পৃষ্ঠাসমূহ

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০১৫

ভবা পাগলার জবান বন্দী

ভবা পাগলা আরেকটি নজীর সৃষ্টি করেছেন। তিনি একটি মাজার বানিয়েছেন। সেটার উপর টাকা দিয়ে গেলাফ চড়িয়েছেন। সেই মাজারের দান বক্সের উপর লিখে রেখেছেন - "মুশকিল আসান"- ভবা পাগলা। ইতঃপূর্বে তার কীর্তিকলাপে ক্ষেপেছিলেন চারটি ধর্মের প্রধান কর্তা ব্যক্তিরা। এবার ক্ষেপেছেন - মাজার বাদীরা। তারা ভবাকে বেইমান কাফের বলে ফতুয়া দিয়েছেন। শুনে ভবা কেবল হেসেছেন। প্রশাসনের লোকজন এই ভবার উপর ক্ষেপে গিয়েছেন ভীষণভাবে। একজন নাগরিক হিসেবে তাকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্ত্তু তার মানে এই না যে, কেবল তাকেই নিরাপত্তা দিতে সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে নিয়োজিত রাখতে হবে? তাছাড়া ভবাকে বার বার এই ন্যাক্কার জাতীয় কাজ করতে দেখে তারাও সমানে গালি দিচ্ছেন। তারা সিধান্ত নিয়েছেন - ভবাকে ধরে নিয়ে আসবেন। সমাজে যাতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করার চিন্তা ভাবনা করছেন। কিন্ত্তু তাকে তো এমনি এমনি কারাগারে প্রেরণ করা যায় না। তাকে বিচারিক আদালতে দাঁড় করাতে হবে। তার কথা শুনতে হবে। উপর থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করার জন্য। সুতরাং পুলিশের ঘুম হারাম হয়ে গেল। এই পাগলকে কোথায় পাওয়া যায়? কোথায় থাকে? তার সাঙ্গ-পাঙ্গ কারা? এতো ভারী মুশকিল হলো দেখছি । কি করা যায় ? শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া গেল। তাকে হাত কড়া পড়িয়ে পুলিশের গাড়ীতে উঠিয়ে নেয়া হলো। থানায় নিয়ে তাকে হাজতে রাখা হল। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হবে। 

ভবাকে গ্রেফতারের সংবাদে মাজারবাদীদের মধ্যে একধরণের আনন্দের জোয়ার বইল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সবাই। থানা হাজতে ভবাকে রাখা হলো। থানার উৎসুক পুলিশ সদস্যরা ভবাকে দেখছে আর টিটকারী মারছে। কেউবা সেটা সহ্য করতে না পেরে অন্যদেরকে বিরত থাকার আহব্বান জানাচ্ছে। যাকে নিয়ে এতো মাথা ব্যাথা সেই ভবা একদম নির্বিকার। সাংবাদিকরা সমানে ছবি তুলছেন। তার সাথে কথা বলতে চাইছেন। কিন্ত্তু পুলিশ প্রশাসন সে অনুমতি দিচ্ছে না। তারা নিরাপত্তার খাতিরে সেটা করতে বাধ্য হয়েছেন। তাই সাংবাদিকরা কেবল ছবি তুলেই চলে যাচ্ছেন। পরদিন তারা কোর্টে দেখা করবেন।

পরদিন ভবাকে নিয়ে যাওয়া হলো সিএমএম আদালতে।আদালতের ম্যাজিট্রেট জনাব জগন্নাথ দাস। তার এজলাস প্রাংগনে ভবাকে হাজির করা হলো। ম্যাজিট্রেট নির্দেশ দিলেন ভবার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে শোনানোর জন্য। নির্দেশ পেয়ে আদালতের কাঠ গড়ায় দাঁড়িয়ে পুলিশের এস আই খোকন সিকদার বললেনঃ মাননীয় আদালত। এই ভবা পূর্বে ম্যাজিট্রেট রশীদ তালুকদার স্যারের থানা প্রাংগনে বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। সে সময় তাকে তিনমাস জেল দেয়া হয়েছিল।
আদালত জানতে চাইল- কি কারণে তাকে জেল দেয়া হয়েছিল?
-হুজুর, সে ধর্মীয় রীতি নীতি ভংগ করে ধর্মের অবমাননা করেছিল। এই নিন হুজুর, সমস্ত অপকর্মের চার্জশীট।

