাহ্ জালাল (রহঃ) এর সাথে তিনি বৎসর অবস্থান করেন তার সহবতে ফায়েজ বরকত লাভ করেন। এই সময় খাজা গরীব উন নাওয়াজ (রহঃ) এর পুত্র হিসাবে পরিচিতি প্রকাশ পেলে হযরত শাহ্ জালাল (রহঃ) তাঁর নাম রাখলেন শরফউদ্দিন যার আরবী অর্থ হচ্ছে-বদলানো বা পাল্টানো। সেই থেকে হযরত হুসাম উদ্দিন চিশতী (রহঃ) হযরত খাজা শরফউদ্দিন চিশতী (রহঃ) নামে পরিচিত হন। 
আমি মাজারে গিয়ে তাজিমী সিজদাহ করে ফাতেহা পাঠ করলাম। অতঃপর মোনাজাত করে মাজার হতে বের হয়ে এলাম। কিন্ত্তু কি করা যায়? মি যাকে খুজছি তাকেতো পা্ছি না। কোথায় গেলে পাওয়া যেতে পারে? চিন্তা করলাম হয়তো হযরত খাজা ইয়ামিন(রহঃ)ওনার ওখানেই থাকতে পারে। পীর ইয়ামিনীকে বলা গোলাপ শাহ। আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম। গোলাপ শাহ (রহঃ) এর মাজারের দিকে।পাগল ছাগলরাই মাজারকে তাদের প্রাণকেন্দ্র মনে করে। তারা দিনকে দিন মাজারেই পড়ে থাকে। মনা পাগলা সেই ধরণেরেই জাতের পাগল। কাজেই তাকে পেতে হলে বিভিন্ন মাজারে দরগাহতে হানা দিতে হবে। তাকে যে আমার ভীষণ দরকার 
(চলবে)

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

মনা পাগলার খোঁজে - প্রথম পর্ব

মনা পাগলার সাথে কবে দেখা হয়েছিল সেই দিনক্ষণ মনে নেই। মনে আছে কেবল দেখা হবার স্মৃতিটুকু। সেই স্মৃতিটুকু হাতড়ে বেড়াবার কোন মানে হয় না। কিন্ত্তু মনের মাঝে খস খস করছে সেই স্মৃতিটুকু। বার বার ফিরে এসে কেবল মনের জানালায় উঁকি দিচ্ছে। তাইতো তার সাথে দেখা করার জন্য মনটা উতালা হয়ে আছে। সবাই তার প্রেমিকার সাথে দেখা করার জন্য পাগল থাকে। আর আমি উতালা হয়ে আছি একটি পাগলের সাথে দেখা করার জন্য। মনা যে আমাকে কি যাদু করেছে কে জানে?

আমি আর দেরি করলাম না। ঘর হতে বের হয়ে এলাম। কিন্ত্তু মনাকে কোথায় খুঁজবো? কোথায় পাওয়া যাবে তাকে? সে কোথায় থাকে তাতো জানি না। আমি হাঁটতে হাঁটতে হাইকোর্ট মাজারের দিকে গেলাম। মাজার হচ্ছে পাগলদের আস্তানা। বলা চলে সবধরণের পাগলদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় মাজারে। এখানে নানান জাতের মানুষ ঘুরে বেড়ায়। নানা ধান্দায় থাকে মানুষ সব। ভাল-মন্দ মিলিয়েই সেই মিলন মেলা হলো মাজার কেন্দ্রিক। যার মাজার সে কি জানে তাকে কেন্দ্র করে কতো জাত বেজাতের মানুষজন নানা ধান্দায় ঘুরে বেড়ায়? মনার কাছে শুনেছি মাজার তারই হয় যার ভেতর অন্তরের মানুষ থাকে। সেই অন্তরের মানুষকে যারা জাগাতে পারে তারা মরেও অমর হয় এই ধরাতে। তারা নরাধম মানুষদের মাঝেই স্বশরীরে বিরাজ করে। কিভাবে সম্ভব কে জানে? মনাকে বলতেই সে বললঃ

করিলে স্বরণ হবে না মরণ
যদি সে থাকে মরু সাহারায়।।*

মনাকে জিগ্যেস করেছিলাম এ ব্যাপারে। আপনি বলেছেনঃ 

-"অলি আউলিয়ারা মরে না। তাঁরা  জীবিত। এর কি কোন দলিল কোরআনে আছে?" 

মনা হাসতে হাসতে জবাব দিল

-আছে মানে? পুরা কোরআনইতো সেই শিক্ষা দিবার জন্য নাজিল হয়েছে। মানবজাতি তা ভুলে বসে আছে। কোরআনের মুল শিক্ষা হলোঃ 

"অসতো মা সদগয়মঃ
তমস্য মা জ্যোতিগয়মঃ
মৃতং মা অমৃত গয়মঃ

অর্থঃ" হে দয়াময় প্রভু! তুমি আমাকে অসৎ হতে সত্যের দিকে নিয়ে যাও। অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে আলোর দিকে ধাবিত করো। মৃত থেকে অমৃতের দিকে নিয়ে যাও।

-কিন্ত্তু এটাতো কোরআনের কোন আয়াত নয়। আমি চাচ্ছি কোরআন কি বলে সেটা জানতে? 

