পৃষ্ঠাসমূহ

রবিবার, ৮ মার্চ, ২০১৫

অজানা গন্তব্যে একদিন-তৃতীয় পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমি চাচা মিয়ার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম-তিনি কি বলেন ব্যাপারে
কিন্ত্তু অতি আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করলাম তিনি ব্যাপারে কোন প্রকার মন্তব্য করছেন না। তিনি নীরব শ্রোতার মতো কেবলই শুনে যাচ্ছেন। আশে পাশে বসে থাকা লোকগুলো কেমন যেন হা হয়ে গেল। আমার বুঝতে বাকী রইল না -এই সহজ সরল মানুষগুলো যে বিশ্বাসকে লালন করে যাচ্ছে তাতে বিন্দুমাত্র হলেও সেখানে একটা বড়ো রকমের আঘাত করছে। তারা বুঝতে পারছে না কি বলবে? কিন্ত্তু আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজের ধর্ম সর্ম্পকে ভালোভাবে জানা। মসজিদের ইমাম সাহেবদের দ্বারা কিংবা পীর-ফকিরদের দ্বারা যে ধর্ম প্রচারিত হচ্ছে সেটা কতটুকু সত্য? সে যা বলছে তা কি তার বানানো কথা নাকি পুঁথি পাঠের মতোই তোতা পাখির মতো বুলি উওড়ানো? পুস্তকে যা লিখা হয় বা প্রচারিত হয়-প্রচলিত কথায় অনেকটাই তাদের তথা প্রকাশকের কথা। যেমন আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের এইম ইন লাইফ নামক রচনা ইংরেজীতে পড়ানো হতো। সেটা আমরা মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় লিখে দিলেই আমাদের নম্বর প্রদান করা হতো।  কোন স্কুলের ইংরেজী ২য় পত্র যেটা পাঠ্য করা হতো-সেখানে দেখা গেল লেখক তার নিজের এইম ইন লাইফ লিখেছে। তার ইচ্ছে সে ডাক্তার হবে। অথচ যে আর্টস বা কমার্সের ছাত্র সেও পড়ছে মাই এইম ইন লাইফ ইজ ডক্টর। আবার দেখা গেল সাইন্স যে পড়ছে তার ইংরেজী পাঠ্য পুস্তকে লিখিত আছে - মাই এইম ইন লাইফ ইজ টিচার। বিষয়টা কি দাঁড়ালো? দাঁড়ালো আমরা সবাই এক প্রকার তোতা পাখি। বুলি উওড়ানো তোতা

-মিয়া ভাই, আপনে যে কথাগুলো বলছেন বা যে দলিল দিছেন আমরা তো লেহা পড়া জানি না। আমরা হেইডা কেমতে জানমু সেইটা সত্য না মিথ্যা?

-চাচা মিয়া, জানার জন্য পড়তে হয় ইসলামের ইতিহাস। সেই ইতিহাসও বড়ো করুণ ইতিহাস। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো এসব বিষয় নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। ধর্ম বলতে আমরা বুঝি বাপ-দাদারা যেভাবে চলে আসছে যেমন নামায পড়া, রোজা রাখা, হজ্জ করা যাকাত দেয়া, কুরবাণী করা আর দুই ঈদে এবং জুম্মার দিন জামাতের সাথে নামায আদায় করা। কিন্ত্তু ঐসব নিয়ে চিন্তা করার আমাদের সময় কোথায়?

-ভাইজান আপনে আসলে ঘটনা বর্ণনা করে আমাদের কি বুঝাতে চাইছেন? জিব্রাইল ফেরেস্তা বা নামুস নামক যার কথা উল্লেখ করেছেন-সেটা কি আসলেই ভিত্তিহীন?