পেশকার সেই চার্জশীটের কপি নিয়ে আদালতে পেশ করলেন। সেটা দেখে আদালত ভবার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সে কোন উকিল নিয়োগ করতে চায় কি-না? কিন্ত্তু একটি পাগলের উকিল হবার জন্য কেউ আগ্রহ দেখালেন না। ভবা সেটা বুঝতে পেরে বললোঃ

- হুজুর। ধর্মাবতার। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সবই আমি স্বীকার করছি। কিন্ত্তু কেন করেছি? সেটার পেছনে কারণগুলো কি? সেটাতো তারা বিচার করতে চাইলো না। কেউ জানতেও চাইলো না। আমি পাগল বলে সবাই আমাকে ধীক্কার দিচ্ছে। আর আমি দেখছি সবাই পাগল।

-আদালত আপনার সমস্ত কথা শুনতে প্রস্তুত। আপনার জবানবন্দী রেকর্ড করা হবে। আপনি বলুন। নির্ভয়ে বলুন।

-ধন্যবাদ মাননীয় আদালত। হুজুর আমার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ - আমি মসজিদের ইমাম সাহেবের স্থানে টাকা দিয়ে একটি ইমাম বানিয়েছি এবং সেটাকে মুসল্লিদের মানতে অনুপ্রাণিত করেছি। কিন্ত্তু কেন করেছি? কেন ইমামের স্থানে রেখেছি? কেন সেটা মুসল্লিদের স্থানে রাখা হয়নি। আর কেনই বা মুসল্লিদেরকে সেটা অনুকরণ করতে বলেছি?

হুজুর, হাদিছে আছেঃ ' লা সালাতা ইল্লাবি হুজুরি কলব'। হুজুরি কলব ব্যতীত সালাত হবে না। হুজুরি কলব হচ্ছে একাগ্রচিত্ত। একাগ্রচিত্তে প্রভুকে স্বরণ করে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআন পাকে বর্ণিত আছেঃ"লা তাকরাবু সালাতা ওয়াআনতুম সুকারা" । অর্থঃ"দুনিয়ার চিন্তা-ভাবনা নিয়ে সালাতে দাঁড়িও না।" কিন্ত্তু ইমামগণ সেটা পালন করেন না। তারা সাংসারিক চিন্তায় মশগুল থাকেন। তাদের চিন্তা চেতনায় থাকে টাকা। তারা যখন সালাত আদায়ের উদ্দেশ্য করে নিয়ত করে সে সময় বলে-সমগ্র দিক হতে মুখ ফিরিয়ে তোমার দিকে আমার মন রুজ্জু করলাম। সুরা ফাতেহায় পাঠ করা হয় " ইয়া ক্যানা বুদু ইয়া কানাস্তাইন।" আমরা তোমার ইবাদত করি এবং তোমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি। হুজুর, এখন ইমামগণ কি ভেবে দেখেছেন - তারা তাদের ইলাহ কাকে বানাচ্ছেন? কেউ যদি টাকার চিন্তা করে সেক্ষেত্রে ইলাহ হচ্ছে টাকা। গরুর চিন্তা করলে ইলাহকে নিয়ে যাচ্ছে গরুর দিকে। বিভিন্ন চিন্তায় মশগুল থেকে তারা স্রষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে দুটি অন্যায় করছে। এক. স্রষ্টার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং দুই. মুসল্লিদেরও তার সাথে নিয়ে যাওয়া। মাননীয় আদালত। ইমামকে অনুসরণ করে মুত্তাকীরা বলে থাকেন - "ইত্তাদায়াতু বেহাজাল ইমাম।"  ইমাম যদি অন্যায় করে থাকে সেই ইমামকে অনুসরণ করে মুত্তাকীরাও বিপথে যাচ্ছে। এর দায় কে নেবে? হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সব ধর্মযাজকরা টাকার কাঙ্গাল হয়ে গেছে। তারা ধর্মকে ব্যবহার করছে হাতিয়ার হিসেবে। তাদের এই হীন্যমনতার কারণে বলী হচ্ছে সাধারন লোকজন। যাদের ধর্মবল প্রবল। ইচ্ছে ভক্তি প্রবল। তাদের সহজ সরল মনকে এরা সহজেই ব্যবহার করছে। তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে।

