পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৬

নিজ দর্পণ ও দর্শনঃ অনুভবের নতুন দিগন্ত

মনা আমাকে ডেকে বললোঃ
-কি রে কি করছিস?
-তেমন কিছু না। বসে আছি।
-একটা গল্প শুনবি।
-বলো। তার আগে বলো তুমি কেন আমাকে গল্প শুনাতে চাইছো?
-গল্পটির মধ্যে একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। দেখি তুই ধরতে পারিস কি-না?
-ঠিক আছে। বল....
মনা তার গল্প বলা শুরু করলোঃ শোন তাহলে-
এক বনে ভেতর মনের সুখে বাস করতো পশু-পাখিরা। তাদের মধ্যে কোন মনমালিন্য ছিল না। ছিল না কোন বিভেদ। বনের রাজা সিংহ মশাই তাই আরামেই দিন গুজরান করছিল। তার মন্ত্রী মশাই বাঘ মামা নাকে তেল দিয়ে অঘোরে ঘুমাতো। কিন্ত্তু বিপদে ছিল পন্ডিত মশাই শিয়াল মামার । রাজার আদেশ ছিল প্রজাদের খোঁজ খবর নেবার। সে দুর দুরান্তে প্রত্যন্ত অন্ঞ্চলে ঘুরে ফিরে প্রজাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফিরে খবরাখবর নিত। কে কেমন আছে?
একদিন সেই শিয়াল গেল দুরের কোন এক গ্রামে। মাথার উপর তখন প্রচন্ড রোদের তাপ। উত্তাপে শিয়াল বেশ কাহিল হয়ে পড়লো। আশে পাশে কারো কাছে যে আশ্রয় নেবে সেই উপায়ও নেই। কি করা...বেচারা কষ্ট করে হাঁটতে হাঁটতে একটা গাছ তলায় আশ্রয় নিল। সেই সময় সে চিন্তা করলো ক্ষাণিকক্ষণ বিশ্রাম নিলে মন্দ হতো না। কিন্ত্তু তার আগে পেট পুরে পানি খাওয়া দরকার। কোথায় পানি পাওয়া যায়...কিছু দুর হাঁটার পর সে একটা পুকুর দেখতে পেল। পরিস্কার স্বচ্ছ পানি। সে আজলা ভরে পানি পান করলো। হটাৎ সে দেখতে পেল সেই পানিতে তারই মতো দেখতে অবিকল আরেকটি শিয়াল। আরে..এটা আবার কে...প্রথমে সে ঘাবড়ে গেল। তারপর সে আবারো উঁকি দিল সেই পুকুরে। দেখলো-তারই মতো দেখতে...অবিকল সে-ই যেন। নিজেকে নিজে দেখতে পেয়ে শেয়ালের মনে আনন্দ আর ধরে না..সে নাচতে নাচতে গাইতে শুরু করে দিলঃ-
আমি দেখেছি আমারে, গভীর কালো পদ্মজলে
আমার আমিকে খুঁজে ফিরে পেয়েছি আজ সদ্যমুলে।
গান গাইতে গাইতে সে যাচ্ছে আর নাচছে। শেয়াল পন্ডিত বলে কথা। আশে পাশের বনের সমস্ত পশু-পাখি শেয়ালের গান শুনে হতভম্ভ হয়ে গেল..তারা বুঝতে পারলো না...তার সেই গীত নৃত্যের মর্ম কথা।
এদিকে সেই কথা বনের রাজা সিংহ মশাইয়ের কানেও গেল। সে মন্ত্রীকে আদেশ করলোঃ যাও...এক্ষুণি ঐ ব্যাটাকে ধরে নিয়ে এস। যথা আজ্ঞা বলে মন্ত্রী মহাদয় বেরিয়ে পড়লো। তারপর সে শিয়াল ব্যাটাকে ধরে নিয়ে আসা হলো রাজ সভায়। সিংহ মশাই শেয়ালের কাছে জানতে চাইলো-মুল বিষয়টি কি?
শেয়াল সবিস্তারে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। শুনে সিংহ মশাইও সেটা দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলো। সাথে অনেকেই গেল।
সত্যিইতো...সিংহ তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে চায়নি যে নিজেকে দেখা যায়...বাঘও বাদ গেল না..একে একে সকলেই নিজেকে দেখার আগ্রহ নিয়ে যখন দেখা শুরু করলো-ঠিক তখনই পুকুরটির পাড় ভেঙ্গে হুড়মুড় করে সবাই পানিতে পড়ে গেল। তারপর কে কার আগে উঠবে, সে প্রতিযোগীতায় মত্ত হয়ে সকলেই ডুবে মরলো।
দুরে দাঁড়িয়ে শেয়াল তখন বললোঃ
"যখন আমি আমাকে দেখলাম - একা দেখলাম। যখন সকলকেই দেখলাম - আমরা হলাম। তাও ঠিক ছিল। কিন্ত্তু সকলই যখন সকলকে দেখতে চাইলো তখনই সর্বনাশ হলো।"
এখন বল। এই গল্পটি থেকে তুই কি শিখলি?
-গল্পতো গল্পই। এর থেকে শেখার কি আছে?
-আছে রে বোকা। সব গল্পই কেবল গল্প নয়। গল্পের ভেতরও রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। তুই যদি ভালো করে লক্ষ্য করিস, তাহলে দেখবি ধর্মগ্রন্থগুলিও বিভিন্ন নবী-রসুলদের কেচ্ছা-কাহিনীর বর্ণনা আছে। আবার যদি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ দেখিস,তো সেখানেও পাবি গল্প। যেমনঃ গীতায় অর্জুনের সাথে শ্রীকৃষ্ণের কথোপকথন। আবার রামায়ণে সীতার কাহিনী বর্ণিত আছে। প্রতিটি ধর্মগ্রণ্থেই গল্পের অবতারণা করা হয়েছে। এছাড়া মসনবী শরীফেও গল্প আছে।
-তাই না-কি?
-হ্যাঁ ঠিক তাই। তুই পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলি ভালো করে পড়ে দেখিস। তাহলেই আমার কথার সত্যতা পাবি। এখন বল্ এই গল্প থেকে তুই কি শিখলি?
-শিখলাম এটাই যে, মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিন রব রুপে প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই নিহিত আছেন সুপ্তাবস্থায়। এই রবকে দেখার জন্য নির্জন সাধনা একান্ত প্রয়োজন। যখন সাধনায় সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়, তখন রব জাগ্রত হয়ে তার সম্মুখে জাহির হয়। সেটাকে তখন হুর বলে। এই হুর দর্শন তথা আমাকে আমি দর্শন করার সমতুল্য। যেমন শিয়াল মহাশয় একা পানি খেতে যেয়ে নিজেকে দেখেছে। এইটাই তার দর্শন। সে তার ভেতর যে আমি রুপী রব আছে, সেটা অনুভব করতে পেরেছে। একে একে সবাই তা অনুভব করতে পেরেছে। কিন্ত্তু সকলেই সেই রবের দর্শন পায়নি। কাজেই নির্জন সাধনা ব্যতীত রবের দর্শন সম্ভবপর নয়।
-শিয়াল কি বলেছিল? শিয়াল বলেছিলঃ যখন আমি আমাকে দেখলাম - একা দেখলাম। তার মানে সে নিঃস্ব। নিজেই নিজের মধ্যে বন্ধী ছিল। যখন সকলকেই দেখলাম - আমরা হলাম। অর্থাৎ যখন সকলেই একসাথে দেখলো তখন তারা তাদের মধ্যে নিজেেদরকে দেখে আমরা হয়েছে। যেমনঃ সিংহ দেখেছে আমি, বাঘ দেখেছে আমি, হরিণ দেখেছে আমি। এই আমি-এর সমষ্ঠিই হচ্ছে আমরা। অর্থাৎ আমরা-আমি, তুমি, সে। আনা-লতিফা-মুনজিল। এরুপে প্রকাশ। প্রথমে হযরত আদম (আঃ)। এরপর হযরত হাওয়া (আঃ)। তারপর তাদের মাধ্যমে জগতের প্রকাশ। আমরা আসলাম। বুঝা গেছে কিছু?

