পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৬

করিম সাহেবের চিন্তা-ধারা ও হাঁস-মুরগীদের ছানাপোনা-পর্ব দুই

(প্রথম পর্বের পর হতে)

করিম সাহেব বেশ চিন্তিত মুখে মলিন বদনে বসে আছেন। তার মুখ-মন্ডলে চিন্তা-রেখা সুস্পষ্ট। তা দেখে রহিমা করিম সাহেবকে বললেনঃ

-কি ব্যাপার? তোমাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে? কি হয়েছে?

-নাহ্ । তেমন কিছু না। আর যা হয়েছে তা তুমি ব্যাখ্যা দিতে পারবে না।

রহিমা জানে তার স্বামী যখন কোন কিছু নিয়ে লেখা লেখি করে তখন তাকে চেনা যায় না। তিনি যেন অন্য কোন গ্রহের মানুষ হয়ে যান। কেমন যেন অচেনা মনে হয় লোকটাকে। অথচ তার স্বামী যখন তারই সাথে খাবার খায় এবং একই বিছানায় ঘুমায়, তখন তাকে চির চেনা লোকটির মতোই মনে হয়। কিন্ত্তু লেখার সময় তিনি লোকটির সাথে পুর্বের লোকটির কোন সায়ুজ্য খুঁজে পান না। তাছাড়া তাকে নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে বেশ রেগে যান। তাই রহিমা সবসময় দুরত্ব বজায় রেখে চলেন। রহিমা করিম সাহেবকে বললেনঃ

-তুমি কি চা খাবে? আদা দিয়ে লাল চা বানিয়ে আনি...খেলে বেশ ভালো লাগবে

করিম সাহেব তার কোন উত্তর না দিয়ে কেবল "হুম" বলে উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন হাঁস-মুরগীদের দিকে। দেখলেন, সবাই কেমন গোগ্রাসে খাবারগুলো খাচ্ছে। হাঁসগুলো তার চেপ্ট্যা ঠোঁটদুটো খাদার মধ্যে ডুবিয়ে কেমন যেন একটি খ্যাত খ্যাত শব্দ করে কুড়োগুলো খাচ্ছে। আর মুরগীটা একটা একটা করে খুদগুলো ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। একবার মাথা উঠাচ্ছে আবার নামাচ্ছে। অনেকটা আমরা যেমন নামাযে দাঁড়াই, সেজদা দেয়ার পুর্বে যেমন রুকু হতে উঠে দাঁড়াই, ঠিক তেমন মনে হচ্ছে। একবার মাথা উপরের দিকে উঠাচ্ছে পরক্ষণেই আবার মাটিতে থাকা খুদের মধ্যে ঠোকর দিচ্ছে। তাকে অনুসরণ করছে মুরগীর ছানাগুলো। তারাও মায়ের মতো করেই খাদ্য খাচ্ছে। করিম সাহেব কি মনে করে যেন সেই দিকটায় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

রহিমাও সেদিকটা দেখার চেষ্টা করলো। সেও দেখলো-তার স্বামী উঠোনে থাকা হাঁস-মুরগীদের খাবারের দৃশ্য উপভোগ করছে। কিন্ত্তু সে ঠিক কি চিন্তা করছে, সেটা রহিমা ধরতে পারলো না। সে বেশ অবাকই হলো। রহিমা জিগ্যেস করলোঃ

-কি, কিছু বলছো না যে? চা বানিয়ে আনবো?

-আরে আনো না...দেখছো না একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি..

-কি কাজ করছো?

-হাঁস মুরগীদের খাবার গ্রহণের দৃশ্যগুলো মনোযোগ সহকারে দেখছি।

-সেটা দেখার কি হলো? আমিতো রোজই দেখি..

-তুমি দ্যাখো কিন্ত্তু উপভোগ করো না...

-উপভোগ? সেটা আবার কি? 

-সেটা হলো দর্শন।

-দর্শন? 

-হ্যাঁ। দর্শন। 

করিম সাহেব একটি সিগারেট ধরিয়ে ফুঁস করে একরাশ ধোঁয়া বের করলেন। তারপর বললেনঃ

-দেখা এক জিনিস আর দর্শন আরেক জিনিস। স্বাভাবিক দৃষ্টি নিয়ে যে দেখা, সেটা হলো সাধারণ দর্শন তথা দেখা। সাদা মাটা। সেটা উপভোগ্য বিষয় নয়। কিন্ত্তু যখন সেই দৃষ্টির মধ্যে গভীর কোন তত্ত্ব খোঁজার চেষ্টা করা হয়, তখন সেখান হতে একটি উপভোগ্য বিষয় বের হয়ে আসে। সেটাই সেটার দর্শন। তথা মুল বিষয় বস্তু। তুমি দেখেছো সাধারণ দৃষ্টি নিয়ে। তাই তোমার কাছে বিষয়টি উপভোগ্য হয়নি। সেটা দর্শন নয়। কিন্ত্তু আমি সেই দৃষ্টি নিয়ে তাকাই নি। আমি সেই দৃশ্যের মধ্যে একটা উপভোগ্য বিষয় খুঁজতে চেষ্টা করেছি। তাই সেটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়েছে। সেটাই আমার দর্শন।

