পৃষ্ঠাসমূহ

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলেঃ কিছু কথা

তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলেঃ কিছু কথা
---------------------------------------------
তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।।
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।।
কূল-মখ্‌লুকে আজি ধ্বনি ওঠে, কে এল ঐ,
কলেমা শাহাদাতের বানী ঠোঁটে, কে এল ঐ,
খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে, কে এল ঐ,
আকাশ গ্রহ তারা প’ড়ে লুটে,- কে এল ঐ,
পড়ে দরুদ ফেরেশ্‌তা,
বেহেশ্‌তে সব দুয়ার খোলে।।
মানুষে মানুষে অধিকার দিল যে জন,
“এক আল্লাহ্‌ ছাড়া প্রভু নাই’’ কহিল যে জন,
মানুষের লাগি’ চির-দীন বেশ নিল যে জন,
বাদশা ফকিরে এক শামিল করিল যে জন,
এল ধরায় ধরা দিতে সেই সে নবি,
ব্যথিত মানবের ধ্যানের ছবি,
আজি মাতিল বিশ্ব-নিখিল মুক্তি-কলরোলে।।

আবিদারা নামক একজন সাহাবী রসুলে পাক হযরত মুহাম্ম দ (সাঃ) -কে জিগ্যাসা করলেনঃ
ইয়া রাসুলআল্লাহ (সাঃ) - সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থায় আল্লাহ পাক কিরুপ অবস্থায় ছিলেন?
উত্তরে রসুলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াস সাল্লাম বললেনঃ
সৃস্টির প্রারম্ভে আল্লাহ পাক আল-আমা নামক একটি কুপে (অন্ধকারাচ্ছন্ন কুছঝটিকা-কুয়াচ্ছান্ন অবস্খায়) ছিলেন।[সুত্রঃসুফীবাদ ও চার তরীকার পীর - অধ্যাপক এ. এম খলীলুর রহমান পৃষ্ঠা নং-৩৯] তাছাড়া হাদিসে কুদসিতে আছেঃ 'কুনতু কানজান মুখফিয়ান ফাআহবাবতু আনউরাফা ফা খালাকতুল খালাক' - এ হাদীছে কুদছি দ্বারাও আল্লাহর অবস্থান গঞ্জ-এ- মু্খফিতে আছেন/ ছিলেন বলে জানা যায়।
প্রশ্ন হলোঃ যদি আল্লাহ পাক কুচ্ছঝটিকারুপেই থাকেন এবং রসুলে খোদা যদি দেখেই থাকেন, তাহলে-সৃষ্টির পুর্বে তার অস্তিত্ব ছিল। যার প্রমানঃ কুনতু আদামা বাইনাল্লাহি মাইয়াততিন [আমি তখনও নবী ছিলাম যখন আদম মাটি ও কাদার মধ্যে মিশ্রিত ছিলেন]।
দ্বিতীয় প্রশ্ন দাঁড়ায় - তিনি আল্লাহ পাককেও দেখেছেন [মান রানি ফাক্কাদ রায়ান হাক্কা]। যার প্রমাণ পবিত্র শবে মিরাজ শরীফ। কারণ সেখানে অন্য কারো যাবার অনুমতি ছিল না। কেবল রসুলে খোদা হাবীবে শান আহমাদ মুস্তফা মুহাম্মদ মুজতাবা হুজুর পাক সাঃ এবং মহান জাতপাক আল্লাহ পাকই ছিলেন। সাক্ষ্য কেবল তারা পরস্পর। আর তাদের সাক্ষ্যই চুড়ান্ত।
অবশ্য তা বিশ্বাসীদের জন্য। জ্ঞানীদের জন্য। অজ্ঞানী এবং অবিশ্বাসীদের জন্য নয়।
তৃতীয়তঃ রসুলে খোদা জানলেন কিভাবে যে আল্লাহ পাক সৃষ্টির প্রারম্ভে কুচঝটিকা রুপে ছিলেন? সেটা কিভাবে সম্ভব?
অনেকেই হয়তো আপত্তি তুলতে পারেন - নাওউযুবিল্লাহ ও বলতে পারেন। প্রশ্নও তুললে পারেন। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে এর স্বরুপটা তথা সত্যটা বুঝতে পারা যায়।
যে সত্যটা বিবৃত করেছেন অনেক সুফী-সাধক এবং সুফী কবিগণও।
যেমনঃ হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী(রহঃ) বলেছেনঃ