আমার কথা শুনে মনা বিরক্ত হয়ে বলেছিলঃ

-আরে গাধা শোন। সুরা বাকারার ১৫৪নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ[وَلَا تَقُولُوا لِمَن يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِن لَّا تَشْعُرُونَ [٢:١٥٤] "ওয়ালাতাকুলু লিমাইয়াখতালু ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াতু বাল আহ্‌হিয়া। ওয়ালাকিল্লা তাশউরুন।" অর্থাৎ আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত। কিন্ত্তু তোমরা তা বুঝ না। সুরা আলে-ইমরানের ১৬৯ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ [وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ [٣:١٦٩] "ওয়ালা-তাসাবান্নাল্লাযিনা কুতিলু ফি সাবিলিল্লা-হি আমওয়া-তা বাল আহ্ইয়াউন ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন।" অর্থঃ আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।" সুরা ইউনুসের ৬২-৬৪নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ[أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ [١٠:٦٢] আলা ইন্না অলিআউলিয়াহে লা খাওফুন আলাইহিম। অর্থঃ মনে রেখো যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ[١٠:٦٣] আল্লাযিনা আমানু ওয়া কা-নু ইয়াত্তাকুন। অর্থঃ যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে। لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ [١٠:٦٤] লাহুমুল বুশরা-ফিল হায়া-তিত দুননিয়া ওয়াফিল আ-খিরাতি; লা -তাবদিলা লিকালিমাতিল লা-হি;যা-লিকাহুওয়াল ফাওযুল আযিম। অর্থঃ তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহর কথার কখনো হের-ফের হয় না। এটাই হল মহা সফলতা।

-আল্লাহর রাস্তা কোন্ টা? মনা আমাকে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল। 

-আমার জানা নেই। আপনিই বলুন। কোন্ টি আল্লাহর রাস্তা।

-মনা হেসে জবাব দিয়েছিলঃ যে রাস্তায় গেলে আল্লাহকে পাওয়া যায় সেই রাস্তাটাই হচ্ছে আল্লাহর রাস্তা। যখন কেউ সেই রাস্তার দিকে হাঁটা শুরু করে তখন সে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হয়। হওয়াটাইতো স্বাভাবিক। যার জীবনে উত্থান-পতন নেই তার জীবনের মানে কোথায়? মনে উদয়-বিলয় না ঘটলে সেটা কিসের মন? তুই কি আল্লামা ইকবালের নাম শুনেছিস? যাকে একশো মুফতি কাফের ফতুয়া দিয়েছিল?

-হ্যাঁ শুনেছি। কিন্ত্তু বিশেষ কিছু তার সম্পর্কে জানি না।

-শোন্ আল্লামা ইকবাল তার এক শিকোয়ায় বলেছিলঃ

"তেরে যমিরপর যবতক না হো নুযুলে কিতাব
শেরা কে শাহে রাজি না সাহেবে কাশশাফ।"

যতক্ষণ তোমার অন্তরে কেতাব নাজিল না হয় ততক্ষণ পযর্ন্ত বিখ্যাত তফসীরকার আল্লামা রাজিই হোন আর আল্লামা যামাকশারীই হোন কেউ এর মর্মগ্রন্থি খুলতে পারবে না। অন্য এক জবাবে আল্লামা ইকবাল বলেছিলঃ "কি হ্যাকছে ফেরেস্তাউনে ইকবালকো গামরাজি আদমকো শিখাতাহে আদাবে খোদাবান্দি।" 
(চলবে)
[*সুত্রঃ হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী কর্তৃক রচিত চিশতী উদ্যান হতে সংকলিত]

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

সোনার মানুষ - শেষ পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

বিরতির পর রহমান সাহেব সলোমানের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

-আমার কথা বুঝতে আপনার কোন কষ্ট হচ্ছে না-তো?

সলোমান হাসি মাখা মুখ নিয়ে বললোঃ

-না তেমুন কষ্ট হয় না। তয় আপনে যে কোরানের আয়াত দিয়া বুঝাইতাছেন হেইডা আমার জানা নাই।

-সমস্যা নাই। আপনি কোরআন হতে দেখে নিয়েন। তো যা বলছিলাম
রহমান সাহেব আবারো শুরু করলেন

দ্যাখেন আল্লাহ পাক সৃষ্টির বিকাশ ঘটিয়েছেন নুরে মুহম্মদী দ্বারা। এই নুরে মুহম্মদীর মধ্যে রুহ প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে। সাধনা দ্বারা নুরে মুহম্মদীর মধ্যে তার জাগরণ ঘটাতে হয়। রুহ যখন সাধক নফসের মধ্যে জাগ্রত হয় তখন তা স্বমুর্তিতে রুপ ধারণ করে সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। এই রুহকে দেখার মানেই হলো আত্মদর্শন লাভ করা। তথা মান আরাফা রাব্বাহু ফাক্কাদ আরাফা রাব্বাহু। তার মানে নিজেকে নিজে দেখা। নিজেকে নিজে চেনা। এর কোন ধ্বংস বা বিনাশ নেই। এটি অপরিবর্তিত তথা স্বয়ং সম্পুর্ণরুপ ।
সুরা মরিয়মের ১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ "ফাততাখাজাত ( সুতরাং তিনি [মরিয়ম] গ্রহণ করিলেন) মিন দুনিহিম (তাহাদের হইতে) হিজাবান (পর্দা) ফা আরসালনা (সুতরাং আমরা [আল্লাহ] পাঠাইলাম) ইলাইহা (তাহার দিকে) রুহানা (আমাদের [আল্লাহর]রুহ) ফাতামাসসালা (সুতরাং উহা প্রকাশিত হইল) লাহা (তাহার জন) বাশারান (বাশার[মানুষ]) সাউইইয়ান (পরিপুর্ণ)। অর্থাৎ এই আয়াতে বলা হলোঃ সুতরাং তিনি(মরিয়ম) পর্দা গ্রহণ করিলেন তাহাদের হইতে, সুতরাং আমরা (আল্লাহ) পাঠাইলাম তাহার দিকে আমাদের (আল্লাহ) রুহ। সুতরাং উহা প্রকাশিত হইল তাহার জন্য পরিপুর্ণ বাশার(মানুষ)। 
এছাড়া সুরা আননাহল আয়াত নং ১০২ তে বলা হয়েছেঃ কুল(বলুন) নাজজালাহু (তিনিই নাজিল করেন) রুহুল কুদুসি (রুহুল কুদ্দুস) মির(হইতে) রাববিকা (তোমার রব) বিল হাককি(সত্যসহ) লিইউসাববিতাল(প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য) আললাজিনা(যাহারা) আমানু(ইমান আনিয়াছে) ওয়া(এবং) হুদাও(হেদায়েত) ওয়া(এবং) বুশরা(সুসংবাদ)লিল(জন্য) মুসলিমিনা(মুসলমা[আত্মসমর্পণকারী]দের)। অর্থঃ তিনিই নাজেল করেন রুহুল কুদ্দুস তোমার রব হইতে সত্যসহ প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য যাহারা ইমান আনিয়াছে এবং হেদায়েত এবং সুসংবাদ মুসলমানদের[আত্মসমর্পণকারী]জন্য। এই আয়াতে প্রথমেই বলা হয়েছে রুহুল কুদ্দুস তিনিই নাজেল করেন তোমার রব হইতে। 
খেয়াল করুন, এখানে 'মিররাব্বিকুম' তথা তোমাদের রব হইতে বলা হয় নি বরং নিছক তোমার রব হইতে রুহুল কু্দ্দুস নাজেল করা হয়। তারপরেই বলা হয়েছেঃ সত্যসহ এবং তারপরে বলা হয়েছেঃ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য নাজেল করা হয়? উত্তরটি হলো যারা ইমান এনেছে এবং হেদায়েত এবং যারা মুসলমান (আত্মসমর্পণকারী) তাদের জন্য । এই বিষয়টি একটি বিরাট সুসংবাদ। এই রুহুল কুদ্দুস যারা মুসলমান এবং ইমান ও হেদায়েত লাভ করেছেন তাদের জন্য বিরাট একটি সুসংবাদ।