আমি আর কিছু বললাম না। কেবল তাকিয়ে দেখলাম মনার দিকে.....কেমন যেন অদ্ভুত দেখাচ্ছে মনাকে।

ময়না ও মনা পাগলার কথোপকথনঃ অনুভবের এক নতুন দিগন্ত

মনা একটি ময়না পাখি কিনে এনেছে। মনা শুনেছে ময়নার ভোকালকড নাকি মানুষের কাছাকাছি। তাকে শিক্ষা দিলে সে সবকিছু বলতে পারে। তাই মনার খেয়াল হলো সে তার কেনা ময়নাটিকে কথা শেখাবে। কিন্ত্তু কি শিখাবে? অনেক ভেবেচিন্তে সে ঠিক করলো তার যা ইচ্ছা তাই সে শেখাবে। তার আগে তাকে তার নিজের ভাষা শেখাবে। যাতে সে সব কিছুই বলতে পারে।
মনার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সে ময়নাটিকে কথা বলাতে সমর্থ্য হলো। একদিন মনা তার প্রিয় ময়নাটিকে জিগ্যেস করলোঃ
-আচ্ছা তুই যখন জঙ্গলে ছিলি তখন কি ভালো ছিলি না-কি এখন ভালো আছিস?
উত্তরে ময়নাটি বললোঃ
-আমি যখন জঙ্গলে ছিলাম তখন স্বাধীন ছিলাম। উন্মুক্ত আকাশে দিগন্ত জোড়া ডানা মেলে উড়তে পারতাম। দিক বিদিগ ছুটে বেড়াতে পারতাম। আমার স্বজাতীয়দের সাথে কথা ভাব-ভালোবাসা বিনিময় করতে পারতাম। কতো সুখে ছিলাম আমি। তুমি আমাকে ঐ মুক্ত অবস্থা হতে ধরে এনে এই খাঁচায় বন্দী করেছো। এখন আমি না পারছি ঐ নির্মল আকাশে উড়তে, না পারছি আমার স্বজাতীয়দের সাথে মেলা মেশা করতে? তুমিই আমার সর্বনাশ করেছো?
-কিভাবে আমি তোর সর্বনাশ করলাম?
-তুমি আমাকে তোমার ভাষা শিখিয়ে তোমার মতো করে গড়ে তুলেছো। তোমার ভাষায় আমি আমার স্বজাতীয়দের সাথে ভাব-ভালোবাসা বিনিময় করতে পারবো না। তারা আমার কথা বুঝবে না...যেহেতু তুমি তোমার মতো করেই আমাকে বির্নিমাণ করেছো।
-তাহলে তুই আমার ভাষা কেন শিখলি?
-তুমি শিখিয়েছো তাই। আমিতো প্রথমে শিখতেই চাইনি। তুমি আমাকে বন্ধী করে জোর করে শিখিয়েছো। না শিখতে চাইলে তুমি আমাকে মারতে...আহার বন্ধ করে দিতে...আমি অনাহারে থেকে শিখেছি....এ থেকে আমার মুক্তি নেই। আমাকে মুক্ত হতে হলে অবশ্যই তোমার আনুগত্য করতে হবে। তাই তোমার আনুগত্য স্বীকার করে আমি তোমার মতো করে নিজেকে বির্নিমাণ করার কাজে মনোযোগী হলাম।
এখন দ্যাখ, আমি কতো সুখে আছি। প্রতিদিন কতো মানুষ আসে আমাকে দেখবার জন্য। যারাই আসে তারাই অবাক হয়। ভাবে,..বন্যপাখি কি ভাবে তাদের ভাষায় ভাব বিনিময় করে? তারা জানে না, আমার গুরু ইনসানে কামিল।
ময়নার মুখে কথাগুলো শোনার পর মনা একটা চিৎকার দিয়ে বলে উঠলোঃ-
আন্তা ফাওক্কী,আন্তা তাহতী, আন্তা আমামী, আন্তা খালফী, আন্তা ফি ওয়া আনা মা'আল জিহাতি ফিহা আয়নামাতুয়াল্লু ফা ছাম্মা ওয়াজহুল্লা।"
উঠাও আবরণ দাও দরশন, তোমার আমার রবে না চিনন
তুমি আসিলে রব না আমি, তোমার আমার হবেগো দেখা।।
[ কালামে পাক হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী(রহঃ)]

মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬

মৃত্তিকা মায়াঃ মনার অনুভব


মনা একমুঠো মাটি নিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করছে। তার হাতে কিছু সিমের বীজ। আর কিছু খেজুরের বীজ। বীজগুলো নিয়েও সে নাড়াচাড়া করছে। উল্টে পাল্টে দেখছে। কিন্ত্তু কিছু বলছে না। মাটিগুলো একটি জায়গায় গর্ত করে তার থেকে উঠানো হয়েছে। গর্তটির মধ্যে সে বীজগুলো পুঁতে ফেলল। তারপর পানি ঢাললো। দুর থেকে অনেকেই মনার এ কীর্তিকলাপ দেখছে। কিত্তু কেউ কিছু বলছে না। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে মনার কার্যটাই দেখছে। অার তা দেখে মনা মিটি মিটি হাসছে। কারণ কি?

এবার মনা হাসতে হাসতে উঠে এল। তারপর সোজা চলে এল মোবারক মামার চায়ের দোকানের সামনে। ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে মনা মোবারকের দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-মোবারক ভাই, ফাস কেলাস একটা চা বানাইয়্যা দেনতো খাই।

-তাতো দিমু। তয় মামা এখখান কতা জিগাই।

-কি জিগাইব্যা তা আমি জানি। ঠিক আছে তারপরও তুমি কও...কি কতা...

-মামা, আপনেরে দেকলাম পরথত মাডি উডাইলেন। তারপর হেই মাডিডি চিপরাইলেন। ধুলা বানাইয়্যা হালাইলেন। আবার মাডিডি থুইয়্যা বীজগুলি লইয়্যা দাপাদাপি করলেন। গর্তের মইদ্যে হেডিরে হালাইয়্যা মাডি দিয়্যা পানি দিলেন। ঘটনাডা কি মামা?

-জানতাম তুমি জিগাইব্যা...আগে চা দেও। চা খাই আর একটা বিড়িও দিও। খাইতে খাইতে কই....

মোবারক মনার জন্য সুন্দর করে একটা চা বানালো এবং একটি সিগারেটও দিল। মনা উদাস ভংগিতে কি যেন ভাবতে ভাবতে চা খাচ্ছে আর সিগারেটে একটা করে টান দিচ্ছে। কিন্ত্তু কিছু বলছে না...চুপ থাকতে দেখে মোবারক আবারো মনাকে ইয়াদ করাইয়্যা দিল...চা সিগারেট শেষ করে মনা এবার তার মতো করে বলতে শুরু করলোঃ

-শুন মিয়া....পরথম মাডি উডাইয়্যা দেকবার চাইলাম - এই মাটি দিয়া আমাগো সৃষ্টি করছে। এই মাটিতেই আমাগো আবারো শোয়ানো অইবো। আবার এই মাডি থিক্ক্যাই আমাগো উডাইবো [মিনহা খালাকনাকুম....তারাতান উখরা]। আমি তার লাইগ্যা মাডিডারে ভাল কইর‌্যা দেকবার চাইলাম। কেমতে উডাইবো? সবতো এই মাডিই খাইয়্যা হালাইবো। তহন আড্ডি গুড্ডি ছাড়াতো কিছুই থাকবো না..একসময় হেইডাও থাকবো না.....তাইলে কেমতে কি? পরক্ষণেই মনে পড়লো আল্লাহয় কইছেঃ ওয়াল্লাহু আনবাতাকুম মিনাল আরদে নাবাতান-সুম্মা ইউয়িদুকুম ফিহা ওয়া ইউখরেজুকুম ইখরাজান। [ বরং অাল্লাহ তোমাদিগকে উদভুত করিয়াছেন ভুমি হইতে। উদ্ভিদের ন্যায়। অতঃপর তিনি উহাতে তোমাদিগকে ফিরাইয়্যা লইবেন এবং তিনি তোমাদিগকে সেখান হইতেই বাহির করিবেন-এক নুতন জাত হিসেবে।] হেইডা মনে অওনের পরথিকক্যা....হাসলাম...

-হ দেকলামতো আপনে খালি হাসতেছন। দোকানের বেবাকতেই দেকছে। আমারে খালি জিগায় মোবারক, মনায় খেজুর বিচি দেইখ্যা ওমনে হাসতাছে ক্যা....বিচির মইধ্যে কি দেকছে...