-খুলে বলো।

রহিমা বেশ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো। সে প্রতিদিনতো একই কাজ করে আসছে। সে হাঁস-মুরগীদের যত্ন আত্তি করছে। তাদের খাবার দিচ্ছে। আবার যথারীতি সাঁঝে হাঁস-মুরগীদের খোয়ারে তোলে দোর লাগিয়ে দেয়। দোরটির মুখে একটি ইট দিয়ে রাখে, যাতে সেটা সরিয়ে কোন শিয়াল কিংবা খাটাশ মুরগী কিংবা হাঁস ধরে নিয়ে যেতে না পারে। এত কিছু করার পরও সে দর্শন করতে পারলো না-বিষয়টা তার কাছে বেশ রহস্যময় মনে হলো। রহিমা তাকিয়ে আছে তার স্বামীর দিকে।

করিম সাহেব সিগারেটে দম নিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বেশ কায়দা করে তার দর্শনের বিষয়টি খুলে বলার চেষ্টা করছেন। শোন তাহলেঃ

- আল্লাহ পাক সমগ্র সৃষ্টিজগতের আধার। তিনি স্রষ্টা হয়ে খালিকরুপে সমগ্র সৃষ্টিজগতের ভার নিয়েছেন। তিনি সেই সৃষ্ট বিষয়ের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞ। তাই তাদের রিজিক তিনি দান করেছেন অকৃপণভাবে। জমিনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। সেই রিযিক গ্রহণ করে দেহবীজ উৎপন্ন করে সৃষ্টিধারা অব্যাহত রেখেছেন মুরীদুন ছেফাতের মাধ্যমে। দেহবীজ তৈরীর মুল উপকরণ হচ্ছে খাদ্য। খাদ্য বিনে দেহবীজ উৎপন্নসম্ভবপর নয়। সেই খাদ্য যেটা জমিনের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, মুরগীটার দিকে লক্ষ্য করো - দ্যাখো তাকিয়ে। সে কিভাবে সেগুলো একটা একটা করে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। আর বাচ্চাদের সেই খাবার গ্রহণের কৌশল শেখাচ্ছে। বাচ্চাগুলো মাকে অবলোকন করে অবলীলায় মায়ের ভংগীতেই খাবারগুলো খাচ্ছে। তার পাশেরই দ্যাখো মোরগটাও খাবার খাচ্ছে। সে খাবার গ্রহণের সময় তার ধারের কাছে কা্‌উকেই ভীড়তে দিচ্ছে না। সে জানে, তার জন্যই খাবারটা বেশি জরুরী। কেননা, তাকে প্রডাক্টিভিটি চালিয়ে রাখার জন্য খাদ্যটা বেশি জরুরী। আর মা মুরগীটা তার ছানাদের নিয়ে অন্যদিকটায় অবস্থান করে অবলীলায় খাদ্য খেয়ে যাচ্ছে। 

অপরদিকটায় দ্যাখো-হাঁসদের খাদ্যের ব্যাপারে আগ্রহের কমতি নেই। তারা গোগ্রাসে কারো দিকে না তাকিয়ে কে কতো বেশি খাবার খেতে পারে, সেরকম এক ধরণের প্রতিযোগীতার সৃষ্টি করে চলেছে। মনে হচ্ছে, অন্য দিকে দৃষ্টি দিলে হয়তো পাশেরটা তার থেকে বেশি খাবার খেয়ে ফেলতে পারে। কারো যেন কোন হুঁস নেই। পাতি হাঁসটি তার বাচ্চাদের দিকেও খেয়াল করছে না। বাচ্চাগুলো মরিয়া হয়ে খাবার গ্রহণের চেষ্টা করছে। সেও তার মা-বাবার মতোই একই কায়দায় খাবার খাচ্ছে। পার্থক্য হলোঃ মা মুরগীটা তার বাচ্চাদের প্রতি কর্তব্যপরায়ন এবং শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে বেশ আগ্রহশীল। আর মা হাসটি তার বাচ্চাদের ব্যাপারে গাফেল। সে সেদিকটায় মোটেও খেয়াল করছে না। না তার খানা খাদ্যে, না তার চলা-চলতিতে। ফলে তাদের যে খাদ্য ছিটকে পড়ছে তার দিকে তাদের খেয়ালই নেই। অথচ মুরগীটি প্রতিটি দানা একটা একটা করে খুটে খুটে খাচ্ছে। কি অদ্ভুদ! তাই, না?

রহিমা তার স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মনেও সেই খেয়াল চাপলো। করিম সাহেব কি হাঁসদের মতোই গাফেল ? সে কি এই সংসারের দিকে এমন দৃষ্টি নিয়ে কখনো দেখেছে? কি করে এই সংসারটা চলে? কিভাবে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে হয়? কিভাবে তাদের জন্য সেই ভোর হতে রাত অবধি গাধার খাটুনি খাটতে হয়? তার চিন্তা-ভাবনা করার মতো ফুরসৎ কই? কিভাবে সে করিম সাহেবের মতো দর্শন খুঁজে বেড়াবে? রহিমার চোখে জল চলে আসছে সংসারের অভাব অনটনের মধ্যে থেকে তার স্বামীর দর্শন চিন্তা দেখে। যে ব্যক্তি সামান্য পশু-পাখিদের মধ্যে দর্শন চিন্তা করতে পারে, সে নিশ্চয়ই বড়ো কোন কিছু অবশ্যই চিন্তা করতে পারে। রহিমা স্বামীকে খুশি করার জন্য বললোঃ