হ্যায় কাঁহা মুছাকে ইতনা তুমছে পেয়ারা মোর্তবা
তুমতো মাহ্ বুবে খোদা হো ম্যায় তেরা দিওয়ানা হো।।
দ্বার হারিমে পর্দায়ে ওয়াছেললে মোয়াল্লা ম্যায় থা কৌণ
সেজদা গাহে জানে জানা ম্যায় তেরা দিওয়ানা হো।।
-কালামে হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ) এর চিশতী উদ্দ্যান থেকে সংগৃহীত।

#দমা_দম_মাস্ত_কালান্দার

গানটি মূলত সূফী শাহবাজ কালান্দারের শানে রচিত হয়েছে।
ওনাকে 'লাল' নামে ডাকা হত কারণ তিনি লাল রঙের গেরুয়া পোষাক পরতেন। তবে এ-নিয়ে ভিন্নজনের ভিন্নমত রয়েছে। হযরত শাহ্‌বাজ সাহেবজি অত্যন্ত জালালী মেজাজের ছিলেন, তাঁর অনেক কাজ কর্মই প্রথাবিরোধী ছিল। তারপরও বুজুর্গগণ তাঁকে অনেক আদর করতেন, তাই তাঁকে #লাল বলা হতো, উর্দুতে আদরণীয়কে লাল বলা হয়। তাঁকে লাল বলার এটাই কারণ। কেবলমাত্র পোশাকের জন্য তাঁকে লাল বলা হতো এ ধারণা হয়তো ঠিক নয়।
'#শাহবাজ' বলার কারণ হল তিনি মহৎব্যক্তি ছিলেন। এবং '#কালান্দার' বলার কারণ হল তিনি সূফী সাধক ছিলেন । এছাড়া চিরকুমার সাধু যাঁরা উচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছেছেন তাঁদেরকেও #কালান্দার বলা হয় ।
সৈয়দ মুহাম্মদ উসমান মারওয়ান্দি (১১৪৯-১২৭৪) লাল শাহবাজ কালান্দার নামে অধিক পরিচিত ।
তিনি সিন্ধু , পাকিস্তানের একজন সুফি দার্শনিক-কবি ছিলেন ।
তিনি সোহরাওয়ার্দিয়া ত্বরিকার অনুসারী ছিলেন।
#প্রিয়_বন্ধুগণ,
আসুন জেনে নেই গানটির বাংলা অনুবাদঃ
দাম মাস্ত কালান্দার মাস্ত মাস্ত -
অর্থঃ মাতাল (প্রেমেনিমগ্ন) কালান্দার এখন আত্মহারা ,
ইক ভিরদ হ্যায় দাম দাম আলি আলি
অর্থঃ তাঁর প্রতি-প্রত্যেক নিঃশ্বাসে এখন আলী'র স্তুতি ,
ছাখি লাল কালন্দার মাস্ত মাস্ত
অর্থঃ সেই লাল-বসনের কালান্দার এখন আত্মহারা ,
(এখানে ১২ তম শতাব্দীর সূফিসাধক লাল শাহবাজ কালান্দার'কে ইঙ্গিত করা হয়েছে)
ঝুলে লাল কালান্দার মাস্ত মাস্ত
অর্থ: (পুনরায় লাল শাহবাজ কালান্দার' এঁর আত্মহারা অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে) ,
আখি জা মালাঙ্গা তু আলি আলি আখি জা মালেঙ্গা