দেখলাম চাচা মিয়া যখন কথা বলা শুরু করছেন তখন অনেকেই এখন আস্তে আস্তে সরব হচ্ছেন। এটা একটা ভালো লক্ষণ। কোন গোঁড়ামি দেখা যাচ্ছে না। তারা যেহেতু বিষয়টি জানতে চাচ্ছে সেক্ষেত্রে তাদের সাথে অালোচনা করা যায়। আমি বললামঃ

-আমি যেই ঘটনার কথা বলেছি সেগুলি কি আপনারা মনোযোগ সহকারে শুনেছেন? যদি শুনে থাকেন তো সেখানে দেখতে পাবেন মহানবীর চরিত্রকে খাটো করার জন্য খ্রীস্টান পাদ্রী ওয়াকারা বিন নাওফেল এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারণ তিনি  আরবী ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। তার মানে ওহীর ব্যাপারে ওয়াকারা বিন নাওফেল ছিলেন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি(?) আবার তিনি আফসোস করে বলছেনঃ তিনি যদি সে সময় বেঁচে থাকতেন,তাহলে তাহাকে সাহায্য করতে পারতেন। তার মানে কি দাঁড়ালো? প্রথমে তাকে স্বপ্ন দেখানো হলো। যে স্বপ্নটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সেই স্বপ্নে আদৃষ্ট হয়ে তিনি হেরাগুহায় ধ্যানের আশ্রয় নিলেন। কারণ হিসেবে বলা হলো - সে সময় কোন ধর্মই প্রচলিত ছিল না। এই ঘটনাটার বর্ণনাকারী এমন একজনের কথা রেফারেন্স দিয়ে তুলে ধরেছেন যে আপনি সে ব্যাপারে কোন প্রশ্নই তুলতে সাহস পাবেন না। তিনি হলেন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাহঃ) যাকে বলা হয় উম্মুল মোমেনিন। অথচ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর উপর তখন ইসলাম জারী ছিল। যেমন সুরা আনআম ১৬১ আয়াতঃ "কুল ইন্নি না হাদানি রাব্বি ইলা সিরাতিল মু্স্তাকিম, দ্বীনা কিইয়ামান মিল্লাতা ইব্রাহিমা হানিফান ওয়া মা কানা মিনাল মুশরিকিনা।" অর্থঃ বলুন আমার প্রতি পালক আমাকে হেদায়েত করিয়াছেন সরল পথে। যাহা প্রতিষ্ঠিত ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ এবং তিনি মোশরেক ছিলেন না। এই আয়াত দ্বারা প্রমানিত হয় যে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কোন নতুন ধর্মাদর্শ দেন নাই। তাকে যে ধর্ম দেয়া হয়েছে তা পূর্বের ইব্রাহীম খলিলুল্লাহকে দেওয়া সেই পুরাতন ধর্ম। তথা ইসলাম।
-তাইলে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) রে আল্লাহয় দুন্ন্যাইতে কেন পাডাইছে?
কোন একজন প্রশ্ন করলো। 

