পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৮

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক



















২৫.

এই পেয়ালা নিলাম হাতে-
সব রেখে দিলাম তফাতে।
মন যদি শরাবে রঙিণ-
পূর্বাপর মুহূর্তে বিলীন।
ওই মাছ নদীর পানির-
অপেক্ষায় আছে বড়শির।
অতএব হাফিজ এখন-
শরাবেই খোঁজে নিমজ্জন ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক



















২৪.
গতকাল শুনি আলোআঁধারির সরাইখানার হাঁক-
পাপ হলে হবে!   পান করো তুমি! পেয়ালাটি হাতে থাক!

এই তো সমূহ শুভ সংবাদ! ওঠো দেখি একবার!
জানবে তোমার    পথের শেষেই নদী বহে করুণার!

এ জীবনে পাপ!    কত কী যে পাপ! তালিকাটি সীমাহীন!
তার চেয়ে দেখো অসীম ক্ষমার আসনে তিনি আসীন।

অতএব চলো সরাইখানায়, ঝেড়ে ফেলো সব দ্বিধা।
দেখবে সেখানে    শরাব রঙিন বালিকারা সুস্মিতা।

হাফিজ, তাহলে   কাজ নেই গুনে কতটা করেছো পাপ।
সরাইখানায় পেয়ালাটি নাও- গোস্তাকি করো মাফ ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক



















২৩.
এই তো হয়েছে ভোর, আলোর নহর
ভাসিয়ে তুলছে আজ শিরাজ নগর।
পাখিরা গাইছে গান প্রণয় বিধুর-
বাগানে ফুলের কানে পশে তার সুর।

ওদের মতোই আমি বুকে ব্যথা নিয়ে
হেঁটে যাচ্ছি বাগানের দিকে পথ নিয়ে।
তাপিত হৃদয় নিয়ে এই হেঁটে যাওয়া।
যদিবা শীতল করে ভোরের এ হাওয়া।

গোলাপ রয়েছে ফুটে ওই থরে থরে-
ভোরের প্রথম আলো বুকে তারা ধরে।
করুণ একটি তারা ভোরবেলাকার-
এখনো রয়েছে ছুঁয়ে আকাশের পাড়।

পাখি ওই বুলবুল গ্রীবা তুলে ধরে।
ফোটে গান হৃদয়ের- শুনি তার স্বরে।
আমার মতোই তারও বিরাম তো নাই-
বাগানে যে গায় গান বুকে প্রেম তাই।

ফুলের পাঁপড়ি খোলে, অশ্রু তার চোখে-
জানি না শিশির নাকি হৃদয়ের শোকে।
তাকিয়ে দেখে সে ওই গোলাপের দিকে-
ক্ষত বলে মনে হয় লাল রঙটিকে।

পদ্ম যে উঠেছে ফুটে- দল যেন তার
তুলে ধরে আছে ভয়াবহ তিরষ্কার।
ওদিকে অনামা ফুল যত আছে সব
যেন ফুল নয় তারা আসলে গুজব।

কিছু ফুল ফুটে আছে, করছে দেয়ালা-
মাতালের হাতে যেন পানের পেয়ালা।
শিশির শরাব হয়ে ঝরেছিল রাতে-
আরো বুঝি বাকি আছে! ঢালো পেয়ালাতে!

সাকির মতোই কিছু ফুল দেখা যায়-
যেন হাতে সোরাহিটি সরাইখানায়!
কাৎ করে ঢেলে যাচ্ছে তাদের জন্যেই-
যাদের হৃদয় পোড়ে প্রেম আগুনেই।

হাফিজ, বাগানে যদি, শিক্ষা নাও তবে-
ফুলের কাছেই আজ পাঠ নিতে হবে।
সময় ফুরিয়ে যায়, যা কিছু এখনি!
এসেছোই যদি- নাও তোমার পত্তনি ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















২২.
রূপবতী, যদি তুমি দাঁড়াও সমুখে,
গলায় জড়িয়ে যদি দাও ওই হাত,
তোমার গোলাপী গাল, ভালোবাসা বুকে,
এ কবি তখনই বাঁচে, বলে বাজি মাৎ-
তুচ্ছ ওই বোখারার সোনার ভান্ডার!
সমরখন্দের মণি? চাই না আমার!

তরল চুনির মতো সুরা ঢালো, সাকি!
নিরাশ হৃদয় ধরে রেখো না হে আর!
গোঁড়া ওই মোল্লাদের কথায় কী থাকি!
এমন নহর আর এই বাগিচার
মতো আর পাবে না হে রওশনাবাদে!
সে যদি সমুখে তবে পাত্র নাও হাতে।

যখন এমন কেউ এসে যায় কাছে-
যখন চোখের তীরে বিদ্ধ করে তারা,
যখন উন্মুখ মন ভালোবাসা যাচে,
মুহূর্তেই আমি হয়ে যাই সর্বহারা!
তাতার দস্যুর হাতে যেমন পথিক-
দ্যাখো আমি সর্বস্বান্ত তারও যে অধিক!

এই যে হৃদয় পোড়ে প্রেমের আগুনে-
চোখের এই যে অশ্রু- সাধ্য আছে তার
শর্করার স্বাদ আনে জীবনের নুনে?
ওই যে গোলাপী গাল, লাল আভা তার
পারে কি রাঙিয়ে দিতে দুনিয়ার ছবি?
তাহলে কিসের কাব্য? কোন্ ছার কবি!