-সত্যিই তো? সেইভাবে তো কখনো দেখিনি। চিন্তাও করতে পারিনি। 

এ কথা বলে রহিমা রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। এখনো অনেক কাজ বাকী। ছেলে-মেয়েদের জন্য নাস্তা তৈরী করতে হবে। নিজেদের জন্যও খাবার তৈরী করতে হবে। তাকে তো কেউ হাঁস-মুরগীদের মতো খাবার তৈরী করে খেতে দেবে না। তার খাবার তার নিজেরই তৈরী করতে হবে।
(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬

করিম সাহেবের চিন্তা-ধারা ও হাঁস-মুরগীর ছানাপোনা - পর্ব এক



শীতের কুয়াশা ভেদ করে যখন সোনালী সুর্যটা হেসে উঠলো ঠিক তক্ষুণী পুর্বাকাশের একচিলতে সোনালী রোদ্দুর সারা উঠোনময় সোনালী আলোয় উদ্ভাষিত হয়ে হেসে উঠলো। সারারাত ধরে যে কুয়াশার বিস্তৃত ছিল পাতায় পাতায় প্রকৃতির ছত্রচ্ছায়ায়, তা যেন মুহুর্তের মধ্যেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে কেবল সোনালী সুর্যের সংস্পর্শে। 

এমনি এক সকালে রহিমা ফজরের নামায আদায় করে খোয়ারে থাকা হাঁস-মুরগীগুলোকে উন্মুক্ত করে দিল খোয়ারের দ্বার খুলে। মুহুর্তের মধ্যেই সবকিছুই পাল্টে গেল। হাঁসগুলো প্যাক প্যাক করতে করতে হেলে দুলে খোয়ার হতে বের হয়ে এল। আর মুরগীগুলো ডানা ঝাঁপটে তার বাচ্চাগুলো নিয়ে খেলা করতে লাগলো। 

বড়ো মুরগীটা কিছুদিন পুর্বে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়েছে। ওমের গন্ধ তখনো মা মুরগীটার গা হতে যায়নি। মা মুরগীটা তার ছানাদের নিয়ে রাজকীয় ভংগীতে সারা উঠোনে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলো।

রহিমা একটা খাদাতে হাঁসদের জন্য কুঁড়োগুলিয়ে নিয়ে আসলো আর মুরগীদের জন্য নিয়ে আসলো খুদ-কুড়ো। সেই খুদ কুড়ো নিয়ে রহিমা যখন আয় আয় তি তি তি…..আয় আয় বলে ডাকছিলো তখন হাঁস-মুরগীর ছানা পোনা সহ সারা উঠানে হাঁস-মুরগীতে ছেয়ে গেল। রহিমা অত্যন্ত আগ্রহ চিত্তে তাদের আদার (খাদ্য)দিচ্ছিল। খানা পেয়ে হাঁসের দল প্যাক প্যাক করতে হেলে দুলে ছুটে আসছিল। আর মুরগীর দল কক কক রবে ডেকে উঠলো। দুর থেকে করিম সাহেব তা লক্ষ্য করছিলেন। 

তিনি একটি বিষয় নিয়ে লেখা লেখি করছেন। কিন্ত্তু লেখাটিতে পুরো পুরি মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। দু’চার লাইন লিখে আবার গভীর ভাবনায় পতিত হন। যেই আবার লিখতে যান, তক্ষুণি আগের লেখাটি কেটে দেন। আবার লিখেন। কিন্ত্তু তিনি লেখাটি সমাপ্ত করতে পারছেন না কোন মতেই। তার ভাবনার বিষয় হচ্ছে – ইনসানুল কামিল। তিনি ইবনুল আরাবীর  একটি বই পেয়েছেন। সেই বইটিতে লেখাঃ

"সুফী সাধনায় তিনি এত উন্নত হন যে তাঁর ভক্তরা তাঁকে “শায়খুল আকবার” বা শ্রেষ্ঠ শায়েখ উপাধিতে ভুষিত করেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে “আল ফতুহাতুল মক্কীয়া” বা মক্কার প্রত্যাদেশ সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গ্রন্থখানি বর্তমানে চারটি সুবৃহৎ খন্ডে ও পাঁচশত ষাটটি অধ্যায়ে বিভক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়। তাঁর মতে, এই গ্রন্থের প্রতিটি শব্দ তিনি অলৌকিকভাবে প্রত্যাদিষ্ট হন এবং তার মধ্যে ঐশীবাণী ছাড়া অন্য কিছুই নাই। “ফতুহাত” রচনা সম্পর্কে তিনি বলেন যে, তিনি যদি ফতুহাত রচনা না করতেন, তাহলে তিনি ঐশী অগ্নিতে ভষ্মীভুত হতেন।"

তিনি আরো বলেন যে, "মক্কায় অবস্থানকালে তিনি হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-কে ফেরেস্তাগণ, নবীগণ ও আউলিয়াসহ আলমে মাসুরে তখতে উপবিষ্ট দেখেন এবং তাঁর দ্বারা ঐশী রহস্য উদঘাটনের আদেশ প্রাপ্ত হন। এক সময়ে কাবা ঘর প্রদক্ষিণের সময় এক সুন্দর স্বাস্থ্যবান ও লাবন্যপুর্ণ যুবককে তাঁর সাথে কাবা প্রদক্ষিণ করতে দেখেন এবং এই যুবকই তাঁকে দৃশ্যাতীত রহস্যময় চির অনন্ত পরম সত্তা আল্লাহর আরশ দেখান এবং এই দৃশ্য অবলোকন করে তিনি মুর্ছা যান। মুর্ছা ভংগের পর ঐশী রহস্য গ্রন্থাকারে প্রকাশের আদেশ তিনি লাভ করেন।"