তাহলে সোলেমান ভাই এইবার আমরা পুর্বের কথায় ফিরে যাই।

খাঁটি স্বর্ণের কথা বলছিলাম। সেই খাঁটি স্বর্ণ হলো এই রুহুল কুদ্দুস যা একটি পরিপুর্ণ বাশার রুপ ধারণ করে। এইটিকেই বলা হয় সোনার মানুষ। মনের মানুষ। মানুষ রতন।  তো সেই স্বর্ণটির মধ্যে খাদ তথা দুনিয়াবী চিন্তা-ধারা কামনা-বাসনার লোভ মোহ মায়া ইত্যাদি মেশানো হয়, তখন তা আর তার স্বরুপটি ধরে রাখতে না পেরে আত্মার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। যখন মৃত্যু নামক বিষয়টি তথা সোহাগা মেশানো হয় এবং এসিডে পোড়ানো হয় তথা মাটিতে বা কবরে শোয়ানো হয় তখনই তার এসিড টেষ্ট হয়। সে যদি খাঁটি হয় তাহলে তার দেহ কখনো মাটি ধ্বংস করতে পারে না। কারণ " ইন্নাল্লাহা হারামা আলাল আরদে আরশাদুল আম্বিয়া "।

- তো সলেমান ভাই কি বুঝলেন?

সলেমান রহমান ভাইয়ের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেল। সে মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো-জীবনে কতো স্বর্ণ গলিয়ে অলংকার তৈরী করেছি। অলংকার ভেংগে স্বর্ণ বের করেছি। কিন্ত্তু কখনো এভাবে চিন্তা করিনি। মৃত্যু নামক এই বিষয়টিকে কেউ এড়িয়ে যেয়ে পারে না। সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্ত্তু তারপরও আমরা অচেতন। কতো পাপ করেছি....চিন্তা করতে করতে সলেমানের দুচোখ জলে ভিজে এল।

রহমান ভাই লক্ষ্য করলেন-সলেমানের চোখ দুটো ছলছল করছে। তিনি কিছু বললেন না। তিনি কেবল চিন্তা করতে লাগলেন - আরো কিছু বলার ছিল। কিন্ত্তু সলেমানের কথা চিন্তা করে তা বাদ দিলেন। কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক প্রমাণতো আল্লাহ পাক নিজেই দু'চারটা করে নজির দেখান। যে লোকটির কথা বলা হলো - তার নজিরতো পুরো গ্রামের মানুষ দেখেছে। তারাই বিচার বিবেচনা করুক। চিন্তা ভাবনা করুক। কোন্ টা সত্য কোন্ টা মিথ্যা...

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

সোনার মানুষ-দশম পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

সুফী সাহেব চলে যেতেই রহমান ভাই সোলেমানের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

-ভাই আপনি কি করেন?

-আমি একজন স্বর্ণকার। সোলেমান বললো।

-তাহলে তো ভালোই হলো। আপনাকে তাহলে স্বর্ণ দিয়েই বুঝাই। পৃথিবীর মধ্যে যতগুলো ধাতু আছে তার মধ্যে স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং একটি মুল্যবান ধাতু। তো এই ধাতু দিয়ে যখন কোন অলংকার তৈরী করা হয় তখন তার সাথে খাদ মিশানো হয়। তারপর অলংকার তৈরী করা হয়। নিখাদ ধাতু দিয়ে অলংকার তৈরী হয় না। তাইতো?

-জি।

-কোন তৈরী করা অলংকার যখন ভেংগে চুরে আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয় তখন প্রথমে কি করেন? স্বর্ণটিকে সোহাগা দিয়ে একটি মাটির পাত্রে রাখেন। তারপর সেই পাত্রটিকে আগুন দিয়ে জ্বাল দেয়া হয়। একসময় স্বর্ণটি গলে একটি খন্ডে পরিণত হয়। তখনও কিন্ত্তু স্বর্ণটি খাটি বা নিখাদ নয়। তাইতো?