-ভাইরে বিচির মইধ্যে কি দেকছি হেই কতা সমাজের কাছে ভাইঙ্গ্যা চুইর‌্যা কওন যাইবো না...বিচির রহস্য বড়োই বিচিত্রময়...বিচিত্রময় এই মাডিও। একই মাডি থিক্ক্যা একেক রকমের গাছ অয়। মরিচের বিচ হালাইলে মরিচ অয়..হেইডা ঝাল..আওউক লাগায়। রস মিষ্টি। খেজুর লাগায়...রস মিষ্টি...কতো কি লাগায়...কত কি অয়...এইডারেই কয় কুদরত। এই কুদরতি খেলা খেলতে গিয়া ধরা দিল এই মাডির শরিলটাতে। এই শইল্যের মইধ্যেই হেয় অাছেরে বোকা...এই মাডিডায়ই মায়া লাগাইছে। মাডিরে ভালো বাসতে শিক। উচা উচা কতা কইয়্যা আর ফালাইয়্যা লাব নাই। হগ্গলরেই এই মাডির মধ্যে হান্দাইতে অইবো। সময় থাকতে মাডির মতো অইয়্যা যাগা....মায়া করতে শিক...দরদ দিয়া যত্নআত্তি কইর‌্যা যারে পালতাছস....হেয় একদিন উড়াল দিবই দিব...যুদি হেরে ধইর‌্যা রাখতে না পারস..তার কোন ঠিকানাও পাবি না,, কোন নিশানাও পাবি না.....কাঁহাছে আনা কাঁহাছে জানা...না নিশানা নাই ঠিকানা [কালামে হযরক থাজা শাহ্ পীর চিশতী (রঃ)]....। ধরতে পারলে আর মরণ নাইরে পাগলা.....কবরে হাশরে মাওলা থাকবোরে তোর সংগ যাই....দিন থাকিতে পন্থ ধরা চাই....[কালামে হযরত থাজা শাহ্ পীর চিশতী (রঃ)]।

মনা তার বুকের বাম পাশটায় হাত রেখে বললোঃ

" হৃদয়ও বনে অতি গোপনে একারও বাঁশি শুনেছি প্রাণে...মরমে মরি চাহি নেহারি...সন্ধানে আমার পাইবে দেখা" [কালামে হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ)]। গভীর রাইতে বইস্যা বইস্যা এই মাটির শইল্যের মধ্যে কান পাইত্তা হুনবি...হেয় কি কয়...হেরে সময় থাকতেই চিনন লাগেরে পাগলা....দিবসও ফুরাইয়্যা গেলে মতি গতির ঠিক নাই....দিন থাকিতে পন্থ ধরা চাই...রে অবোধ ভাই....যহন তারে চিনবি তহন কবি..উঠাও আবরণ দাও দরশন তোমারও আমার রবে না চিনন...তুমি আসিলে রব না আমি...তোমারও আমার হবে গো দেখ্যা..[কালামে হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ)]।

মনা উঠে যেতে যেতে বললো-যত্ন কর....এই মাডিটারে য্ত্ন কর....যতনে রতন মিলে...

মনার কথা শুনে উপস্থিত সকলেরই মুখ হা হয়ে গেল। কেউ কোন কথা বললো না। কেবল মোবারকের চোখের দেখা দিল....একফোঁটা বারিবিন্দু...যা সৃষ্টি হয় মহা সিন্ধু থেকে...এর উৎসও কেউ জানে না...ছোট্র এই দেহের মধ্যে কি অমুল্য ধনই না তিনি রেখেছেন...

বুধবার, ১০ আগস্ট, ২০১৬

বিভ্রান্ত ও পথহারা এক পথিক

----------------------------
বিভ্রান্ত ও পথহারা এক পথিক
-----------------------------
এলোমেলো পথ চলায় আমার আনন্দ। এ আনন্দের স্বরুপ উপলব্দি করার জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে কোন অচেনা পথে হাঁটা। তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়লে কোন ছায়া সুনীবিড় বৃক্ষ তলের কোন একটি টং দোকানে বসে পড়া। আর সে যদি সাথে থাকে ঝির ঝির পাতলা বাতাস, তাহলে চোখ দুটো একটু মুদে থাকুন। স্রষ্টাকে স্বরণ করুন। কেননা, এ বাতাসের জন্য আপনাকে কোন ট্যাক্স দিতে হবে না। কোন সুইচ অন করা লাগবে না। বিনা মুল্যে পেয়ে যাবেন প্রাণকে শীতল করা পরশবুলি। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো-সেখানে আপনি পাবেন একদল জ্ঞানীমানুষ। যারা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে থাকে। তেমনি একজন জ্ঞানী মানুষ পেলাম। নাম বশির মিয়া। হাড় জিরজিরে কংকালসার শরীর। কাঁধে একটি লাল গামছা। লুঙ্গিপড়া। সে বসে আছে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে। একটি পা মাটিতে অন্য পা বেঞ্চিতে রাখা। সে বেশ আয়েশের ভঙ্গিতে বসেই আলাপ চারিতা করছে। আলাপের বিষয়বস্ত্তু ঠিক মতো ধরতে পারছি না। যেহেতু প্রথম থেকেই ছিলাম না, তাই মাঝখান থেকে শুনতে হচ্ছে। সে বলছেঃ অাল্লাহ পাক কুরআন পাক যখন সর্ব প্রথম নাযিল করলেন তখন নবী মস্তফা (সাঃ) তা পড়তে পারলো না। হযরত জিব্রাইল আঃ জিগ্যাসা করলেনঃ পড়....সে বললোঃ আমি পড়তে পারি না। এরপর জিব্রাইল তারে যখন ধইর‌্যা ছিনায় চাপ দেয় তখন সে পড়তে পারে। সে তখন পড়ে একরা বিসমি রাব্বিকাল লাজি খালাক্...তাইলে দেখা যাইতাছে হযরত রসুলে পাকের ওস্তাদ হইতাছে জিব্রাইল আঃ। কি বলেন আপনারা? জিব্রাইল যদি তারে ছিনায় চাপ না দিতো তাইলে কি নবী পড়তে পারতো? পারতো না....
বশির মিয়ার কথা শুনে মেজাজটা বিগড়ে গেল। আমি তাকে বললামঃ বশির ভাই, এদিকে আসেন। আমি পকেট থেকে গোল্ডলিফের প্যাকেটটা বের করে তাকে ইংরেজিতে লেথা Make by British American Tobacco Bangladesh লেখাটা পড়তে দিলাম। বললাম পড়েন। সে বললোঃ ভাই অামিতো ইংরাজি পড়তে পারি না। ও ...তাই...এদিকে আসেন। সে আসতেই তাকে ধরে জোরে চাপ দেই। সে ওরে বাবারে মইর‌্যা যাইতাছি গা...ছারেন...ছারেন...ও ভাই ছারেন বলে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। তারপর বললামঃ পড়েন...কি পড়মু ভাই...এই যে এই লেখাটা....কেমতে পড়মু....কেন্ আপনি না বললেন জিব্রাইল ফেরেস্তা নবীকে ধরে চাপ দিল আর নবী পড়া শুরু করে দিল...আরে ভাই আপনে কি জিব্রাইল ফেরেস্তা......কি বলা যায়...