-প্রমাণ দিন।

-হুজুর কি প্রমাণ দিব? প্রমাণতো মন। এই হৃদয়। এই হৃদ মন্দিরের মাঝেই যে বন্দী আছে সেইতো দ্রষ্টা। সেইতো শ্রোতা। সে সবকিছু জানে।

-আবেগ দিয়ে ধর্ম কর্ম করা যায়। বিচার কার্যে প্রয়োজন হয় প্রমাণ। প্রমাণ ব্যতীত আদালত বিচারিক কার্য সম্পাদন করতে পারে না। আপনি যে কাজ করেছেন তার প্রমাণ আছে। কিন্ত্তু মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধদের ভিক্ষু, খ্রীষ্টানদের পাদ্রী-তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনলে প্রয়োজন দালিলিক প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ। যেটা আপনি দিতে পারেননি। ধরেই নিলাম আপনি দালিলিক প্রমাণ দিলেন কিন্ত্তু প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিভাবে দেবেন?

আদালতের কথা শুনে ভবা বেকুব হয়ে গেল। সে কিভাবে প্রমাণ দেবে যে ইমাম মনে মনে কি বলছে? ঠাকুর পুরোহিতরা কি করছে? ভিক্ষুরা কি করছে? ফাদাররা কি করছে? কোন অলীর মাজারকে পুজি করে কিভাবে ব্যবসা করছে? আমিতো দেখছি সবই...কিন্ত্তু আদালতের ঐ বিচারককে কিভাবে দেখাই? চিন্তায় মশগুল ভবার হটাৎ চোখ গেল আদালতের এক কোণায় দাঁড় করানো একটি মুর্তির দিকে। যার চোখ বন্ধ, হাতে একটি পাল্লা যেটা সে ধরে আছে...আর সেটা দেখেই ভবা এমন বিকট শব্দে হাসতে লাগলো যে আদালতে উপস্থিত জনাকীর্ণ সকলেই হতভম্ভ হয়ে গেল। ভবা বললোঃ

-যার চোখ বন্ধ সে কিভাবে সঠিক বিচার করতে পারে সেটা ভেবেই হাসছি।

চারদিকে ভীষণ গুন্ঞ্জন উঠলো। কেউ কেউ আদালত অবমাননা করার অভিযোগ আনলো। কেউ বললো এই ভন্ডকে ফাঁসিতে দেয়া উচিত....কেউবা ভবার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অসহায় দৃষ্টিতে। ভবা দেখছে আর হাসছে....স্বশব্দ করেই হাসছে।

যতই মাননীয় আদালত বলে অর্ডার অর্ডার..ততবারই ভবা হাসছে..স্বশব্দ করেই হাসছে..