অর্থঃ হে প্রেমিকেরা ! আলি আলি ডাকতে থাক , ডাকতেই থাক ,
আখি জা মালেঙ্গা সাজেয়া পে মুন লাইন গেঁ
অর্থ:হে সহগামীরা ! ডাকতেই থাক । তারা (অবিশ্বাসীরা) তোমাদের সত্যকে গ্রহণ করবে ,
আজ নে তে কাল সারে আলি আলি কাহেঁ গেঁ
অর্থ:আজ নয়তো কাল সবাই আলী আলী ডাকবেই ডাকবে
রাবনে কিন্নে শান বানায়ে
অর্থ: খোদা কত (অগণিত) মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
[ #মন্তব্যঃ "রাবনে কিন্নে শান বানায়ে এটার অর্থটা বোধয় মানুষ হবেনা মর্যাদা বা তারিফ হবে প্রভূ এতো মর্যাদা দিয়েছেন অনেক কে। হয়তো সেটাই বুঝিয়েছেন।
"রাবনে কিন্নে #শান বানায়ে'' এখানে শব্দটা যদি #ইনসান হয় তাহলে মানুষ অর্থাৎ অনুবাদকের কথাটা ঠিক আছে।]
বে কারাম তে কারাম কামায়ে
অর্থঃএবং তিনি অকৃতজ্ঞদেরও কৃপা করেছেন,
জেহদা ভি তেরে তে আঁয়ে
-অর্থঃযে তোমার দ্বারে উপনিত হয়েছে ,
ও না কাভহি ভি খালি জায়ে
- অর্থঃকেউ রিক্তহস্তে ফেরত যায় নি ,
শানা উঁচিয়া তেরাঁ পীরা
অর্থঃহে প্রতিভূ ! (মওলা আলি'কে সম্বোধিত) তোমার অনুগ্রহ উত্তুঙ্গ ,(অতি সুউচ্চ তোমার শান)
হোভান দোর হানেরিয়াঁ পীরা
- অর্থঃবদান্যতায় হৃদ-আঁধার (এমনকি আমারও) দূরীভূত করুন , হে প্রতিভূ ! ,
আসানা রেহ-মা তেরিয়া পীরা
- অর্থ:আমি আমার অগণিত প্রত্যাশা টুকে রেখেছি তোমার সকাশে , হে প্রতিভূ ! ,
সুন আরজা আজ মেরিয়া পীরা
- অর্থ:আমার আর্জিকে শ্রবণ করুন , হে প্রতিভূ !
#নাজার_কারাম_দি_পাভি_সাইয়া
অর্থঃদয়ার্ত দৃষ্টি আমরাও যেন পাই , হে প্রেমাস্পদ ! ,
#বেরিয়ান_বানে_ধাভি_সাইয়া
- অর্থঃআমাদের ভাটার টানে হারাতে দিও না হে , প্রেমাস্পদ ! ,
#ভুল_না_কিদরে_জায়ি_সাইয়া
-অর্থ: কখনও আমাদের ভুলে যেও না , হে প্রেমাস্পদ ! ,
#লাইয়ান_তোদ_নিভয়ি_সাইয়া
অর্থ:তোমার দয়ার প্রতিজ্ঞা পূরণ করিও , হে প্রেমাস্পদ !
________
বহুল প্রচারিত এ গানটি ভারতীয় উপমহাদেশে শতাব্দী ব্যাপী প্রচলিত এবং জন নন্দিত। এটি মূলত একটি কবিতার বিবর্তিত রূপ। যা সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আমীর খসরু বিরচিত ।
পরবর্তীতে এটি পাঞ্জাবী কবি বুল্লে শাহ্‌ কতৃক সংকলিত হয়।