-আল্লাহ পাক রাসুল(সাঃ) কে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন এই জন্য যে - "ইন্নামা বুইছতু লিউতামমিমাল আখলাক" অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি স্বভাবের গুণসমুহকে উৎকৃষ্টরুপে ফুটিয়ে তোলার জন্য। তাহলে আপনাকে জানতে হবে স্বভাব কি? যা ফুটিয়ে তোলার জন্য রাসুলের আগমণ? এসমন্ধে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ" ফেতরাতাল্লাহিল্লাতি ফাতারান্নাছা আলায়হা, লা তাবদিলা-লি-খালাক্বিল্লাহ, জালিকা দীনুল ক্কাইয়ুমু ওয়ালা কিন্না আকছারান্নাছে লাইয়ালামুন।" অর্থঃ আল্লাহর যে স্বভাব, সে স্বভাবেরই উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহর এই সৃষ্টিতে কোনই পরিবর্তন নেই। উহাই স্হায়ী ধর্ম। কিন্ত্তু অধিকাংশ মানুষ তা বুঝে না [সুরা রুম রুকু, আয়াত ৩০] উক্ত বাণী হতে বুঝা যায় যে, আল্লাহর স্বভাবেই মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাতে কিছুমাত্র পরিবর্তন করা হয়নি। সুতরাং আল্লাহর এই স্বভাব একটুও বিকৃত না করে নিজের মধ্যে পরিপূর্ণরুপে ফুটিয়ে তোলাই মানুষের ধর্ম। তাহলে ধর্ম কি? ধর্ম শব্দটি ধৃ ধাতু হতে এসেছে। যার অর্থ ধারণ করা। যা এই বিশ্বজগতকে ধারণ করে রেখেছে তাই ধর্ম। ধর্মের শাব্দিক অর্থ স্বভাব বা প্রকৃতি। যেমনঃ আগুনের ধর্ম দহন করা। আল্লাহ অন্যস্হানে বলেছেনঃ" ছিবগাতাল্লাহি ওয়ামান আহসানু মিনাল্লাহি ছিবগাতান।" অর্থঃ " আমরা আল্লাহর রংঙে রন্ঞ্জিত আল্লাহ হতে রঞ্জিত অপেক্ষা কে উৎকৃষ্ট? [সুরা বাকারা ১৬ রুকু আয়াত ১৩৮] আমরা আল্লাহর রংঙে রন্ঞ্জিত হওয়ার অর্থ আল্লাহর স্বভাব হওয়া এবং যিনি আল্লাহর স্বভাবে স্বভাব গঠন করেছে তিনিই সর্বোৎকৃষ্ট। আল্লাহর এই পরিপুর্ণ গুণরাজি আল্লাহ মানুষের মধ্যে আমানত রুপেই অর্পণ করেছেন। যেহেতু আল্লাহ বলেছেনঃ" ইন্না আরাধনাল আমানতা আলাছছামাওয়াতে ওয়াল আরধে ওয়াল জেবালে, ফাআবাইনা ওয়া আইয়াহমিলনাহা ওয়া আশফাক্কনা মিনহা ওয়া হামালাহাল ইনসানু ইন্নাহু কানা জালুমান জাহুলা [সুরা আযাব ৯রুকু আয়াত ৭২]" অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি আকাশ পৃথিবী পর্বতের নিকট আমানত উপস্থিত করেছিলাম। কিন্ত্তু উহা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল এবং ভীত হয়েছিল। অথচ মানুষ ইহা গ্রহণ করেছিল। নিশ্চয়ই সে অত্যাচারী অনভিজ্ঞ ছিল
আমানত হলো গচ্ছিত বস্তু। কোন বস্তু যথা সময়ে ফিরিয়ে দেবার চুক্তিতে গচ্ছিত রাখার নামই আমানত। গচ্ছিত বস্তু যথাসময়ে সঠিকভাবে ফিরিয়ে না দিলে সে মানুষ বেইমান বলে ধিকৃত হয়। মানবাত্মা আল্লাহ হতে আগত। আল্লাহ মানবদেহে নিজ রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। আমরা জানি প্রত্যেক বস্তু তার মুল বস্তুর গুণে গুণাণ্বিত থাকে। এই গুণরাজি বিকৃত না করাই মানব ধর্ম
মহানবী সেই ধর্ম কিভাবে পালন করতে হয় তা দেখানোর জন্যই দুনিয়াতে এসেছিলেন। আর হেরা গুহায় ধ্যান করে তার রবকে দর্শন করেছিলেন। সেই রবই তাকে শিক্ষা দিয়েছিল। সুরা আলাকে তাই বর্ণিত হয়েছে।
কারণ সুরা আলাকে বলা হয়েছেঃ 
. ইকরা বিসমি রাব্বিকাল লাজি খালাক। অর্থঃ পড় পরদার সহিত যাহা তোমার প্রভুরুপে আছে এবং যাহা সৃষ্টি করে।
. খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। অর্থঃ (এইরুপে) ইনসান সৃষিট হইয়াছে আলাকা হইতে
. ইকরা ওয়ারাব্বুকাল আকরাম। অর্থঃ (হে ইনসান) ক্কাফ শক্তির অনুশীলন কর এবং তোমার রব প্রতিষ্ঠিতভাবে (বা পরম) সম্মানিত
. আল্লাজি আল্লামাবিল কলম। অর্থঃ যিনি (তোমাকে) শিক্ষাদান করেন কলম দ্বারা
. আল্লামাল ইনসানা মা লামইযালাম। অর্থঃ শিক্ষা দেন আল ইনসানকে যাহা সে জানে না
তাই রবের দর্শনের ব্যাপারটিকে আড়াল করার জন্যই এই গল্প তৈরী করেছিল। আর রেফারেন্স হিসাবে হযরত আয়েশা(রাঃ)-কে কেন তুলে ধরা হলো তা জানতে হলে আপনাকে ইতিহাস জানতে হবে। জানতে হবে গাদীরে খুমের ঘটনাবলী এবং জংগে জামালের ঘটনা রাসুলের ওফাতের পূর্বাপর ঘটনাবলীতাহলেই মুল বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