লেখাটি পড়ে তিনি বেশ চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিলেন। কারণ হিসেবে বের করলেনঃ

১. তিনি রসুল পাক (সাঃ)- কে ফেরেস্তাগণ, নবীগণ ও আউলিয়াসহ আলমে মাসুরে তখতে উপবিষ্ট দেখেন।
২. একটি সুদর্শন যুবক তাকে দৃশ্যাতীত রহস্যময় চির অনন্ত পরম সত্তা আল্লাহর আরশ দেখান।
৩. এবং মুর্ছা ভংগের পর তিনি ঐশী আদেশ লাভ করেন।

তিনি শুনেছেন এবং জেনেছেন যে, কুল্লি নাফছিন জায়কাতুল মউত। প্রত্যেকটি নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। সেই সুত্র ধরে আবদুল্লাহ পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ) ও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছেন এবং তৎপুর্ব সমস্ত নবী-অলীগণ সকলেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন এবং এই নশ্বর ধরণী ত্যাগ করেছেন। তাহলে কিভাবে সম্ভব রসুল পাক (সাঃ)- কে ঘিরে ফেরেস্তাগণ, নবীগণ ও আউলিয়াসহ আলমে মাসুরে তখতে উপবিষ্ট হওয়া? তাছাড়া তাঁরা যদি এই নশ্বর ভুমি ত্যাগ করেন, তাহলে এই ধরাতেই কেন তাঁদের দেখতে পাওয়া যায়? আর কেনই বা তাঁরা এই নশ্বর ভুবনে ফিরে এসে দেখা দেন? ঐ পরপারের যে স্থানে তাঁদের থাকার কথা – সেখানে যদি তাঁরা থাকেন তাহলে যার সাথে দেখা দেন, তিনি যদি সেরুপ উপযুক্ত না হন, তাহলে তাঁদের সাথে দেখা হবার তো সম্ভাবনাই থাকে না। আর তিনি যদি উপযুক্ত হনই, তাহলে তিনিতো সেখানেই দেখা দিলেই পারতেন? কেন তাঁরা এই ধরাতেই দেখা দেন? তবে কি তাঁরা মরেননি? তারা কি অমর? নাহ…নাহ…তা কিভাবে সম্ভব?

করিম সাহবের ভ্রু কুঁচকে গেল। ভ্রু কুঁচকে তিনি বেশ বিরক্তভাব নিয়েই উঠানের দিকে তাকাতেই দেখলেন-রহিমা তি তি করে হাঁস মুরগীদের ডাকছে। তারা সেই ডাক শুনে দ্রুত ছুটে আসছে। একে অন্যের সাথে খাবার নিয়ে প্রতিযোগীতা শুরু করে দিয়েছে।

মাথা ক্ষাণিকক্ষণ চুলকে তিনি আবার লেখা শুরু করলেনঃ

আচ্ছা সুরা বাকারা আয়াত-১৫৪ তে বলা হয়েছেঃ “ওয়াতাকুলু মাইইয়াখতালু ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াত বাল আহহিয়া ওয়ালা কিলল্লাহ তাশউরুন” ওয়া(এবং) তাকুলু(কতল-কতল হওয়া) মাইইয়াখতালু ফি সাবিলিল্লাহি (আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন) বাল(বরং) আহহিয়া(হাইয়ুন-জীবিত) ওয়ালা কিলল্লাহ তাশউরুন(তাশুর – বুঝতে পারা)। যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে মৃত বলো না বরং তারা জীবিত। তোমরা তা বুঝতেই পারবে না। 
এছাড়া সুরা আলে-ইমরানের ১৬৯ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ ওয়ালা তাহসাবান্নাল্লাযীনা কুতিলু ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াতা বাল আহইয়াউন ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন।” অর্থঃ যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় কতল হয়েছে তাঁদেরকে মৃত মনে করো না। বরং তাঁরা জীবিত নিজের রবের নৈকট্যপ্রাপ্ত, নিজের রবের পক্ষ হতে রিজিকও প্রাপ্ত।

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, যারা আল্লাহর রাস্তায় কতল হয়েছেন-তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক। তাহলে শহীদরা অমর-এ কথাতো কোরআনেরই। যদি তাই হয় তাহলে যারা শহীদ হন, তাদের দেহ গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পড়িয়ে জানাজা দেয়া হয় কেন? জীবিত ব্যক্তির জন্যতো কোন জানাজার নামাজ জায়েজ নয়। তথা প্রযোজ্য নয়। তাহলে এই আনুষ্ঠানিকতা কেন? জীবিত ব্যক্তিকে কেউ কি কবর দেয়? কবরতো দেয় মৃত ব্যক্তিদের।

দ্বিতীয় আয়াতে দেখা যাচ্ছে আরো ভয়াবহ অবস্থা আর তাহলোঃ 
তাঁরা রবের নিকট হতে রিজিক প্রাপ্ত। রিযিক কি? রিযিক বলতে আমরা যা আহার করি তাই। সেটা যদি রিযিক হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তি কিভাবে রিযিক গ্রহণ করে? বাল আহইয়াউন ইন্দা রাব্বিহিম ইউরয়াকুন। বাল(বরং) আহইয়াউন(হাইয়ুন-হায়াত-জীবিত) ইন্দা রাব্বিহিম (রবের নিকট হতে প্রাপ্ত) ইউরযাকুন (রিযিক)।