যেখানে দেখিবে ছাই কুড়াইয়া দেখ তাই

সদরঘাটের রাস্তা-ঘাট সর্ম্পকে যাদের কিঞ্চিৎ ধারণা আছে, তারা বোধ করি দেখে থাকবেন সারি সারি বইয়ের দোকান। তার মাঝে আছে পশরা সাজিয়ে কম দামে বই বিক্রি করার কিছু দোকানী। " যারা দেইখ্যা নেন দশ টাকা বাইছ্যা নেন দশ টাকা " দামের কিছু বই বিক্রি করে থাকে। তেমনি একটি বইয়ের পশরার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। দেখছি কি কি বই বিক্রি করে। বইগুলো উলট পালট করে দেখতে থাকলাম। দেখলাম আছেঃ বেহেস্তের শান্তি দোযখের অাযাব, নেকী বদীর হিসাব-নিকাশ, দশ লক্ষ নেকীর দোয়া-কালাম, স্বামী-স্ত্রীর মধুর মিলন, ওয়াজে ইসলাম, সাওয়াল-জওয়াব ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে দৃষ্টি নিবন্ধিত হলো একটি বইয়ের উপর। উপরের মলাটটা হাওয়া হয়ে গেছে। হাল্কা-পাতলা চটি ধরণের বই। পিনআপ করা। বইটির মাঝখানে লেখাঃ মকতুবাদে খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী (রহঃ) ও আসরারে হাকিকী। অনুবাদ-জিয়াউল আলম মোহাম্মদ ই্‌উসুফ খাঁ।
হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ মঈনউদ্দিন চিশতী (রহ) তাঁর প্রিয়তমযোগ্য শিষ্য হযরত খাজা কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহঃ) এর উদ্দেশ্যে লিখিত পত্রাবলী। বইটি হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলামঃ
-------------------------------------
বইটির ভুমিকা নামক অধ্যায়ে হাদিয়া নামক স্থানে লিখিত আছেঃ
যে মহান আউলিয়াকুল চুড়ামণির অপুর্ব আধ্যাত্মিক তত্ত্বের সুখ্যাতি বিভক্তি পুর্ব সমগ্র ভারতবর্ষে, উপজাতীয় সীমান্ত অন্ঞ্চলে, আফগানিস্তান ইরানে এবং আরব জগতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল যাহার দারাজ দাস্ত মোবারকে হিন্দু মুসলমান, খ্রীষ্টান ইহুদী পারসিক জৈন এবং বৌদ্ধ মারাঠী ইত্যাদি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে জামে মারেফাত পান করিয়া রাহে নাজাতের সন্ধান পাইয়াছে-যাহার খেদমত পাকে হায়দারাবাদের নিজাম বাহাদুর রামপুর ভুপাল এবং আলীগড়েরর নবাব নাজিমগণ ছের বাছজুদ থাকিতেন-যাহার নির্দেশ মোতাবেক ও তত্ত্বাবধানে জামানা দারাজ পর্যন্ত আজমীর শরীফের পবিত্র উরছ শরীফ সুসস্পন্ন হইত- যাহার শানে পবিত্র মক্কা মোয়াজ্জেমা নিবাসী ছৈয়দ হাবিব উলুবি উদাত্ত কন্ঠে গাহিয়াছেন-
ভাই কি দেকতাছেন? নিলে নেন, না নিলে রাইখ্যা দেন। খাড়াইয়্যা খাড়াইয়্যা খামাখা কেচ্যাল কইরেন না...দোকানীর কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সাথে সাথে দশটি টাকা দিয়ে বইটি কিনে নিলাম।
এমন একটি অমুল্য ধন যে দশটি টাকার বিনিময়ে পেয়ে যাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি। হয়তো গরীব নেওয়াজের অশেষ রহমত ও নেগাহ পাকের করমে ভাগ্যগুণে পেয়ে গেছি। যদিও দশটি টাকা এই পার্থিব জীবনে অতি নগণ্য কিন্ত্তু যে বস্ত্তুটি ক্রয় করেছি তার মুল্য হয়তো অপার্থিব জীবনে অমৃত সুধার ন্যায় শরাবান তাহুরা...

শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০১৬

যাদুকর ও মনার ভোঁ দৌড়

মীরপুর ১নং শাহ্ আলী (রহঃ) মাজার গেটের কাছে বেশ একটা জটলা দেখা যাচ্ছে। চারদিক থেকে গোল হয়ে সেই জটলা একটা সময়পর বেশ বড়ো সড়ো আকার ধারণ করলো। মনা পাগলা বেশ আগ্রহ নিয়ে সেই জটলার মধ্যে ছেলেমানুষের মতো বসে বসে দেখছে। কি দেখছে? দেখছে একজন যাদুকর তার যাদু দেখাচ্ছে। যাদুকরের বেশভুষা আহমরি কিছু নয়। দেখতেও খুব একটা সুশ্রী বলা যাচ্ছে না। কিন্ত্তু তার কথা-বার্তার ধরণ এবং যাদু দেখে হাজারো মানুষকে আকৃষ্ট করছে। সেই যাদুকর একটা ডিম বল হাতে নিয়ে সবাইকে দেখাচ্ছে আর বলছেঃ

-বাই আমার আতে এইড্যা কি দেখতাচ্ছেন? একটা ডিম বল। তাই না ? কি বাই ? কতা কন্ন্যা ক্যা ?