সোমবার, ১১ মে, ২০১৫

একটি শোক সংবাদ- শেষ পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

তথ্যটি পাওয়ার পর শফিক সাহেবের আগ্রহ বেড়ে গেল। কিন্ত্তু তার তৃষ্ঞার নিবৃত্তি হচ্ছিল না। তাকে আরো জানতে হবে। তিনি গুগল ব্যবহার করে নেটে সার্চ দিলেন। কিন্ত্তু কোন পোষ্টই তার মনের তৃষ্ঞা পূর্বের মতো নিবৃত্ত করতে পারছিল না। অধিকাংশই নানান বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রাখে। তিনি সেদিকে গেলেন না। মৃত্যু কি? সেটা মোটামুটি জানা গেলেও মৃত্যুটি কেন? সেটার উপর তেমন কোন ভালো মানের লেখা তার দৃষ্টি গোচর হচ্ছিল না। বেশ বিরক্ত হয়েই তিনি সার্চ করা বাদ রাখলেন। তিনি এবার দৃষ্টি দিলেন ধর্মগ্রন্থের দিকে। তার মনে পড়লো কোরআনের একটি আয়াত। এটি প্রায়ই প্রত্যেকটি মুসলিম নর-নারীই জানে। সেটি কি? সেটি হলোঃ”কুল্লি নাফসিন জায়েকাতুল মউত।” প্রত্যেকটি প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে। অন্য স্থানে বলা হয়েছেঃ”ইয়া আইয়্যাতুহান নাফসুল মুতমাইন্নাতু ইরজিই ইলা রাব্বিকি রাদিয়াতাম মারদিয়াতিন। ফাদখুলুফি ইবাদি। ওয়াদ খুলি জান্নাতি ” [সুরা ফজর। আয়াত ২৭-৩০] হে প্রশান্ত আত্মা ফিরিয়া আস তোমার রবের দিকে একাগ্র খুশি মনে। (তার) একই মর্জি অনুসারে। সুতরাং আমার দাসের মধ্যে নিহিত হও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর। সুরা বনী ইসরাইল ৪৯-৫০নং আয়াতে বলা হয়েছে-”এবং তাহারা বলে (আমরা) যখন পচে গলে হাড়ে পরিণত হইব তখনও কি আমাদেরকে নতুনভাবে সৃজন করিয়া পুণরায় উঠানো হইবে?[ওয়াকালু আ-ইজা কুন্না ইজামান ওয়ারুফাতান আ-ইন্না লামারউসুনা-খালকান জাদিদান] তুমি বল, তোমরা পাথর অথবা লৌহখন্ডে পরিণত হইলেও।” [কুলু কুনু হেজারাতান আও হাদীদান]। সুরা আনআম ৩৮নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ ” এবং পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী রহিয়াছে এবং দুই ডানায় ভর করে যত পাখি ওড়ে অবশ্যই তাহারা তোমাদের মতো একটি উম্মত(দল,সম্প্রদায়) ব্যতীত নয়। (ওয়ালা মিন দাববাতীন ফিল আরদে ওয়ালা তায়েরীন ইয়াতীরু বে জানাহাইহে ইল্লা উমামুন আমসালুকুম)।
সনাতন ধর্মের প্রধান একটি বিষয় জন্মান্তরবাদ। গীতায় বলা হয়েছেঃ “জাতস্য হি ধ্রবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ। তস্মাদপরিহার্যেহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।।” (গীতা ২/২৭)
অর্থঃ ” যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। অতএব তোমার কর্তব্য সম্পাদন করার সময় শোক করা উচিত নয়।”
বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুললো।একটু বিরতি নিয়ে তিনি আবার লেখা শুরু করলেন। হেডিং হিসেবে লিখলেন মৃত্যু কেন?