এছাড়া অন্য একটি প্রশ্ন এসে যায় আর তাহলোঃ শহীদের মর্যাদা বড়ো না নবী-অলীদের মর্যাদা বড়ো? যদি শহীদের মর্যাদা বড়ো হয় তাহলে ভাষা আন্দোলনে যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছেন বা ভাষা সৈনিক শহীদ হয়েছেন, তাদের কেহ দেখেছেন বলে তো শুনিনি? তাছাড়া তারা তো কারোর উপর আদেশও করেননি। যত কাহিনী শুনি তার সিংহভাগই অলী-আউলিয়াদের শানেই। কি বলার আছে আর কি লিখবো? যদি মর্যাদার প্রশ্ন ধরি, তাহলে বলা হয়ঃ “বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র”। তাহলে কোরআন মতে বিদ্বানও শহীদের মর্যাদা পান না তথা জীবিত থাকার কোন প্রশ্নই উঠছে না। প্রশ্ন উঠছে - যারা শহীদ হয়েছে তাদেরকে মৃত বলা নিষেধ। কেবল তারাই জীবিত। আর বাকী যারা মারা যাবে তারা সবাই মৃত। বিষয়টি কেমন যেন চিন্তায় ফেলে দিল করিম সাহেবকে। কি কোন কুল কিনারা করতে পারছেন না।
(চলবে)

বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬

শ্বেতার ডায়রী-শেষ পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

আমাকে উঠতে দেখে দোকানী বলে উঠলোঃ

-মামা কি কট খাইছেন?

-মানেটা কি? কট খাইছেন?

-মামা আপনি ধরা খাইছিলেন না-কি? হেইডা জিগাইলাম?

-হুম।

-দেইক্ক্যাই বুইঝ্যালাইছি...

-কি ভাবে?

-আপনের চোখ দুডা লাল টকটকা হইয়্যা রইছে। মনে অয় হারা রাইত বহাইয়্যা রাকছিল..

-তুমি তো দেখছি সবই বলে দিতে পারো...

-মামা অনেক দিন ধইর‌্যা চা বেচি। আপনেগো মতো মামারা মামীরা এইহানে চা খাইতে আহে। হেগো অনেক কতাও হুনি..

দোকানীর আলাপে কেমন যেন আনন্দ পেলাম। মনের গহীনে যে ব্যাথাটা টন টন করছিল তা যেন কিছুটা হলেও সান্তনার বাণী খুঁজে পেল। কে কি ধরণের আলাপচারিতা করে দোকানী তা আমাকে অকপটে বলে যাচ্ছিল। ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে অনেক সময় এসমস্ত টং দোকানীতে বসে আলাপচারিতা করে। তাদের আলাপের অনেক কথাই তারা না শোনার ভান করে শুনে ফেলে...তাছাড়া রিক্সাওয়ালা কিংবা সিএনজি চালক কিংবা প্রাইভেট কারের ড্রাইভারই হোক তারাও যে তাদের প্রাইভেট কথা শুনছে না..তারই বা কি গ্যারান্টি আছে? তাইতো সন্দেহের তালিকায় পুলিশ প্রথমেই জিগ্যাসা করে টং দোকানদারদের। কারা কারা আড্ডা মারে...কিংবা কোন দুঘর্টনায় প্রাইভেট কারের চালকদের এবং বাসার পরিচারিকাদের। দোকানীর কাছ থেকে অনেক কিছুই জানা হলো। এবার উঠতে হবে। আমি মানিব্যাগ বের করে দোকানীকে টাকা দিতে গিয়ে দেখলাম-সেখানে ভাঁজ করা শ্বেতার লেখা একটা চিঠি। চিঠিটা ডায়রীর সাথেই ছিল। আমার মনে পড়লোঃ গতদিন দুপুরে কুরিয়ার সার্ভিসে আমার কাছে একটা গিফট নিয়ে একজন সার্ভিসের লোক এসেছিল। আমার হাতে একটি গিফট বক্স দিয়ে দস্তখত নিয়ে গিয়েছিল। আমি গিফট বক্সটি খুলে দেখি সেখানে একটি ডায়রী এবং একটি চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিলঃ

প্রিয় সাজিদ,
যখন তোমার ঘুম ভাংগবে, যখন তোমার হাতে আমার ডায়রীটা থাকবে, তখন আমি থাকবো তোমার থেকে অনেক অনেক দুরে। আমি চলে যাচ্ছি আব্বুর সাথে ইংল্যান্ডে। সেখানে আমি আমার খালামণির সাথে থাকবো। সেখানেই স্থানীয় একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আমার ভর্তি কনফার্ম হয়ে আছে। তোমার সাথে আর এ জীবনে দেখা হবে কি-না জানি না। তবে জেনে নিও শিরিন সিকদারের বয়েতের উদ্ধৃতি দিয়েই বলছিঃ

মৃন্ময়ী মাটির মত্ত শিরীন শারেঙ্গী.
উতলা ভূতলা বুকে তার উন্মাদ ঝংকার: 
হায় পথ আছে আমার পাথেয় কই!