জনসমুদ্র হতে অনেকেই চিৎকার করে বলছেঃ

-হ এইডা একটা ডিম বল। 

যাদুকর বললোঃ

প্রয়োজন হইলে আপনেরা হাতে নিয়া দেখতে পারেন। তারপর যাদুকর সেই বলটা নিয়ে জনগণকে হাতে নিয়ে দেখাচ্ছে। মনাও বাদ গেল না। সে বলটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে বললোঃ

-হাচাইতো একটা প্যালাষ্টিকের বল। ডিমের লাহান দেহা যাইতাছে।

যাদুকর মনার হাত থেকে বলটা নিয়ে বললোঃ 

-এইবার দেকবেন আসল খেলা।

এই বলে সে বলটাকে তালু বন্ধি করলো। তারপর সে তুড়ি বাজাতেই বলটা গায়েব হয়ে গেল। তার হাতের মধ্যেই যে বলটি ছিল, তা মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল। সকলেই অবাক হয়ে সেই যাদুকরের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর সেই যাদুকর বললোঃ

-দেকছেন মুহুর্তের মইদ্যেই বলডা গায়েব হইয়্যা গেল। এহন এই বলটা কই পাই? দেহেন কি করি? বলটাতো আননের দরকার...এই বলে সেই একটি অপরিচিত ছেলেকে বললোঃ

-বাবা হা করতো? ছেলেটা হা করতেই যাদুকর বললোঃ 

-আয়তো...
অায়তো বলার সাথে সাথে বলটা ছেলেটির মুখের মধ্যে চলে এল। সে বলটা সবাইকে দেখিয়ে বললোঃ

-দেকছেন? ডিম মনে কইর‌্যা পুলাডা খাইয়্যা হালাইছিল। আরে বাবা আমার জিনিস তুমি খাইয়্যা হালাইব্যা আর আমি সালাম যাদুকর চাইয়্যা চাইয়্যা দেকমু, হেইড্যা অইবো না....

এবার সে ঐ ছেলেটাকে ডেকে তার কাছে নিয়ে এল। তারপর মুখ খুলতে বললো। ছেলেটা মুখ খুলতেই যাদুকর মুখের ভেতর বলটি ঠেসে ধরে বললোঃ যা গা...বলটা যাদুকরের হাতও নেই ছেলেটির মুখেও নেই। সকলেই মুগ্ধ হয়ে যাদুকরের সেই অভাবনীয় যাদু দেখছে। কারো মুখের দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। সকলেই অবাক বিষ্ময়ের সাথে যাদুকরের যাদুর প্রশংসা করছে। এরপর যাদুকর ছেলেটিকে বসতে বললো। ছেলেটা বসলো। যাদুকর ছেলেটির পিঠের উপর দুইটা থাপ্পর মেরে বললোঃ বাইর অ। কথা বলা শেষ হতেই দেখা গেল বলটি ছেলেটির পশ্চাৎদেশ হতে বের হয়ে এল। এই দৃশ্য দেখে সকলেই হাসিতে ফেটে পড়লো। লজ্জা পেয়ে ছেলেটি দিল ভোঁ দৌড়।

যাদুটি দেখে মনা মনে মনে ভাবছে - এই বিশ্ব বিধাতা তাহলে যাদুকরের মতোই কুন-ফা ইয়া কুন বলে এই জগত সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ "বাদী‘উস্ সামা-ওয়া-তি অল র্আদ্ব অইযা-ক্বাদ্বোয়ায় আম্মান ফা ইন্নামা- ইয়াক্বুলু লাহু কুন্ ফাইয়া-কুন [بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ]।"  অর্থঃ তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়। দারুণতো....সে বেশ উৎসাহ বোধ করছে....ঠিক সেই মুহুর্তে

যাদুকর মনা পাগলার দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-বাজান আপনে একটু এইদিকে আহেনতো?

মনা তখনো হাসছে। সে হাসতে হাসতে সামনের দিকে গেল। তারপর যাদুকর সকলের উদ্দেশ্যে বললোঃ 

-এতক্ষণতো আপনেরা দেকলেন বলের খেলা। এইবার দেকবেন আশেক-মাশুকের খেলা। প্রেমের খেলা। মায়া মোহাব্বতের খেলা। দেহেন আমার আতে দুইডা পুতুল। একটা বেডা। আর একটা মাইয়্যা। এই পুতুল দুইডা একজন আরেক জনরে ছাড়া থাকতে পারে না। দেহেন কেমুন মোহাব্বত! আর আজ কাইল আমাগো মইধ্যে মোহাব্বত নাই বললেই চলে। বাজান আপনে একটু এই দিকটায় আহেন। এ কথা বলে সে মনাকে টেনে একটু দুরে দাঁড় করিয়ে রাখলো। তারপর একটা পুতুল মনার হাতে দিয়ে বললোঃ 

-বাই এই পুতুলটা এইহানে রাখেন। তারপর এই বাডি দিয়্যা চাইপ্প্যা ধইর‌্যা রাকবেন। খবরদার উডাইবেন না। যহন আমি উডাইতে কমু তহন উডাইবেন। তারপর দেখবেন খেলা। 
এ কথা বলেই যাদুকর তার হাতের পুতুলটি নিয়ে আরেকটি জায়গায় রাখলো। তারপর বাটি দিয়ে চেপে ধরে বললোঃ

-এ্যাই মজনু আয়তো বাবা.....