আমার কথা শুনে সবাই চুপ মেরে গেল। নেহায়েত চাচা মিয়া বললো
-বাবা আমরা মুর্খ শুর্খ মানুষ। আমাগো বাপ-দাদারা যা কইছে তাই বিশ্বাস করছি। মসজিদের হুজুরগো কইতে হুনছি। এহন আপনে যা কইলেন হেইডাতো বাবা আমরা কেওই হুনি নাই। আর কি জানি গাদিরে খুমের কতা কইলেন হেডাতো বাজান আমরা জানি না। তয় আপনে হাছা না মিছা কইছেন আমরা তাও জানি না।

-চাচা মিয়া। এমন অনেক ঘটনাই আছে যা আমরা জানি না। আমাদের না জানার কারণেই সত্যটা সবসময় আড়াল থেকেই যাচ্ছে। সেই সত্যটা প্রকাশ করার জন্যই ইয়াজীদী ইসলামের পাশাপাশি মুহাম্মদী ইসলাম টিকে আছে। আর এ কারণেই আওলাদে রাসুল হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) স্বপরিবারে কারবালায় শহীদ হয়েছেন। "ইসলাম জিন্দা হেতাহ্যায় হার কারবালাকে বাদ।"
তো চাচা অনেক কথা বললাম। মনে কিছু করবেন না। আমি তাহলে আজকের মতো আসি।

-বাবা তুমি কই থাকো? আর তোমার কাছে ঐ গাদীরে খুমের ঘটনাটা ও রসুলের ওফাতের ঘটনাটা জানতে চাইছিলাম? যদি আমাগো কইতা, তাইলে আরো কিছু জানতে পারতাম।

-আমি থাকি ঢাকা। আর অনেক সময়ইতো বসলাম। এখন আর বসতে ইচ্ছে করছে না। তাই চলে যেতে চাইছি। অনেকদুর হেটে আসছিতো। তাই ক্লান্ত। 

-ঠিক আছে বাবা। যাও। আবার যুদি এইহানে আহো তয় আমার বাইত্তে কিন্ত্তু আসবা। আমার নাম আফজাল শেখ। আফজাল শেখের বাড়ীর কতা কইলে সবাই দেহাইয়া দিব।

চাচা মিয়া আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে আছে।তার থেকে বিদায় নিয়ে এবং দোকানের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে এই ভরদুপুরে হাঁটা শুরু করলাম। হয়তো একটা অজানা স্হানকে জেনে ফেলেছি। তাই আর সেটা ভালো লাগছে না। চলে যেতে মন চাইছে অজানা কোন দুর গন্তব্যে। যার ঠিকানা কেউ জানে না।