আমার পাথেয়তো তুমিই ছিলে। কিন্ত্তু জীবনের বাস্তবতায় আজ আমি আমার পাথেয় হারিয়ে ফেলছি। তবে জেনে নিও

ভালোবাসতে বাসতে আমি ভালোবাসা ছাড়া আর সব ভুলে গেছি, 
মৃত্যু যন্ত্রনায় জ্বলতে জ্বলতে আমি বাঁচতেই ভুলে গেছি। 
ফিরে যদি দেখো শিরীনের শবদেহ, অনিমেষ চোখ - বুঝে নিও, 
প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে আমি চোখ বুঝতেই ভুলে গেছি।

ইতি
তোমারই
শ্বেতা।

সেই চিঠিটা পড়ে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আমি শ্বেতাকে কখনো বলিনি যে - শ্বেতা, তোমাকে আমি খুঁজতে যখন তোমাদের বাড়ীতে যাই, তখন তোমার আম্মু আমাকে দেখে বলেছিল-এই ভিখিরীর ছেলে কি করে শ্বেতার ক্লাসমেট হয়? যত্তসব...সেই কষ্টের কথা তোমাকে কোনদিনও বুঝতে দেইনি। বুকের যন্ত্রণা চেপে কেবল তোমার স্মৃতিতে যেন চির জাগরুখ থাকি, সেই চেষ্টাটাই করেছি। আজ তোমার চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে আমার পাগলামিটা স্বার্থক হয়েছে। সেই পাগলটাই আজ তোমার অজান্তেই মির্জা গালিবের একটি শায়ের তোমার উদ্দেশ্যেই বলছেঃ

থা জিন্দেগী মে মর্গকা খটকা লাগা হুয়া
উড়নেছে পেশতর ভি মেরা রং জর্দ থা।।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। মিরপুরের বাস চলাচল করছে। বাসে চেপে আমাকে ফিরতে হবে আমার সেই চিরচেনা মেসে। তেল চিটচিটে বালিশ আর তালি দেয়া খ্যাতা যার সম্বল, তার ধনীর দুলারীদের সাথে প্রেম করতে নেই। কেবল স্বপ্ন দেখাই সার। মনে মনে আবৃত্তি করলাম আরেকটি শায়ের

কিতনা খফ হোতা হ্যায় শামকে অন্ধোরো মে,
পুছ উন পরিন্দো সে জিন কে ঘর নেহি হোতা।। 

আকাশের পানে তাকিয়ে দেখলাম সুর্যটা হাসছে। গোটা চারেক কাক ডাকাডাকি করছে। আর আমি ধীর পায়ে চলেছি আমার গন্তব্যে।

সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৬

শ্বেতার ডায়রী-অষ্টম পর্ব

(সপ্তম পর্বের পর)

শ্বেতা তার ডায়রিতে লিখেছিলঃ

তারিখঃ২২শে এপ্রিল,২০১৪
বারঃমঙ্গলবার

প্রিয় সাজিদ,
তোমায় ভালোবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মেশে
জানি তুমি আমার কোনদিন মনের মতো হবে না। তোমাকে যতবারই আমি আমার মনের মতো সাজাতে চেয়েছি, ততই তোমার পাগলামি বেড়েছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, তুমি হয়তো আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই তোমার পাগলামির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছো। ওমন ভরদুপুরে কেউ হাঁটে না। অথচ তুমি আমাকে নিয়ে সেই চৈত্রের ভরদুপুরে হাঁটলে। বললে-সুর্য স্নান হবে। সুর্যের আলোয় আলোকিত হব। কিন্ত্তু বাস্তবে কি হলো? বাড়িতে গিয়ে আমাকে আম্মুর বকা শুনতে হলো। জ্বর হলো। ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। তুমি জানো যে, আমি রোদে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি না। কিন্ত্তু তোমার কথা আমি ফেলতে পারিনি। তোমার পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে হাঁটতে পারা আমার জন্য বেশ রোমান্টিক অনুভুতির জন্ম দিয়েছিল। সেই রোমান্টিক অনুভুতির ঘোর কাটলো ১০২ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে। আচ্ছা, আমার যখন জ্বর হয়েছিল, তোমারো কি জ্বর হয়েছিল?

আমি শ্বেতাকে বলতে পারিনি-আমার জ্বর হয়েছিল। সত্যিইতো আমার কোন জ্বর হয়নি। কারণ, আমি শ্বেতার মতো কোন ধনীর দুলারী নই। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমাকে রোদ বৃষ্টির কথা চিন্তা করলে চলে না। ব্যাঙের মতোন চলতে হয় আমাদের। আমাদের কোন রাজপ্রাসাদ নেই। ভাঙ্গা টিনের চালের উপর বৃষ্টির পানি যখন টুপ টুপ করে পড়ে তখন জীবনানন্দ দাসের মতোন ওমন উঁচু স্তরের কবিতা বের হয় না। প্রচন্ড খররৌদ্রে যখন টিনের চালা আগুন গরম হয়ে ওঠে, তখন ঠান্ডা এসির বাতাস কল্পনা করি না। ভোরের সোনালী সুর্যালোক যখন ভাঙ্গা টিনের চালা গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তার প্রখরতা জানান দেয়, তখন  জীবনের দর্শন আমরা লাভ করি বাস্তবতার নিরিখে। বাস্তবতাই আমাদের দর্শন শেখায়। আমরা দার্শনিক হই কেবল বেঁচে থাকার ন্যুনতম প্রয়াসে। যেটা গালিব বলেছিলঃ