-জ্বি।

-এরপর সেই স্বর্ণটিকে একোয়া রিজিয়া বা এসিডে চুবিয়ে রাখা হয়। কেন? স্বর্ণের মধ্যে যে খাদ আছে তা এসিড ধ্বংস করে ফেলে। ফলে একপর্যায়ে সেই স্বর্ণটি হয়ে যায় নিখাদ স্বর্ণ। এরমধ্যে আর কোন খাদ থাকে না। আর এসিডেরও কোন ক্ষমতা থাকে না সেটিকে ধ্বংস করার। তাইতো?

-জ্বি।

এবার আসি আমাদের আলোচনায়। পৃথিবীর মধ্যে যতপ্রকার জীব আছে তার মধ্যে মানব হচ্ছে আল্লাহর বহিঃপ্রকাশের সবোর্ত্তম মাধ্যম। সুরা তীন আয়াত নং-৪ এ বলা হয়েছেঃ "লাকাদ খালাকনাল ইনসানা ফি আহসানে তাকবীম" অর্থঃ
আমরা মানুষকে গঠন করিয়াছি সর্বোত্তম সাংগঠনিক পরিকল্পনা অনুসারে। আল্লাহ পাক এই মানবের মধ্যে নিজের একটি অংশ খুবই সুক্ষ্ম আকারে দিয়ে দিয়েছেন। সেটি হলো রুহ। যা এই নশ্বর পৃথিবীতে সৃষ্ট নয়। সমগ্র জগতই স্বয়ং আল্লাহপাকের সৃষ্ট হলেও তার মুল অংশ যা চিৎপরমাণু নামে পরিচিত, যাকে বলা হয় রুহ, তার অবস্থান হচ্ছে প্রাণে। প্রাণ ব্যতীত কোন প্রাণী নেই। এই প্রাণের স্পন্দন অনুভুত হয় হৃদপিন্ডে। যাকে বলা হয় কলব। এই কলবের মধ্যে ছুদুর নামক একটি মোকামের উল্লেখ আছে। যা থেকে ওয়াস ওয়াসা অর্থাৎ কুমন্ত্রণা বা খারাপ কাজের আদেশ দেয়া হয়। সুরা নাসে বলা হয়েছেঃ মিন শারিল্লিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস। আবার অন্যত্র বলা হয়েছেঃ ইন্নামাল নাফসুল আম্মারা বিসসুয়ে। নিশ্চয়ই নফসে আম্মারা খারাপ আদেশ কলনেওয়ালা। তার মানে যে আত্মা কলুষিত সে আত্মাকে বলা হয় নাফসুল আম্মারা। নাফস হচ্ছে দেহ। নফসকে আম্মারা, লাউয়ামা এবং মুৎমায়িন্না এই তিনভাগে ভাগ করা যায় এবং এই নফস পন্ঞ্চভুতে তৈরী। এই নফস বা দেহ সংগঠনের তিনটি স্তর আছে। বহিঃস্তর বা দেহের বাহ্যিক অবয়ব। মধ্যঃস্তর বা সুক্ষ্ম দেহ অর্থাৎ প্রানময় শরীর। অন্তঃস্তর বা সুক্ষাতিসুক্ষ স্তর বা সুক্ষ্মদেহ বা জ্যোতিদেহ। এই জ্যোতিদেহই হচ্ছে রুহ। যা খালি চোখে দেখা যায় না। রুহ সর্ম্পকে জানতে চাওয়া হলে নবীপাক (সাঃ) মারফত আল্লাহ পাক বলেছেন পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতেঃ “কুল্লির রুহ মিনআমরি রাব্বি”। অর্থাৎ রুহ হচ্ছে আল্লাহ পাকের হুকুম। অন্যত্র বলা হয়েছেঃ ওয়া নাফাখতু ফিহে মেররুহি”। এর কোন ধ্বংস বা বিনাশ নাই। যেহেতু সে দেহে অবস্থান করে সেহেতু পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা জানি পদার্থের তিনটি গুণাবলী যথাঃ ওজন, অবস্থান, আকার এবং অায়তন আছে। বাতাসের আকার ব্যতীত অন্যান্য গুণাবলী থাকার কারণে তা একটি পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত। যেমন খালি বেলুনে বাতাস ভর্তি করে ওজন নিলে ঐ বেলুনে বাতাসের কত ওজন তা পরিমাপ করা যায়। বিজ্ঞানীরা এই পদার্থ সর্ম্পকে ব্যাপক গবেষণা করে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, পদার্থ বিনষ্ট কিংবা সৃষ্টি হতে পারে না তবে একরুপ হতে অন্য রুপে রুপান্তর হতে পারে। বস্ত্তুর অবিনাশিতাবাদ সুত্রে বলা হয়েছেঃ Matter can not be destroyed, can not be created but can shaped from one to another. একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝে নেয়া যাক। আমরা জানি পানি একটি তরল পদার্থ। পানিকে উত্তপ্ত করলে তা বাষ্পে পরিণত হয়। পানির এই অবস্থা হচ্ছে বায়বীয় অবস্থা। একইভাবে তরল পানিকে কম তাপমাত্রায় রাখলে তা বরফ হয়ে যায়। বরফ হচ্ছে কঠিন পদার্থ। একই পানির তিনটি অবস্থা থাকায় কোনটার বিনাশ সম্ভব হচ্ছে না বরং একটি থেকে অন্যটির অহরহ রুপান্তর হচ্ছে।এ পর্যায়ে রহমান সাহেব একটু বিরতি দিলেন।
(চলবে)

বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৫

সোনার মানুষ - নবম পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)
এবার আসি আল্লাহর আরশ সর্ম্পকে। 
আল্লাহর পবিত্রতার বিকাশ মানুষ এবং জিনের মন ছাড়া সমগ্র সৃষ্টিতে প্রাকৃতিক নিয়মেই চলছে। এ সকল সৃষ্টি হলো আল্লাহর কুরসী। এর মধ্যে আল্লাহর পবিত্রতা তাঁর রচিত বিধান অনুযায়ী আপনা আপনি প্রকাশিত হচ্ছে। আল্লাহর আদেশ নির্দেশ যে মনের মধ্যে পরিপুর্ণভাবে কার্যকরী হয় সেই মনকে আরশ বলে। মানুষ এবং জিনের মন যখন তসবীহ করতে সক্ষম হয় তখনই তসবীহ হামদ হয়ে যায়। এবং সেই মন বা নফস আরশে পরিণত হয়ে যায়। আরশের মধ্যে আল্লাহর আদেশ, নির্দেশ পুর্ণভাবে কার্যকরী থাকে। আরশ আল্লাহর কর্তৃত্ব।

তাহলে " কুলুবুল মোমিনিনা আরশু আল্লাহ " বলতে আমরা যা বুঝলাম তাহলোঃ কোন আমানু যখন কোরআনের আদেশ নির্দেশ অনুযায়ী আমল করতে থাকেন তখন সেই আমানু মোমিন হয়ে যান। আর সেই মোমিনের কলবেই আল্লাহর আরশ। তাই মোমিন আল্লাহর আদেশের ব্যতিক্রম কাজ আর কখনো করেন না। অবিরাম সালাত প্রক্রিয়ায় সংযোগ থেকে উদয়-বিলয়ের মাধ্যমে মন-মস্তিষ্কে আগত ধর্মরাশি সমুহকে ভেংগে চুরে ফেললে লা মোকাম তৈরী হয়। লা মোকামকেই মোকামে মাহমুদা বলা হয়। এটি একটি উচ্চস্তরের মোকাম। এই শুন্য মোকামে পৌঁছা প্রতিটি জীবের কর্তব্য। কোরআন সেই আদেশই দিতেছে। কিন্ত্তু বস্ত্তু মোহে নিমজ্জিত কলুষিত নফস সেই মোকামে পৌঁছাতে বাঁধা দেয়। তাই সেই বাঁধাকে অতিক্রম করার জন্য কোরআন আদেশ দিচ্ছেঃ " ইয়া আয়্যুহাললাযিনা আমানুত্তাকুল্লাহা ইয়াবতাগু ইলাহিল ওসিলাতা ওয়া জাহিদু ফি সাবিলিল্লাহি লা আল্লাকুম তুফলিহুন।" কারণ মান হাদি আল্লাহু ফা হুয়াল মুহতাদি ওয়ামাইইয়ুদ দলিল ফালান তাজিদালাহু ওয়ালিয়াম মুর্শিদা [সুরা কাহাফ]। সেই মুর্শিদের আদেশ নির্দেশ মেনে চললে আমানু মোমিন হয়ে যান এবং তার জাহেরী জিন্দেগী অবসানের পর তিনি লা মউতের অধিকারী হয়ে যায়। মোমিনের নফসকেই নফসে মুৎমাইন্না বলা হয়। নফসের মধ্যে রুহ প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে। সালাতের মাধ্যমে সেই রুহ যখন জাগ্রত হয় তখন তাকে হুর বলে।  হুর দর্শনই আত্মদর্শন। সেই নফসকে লক্ষ্য করে কোরআনে সুরা ফজরে বলা হয়েছেঃ "ইয়া আইয়্যুহাতুহান্নাফসুল মুতমাইন্না, ইরজিয়ী ইলা রাব্বিকি রাদ্বিইয়্যাতাম্মারদিয়্যা, ফাদ্বখুলী ফী ঈবাদী ওয়াদখুলী জান্নাতি [সুরা ফজর, আয়াতঃ২৭-২৯]।"

এই পর্যন্ত বলে সুফী সাহেব একটু বিরতি দিলেন। তিনি তাকালেন উপস্থিত সকলের দিকে। কেউ কোন কথা বলছে না। কেবল ছলেমান মাথা নিচু করে বসে আছে। মনে হচ্ছে সে ঝিমুচ্ছে। ঝিমানেরই কথা। তিনি যে দার্শনিক আলাপচারিতা করছেন তা বোঝার মতো কোন মানুষ সেখানে ছিল বলে মনে হয় না। সুফী সাহেব মনে মনে ভীষণ লজ্জা পেলেন।  তিনি প্রায়ই ভুলে গেছেন সেই কথাটি। "কাল্লিমান নাসা আলা উকুলিহিম"- যে যতটুকু বোঝে তার সাথে ততটুকু আলাপচারিতা কর। তিনি একটু ঝেড়ে কাশলেন। তার কাশি শুনে ছলোমান মাথা উচু করলো। তিনি তাকালেন সুফী সাহেবের দিকে। সুফী সাহেব জিগ্যেস করলেনঃ-

- কি বলেছি তুমি বুঝতে পেরেছো?

-হুজুর, আমরা কি ওমন শক্ত কতা বুঝি? আমাগো তো হেই ক্ষেমতা নাই যে আপনের কতা বুঝতে পারুম?