শনিবার, ৭ মার্চ, ২০১৫

অজানা গন্তব্যে একদিন-দ্বিতীয় পর্ব

(প্রথম পর্বের পর)
চা টা শেষ করেই একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললামঃ
-আচ্ছা চাচা মিয়া, আপনি বলেন সুরা আলাক সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছিল। তাই না? শানে নুযুল অংশে আমরা জানতে পারি যে সুরা আলাকের প্রথম যে কয়টি আয়াত নাযিল হয়েছিল ঠিক তার কত দিন পর বাকী অংশ নাযিল হয়েছিল? যে সুরা আগে নাযিল হয়েছিল সর্বপ্রথম সেই সুরাই কোরআনের প্রথমে থাকার কথা। সেটা না হয়ে সেটা স্হান পেল ৯৬ নম্বরে। কোন সুত্র ধরে?
-সেইটাতো বাবা জানি না। শুনছি সুরা আলাকের প্রথম আটটি আয়াত প্রথম নাযিল হয়েছিল। আর কতোদিন পর বাকী অংশ নাযিল হয় তা আমার জানা নাই।
-আটটা না প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয়েছিল। চাচা মিয়া যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা বলি। যেহেতু আমি সিগারেট খেয়েছি আমাকে একটু ওযু করার সময় সময় দিন। আমি আসছি।
আমার কথা শুনে চাচা মিয়া হা হা করে উঠলেন। বলেন ঐ বাচ্চু মিয়াভাইরে পানি দে। এইহানেই সে ওযু করে নিক। বাচ্চু পানি দিল। আমি তাড়াতাড়ি ওযু করে নিলাম। মুখ হাত মুছে তারপর বললাম
-সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত হলোঃ 
১)اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ 
 [ইকরা বিসমি রাব্বিকাল রাজি খালাক]
২)خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ
[খালাকাল ইনসানা মিন আলাক]
৩)اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ
[ইকরাওয়া রাব্বুকাল আকরামুল]
৪)الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ
[আললাজি আল্লামা বিল কলম]
৫)عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
[আল্লামা ইনসানা মা লাম ইয়ালাম]
শুনেন,
মুহাদ্দিসগণ অহীর সূচনা পর্বের ঘটনা নিজের নিজের সনদের মাধ্যমে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম যুহরী এ ঘটনা হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর থেকে এবং তিনি নিজের খালা হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহীর সূচনা হয় সত্য স্বপ্নের (কোন কোন বর্ণনা অনুসারে ভালো স্বপ্নের) মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, মনে হতো যেন দিনের আলোয় তিনি তা দেখছেন। এরপর তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়েন। এরপর কয়েকদিন হেরা গুহায় অবস্থান করে দিনরাত ইবাদাতের মধ্যে কাটিয়ে দিতে থাকেন। হযরত আয়েশা (রা., তাহান্নুস تحنث শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইমাম যুহরী তা’আব্বুদ تَعَبُّدُ বা ইবাদাত-বন্দেগী শব্দের সাহায্যে এর ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে তিনি কোন ধরনের ইবাদাত করতেন? কারণ তখনো পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবাদাতের পদ্ধতি তাঁকে শেখানো হয়নি । ঘর থেকে খাবার- দাবার নিয়ে তিনি কয়েকদিন সেখানে কাটাতেন। তারপর হযরত খাদীজা (রা.) এর কাছে ফিরে আসতেন। তিনি আবার কয়েক দিনের খাবার সামগ্রী তাঁকে যোগাড় করে দিতেন। একদিন তিনি হেরা গুহার মধ্যে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ওপর ওহী নাযিল হলো। ফেরেশতা এসে তাঁকে বললেনঃ “পড়ো” এর পর হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ আমি বললাম, “আমি তো পড়তে জানি না।” একথায় ফেরেশতা আমাকে ধরে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন। এমনকি আমি তা সহ্য করার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেল্লাম। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ো।” আমি বললাম “আমি তো, পড়তে জানি না।” তিনি দ্বিতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ধরে ভয়ানক চাপ দিলেন। আমার সহ্য করার শক্তি প্রায় শেষ হতে লাগলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ো।” আমি আবার বলালাম, “আমি তো পড়া জানি না।” তিনি তৃতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন আমার সহ্য করার শক্তি খতম হবার উপক্রম হলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, اقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّكَ الَّذِىۡ خَلَقَ‌ۚ‏ (পড়ো নিজের রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন) এখানে থেকে مَا لَمۡ يَعۡلَمۡؕ‏ (যা সে জানতো না) পর্যন্ত। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁপতে কাঁপতে সেখান থেকে ফিরলেন। তিনি হযরত খাদীজা (রা.) এর কাছে ফিরে এসে বললেন, আমার গায়ে কিছু (চাঁদর-কম্বল) জড়িয়ে দাও! আমার গায়ে কিছু (চাঁদর-কম্বল) জড়িয়ে দাও! তখন তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেয়া হলো। তাঁর মধ্য থেকে ভীতির ভাব দূর গেলে তিনি বললেনঃ “হে খাদীজা! আমার কি হয়ে গেলো? তারপর তিনি তাঁকে পুরো ঘটনা শুনিয়ে দিলেন এবং বললেন, আমার নিজের জানের ভয় হচ্ছে।” হযরত খাদীজা বললেনঃ “মোটেই না। বরং খুশী হয়ে যান। আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমাণিত করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করেন। সত্য কথা বলেন। (একটি বর্ণনায় বাড়তি বলা হয়েছে, আপনি আমানত পরিশোধ করে দেন, ) অসহায় লোকদের বোঝা বহন করেন। নিজে অর্থ উপার্জন করে অভাবীদেরকে দেন। মেহমানদারী করেন। ভালো কাজে সাহায্য করেন।” তারপর তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই। জাহেলী যুগে তিনি ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আরবী ও ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। হযরত খাদীজা (রা.) তাঁকে বললেন, ভাইজান! আপনার ভাতিজার ঘটনাটা একটু শুনুন। ওয়ারাকা রসূলুল্লাহকে(সা., বললেনঃ “ভাতিজা! তুমি কি দেখেছো ?” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু দেখেছিলেন তা বর্ণনা করলেন। ওয়ারাকা বললেনঃ “ইনি সেই নামূস (অহী বহনকারী ফেরেশতা) যাকে আল্লাহ মূসার(আঃ) ওপর নাযিল করেছিলেন। [অন্য বর্ণনায় আছে-কুদ্দুসুন! কুদ্দুসুন। অর্থাৎ পবিত্র আত্মা। পবিত্র আত্মা বলে - স্প্রিরিট অফ ইসলাম] হায়, যদি আমি আপনার নবুয়াতের জামানায় শক্তিশালী যুবক হতাম! হায়, যদি আমি তখন জীবিত থাকি যখন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে।” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “এরা আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেনঃ “হাঁ, কখনো এমনটি হয়নি, আপনি যা নিয়ে এসেছেন কোন ব্যক্তি তা নিয়ে এসেছে এবং তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। যদি আমি আপনার সেই আমলে বেঁচে থাকি তাহলে আপনাকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করবো।” কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই ওয়ারাকা ইন্তিকাল করেন।
উক্ত ঘটনাটি বর্ণিত আছে তাফহীমুল কুরআন সুরা আলাকের শানে নুযুল অংশে। এছাড়া স্পিরিট অফ ইসলাম -স্যার সৈয়দ আমীর আলী রচিত পুস্তকে। এছাড়া অন্যান্য ইমামদের মধ্যেও মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো হলোঃ-
প্রথম ও প্রাধন অভিমতঃ কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম যা অবতীর্ণ হয় তা হল সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত।
এই মতের পক্ষে যারা অভিমত পেশ করেছেন তাদের দলীল হল- ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম হাকেম রহ. এবং ইমাম বায়হাকী রহ. তাদের গ্রন্থে উক্ত মতের পক্ষেই দলীল পেশ করেন।
আল্লামা তিবরানী রহ. কাবীর নামক গ্রন্থে আবু রাজা আতারাদী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, যখন আবু মুসা আশয়ারী রা. আমাদেরকে পড়াতেন তখন আমাদেরকে বৃত্তাকারে বসাতেন, আর তার পরনে থাকত সাদা দুটি জামা। তারপর যখন সূরা আলাকের প্রথম আয়াতগুলো পড়াতেন তখন বলতেন এটা হল প্রথম সূরা যা হযরত মুহাম্মদ সা. -এর উপর নাযিল হয়েছিল। হযরত মুজাহিদ, ইবনে শিহাব যুহরী, ওবায়েদ ইবনে ওমায়ের রা. প্রমুখ উক্ত মতের পক্ষে মত প্রকাশ করেন।