মত পুছ কে ক্যা হাল হ্যায় মেরে তেরে পিছে
তু দেখ কে ক্যা রঙ্গ হ্যায় তেরে মেরে আগে।।

যে ভালোবাসা একসময় আমাকে স্বপ্ন দেখাতো, সেই স্বপ্নসাধটা ধুলিস্মাৎ হয়ে যাচ্ছে কেবল আমারই ভুলে। কিন্ত্তু ভুলটা কি সত্যিই আমার? আমি যা করি, তা কি সত্যিই ইচ্ছাকৃত? না-কি যে ইচ্ছাময় আমাকে চালাচ্ছে, তারই কোন গোপন ইচ্ছার অভিব্যক্তি? আমার মনে পড়লো মীর্যা গালিবের আরেকটি শায়েরঃ

হাজারো খোয়াইশে অ্যাসে কি হর খোয়াইশ পে দম নিকলে
বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফিরভি কম নিকলে।।

ভোরের আলোয় ফুটে ওঠার সাথে সাথে দেখলাম জনা দুয়েক মুসল্লি হাঁটা চলা করছে। ইব্রাহিম কর্ডিয়াক হাসপাতালের সামনে দেখলাম একটা এম্বুলেন্স পো পো করে বের হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন এ দুনিয়ার মায়া ছেড়ে ওপারে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে দেখলাম কান্নার রোল পড়ে গেছে। আর ডায়বেটিস হাসপাতালের সামনে দেখলাম আস্তে আস্তে ডায়বেটিস রোগীদের সিরিয়ালটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কি বিচিত্র দৃশ্য এটি। কি নির্মম অথচ কতো বড়ো সত্য। বেঁচে থাকার তাগিদে একদল আসছে হাসপাতালে আর ঐ হাসপাতালের অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে ওপারে। না ফেরার দেশে...অন্যদিকে যে পাশটায় আমি বসে আছি সেইপাশটা সম্পুর্ণ বিপরীত। নতুন করে জীবন সাজানোর বিলাশ বহুল প্রসাধন নিয়ে বসে আছে ফুল ক্রেতারা। 

একেতো সারাটা রাত একটা দুঃবির্ষ জার্নি করা তার উপর মন খারাপ করা একটা দৃশ্য..নির্মম বাস্তবতার দৃশ্য...উঠতে হবে আমাকে..যেতে হবে বহুদুর। এখনো অনেক পথ পাড়ি দেয়া বাকী। আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম।

(চলবে)

শুক্রবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৬

শ্বেতার ডায়রী-সপ্তম পর্ব

(ষষ্ঠ পর্বের পর)
সাত্তার ভাই আমাকে নিয়ে ওসির রুমে গেলেন। রুমে ঢুকেই জোড় কদমে বেশ কায়দা করে স্যালুট দিলেন। তারপর আমাকে দেখিয়ে বললেনঃ

-স্যার, একে ধরেছি স্যার। ধারা ৫৪। সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করছিল স্যার।

-হুম....কি কিছু পেয়েছেন?

-না স্যার। তেমন কিছুই পাইনি। কেবল এই ডায়রীটা পেয়েছি। 

-কোন জংগীর সাথে সম্পৃক্ততা কিংবা কোন তথ্য আছে কি?

-না স্যার। স্যার এই যে ডায়রী...

সাত্তার ডায়রীটা এগিয়ে দিল ওসির দিকে। আমি তাকিয়ে আছি ওসি সাহেবের দিকে। পাশের চার্ট টেবিলে লেখাঃ আব্দুল লতিফ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার মানে ওসি সাহেবের নাম আব্দুল লতিফ। দেখি লতিফ সাহেব কি করে? আমি তাকিয়ে থাকলাম ওসি সাহেবের দিকে। তিনি ডায়রীটা নাড়া চাড়া করে দেখে বললেনঃ

-ফালতু একটা জিনিস কেন আনছো? এইসব ছেলে পেলেরা প্রেম ভালোবাসা করে দেশটার বারো বাজিয়ে দিল। আজ অমুকে বিষ খায় তো কাল আরেকটা ফাঁসিতে ঝোলে..যত্তসব....এ্যাই কি নাম তোর?

-সাজিদ হাসান।

-হুম। কোথায় থাকিস?

-স্যার মীরপুর এক নম্বরে। কলওয়ালাপাড়া মসজিদের সামনে।

-রাতে বের হয়েছিলি কেন?

-স্যার মাথা ধরেছিল। তাই ঔষধ কেনার জন্য বের হয়েছিলাম। আর সেই সময়...

-থাক্ আর বলতে হবে না। সেন্ট্রি....ওর বন্ড সই নিয়ে ছেড়ে দেন। যাতে আর কখনো অযথা যত্রতত্র ঘুরে না বেড়ায়...
 