কোন্ জিনিসটি পৃথিবীতে চিরন্তন সত্য? কোন্ বিষয়টি নিয়ে মানুষ এতো দুঃচিন্তাগ্রন্থ হয়েছে? কোন্ বিষয়টি অতিক্রম করার জন্য সুফী সাধকগণ জীবনের সকল বাসনা ত্যাগ করে ধ্যান মগ্ন হয়েছেন? মৃত্যুর বিষয়টি ছাড়া আর কোন বিষয়ই মানুষকে এতো বেশি ভয় পাইয়ে দেয়নি। কাজেই মৃত্যু একটি অনিবার্য্য পরিণতি। এটিকে স্বীকার করে নেয়া ছাড়া অন্য কোন গত্যান্তর নেই। কিন্ত্তু মৃত্যটি কেন?
পদার্থ বিজ্ঞানের শক্তির নিত্যতা বিধির সুত্রটি অধ্যয়ন করলে জানা যায়-”শক্তির সৃষ্টি বা ধংস নেই। শক্তিকে শুধুমাত্র একরুপ হতে অন্যরুপে রুপান্তরিত করা যায়। সমগ্র সৃষ্টি জগত, সাগর, মহা-সাগর ইত্যাদি কোথা হতে আসলো? এ কথা সকল ধর্মগ্রন্থ কর্তৃক স্বীকৃত যে, সকল সৃষ্টি জগতই এক পরম সত্তা একটি মহাশক্তি হতে নির্গত হয়েছে এবং উহাতেই প্রত্যাবর্তন করবে। একথা পবিত্র কোরআন শরীফেও বর্ণিত আছে। যথাঃ ইন্নানিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন।
প্রকৃতির দিকে খেয়াল করলে দেখলে আমরা কি দেখতে পাই? সমুদ্র হতে পানি বাষ্প হয়ে আকাশে মেঘের আকারে জমা হচ্ছে। মেঘ বরফে রুপান্তরিত হচ্ছে। সেই মেঘই আবার বৃষ্টি হয়ে সমুদ্রে প্রত্যাবর্তন করছে। মাটির নীচ হতে একটি ক্ষুদ্র বীজ হতে অন্কুর উঁকি মারছে। ক্রমে শিশু চারা গাছটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তারপর বাড়তে বাড়তে একটি বিরাট বৃক্ষ রুপ ধারণ করছে। তারপর বৃক্ষটি কিছু বীজ রেখে মৃত্যু মুখে পতিত হলো। একটি পাখির দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেখুন কিভাবে একটি ডিম থেকে তার জন্ম হয়? তারপর সে জীবন-যাপন করে তারপর তার মৃত্যু হয় আর মৃত্যুকালে রেখে যায় কতোগুলো ডিম। সমস্ত সৃষ্ট জগত এ নিয়মে চক্রাকারে ঘুরছে। যেখান থেকে তার সৃষ্টি সেখানেই সেটি প্রত্যাবর্তন করছে। সুতরাং মৃত্যু অর্থ কখনোই ধ্বংস নয়। এর অর্থ যা থেকে তার উদ্ভব উহাতেই তার প্রত্যাবর্তন। ক্রমেই সমগ্র সৃষ্টি জগত জন্ম মৃত্যুর আবর্তে ঘুরতে ঘুরতে সেই পরম সত্তায় বিলীন হচ্ছে। কোরআন দর্শনে সুফী সদরউদ্দিন আহমদ চিশতী সাহেব ও তাঁর কোরআন দর্শনে এই চক্রাকারের কথাই বলেছেন। কোরআন দর্শনে উল্লেখ আছেঃ হামিম অর্থ নরকের ঘোলা পানি বা বীর্য। যা হতে জীবের সৃষ্টি। হাবিয়া অর্থ-মাতৃগর্ভ বা ভ্রুণ। জাহিম – নরকের আগুন অর্থাৎ নরকের জ্বালা যন্ত্রণা। মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত নরকবাসীগণ হামিম-হাবিয়া-জাহিম এই চক্রাকারে ঘুরছে। হয়তো এ বিষয়টি বুঝতে পেরেই মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী বলেছেনঃ-
আমি পাথর হয়ে মরি আবার গাছ হয়ে জন্মাই
গাছ হয়ে মরি আবার পশু হয়ে জাগি
পশু হয়ে মরি আবার মানুষ হয়ে জন্মাই
তাহলে ভয় কিসের? কি বা হারাবার আছে মৃত্যুতে?
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা মোটামুটি বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে আমাদের বৃহত্তর জীবনকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