আমার ভাংগা ঘরে চাঁদের আলো উছলিয়া পড়ে

আমার ঘরটি বেশ ছোট। সেই ছোট্র ঘরটিতে এই শীতের উত্তুরি হাওয়া হু হু করে ঢুকে পড়ে। হাড় কাঁপুনি শীতের আমেজ বেশ উপভোগ্য হয়। ঘরটির পেছনে আছে মুল খালের একটি অংশ। কাঠ দিয়ে ঘাট তৈরী করা হয়েছে। সেই ঘাটে যখন হাঁটি তখন মড় মড় শব্দ করে। মনে হয় এক্ষুণী বুঝি ভেংগে যাবে।কিন্তু ভাংগে না। শব্দ করাটা বাতিক। শব্দ করতেই হবে। নচেৎ কি ভাবে জানান দেবে সে এখনো টিকে আছে? যেমনটা আমাদের ভেতরটা ডিব ডিব করে জানান দেয়। ঠিক সেইরুপ। পার্থক্য হলোঃ একটা প্রকৃতির অংশ অন্যটি প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত। যাদের সম্মি লনে তৈরী করা হয়েছে এই ঘাটটি।
সুদীর্ঘ শীতের রাত্রি শেষে যখন প্রকৃতির নিয়মে জগন্নাথ পুর্ব দিকে উঁকি দেয়, তখন একচিলতে রোদ্দুর এসে উঠোনে আছড়ে পড়ে। সোনালী সেই রোদ্দুর জানান দেয়, সে এখনো আমাদের মতো ছা-পোষাদের কীট পতঙ্গের মতো বাঁচিয়ে রেখেছে। জগতের নাথ সুর্যদেবকে তাই সনাতনীরা প্রথানুযায়ী নমস্কার করে থাকে। অন্যদিকে চাঁদনী রাতে যখন চাঁদমামা তার আলো ফেলে তখন এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে। পুরো উঠোনজুড়ে চলে আলো-আঁধারির খেলা। এমন মায়াবী পরিবেশে মনটা বেশ উথাল পাথাল করে। হারিয়ে যেতে চায় কোন এক অচেনা অজানা দেশে। কিন্তু চাইলেই কি তা পারা যায়? যায় না। দয়াময় যখন দয়া করে ডাকবেন, তখন অবশ্যই সেই ডাকে সারা দিয়ে চলে যেতে হবে। হারাতে হবে বিধাতার এই সাজানো সংসার। কি অদ্ভুত? তাই -না?
হযরত থাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ) তাঁর চিশতী উদ্দ্যানে বলেছেনঃ
কেনোরে মন বুঝতেছো না, এ ভবের ভাবনা ভেবে, লাভ কিরে তোর ওরে কানা।
সত্যিইতো। এ ভব খেলাঘরে কিছুদিনের জন্য এসেছি। আবার চলে যাবো। কিন্তু যখন আমার সন্তানদের দিকে তাকাই, তখনই প্রাণটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। এই সন্তানদের ছেড়ে একদিন বিদায় নিতে হবে। নিয়তির এমনই বিধান যে, তা অলংঘনীয়। এই নিয়মের কোন ব্যত্যয় নেই।
সত্যিই.. কি রহস্যময় এই জগত সংসার.....

ছেঁড়া কাগজ ও তার আর্তনাদ

ছেঁড়া কাগজ ও তার আর্তনাদ
----------------------------
বাতাসে একটুকরো ছেঁড়া মলিন কাগজ উড়ছে। এথানে সেখানে। উড়তে উড়তে সেই মলিন কাগজটি একটি স্থানে এসে স্থির হয়ে বসে রইলো।
সেই পথ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন এক বুজুর্গ লোক। সে কাগজটি দেখতে পেয়ে সেটা হাতে তুলে নিল তারপর পড়া শুরু করলো। পড়া শেষ হতেই লোকটি সেটা তার বুক পকেটে রেখে দিল।
সেটা দেখে এক পথিক সেই বুজুর্গলোকটির কাছে জানতে চাইলোঃ
-জনাবে আলা, কি লেখা রয়েছে সেই কাগজটিতে।
উত্তরে বুজুর্গলোকটি উত্তর দিলঃ
-কাগজটির করুণ পরিণতির কথা লেখা রয়েছে।
লোকটি বিশদ ভাবে জানতে চাইলো। সেটা লক্ষ্য করে বুজুর্গলোকটি বললোঃ
-শুন তাহলে। আমি প্রথমেই কাগজটির কাছে জানতে চাইলাম, তুমিতো সাদা ছিলে। কে তোমাকে মলিন করলো? সে জানালো-কলমকে জিগ্যাসা কর। আমি কলমের কাছে জানতে চাইলাম, তুমি কাগজটিকে মলিন করলে কেন? কলম উত্তর দিল-তার জন্য তোমরাই দায়ী। আমি বললাম কিভাবে? সে জানালোঃ আমার লেখার সাধ্য নেই। তোমরা মানুষেরা আমাকে দিয়ে যা খুশি লিখিয়েছো। অামি সেভাবেই চলেছি। তোমাদের হাতের পুতুল হয়ে। কাজেই আমাকে দোষ দিও না। আমি ভেবে দেখলামঃ ঠিকইতো। আমরাইতো তাকে মলিন করেছি। কাজেই আমার উচিত তাকে যথাযথ সম্মাান দেয়া। তাই তাকে বুকে তুলে নিয়েছি।