-ওহ! সুফী সাহেব তার পাশে বসা রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন

-রহমান তুমি ছলেমানকে ওর বিষয়টি ভালোভাবে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দাও।

এ কথা বলেই সুফী সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। এশার আযান হচ্ছে। লোকজনের বেশ উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আর দেরী করলেন না। তিনি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি উঠে দাঁড়াতেই সকলে সমভাবে উঠে দাঁড়ালো। কবির তাকে রুম থেকে বাহিরে খানকাহ শরীফের দিকে নিয়ে গেল। ছলেমান আর রহমান সাহেব এবং হাতে গোনা দু'চারজন ছাড়া আর কোন লোক সেখানে থাকলো না। বাকীরা সবাই সুফী সাহেবের সাথে খানকাহ্ শরীফের দিকে চলে গেল।
(চলবে)

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৫

সোনার মানুষ-অষ্টম পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর) 

এরপর আসি আহাদ আল্লাহ প্রসংগে।  

আহাদ আল্লাহঃ আল্লাহ্‌র প্রকাশিত রূপের মধ্যে এটি নিম্নমানের দুর্বল স্তর। ‘আহাদ’ শব্দটি মূলতই বহুবচন। যেমন ইংরেজি শব্দ ‘আর্মি’ তেমনই আহাদ শব্দটিও। একজনকে নিয়ে ‘আর্মি’ হয় না। ‘আহাদ’ শব্দটি অর্থ এক বললে ভুল হবে। এর অর্থ একক বলা-ই উত্তম। এককের সংজ্ঞা এমনভাবে দেয়া যেতে পরে যে, যে-বহুর সমষ্টি এক মূলের সহিত যুক্ত তাই একক। এই দৃশ্যমান জগতে জীব, জড় ও শক্তিরূপে আল্লাহ্‌ নিজেই বহুরূপে রূপায়িত। তাঁর বাইরে কোন অস্তিত্ব নাই। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর সেফাত হতে আগত এবং তাঁর নিকট হতে প্রাপ্ত সেফাত সাময়িক। সৃষ্টি তার আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হলেও স্রষ্টার সেফাতের বাইরে তার আপন বা নিজস্ব কোন সেফাত নাই।

মুলতঃ আহাদ জগত নারী প্রকৃতি। যা উৎপাদনশীল তাই প্রকৃতি। তবে যে-সত্ত্বা মহিমান্বিত আল্লাহ্‌র শক্তিতে শক্তিমান হয়ে সৃজনী শক্তির অধিকারী হয়েছেন, তিনি উৎপাদনশীলতার সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও আহাদ জগতের অন্তর্ভুক্ত নন। তিনি যদি আহাদ জগতের বাসিন্দা তবুও সামাদ জগতের ব্যক্তিত্ব। আহাদ জগতের প্রতিটি সত্ত্বা দুর্বল, অস্থায়ী, অধম, মন্দ। জড় জগত, জীব জগত, মনুষ্য জগত এবং মনুষ্য জগতের মধ্যকার জাহান্নাম ও জান্নাত সকলই আহাদ জগতের অন্তর্ভুক্ত। আহাদ জগতের প্রতিটি সত্ত্বা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। পরস্পরের নির্ভরশীলতায় আহাদের সবাই একধর্মী। একজনকে ব্যতিরেকে অপরজন অচল। তাই আহাদ জগত দুঃখময়। বস্তুজগতের যাহা কিছু আমরা দেখি, শুনি ও অনুভব করি তা আহাদ আল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। জন্ম, মৃত্যু, জরা, রোগ, শোক, আনন্দ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি এই আহাদ জগতের উপাদান ও গুণাবলী। কোরানে আল্লাহ্‌র এই স্তরকে তাই বলা হয়েছে ‘দুনাল্লাহ’ অর্থাৎ দুর্বল বা মন্দ আল্লাহ্‌। সুতরাং মানুষের মুক্তি পথে দুর্বল আল্লাহ্‌ হতে কোন অভিভাবক বন্ধু এবং সাহায্যকারী নাই। জীব সত্ত্বা ক্রমোন্নতি প্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধিমত্তায় উন্নত পর্যায়ে অর্থাৎ মানব-রূপে আসে। মানব হইতে ক্রমশ আত্মোন্নতির সাহায্যে সামাদিয়াত অর্জন করতে পারে। আহাদ জগতের দুর্বল সত্ত্বা কর্তৃক দুর্বল সত্ত্বার বা দুর্বল আল্লাহ্‌র উপর আজীবন নির্ভরতা বা দাসত্বের পরিনাম— জাহান্নাম। অপর পক্ষে দুর্বল সত্ত্বা কর্তৃক কোন শক্তিশালী সত্ত্বা অর্থাৎ সামাদ আল্লাহ্‌র উপর নির্ভরতা ও দাসত্বের ফল— প্রাথমিক পর্যায় জান্নাত এবং তদ্‌পরবর্তীতে মুক্তি। এই মুক্তি জাহান্নাম হতে মুক্তি, এই মুক্তি সৃষ্টির বন্ধন হতে মুক্তি।