১) মাতৃ গর্ভে আসার আগে মহান সৃষ্টি কর্তার আছে আমাদের অবস্থান,
২) মাতৃ গর্ভে আমাদের দশ মাসের আবাস,
৩) পৃথিবীর বুকে আমাদের জীবনযাপন,
৪) মৃত্যু আর পুনরুজ্জীবনের মধ্যকার জীবন আর সর্ব শেষে
৫) পুনরুজ্জীবন থেকে আরম্ভ করে শেষ বিচার আর তার পরবর্তী স্বর্গ অথবা নরকের জীবন।
শেষ বিচারের পরে আমরা আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পোঁছাবো। এর পরে সেখানে আমাদের পথ চলা বন্ধ হবে। আরম্ভ হবে অনন্ত জীবন। যার কোন শেষ থাকবে না। বর্তমানে আমাদের অবস্থান ৩ নম্বর পর্যায়ে। আমরা পৃথিবীর বুকে ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। পরবর্তী পর্যায়ের দিকে। যা হল মৃত্যু। এটা আমরা ইতিমধ্যেই জানি, আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থান কি ভাবে কাটাচ্ছি। তার উপরে নির্ভর করছে আমাদের বৃহত্তর জীবনের পর্যায় ৪ ও ৫।
সর্বশেষে বলা যায় – মৃত্যু হচ্ছে একটি সেতু স্বরুপ। যা বন্ধুকে বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দেয়। মৃত্যু নিয়ে ভীততো তারাই হবে যারা অন্যায়-অবিচার অনাচার করছে। তাদের জন্য দুঃসংবাদ। আর যারা সৎ কার্য সমাধা করবে তাদের জন্যতো সুসংবাদ। তারা প্রভুর সান্নিধ্যে আশ্রয় লাভ করবে….চিরজীবনের জন্য চিরস্থায়ী নিবাসের জন্য।
লেখাটি শেষ করে তিনি নিজেই অনেক ভাবিত হলেন। স্রষ্টার স্বরণ নেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। ওয়াশ রুমে গিয়ে ওযু করে এশার নামাযের প্রস্তুতি নিলেন। নামায শেষ করে নিজের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো তিনি বিদায় নিলে তারই ফেলা যাওয়া বীজের অন্কুরগুলোও ক্রমান্বয়ে উদ্ভিদাকারে বড়ো হবে। এবং তারাও কিছুদিনের অবকাশ পাবে। তারপর তারাও বিদায় নিবে। কি অদ্ভুত এ মানব জীবন। কি রহস্যময় তার লীলা…স্রষ্টার করুণাধারায় সিক্ত শফিক সাহেবের দুচোখে তখন শ্রাবণের বারিধারা অনর্গল বয়ে চলেছে….
দুর হতে বাবাকে দেখছিল অর্থি। বাবার চোখে জল দেখে অর্থি দৌড়ে এসে বললো
- বাবা, তুমি কাঁদছো কেন?
-ও তুমি বুঝবে না মা। তিনি মেয়েকে শক্ত করে চেপে ধরলেন। যেন যম তাকে ছিনিয়ে নিতে না পারে। কিন্তুু তিনি জেনে গেছেন..তা সম্ভব নয়। তিনি স্বশব্দে কেঁদে উঠলেন। আর বিড়বিড় করে আবৃত্তি করলেন মীর্যা গালিবের একটি শায়ের -
আমি যেতে চাই বসতবাটিতে,
এমন স্থলে,
যেখানে কোথাও কেউ নেই।
আমার বক্তব্য বুঝতে কেউ নেই,
আমার সঙ্গে কথা বলারও কেউ নেই,
সেখানেই, আমি যেতে চাই।
আমি গড়তে চাই,
এমন একটি বসতবাটি,
প্রবেশের একটি দরজা ছাড়া,
সীমানা দেওয়াল ছাড়া,
সেখানে কোনো প্রতিবেশী থাকবে না,
এবং কোনো পাহারা থাকবে না।
এখানে কেউ একত্র হবে না,
আমার প্রতি যত্নবান হতে,
যখন আমি পশুচর্মে আবৃত হব।
তখনো কেউ থাকবে না,
শোকসন্তপ্ত অথবা কাঁদবে,
যখন আমি চলে যাব।