#সংসার

#সংসার
সংসার=সম্+সার। সম মানে সমান। আর সার মানে মুল বা মৌল। অর্থাৎ মুল বিষয়ে সমান অধিকার। চেয়ে দেখ জগত সংসারের দিকে। সর্বক্ষেত্রেই দেখতে পাবে, #জগতপতি সকলকেই সমান অধিকারে তার সমস্ত বিষয়াবলি বিলিয়ে দিচ্ছে।
তুমি যদি তোমার সংসারের দিকে তাকাও, তাহলে দেখতে পাবে, পিতা-মাতাতো দুরের কথা, তোমার অতি নিকটাত্মীয়ও এমনকি তোমারই রক্তের ভাই-বোন তোমার মতো নয়। তুমিও তাদের মতো নও। সকলেই সঙ ধরে মুল বিষয় নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। যে সংসারে এই মনোভাব বিরাজ করে, সেটা সংসার নয়। তাহলে সেটা কি? সেটা হলো সঙ ধরা সার। অর্থাৎ #সঙসার

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

বেলুন বাঁশি - দ্বিতীয় পর্ব


(পুর্ব প্রকাশের পর হতে)
-ঐ মিয়া, তুমি কি মসনবী শরীফ পড়ছো? মনা মোবারকের দিকে তাকিয়ে বললো..
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (রহঃ) তার মসনবী শরীফের প্রথমেই কইছেঃ
বিশনু আজ না এচু হেকাইযে মিকুনাদ
ওয়াজ জুদাই হা শিকাইয়েত মীকুনাদ।
 অর্থঃ মাওলানা রুমী (রহঃ) বলেনঃ বাঁশের বাঁশি যখন বাজে,তখন তোমরা মন দিয়ে শোনো, সে কি বলে? সে তার বিরহ বেদনায় অনুতপ্ত হয়ে ক্রন্দন করছে।
এই দেহডা অইতাছে বাঁশের বাঁশি। এই দেহডারে মাওলানা বাঁশের বাঁশির সাথে তুলনা করছে। বাঁশের ঝাড় থিক্ক্যা বাঁশটা কাইট্র্যা আননের ফলে ঐ কাডা বাঁশটা যেইডা দিয়া বাঁশি বানাইছে,হেইডা তার আগের জায়গায় মানে অইলো ঐ বাঁশ ঝাড়ে যাওনের লিগ্গ্যা কানতাছে।

-এইহানে কান্দনের কি অইলো?

-ধুর ব্যাটা..তুই বুঝলে তো কামই অইছিলো। বাঁশের ঝাড় মানে অইলো আলমে অারওয়াহ। যেহানে সমস্ত রুহগুলিরে আল্লাহ্ বানাইয়্যা রাকছিল..হেই হান থিক্ক্যা এই জমিনে আওনের ফলে অর মনে যে ব্যাথা বেদনা, হেইডা মনে কইর‌্যাই কান্দে...বুছবার পারছো?

-এইডা তো মাউলানা সাহেবের কতা...আপনে যে বেলুন বাঁশির কতা কইতাছিলেন,হেঁইডা কন হুনি...