এতো গেল আহাদ আল্লাহ সম্পর্কে কিছু কথা। এবার আসা যাক সামাদ আল্লাহ প্রসংগে।

সামাদ আল্লাহঃ আল্লাহ্‌র প্রকাশিত রূপের মধ্যে এটি শক্তিশালী স্তর। কোরানে আল্লাহ্‌র যত গুণাবলী ও শক্তির বর্ণনা আছে তা ‘সামাদ আল্লাহ্‌’ স্তরের গুণাবলী ও শক্তি। কোরানে সামাদ আল্লাহ্‌ ‘আমরা’ সম্বোধন করে কথা বলেছেন। বিশ্বের যত নবি, রসুল, উলিল-আমর মহাপুরুষ, অলি-আউলিয়া আছেন— তাঁরা এই ‘আমরা (নাহানু)’ দলের সদস্য। তাঁরাই এই জগতের লালন-পালন ও হরণকারী। আহাদ জগতের জ্বিন ও ইনসানকে সালাত শিক্ষা তথা ধ্যান শিক্ষা দিয়ে হেদায়েত করার জন্য নবি, রসুল, অলি-আউলিয়া ও আধ্যাত্মিক গুরু রূপে আল্লাহ্‌ নিজেই নর-মাংসের দেহে অবতীর্ণ হন। তাঁরাই হচ্ছেন সামাদ আল্লাহ্‌। সামাদ সত্ত্বা— পুরুষ। যে মানব সত্ত্বার মন-মস্তিষ্কে কোন উৎপাদন নাই অর্থাৎ যাঁর মন-মস্তিষ্কে মরুভূমির ন্যায়— যেখানে মোহ রূপ গাছ-পালা জন্মায় না অর্থাৎ যে মন-মস্তিষ্কে কেবলই মহাশূন্যতা সেখানেই উচ্চ পর্যায়ের সামাদ সত্ত্বা কর্তৃক রুহ ফুঁৎকার করা হলে তাঁকে সামাদ সত্ত্বার অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়। আহাদ ও সামাদ একে অপরের পরিপূরক। আহাদ নারী জগত। এর সাহায্য-সহযোগিতা দ্বারা এবং লালন পালনের সুষ্ঠু পরিচর্যা দ্বারা পরিপুষ্ট হয়ে স্বাধীন সামাদ সত্ত্বার উদ্ভব হয়। অপর পক্ষে, সামাদ সত্ত্বা আহাদ জগতের (সৃষ্টির) নিয়ন্ত্রক প্রভু হয়ে জাহান্নাম ও জান্নাতের উৎকর্ষ সাধন করেন এবং সমগ্র আহাদ জগতকে রূপে রসে লীলাময়, রহস্যময়, অর্থপূর্ণ এবং সার্থক করে তোলেন এবং নিরাকারের লীলা আকার সাকারে পরিপূর্ণ করে তোলেন। মায়া বিজড়িত অখণ্ড নারীজগত আহাদ। এটি হতে বিখণ্ডিত, মোহবন্ধন মুক্ত, পুরুষ সত্ত্বা সামাদ। জান্নাতবাসীগণ সালাতকর্মের সাহায্যে সংস্কাররাশির উপর সম্পূর্ণরূপে ভাসমান থেকে মুক্ত পুরুষ তথা সামাদে পরিণত হন। জীবদ্দশায় তাঁরা দেহ-মনের চাহিদা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে মরার আগে মরে গেছেন। সুতরাং তাঁদের কর্মকাণ্ডের তাঁদের নহে বরং দেহ-মনের। এজন্যই সামাদ সত্ত্বা “লাম ইয়ালিদ অলাম ইউলাদ”. তাঁরা নিজেরা জন্ম দেন না, জন্ম নেয়ার কর্মও করেন না। বিষয় বাসনা হইতে মুক্ত। সামাদ সত্ত্বা লা-শরিক, স্বাধীন, স্বনির্ভর, নিরপেক্ষ, মুক্ত, বন্ধনহীন, বেনেয়াজ। তাঁরাই সৃষ্টি পরিচালনা করে থাকেন। এজন্য লক্ষ করা যায়, কোরানে যেক্ষেত্রে আল্লাহতা’য়লার শান-মানের কথা বলা হয়েছে সেক্ষেত্রে এক বচনে ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে আবার যেক্ষেত্রে রূপান্তর সৃষ্টি (খালাকা) করা, হেদায়েত দান করা, রিজিক বণ্টন করা, রুহ ফুঁৎকার করা, জীবন দান করা, মৃত্যু ঘটানো, তৈরী (জাআলনা) করা, সংহার করা, নাজেল (অবতীর্ণ, উদয়) করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে সেক্ষেত্রে বহুবচনে ‘আমরা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। [গ্রন্থসুত্রঃ কোরআন দর্শন - সুফী সদরউদ্দিন আহমদ চিশতী ] 
(চলবে)

রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৫

সোনার মানুষ- সপ্তম পর্ব


(পুর্ব প্রকাশের পর)
ো তোমাকে যে কথা বলছিলাম। সেটা হআমাদের প্রথমে জানতে হবে আল্লাহ এবং র্শ সর্ম্পকে। এদুটো বিষয় জানা হলে আমরা হাদিসটির মুলার্থ ধরতে পারবো। প্রথমে আসি আল্লাহ শব্দটি প্রসঙ্গে।  "আল্লাহ" শব্দটি আরবি "আল" (বাংলায় যার অর্থ সুনির্দিষ্ট বা একমাত্র) এবং "ইলাহ" (বাংলায় যার অর্থ সৃষ্টিকর্তা) শব্দদ্বয়ের সম্মিলিত রূপ, যার অর্থ দাঁড়ায় "একমাত্র আললাহ" বা "একক আললাহ"। একই শব্দমূল-বিশিষ্ট শব্দ অন্যান্য সেমিটিক ভাষাতেও পাওয়া যায়। 

উদাহরণ স্বরূপ, বলা যায়, হিব্রু এবং আরামাইক ভাষার কথা। প্রাচীন হিব্রু ভাষায় শব্দটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বহুবচন এলোহিম אֱלֹהִ֔ים (কিন্ত্তু অর্থের দিক দিয়ে একবচন) হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আর আরামাইক ভাষায় শব্দটির রূপ এলাহা ܐܠܗܐ বা আলাহা ܐܲܠܵܗܵܐ। কিন্ত্তু এই শব্দটির অর্থ এই সব ভাষাতেই সমার্থক, "একক আললাহ"। শিখ ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিবে এই "আল্লাহ" (ਅਲਹੁ) শব্দটি ৩৭বার চেয়ে বেশি বার ব্যবহৃত হয়েছে।[তথ্যসুত্রঃউইকিপিডিয়া]