একথা বলার সাথে সাথে মনাকে বাটিটি উঠাতে বললো। সকলেই অবাক হয়ে দেখলো পুতুলটি সেখানে নাই। সকলেই অবাক হয়ে গেল। যাদুকর তার হাতের বাটি উঠাতেই দেখতে পেল সেই বাটির মধ্যে ছেলে পুতুলটি চলে আসছে। এটা দেখে সকলেই হাত তালি দিতে লাগলো। তারপর সে সেই খেলারই পুণারবৃত্তি করার কথা বলে মনার হাতে মেয়ে পুতুলটি দিয়ে পুর্বের মতোই চেপে ধরে রাখতে বললো। তার পর যাদুকর তার হাতের ছেলে পুতুলটি পুর্বের মতো করেই বললোঃ এ্যাই তরা যা গা। মনাকে বাটি উঠাতে বললো। মনা বাটি উঠালো। যাদুকরও তার বাটি উঠালো। দেখলো কোথাও পুতুল দুটি নেই। 

এটা দেখে তো মনার মাথা খারাপ হয়ে গেল। কেমনে, কি ভাবে হলো?
আশেক মাশুকের টানে থাকতে পারে না। আশেককে ডাকলে অবশ্যই মাশুক হাজির হবার কথা [উচ্চারণঃ"فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ অর্থঃ "অতএব তোমরা আমাকেই স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব, তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং আল্লাহর বিরুদ্ধাচারী হইও না।"]। কিন্ত্তু আমরা যে বলি আমরা নবীর আশেক। আমরা আল্লাহর আশেক। তাহলেতো নবীর আসার কথা। যে নবীর আশেক, সে যদি ডাকে তাহলে তো অবশ্যই নবী আসবে। আবার যে আল্লাহর আশেক, সে যদি ডাকে তাহলেতো আল্লাহপাকেরও আসার কথা।

একটা সামান্য যাদুকর যদি এটা করে দেখাতে পারে, তাহলে যারা সত্যিকারের আশেক, তারা যদি তার মাশুককে ডাকে, তাহলে তার মাশুক আসবে না কেন? যদি না-ই আসে, তাহলে সে কিরুপ আশেক? অামরা বলি আমরা সবাই পীরের আশেক। তাহলে তার পীর যদি তাকে ডাকে আর সে যদি না যায়, তাহলে সে কিরুপ আশেক? ইশকের আগুনে যদি অন্তরই না পুড়লো, তাহলে সেই অন্তর দিয়ে হাজারো ডাকলে মাওলার দিদার পাওয়া সম্ভব নয়। মাওলার দিদার পেতে হলে তার কথা সঠিক ভাবে পালন করতে হবে। তিনি যা বলেছেন, তাই অক্ষরে অক্ষরে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে হবে। আশেকের মাশুক হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। আশেকের মাশুকের খেলা বড়ো সাংঘাতিক খেলা। 

মনার মনে পড়লো তার গুরু তাকে ডেকে ছিল। সে যেতে পারেনি। তার কাছে যাবার মতো টাকা ছিল না। কারো কাছ থেকে যে টাকা নেবে তারও উপায় নেই। তাহলে সে কি আশেক নয়...সে কি সত্যিই আশেক নয়....

মনার বুক ফেটে কান্না আসছে। সে ভীড় ঠেলে বাহিরে বের হয়ে এল। তারপর ইয়া মুর্শিদ বলে একটা ভোঁ দৌড় দিল।

বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০১৬

বৃষ্টি নিয়ে ভাবনাঃমনা পাগলার চিন্তা

মনার আজ মন ভালো নেই। সে মন মরা হয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে বাহিরের আবহাওয়ার সাথে তার মনের একটা সর্ম্পক তৈরী হয়ে গেছে। এই শ্রাবণ মাসের বারিধারায় স্নাত হওয়া একটা সময় তার সিজোনাল বাথ থাকলেও তা এখন পাল্টে গ্যাছে। তার এই ধরণ সরণ সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল নয়। কিন্ত্তু তাকে যারা চেনে,তারা তার এই ধরণ-সরণ সম্পর্কে জানে। তাদেরই একজন হচ্ছেন জামিল ভাই। সেই জামিল ভাই এসে মনার কাঁধে হাত রেখে বললঃ
- কেমন আছেন?
- যেমন দেখছেন?
- দেখছি তো ভালোই আছেন।
- তাহলে ভালোই আছি।
- মন খারাপ কেন?
- ভাবচ্ছি।
- কি ভাবছেন?
- বৃষ্টির কথা...
- বৃষ্টির কথা ! জামিল ভাই কথাটা শুনে অনেকটা ভুত দেখার মতো করে চমকে উঠে বললেনঃ
- মেয়েটা কোথায় থাকে?
-আরে মিয়া, কিয়ের মাইয়্যা...আমি কইতাছি বাইরে যে বিষ্টি অইতাছে,হেইডার কথা..
জামিল ভাই দেখলেন মনা তার আসল রুপে ফিরে গেছে। তাই সে বেশ প্রফুল্ল বোধ করছেন। একটা স্বস্তি পাচ্ছেন। যাক্ শেষ পর্যন্ত মনাকে তার আসলরুপে পাওয়া গেল। তাহলে তার ভাবনার বিষয়টা জানা যেতে পারে....জামিল ভাই আস্তে করে মনাকে বললেনঃ বৃষ্টি সম্পর্কে কি ভাবছেন? সেটা কি বলা যাবে?
মনা দেখলো জামিল কেমন যেন মায়াবি গলায় কথাগুলো বলছে। মনার একটু দয়া হলো। সে ও আস্তে আস্তে করে জামিলকে বললোঃ