আমি ওসি সাহেবের রুম হতে বের হতে পেরে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানালাম স্রষ্টার কাছে। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থটা যেন বুঝতে পারলাম। যখন চলে যেতে চাইলাম তখন সাত্তার নামক পুলিশটি ডায়রীটা ফেরত দিল। আমি ডায়রীটা নিয়ে থানা হতে বের হয়ে এলাম।

শাহবাগের মোড়ে একদিকে যাদুঘর অন্যদিকে হাসপাতাল। আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশটা ততক্ষণে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। ফুলের দোকানদাররা তাদের ফুলগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখছে। টং দোকানের মালিকরা তাদের দোকানের পশরা সাজাতে ব্যস্ত। কেউ চুলা জ্বালিয়ে পানি গরম করছে। চা বানানোর জন্য। আমি চা খাওয়ার জন্য একটি বেন্ঞ্চিতে বসলাম। বসা মাত্রই আমি লক্ষ্য করলাম যে, একটি পোষ্টারে লেখাঃ  "মাহবুবে খোদা ......মাহবুবে এলাহি...পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) -এর শুভেচ্ছা "।
একটি বিষয় বেশ আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুললো। আশেকে নবীগণ যাদের নবী প্রেমিক বলা হয়, তাদের নবীপ্রেম এবং পুর্ববর্তী যারা রসুলের জামানায় ছিলেন তাদের নবীপ্রেমে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়ঃ পনেরো শতকের ঘটনা। আল্লামা আবদুর রহমান জামী (রঃ) ছিলেন একজন মহান রসুল প্রেমিক। নবী প্রেমের কারণেই তিনি একজন কালোত্তীর্ণ মহাপুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। একদা তিনি রসুল পাকের শানে না'ত তথা কাসিদা লিখে রঁওজায়ে আকদাসের জেয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনায় গমণ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তার একান্ত ইচ্ছে-রঁওজা পাকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর বিখ্যাত না'ত-ই-রসুলটি পাঠ করা। যখন আল্লামা জামী (রঃ) নবী প্রেমে বিভোর হয়ে মদীনা পানে ছুটলেন, তখন মক্কার তৎকালীন গভর্ণরকে স্বপ্নে হুজুর পাক (সাঃ) এই বলে নির্দেশ প্রদান করেন যে, পারস্য হতে আগত যার নাম জামী (রঃ) তাকে যেন কোন মতেই মদীনায় যেতে দেয়া না হয়। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মক্কার গভর্ণর তাকে পাকড়াও করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। এরপর গভর্ণর আবার হুজুরে পাক (সঃ)-কে স্বপ্নে দেখেন। স্বপ্নে রাসুলে পাক (সঃ) বললেনঃ
"আবদুর রহমান জামী (রঃ) কোন অপরাধী নয়। বরং সে কিছু কবিতা রচনা করেছে। এখানে এসে সে এগুলো আমার রওজার পাশে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করতে চায়। যদি  এমন হয়, তাহলে শরীয়তের আইন ভংগ করে রঁওজা হতে আমার হাত মাসাফাহার (Hand Shake) জন্য বের হয়ে আসবে। তা ঠিক হবে না। তাই তাকে বলো-এখানে এসে সে যেন এই কবিতাটি পাঠ না করে "। স্বপ্নের মাধ্যমে এ সুসংবাদ শুনে গভর্ণর কারাগার হতে তাঁকে মুক্ত করেন এবং তাঁর প্রতি বিরাট সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করেন। (কাসিদা-ই-নু'মান, পৃষ্ঠা ৩১২-১৩)। সে বিখ্যাত কাসিদাটি ছিলঃ

তানাম ফারসুদা জা পারা, জে হিজরা ইয়া রাসুল আল্লাহ
দিলাম পাজ মুর্দা আওয়ারা জে ইসইয়া, ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
চুন সু.ইয়ে মান গুজার আরি, মানে মিসকীন জানা দারি
ফিদা.ই.নাকস.ই.নালাইনাত, কুনাম জা, ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
জে খারদা খাইশ হাইরা নাম, সিয়া সুদ রোজ ইসইয়ানাম
পাসেমা নাম, পাসেমা নাম, পাসেমা নাম ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
জে জামে হু্ব্ব তু মাস্তাম, বা জানজিরি তু দিল বাস্তাম
না'মি গুইয়াম কি মান বাস্তাম, সুকুন দা ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
চুন বাজু.ই শাফা'য়াত রা, খুশাই.ল বার গুনাগারা
মাকুন মাহ.রুমে জামে রা, দারা আন, ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
উল্লেখ্য যে, সেই নবীপ্রেমিকও মাহবুবে খোদা শব্দটি ব্যবহার করতে সাহস দেখাননি। এমনকি হযরত ওয়ায়েস কারণী (রাঃ) ও ব্যবহার করেননি। এমনকি হযরত মুসা (আঃ) ও যিনি আল্লাহ পাকের সাথে সরাসরি তুর পর্বতে কথোপকথন করতেন, তিনিও ব্যবহার করেননি । কিন্ত্তু হাল জামানায় এমন সব বিখ্যাত বিখ্যাত খেতাব যুক্ত পীর ফকির দরবেশ দেখা যায়, যারা অধিকাংশই পান্ডিত্যবহুল কেতাবীজ্ঞানে জ্ঞানী। কিন্ত্তু আধ্যাত্মিকতা তাদের জন্য সুদুর পরাহত। যদিও এসব বিষয়ে মাথা না ঘামালেও চলতো কিন্ত্তু বাহুল্যের কারণেই হোক কিংবা অন্যকোন কারণেই হোক, যে বা যারা এই শব্দটি ব্যবহার করছে, তার পক্ষে অবশ্যই কোন না কোন কারণ আছে। কারণটা কি, সেটা সেই ভালো জানে।

দোকানী আমাকে চা দিল। শীতের এই আমেজে এককাপ গরম চা যে কি পরিমাণ আনন্দ দিতে পারে, তা কেবল প্রত্যক্ষদর্শীরাই বলতে পারবে। আমার সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হলো - শ্বেতার লেখাটি পড়ে।
(চলবে)