ইসলাম-পূর্ব আরবেও আল্লাহ  নামের ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্ত্তু তা করতো শুধুমাত্র সৃষ্টিকারী দেবতা (খুব সম্ভবতঃ সবচেয়ে শক্তিশালী জন) বুঝাতে। তবে আল্লাহ  সম্পর্কে ধারনা বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন। ইসলাম-পূর্ব আরবে পৌত্তলিক আরবরা আল্লাহকে একক মনে করতো না। বরং তার সাথে সঙ্গী-সাথী, এবং পুত্র-কন্যার ধারনা সংযুক্ত করেছিলো, যা ইসলামী যুগে সমূলে উৎপাটন করা হয়। ইসলামে আল্লাহ  শব্দটি দ্বারা এক, অদ্বিতীয় এবং অবিনশ্বর ঈশ্বরের দিকে ইঙ্গিত করা হয় এবং সমস্ত স্বর্গীয় গুনবাচক নামকে সেই একক স্বত্তার নাম বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ইসলামিক ভাষ্যনুযায়ী, আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়, সমস্ত-জগতের-সৃষ্টিকর্তা, সর্বত্র বিরাজমান, একক অধীশ্বর। এই কারণে বর্তমান-যুগের আরব-খ্রীস্টানেরা মুসলিমদের থেকে পার্থক্য সৃষ্টি করতে Allāh al-ʾAb (الله الأب, "God the Father" (অর্থাৎ, ঈশ্বর-পিতা) শব্দ ব্যবহার করে। এমনিভাবে কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ শব্দার্থ এবং হিব্রু বাইবেলে বর্ণিত আল্লাহ শব্দের অর্থে মিল এবং অমিল দুটি আছে [সুত্রঃউইকিপিডিয়া]। এটি হলো আল্লাহ শব্দের বাহ্যিক রুপ। আর ইলমে বাতিন অর্থাৎ গুপ্ত অর্থে আল্লাহ শব্দটির অন্য আরেকটি রুপ পাওয়া যায়।

পবিত্র কোরআন মতে, আল্লাহঃ- (আর্দ ও সামা) সৃষ্টির ও মনের কেন্দ্রবিন্দুটি হইলেন আল্লাহ্‌। আল+ইলাহ=আল্লাহ। অর্থাৎ একমাত্র উপাস্য। ইলাহ্‌ অর্থ কর্তা, নেতা, অধিকারী, তাই উপাস্য। সৃষ্টিময় আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ্‌ নাই। মোহাম্মদ (আ.) ব্যতীত নিরাকার আল্লাহ্‌র পরিচয়ের কোন প্রকাশ নাই। সৃষ্টি পরিচালনার জন্য তাঁহারই উপর সকল নেতৃত্ব কর্তৃত্ব এবং অধিকার ন্যস্ত রহিয়াছে। সুতরাং তিনিই হইলেন আল ইলাহ্‌'র প্রকাশ্য অভিব্যক্তি। সকল মহাপুরুষ ঐ জাহেরী ইলাহ্‌'রই পরিচয় প্রকাশক। একমাত্র সেই ইলাহ্‌'র নির্দেশ ব্যতীত মনুষ্য জীবনের নির্ভরের অন্যান্য বস্তু ও ব্যক্তিগনকে মানুষ যেইরূপ কর্তৃত্বের আসনে বসাইয়া থাকে তাহা কাল্পনিক বা মিথ্যা ইলাহ্‌। যেহেতু এই ইলাহ্‌সমূহ নিজেরাই অস্থায়ী এবং আল ইলাহ্‌'র নিয়ন্ত্রণাধীন। কাজেই 'ইলাহ' নির্ভরের আসন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বা বিষয়। ইহাকে আমরা উপাস্য বলিয়া থাকি। যাহার উপর নির্ভরের আসন নেওয়া হয় তাহাই উপাস্য। উপ+আসন=উপাসন। কাহারও উপরে নির্ভরের আসন গ্রহণ করিবার নাম তাহার উপাসনা করা। যেহেতু প্রকৃতপক্ষে একমাত্র আল্লাহ্‌র উপরেই আজীবন নির্ভরের আসন গ্রহণ করা উচিত নতুবা ক্ষতিগ্রস্থ হইতে হয়, সেইহেতু আজীবন যোগ্য উপাস্য আল্লাহ্‌ ব্যতীত কেহই নাই। আল্লাহ্‌ মনোজগতের সম্যক গুরুরূপে বিশ্বময় বিরাজিত। সুতরাং মনুষ্য-জগতে তিনি ছাড়া আজীবন উপাসনা যোগ্য আর কেহ নাই। বিশ্বজগত আল্লাহ্‌র বিকাশিত রূপ, সেইজন্য আল্লাহই সব এবং সবই আল্লাহ্‌র প্রকাশ অর্থাৎ এই বিশ্বজগত আল্লাহ-সত্ত্বাময়। আল্লাহ্‌ ব্যতীত দ্বিতীয় কোন সত্ত্বা নাই। আল্লাহ্‌ নিজেকে প্রলম্বিত করিয়াই এই জগত বানাইয়াছেন। এই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের সব কিছুই তাঁহারই শরীর। তাঁহার বাইরে কিছুই নাই। এই জগত তাঁহার সৃষ্ট নয় বরং তাঁহার নিজের প্রলম্বিত শরীর। মহাবিশ্বে মহিমান্বিত আল্লাহ্‌ নিজেকে তাঁহার মর্যাদা অনুযায়ী তিনটি স্তরে পরিব্যপ্তি ঘটাইয়াছেন। যথা— ১. আহাদ আল্লাহ্‌, ২. সামাদ আল্লাহ্‌ এবং ৩. লা-শারিক বা নিরাকার আল্লাহ্‌। [সুত্রঃ কোরআন দর্শন-সুফী সদরউদ্দিন আহমদ চিশতী]
(চলবে)