- তুমি যদি একটা পাত্রে পানি রেখে জ্বাল দিতে থাকো সেটা বাস্প হয়ে উড়ে যায়। সেটা জমে কখনোই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে না..তাহলে...কি পরিমাণ পানি বাষ্প হলে সেটা জমে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে....মাঝে ....মাঝে শিলাবৃষ্টিও হয়? সুর্যকে কে নির্দেশ দিল পর্যাপ্ত পরিমাণ তাপ দিয়ে পানিকে বাষ্পে পরিণত করতে? না-কি মাটির বুক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে সিক্ত করণের জন্য পানি প্রয়োজন? মাটি কি কান্না করছিল পানির জন্য? যদি কান্না করেই থাকে, তাহলে সেই কান্না আমরা শুনতে পাই না কেন? অার যদি কান্না না করেই থাকে, তাহলে সে কার কাছে পানির জন্য আর্জি প্রার্থনা করছিল?
দ্যাখো,মহান রব মাটির ডাক শুনে বৃষ্টির পানি দিয়ে তাকে সিক্ত করেছেন। যেন শক্ত মাটিগুলো রসালো হয়। রসের জন্য প্রয়োজন পানি। বিধাতা সেই পানি দিয়ে জমিনকে সিক্ত করছেন। কারণ জমিন থেকে যে ফসল উৎপন্ন হবে তা তার বান্দারা আহার করবে। সেই আহার থেকে খাদ্যরস দেহবীজে পরিণত হবে। তারপর নতুন কিছু শিশু দুনিয়াতে আগমণ করবে। কেউ কেউ নির্গমণও হবে। তারপরও কথা থেকে যায়..

- কি কথা?

- যে শিশুটি ভুমিষ্ট হবে সে হবে লাকাদ খালাকনাল ইনসানা ফি অাহসানে তাকবীম। সেই শিশুটিকে তিনি বিভিন্ন ধাপে ধাপে সৃষ্টি করেছেন। যেমন সুরা নুহ আয়াত নং ১৪। বলছেনঃ ওয়াকাদ খালাকা কুম আতওয়ারা.....তিনি (আল্লাহ) গঠন করিয়াছেন তোমাদিগকে উন্নতির নানা মাত্রায় (পর্যায়ক্রমে-বিভিন্ন ধাপে ধাপে)। সেই ধাপগুলো কি কি? একটু চিন্তা করে দেখ। এক সময় তোমার কোন অস্তিত্বই ছিল না। তুমি ছিলে নিরাকার। এরপর তোমার আকার দেয়ার প্রয়োজন হয়েছে। কখন? যখন তুমি নুৎফারুপে ছিলে। সেই নুৎফার উৎপত্তি এই মাটি। ফা ইন্না খালাকনাকুম মিন তুরাবেন [সুরা হজ্জ আয়াত-২২]। তোমাকে গঠন করিয়াছি মাটি হইতে। কিরুপে? ওয়াল্লাহু আনবাতাকুম মিনাল আরদে নাবাতান-সুম্মা ইউয়িদুকুম ফিহা ওয়া ইউখরেজুকুম ইখরাজান [সুরা নুহ আয়াত নং-১৭-১৮]। বরং আল্লাহ তোমাদিগকে উদ্ভুত কয়িাছেন ভুমি হইতে-উদ্ভিদের ন্যায়। অতঃপর তিনি উহাতে তোমাদিগকে ফিরাইয়া লইবেন এবং তিনি তোমাদিগকে সেখান হইতে বাহির করিবেন-এক (নতুন) জাত হিসাবে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কি জানো? ইনসান সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপটি। যেমন সুরা মোমিনুন আয়াত নং-১৪তে বলা হয়েছেঃ 
সুম্মা খালাকনান নুৎফাতা আলাকাতান মুদগাতান। অতঃপর অামরা সেই শুক্রবিন্দুকে দৃঢভাবে আটকাইয়া রাখি(জরায়ুতে)। ফা খালাকনাল মুদগাতা এজামান। পরে সেই দৃঢ়ভাবে আটকাইয়া রাখা বস্তুটাকে পরিণত করি চিবানো গোশতের পিন্ডরুপে। ফা কাসাওনাল এজামান লাহমান। এবং সেই চিবানো গোশতের পিন্ডকে রুপ দেই হাড়-হাড্ডিতে এবং সেই হাড্ডির উপরে দেই আবরণ-অক্ষত গোশতের দ্বারা।ছুম্মা আনশানা-হু খালক্কান আ-খার। অতঃপর তাকে অন্য একটি সৃষ্টি বানিয়ে দাঁড় করিয়েছি। ফাতাবা-রাকাল লাহু আহসানুল খালিকিন। সুতরাং তোমার সৃষ্টিকর্তা সুন্দরতম বরকতময়। 
দ্যাখো আল্লাহপাক কেবল মানব সৃষ্টির ব্যাপারেই কেবল বলেছেন ফাতাবা-রাকাল লাহু আহসানুল খালিকীন। আর অন্য সবার ক্ষেত্রে রাব্বুল আলামিন। খালিক তিনিই যিনি উপাদান ছাড়াই সৃষ্টি করতে পারেন। এ কথাটা কেবল আল্লাহ পাকের ক্ষেত্রেই খাটে। অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা, এই বিশ্ব ভুমন্ডল কেবল মাত্র মহান জাত পাক আল্লাহ পাকের। কাজেই তার উপাদান দিয়েই তুমি সৃষ্টি করছো। এজন্য তুমি হচ্চো সানে মানে দ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তা। যা কেবল ইনসানের ক্ষেত্রেই খাটে। এটা মাজেজি। হাকিকি নয়। পুর্ণ হাকিকি হচ্ছে মহান জাত পাক সুবহান ওয়া জালজালালি ওয়াল ইকরাম। তিনিই হচ্ছেন খালিক। তিনি ব্যতীত আর কেউ এ নামের যোগ্য নন।

মনার কথা শুনে জামিল ভাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতেই পারেননি বৃষ্টি নিয়ে কেউ এভাবে ভাবতে পারে? মনে মনে তিনি মনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা অবনত করলেন।