-হুন। আমাগো দেহের মইধ্যে বাতাস ধইর‌্যা রাখনের লিগা যেইডা আল্লাহয় বানাইছে, হেইডারে আমি বেলুন দিয়া বুঝাইছি। আর ছোড এই যে কন্ঞ্চিটা দেকবার পারতাস..এইডা অইলো গিয়া গলা....আর এই যে বড় বাঁশের মোডা অংশডা দেকতাছস, যেইডা দিয়া বাতাস বাইর অইলে বাজে, হেইডা অইলো হলকুম...এই যে গলার মোডা অংশডা।
আল্লাহয় যখন রুহ ফুঁইক্যা দেয়, তহন একটা বাতাস আদমের দেহতনে ঢূইক্ক্যা যায় নাক দিয়া.....এইডা অইলো আধ্যাত্মিক বাতাস। আল্লাহর এই ফুঁ দেওনের ফলে আদম চৈতন্য পায়। মানে অইলো আদম জাইগ্গ্যা যায়..হেই বাতাসটা হেইহানেই বইয়্যাই হেয় দেহরাজ্যে রাজত্ব করতাছে...এই যে ডুব ডুব শব্দ হুনতাছোস, এইডাই অইলো হেইডা। বেলুন বাঁশি....হের বাঁশি হেয় যেমতে মন চায়, হেমতে বাঁজায়....অামরা খালি হুনি....

আমার হৃদয় বীণায় কেমন করে বাজাও তুমি সুর
আমি শুনি সেই সুর, বড় সুমধুর।।
তোমার সুরে মাতওয়ারা এই জাহান, করে এই আহব্বান
লা হু আল্লাহু, ওয়াহ্ দাহু লা শারিকা লাহু।।

এইডা অইলো হেইডা, যেইডারে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিন নাফাক্ তু ফি মির রুহি কয়....

মনার কথা শুনে মোবারক কি বুঝলো কে জানে, সে বিকট একটা চিৎকার দিয়ে কান্না কাটি শুরু করে দিল। ঘটনার আকষ্মিকতায় মনা হতভম্ব হয়ে যায়...সে কি বলবে...কিছুই বুঝতে পারছে না....সে কেবল অাউড়াচ্ছেঃ

ছিনাহ খাহাম শরাহ অাজ ফেরাক
তা বগুইয়াম শরহে দরদে ইশতিয়াক।
অর্থঃ অামার বিচ্ছেদের ব্যথা অনুভব করার জন্য ভুক্তভুগী অন্তর দরকার। পাষাণ অন্তঃকরণ আমার যাতনা বুঝতে পারবে না...তাই যে অন্তঃকরণ বিচ্ছেদের ব্যথায় টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, সেই অন্তঃকরণ পেলেই আমার ব্যথা ব্যক্ত করিবো। অন্যথায় আমার রোদন বৃথা যাবে।

বেলুন বাঁশি - প্রথম পর্ব

আজ সকালে ছেলে-মেয়েরা সবাই তাড়াতাড়ি করে মেলায় চলে এসেছে। মেলা শেষ হতে আর বেশি দিন বাকী নেই। তাই যারা বাদ পড়েছিল কেনাকাটায়, তারা আজ খুব সকাল সকাল চলে এসেছে। সাথে ছেলে-মেয়েদের হৈ-হুল্লোড় , চিৎকার চেঁচামেঁচিতে যেন মৃতবৎ মেলাটি প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

দোকানীরা ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে। শেষ সময়ে যাতে পুঁজি নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে পারে, তারই একটা প্রতিযোগীতা চলছে। সকল দোকানদাররা তাদের জিনিস পত্রের দাম কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তৈজস জিনিস পত্রের দাম কম হওয়ায় গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি তাদের পছন্দ মাফিক জিনিস কিনছে। কিন্তু একটা জিনিসের দাম কিছুতেই কমছে না। সেটা হলোঃ বেলুন বাঁশি। একটা বাঁশের বাঁশি ও একটি বেলুন একত্র করে বানানো হয়েছে। বাঁশিটিতে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে দিলেই বাঁশিটি বাজতে শুরু করে। বাশিটি আহামরি কিছুই নয়। কিন্তু সেই বাঁশিটি কেনার জন্যও মনা পাগলাও ছেলে-মেয়েদের সাথে বাঁশিওয়ালার সাথে দাঁড়িয়ে আছে। সেও একটি বাঁশি কিনতে চাইছে। কিন্তু বাঁশিওয়ালার এককথা। দাম দশ ট্যাকা। এক ট্যাকাও কম না।
মনা বাঁশিওয়ালাকে লক্ষ্য করে বলছেঃ

-বাই, দুই ট্যাকা কম রাখেন। এই ধরেন আট ট্যাকা...