কপালে যা আছে হবে! তুমি গান গাও,
বাগানে যে ফোটে ফুল তার কথা বলো,
শরাবের কথা যেন একটু না থামাও-
যতই তোমার চোখ হোক ছলোছলো।
যদিও এ সবই স্বপ্ন, মেঘে ঢাকা চাঁদ-
আশা না রাখলে হবে সবই বরবাদ!

রূপের এমনই জাদু, সেই ইউসুফ-
কী হলো দশাটি তার জুলেখাকে দেখে!
মুহূর্তেই মেশে তার রূপ ও অরূপ-
তৃষ্ণা জাগে- ইতিহাস এ কথাই লেখে।
এমন দেখিনি আর, শুনবো না আর-
অরূপ সন্ধানে রূপ! এমনই আমার!

রূপবতী তুমি অতি, আমার মিনতি,
আমাকেও দয়া করো, আমি প্রার্থনায়-
একবার যদি পাই তোমার সম্মতি
তবেই উঠবে চাঁদ এ অমাবস্যায়।
শরাব ঢালছে সাকি পেয়ালায় ওই-
এসো মাতি, এ সুধায় মাতাল তো হই!

কঠিন জবাব দিলে! তুমি কী নির্দয়!
এতটা বিরাগ! আমি তবু তোমাকেই
দিয়েছি সর্বস্বসহ দুর্বহ হৃদয়।
তুমি ছাড়া প্রার্থনার আর কিছু নেই।
যে ঠোঁটে এতটা মধু, তাতে কেন নুন?
এত যে শীতল চাঁদ- জ্যোৎস্নায় আগুন!

হাফিজ, কাতর তুমি রূপের সাক্ষাতে-
না হয় বিরূপ! আর তুমি কী উৎসুক!
মণি ও মুক্তার মতো শব্দরাজি হাতে
যদি পারো গাও গীত, ভাষা তো ফুটুক!
অন্তত তোমার কাব্য সে ভালোবেসেছে-
জেনে রেখো- যথালাভ! ওঠো তাই নেচে!

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক



















২১.
তুলেছি যেই পেয়ালা ঠোঁটে বিশুদ্ধ এই শরাবটির-
অমনি শুরু হলো আবার বুলবুলি ওই পাখিটির।
গাইছে গান বুলবুলিটি, বলতে কী চায় ভাবছো কি?
ব্যাখ্যা পেতে পণ্ডিতদের কাছেই তুমি যাচ্ছো কি?
তাদের কাছে খবর নেই! জানতে যদি ইচ্ছাটি-
পাখির কাছেই জানতে পাবে গানের তার ব্যাখ্যাটি।
শরাব! তুমি হারামখোর! ফতোয়া দেন মৌলভি!
হাফিজ, তুমি টসকাবে না! শুনবে না ওই বাৎ কভি!
ওরা তো সেই ধুর্ত জোলা,সুতোয় বোনে জায়নামাজ-
কিন্তু বলেসোনায় বোনা!-একেই বলে ধোঁকাবাজ!
হাফিজ, এসো, পেয়ালা নাও, মাতাল হও শীগগির।
শরাব সে তো পান করারই- কক্ষনো নয় বিক্রির!

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















২০.
অপার সাগরের মতো এ ভালোবাসা-
এখানে নেই কুল কিনারা।
বিলিয়ে দেয়া যায় যদি এ নিজেকেই,
তবেই আশা আছে হয়ত।
তুমি যে এসে গেলে এতটা পথ হেঁটে,
অনেক যদি থাকে গল্প-
সে সব পড়ে থাক, শরাব এনো তুমি,
শাস্ত্র কথা আর নয়ত।

বৈদ্য বহু আছে, তাদের কাছে তুমি
বলো না অসুখের বিবরণ।
বরং হৃদয়ের মোহর দিয়ে তুমি
সওদা করে নাও, সুফি!
দিও না দোষ তুমি মন্দ কপালের,
দরজা থাকে যদি বন্ধ।
স্বচ্ছ আয়নায় মুখটি দেখে নাও,
মাথায় পরে নাও টুপি।

পেয়ালা হাতে সাকি! সরাইখানা ডাকে!
মাতাল হও তুমি শরাবে।
কোদাল হাতে নিয়ে যেমন লুব্ধেরা
গুপ্তধন করে সন্ধান-
তুমিও তাই করো! তাকিয়ে দেখো তুমি
চোখের পানি পড়ে হাফিজের।
হৃদয় গলবে না? মিনতি রাখবে না?
কঠিন করে আর রেখো না প্রাণ ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















১৯.
কোথায় পালিয়ে গেলে? কই তুমি? বনের হরিণ!
তোমাকে নিবিড় করে জানতাম আমি একদিন।
ছিলাম তোমার বন্ধু, ছিলে তুমি প্রাণের অধিক।
আজ দ্যাখো দুজনেই পথহারা নিঃসঙ্গ পথিক।

এখন যে যার মতো হেঁটে যাচ্ছি- বড়ো দুঃসময়!
প্রতিটি পথের বাঁকে হামা দিয়ে আছে আজ ভয়।
হাফিজ, তোমাকে ডাকে- দেখা দাও, কাছে  এসো তুমি,
একা তো পারি না আর! চলো খুঁজি শ্যামশষ্প ভূমি-

যেখানে বিচ্ছেদ নেই, পুষ্প চাষ যেইখানে হয়-
হোক তা রক্তের রঙে, তবুও তো গোলাপ নিশ্চয় ॥