দ্বিতীয় মতঃ কারো মতে কুরআনের সর্বপ্রথম সূরা ফাতিহা নাযিল হয়। ইমাম বায়হাকী তার দালায়েল গ্রন্থে এর পক্ষে একটা দলীল পেশ করেন। অনেকে একে এ ব্যাপারে দুর্বল মনে করেছেন।

তৃতীয় মতঃ একদল আলেমের মতে, সর্বপ্রথম কুরআনের অবতীর্ণ আয়াত হল সূরা মুদ্দাচ্ছির।

চতুর্থ মতঃ হযরত ইকরামা ও হাসান বসরী রহ. বলেন-সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত হল- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
উক্ত বিষয়টি বর্ণিত আছে - মাওলানা  নুর হোসাইন কর্তৃক রচিত প্রবন্ধ মুসলিম উম্মাহর একমাত্র জীবন ব্যবস্থা আল কোরআন নামক অংশে মাসিক আল-জান্নাত নামক পত্রিকায়। প্রকাশ কালঃ ১০ই ডিসেম্বর,২০১৪।

উপরোক্ত ঘটনাবলী শুনতে এবং বলতে ভালো লাগে। কারণ ঘটনা প্রকাশকাল হচ্ছে নবুয়তের প্রারম্ভিককাল। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন হেরা গুহায় ধ্যান করতেন এবং হযরত খাজিদাতুল কোবরা (রাহঃ) যখন তার স্বামী ছিলেন। সেই সময় হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাহঃ) নবীজি (সাঃ)এর সাথে বৈবাহিক সুত্রে আবদ্ধ হননি। তাছাড়া তাঁর বয়স ছিল নয় বছর। যখন হযরতের সাথে তার বিয়ে হয়। সে তখনো নাবালিকা। সুতরাং তার নবুয়ত তথা সুরা নাযিলের এ সমস্ত আধ্যাত্মিকতা বুঝার কথা নয়। কিন্ত্তু রাবি (হাদীছ বর্ণনাকারী) হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঞঃ) কে দিয়ে সেই ঘটনার বর্ণনা করলেন এমন একটি সুত্র ধরে যাকে সরাসরি অস্বীকার করতে গেলে ভয়াবহ বিপদের এবং নানান অপবাদ ও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়া রাবি যে ঘটনা তথা সুত্রের কথা বলেছেন সেই সুত্রটি পর্যলোচনা করলে দেখা যায় - ওহী নাযিলের সুত্রপাত হয় - স্বপ্নের মাধ্যমে। আর ওয়াকারা বিন নাওফেল নামক একজন খ্রীষ্টান পাদ্রী কর্তৃক ফেরেস্তা জিব্রাইল তথা নামুসের সুত্রপাত হয়। যিনি আরবী ও ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন।
উক্ত ঘটনাবলী থেকে কি বুঝলেন চাচা মিয়া? আমি চাচা মিয়ার দিকে দৃষ্টি দিলাম। তিনি বলেন এ ব্যাপারে। তার মতামতটাও জানা জরুরী (চলবে)