-কইলাম না, একট্যাকাও কম অইবো না....

-দেননারে বাই...এই আপনের পায়ে দরি...বাই বাই দেন...

-অই মিয়া, তুমি এই বাঁশি দিয়া কি করব্যা...

-হেইড্যা জাননের কাম নাই।

মনার অনেক পীড়াপিড়িতে বাধ্য হয়েই দোকানী মনার কাছে একটি বেলুন বাঁশি বিক্রি করে। বাঁশিটি হাতে পেয়ে মনা এতই খুশি হয়ে গেছে যে ভাষায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না....তার এই উল্লাসের কারণ কি? কেউ তা ধরতে পারছে না। আর মনাও সেটা বলতে চাচ্ছে না...
বাঁশিটি পেয়ে মনা সেটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। দেখছে আর ফুঁ দিয়ে বেলুনটি ফুঁলিয়ে বাঁশিটি বাজাচ্ছে। বাঁশিটি বাজছে আর মনা হাসছে। তার হাসি আর কিছুতেই থামতে চাচ্ছে না...হাসির থমকে সে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একটা মানুষ বাঁশি বাজাচ্ছে আর সেই বাঁশিটি বাজার সাথে সাথেই সে হাসছে আর গড়াগড়ি খাচ্ছে - এমন অভুতপুর্ব দৃশ্যটি দেখে সকলেই মনাকে ঘিরে ধরেছে। মনা তাদের দেখে বিরক্ত হয়ে বলছেঃ

-কি বাইরা, খাড়াইয়্যা খাড়াইয়্যা কি দেকতাছো?

কিন্তু কেউ কোন কথা বলছে না। সকলেই কেমন অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনা সেখান থেকে বের হয়েই একটা টং ঘরে ঢুকলো। তারপর সেখানে বসে বাঁশিটি খুললো। দেখলো একটা বাঁশের কন্ঞ্চি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। বাশের চিকন কন্ঞ্চিটি কেটে একটা পাতলা আবরণ তুলে নেয়া হয়েছে এবং সেটি সেখানেই লেগে আছে। আরেকটি বাঁশের মোটা কন্ঞ্চি গোল করে কেটে সেটার সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। বাতাস যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য কাগজ দিয়ে পেঁচিয়ে দেয়া হয়েছে। মোটা বাঁশের কন্ঞ্চির শেষ প্রান্তে একটা বেলুন বেঁধে দেয়া হয়েছে। ছোট চিকন বাঁশের কন্ঞ্চিটিতে ফুঁ দিয়ে বেলুনটি ফুলালে যতক্ষণ ফুঁ দেয়া বাতাস থাকে, ততক্ষণ বাঁশিটি বাজতে থাকে। এটা এমন কিছু আহমরি কিছু নয়। সবাই তা দেখেছে। কিন্তু মনার দেখা আর তাদের দেখার মধ্যে একটা বিশাল ব্যবধান আছে। সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে...সেটা দেখে মোবারক মামা তাকে জিগ্যাসা করে...

-বাই, এমুন কইর‌্যা তাকাইয়্যা তাকাইয়্যা কি দেকতাছেন....

-কি দেকতাছি, হেইডা তোমাগো কাছে কইলে মিয়া এই বাঁশির লিগ্গ্যা দেওয়ানা অইয়্যা যাইব্যা গা...

-কন কি বাই?

-ঠিকই কইতাছি।

-তয় হুনি দেহি আপনের বয়ান....

-মিয়া, বয়ান হুননের আগে চা খাওয়াও আর সিগারেট দেও...চা খাইতে খাইতে কই...

মোবারক মামা মনাকে চা এবং সিগারেট দেয়। মনা চায়ে চুমুক দিয়ে বলতে থাকে...

(চলবে)