শনিবার, ৯ মে, ২০১৫

হাঁস-মুরগীর ছাও

করিমবক্স সবেমাত্র সকালের নাস্তা সেরে উঠোনে এসে বসেছেন। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তিনি একটি মোড়া পেতে বসে চা খাচ্ছেন আর খবরের কাগজ পড়ছেন। একটি খবরের দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। সম্পাদকীয় কলামে সম্পাদক বলছেনঃ আমরা কি খাচ্ছি? ট্যানারির বর্জ্য পদার্থ দ্বারা তৈরী পোল্ট্রি ফার্মের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে আমরা আমাদের পুষ্টির জন্য যে মুরগী খাচ্ছি তা বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সাথে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য হিসেবে যে ডিম আমরা খাই তাও বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। বিষাক্ততার কারণে আমরা নানা প্রকার রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। এতে করে বাড়ছে বুদ্ধির স্বল্পতা। বিকশিত হচ্ছে না মেধা। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফার্মেসীর সংখ্যা।... খবরটা পড়ে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হলেন। আমাদের দেহের মুল অংশ তথা সারবস্তু হচ্ছে-শুক্রানু। সেটাও কি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে না? বিয়ে শাদী করে সন্তান ধারণ করলে মায়ের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বেশি করে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের । সেই প্রোটিনের সিংহভাগ মেটায় এই পোল্ট্রিফার্ম। তার উপর আছে ফর্মালিনের উপদ্রব। কি যে হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছি আমরা? কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের নৈতিক শিক্ষা? তিনি চিন্তিত মুখে কাপটি রাখলেন। তারপর চোখের চশমাটা খুলে তা আবার পরিস্কার করে পড়লেন। 
এরই ফাঁকে তার দৃষ্টি গেল উঠোনের দিকে। তিনি দেখলেন একটি মা মুরগী তার বাচ্চাদের নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাবার শেখাচ্ছে। কখনো কখনো পায়ের নখের আঁচর দিয়ে ঘেটে ঘুটে খাদ্য বের করছে। আর তার বাচ্চারা সেটা অনুসরণ করে একই কায়দায় খাদ্য বের করছে। দৃশ্যটি তার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হলো। তিনি তাকিয়ে তাকিয়ে সেটা দেখতে লাগলেন। কিন্ত্তু তার চিন্তার রেশ কাটলো না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ে গেলেন। দেখলেন সেখানে একটি হাঁস তার বাচ্চাদের নিয়ে মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে। বাচ্চাগুলো মাকে অনুসরণ করে ডুব দিচ্ছে আবার উঠছে। মা হাঁসটি পুকুর পাড়ে উঠে শরীরটাকে ঝাঁকালেন। সমস্ত পানি হাঁসটির শরীর থেকে ছিটিয়ে পড়ছে। সেটাকে দেখে বাচ্চাগুলোও মাকে অনুসরণ করে একই কায়দায় শরীরটাকে ঝাঁকাচ্ছে। তারপর ময়লা কাদা ঘাঁটাঘাঁটি করছে। সেটা দেখে তিনি বেশ গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। মনে হলো তিনি কিছু একটা পেয়েছেন। তিনি আর দেরী করলেন না। সেখান থেকে চলে আসলেন। তাকে হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে মিতু জিগ্যেস করলোঃ

-কি হয়েছে তোমার? ওমন করছো কেন? 

-ও তুমি বুঝবে না। তোমাকে আল্লাহ সে জ্ঞান দেয়নি। যে জ্ঞান হাঁস-মুরগিকে আল্লাহ দিয়েছেন, তার কিছুটা যদি তোমাকে দিত তাহলে কিছুটা হলেও ছেলে-মেয়েগুলো অত্যন্ত মানুষ হতো?

- কি বললে তুমি? আল্লাহ অামাকে হাঁস-মুরগীর জ্ঞানও দেয়নি। সব জ্ঞান আল্লাহ তোমাকে দিয়ে তাই না?

স্ত্রীর প্রতি এ আচরণ তিনি কখনো করেন না। কিন্ত্তু তিনি আজ কেন করলেন কে জানে? কিছুটা শান্ত হয়ে তিনি স্ত্রীকে বললেনঃ

-চলো আমার সাথে।

-কোথায় যাবো?

-আরে আসোতে? আসলেই দেখতে পাবে। আসো আমার সাথে। 
তিনি মিতুর হাত ধরে টেনে সাথে নিয়ে চললেন। উঠোনে যেখানে মা মুরগীটা তার বাচ্চাদের নিয়ে কিভাবে খেতে হবে, কিভাবে ঘুরে বেড়ায় কি করে সেটা দেখালেন। এরপর নিয়ে গেলেন পুকুর পাড়ে। সেখানে তিনি যা দেখে ছিলেন, তাই মিতুকে দেখালেন। মিতুর বিরক্তির সীমা রইলো না। সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে হাত ঝাটকা মেরে সেখান থেকে চলে এলেন। স্ত্রীর এ আচরণে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তিনি ভেবে ছিলেন পুরো বিষয়টি তাকে দেখিয়ে যে শিক্ষাটা সকালে পেয়েছেন সেটা বুঝিয়ে বলবেন। কিন্ত্তু উল্টা মিতুই তাকে শিক্ষা দিল। তার চোখের কোণে একটু জল জমে গিয়েছে। সেটা গড়িয়ে পড়ার অাগেই মুছে ফেললেন। সারাদিন কারো সাথে কিছু বললেন না। বিছানায় শুয়ে রইলেন।

দুপুর বেলা ঘুম হতে উঠলেন। গোসল সেরে নামায পড়ে খেতে বসলেন। দেখলেন তার ছেলে-মেয়েরাও খেতে বসছে। সবাই এক সাথে খেতে বসছেন। খেতে খেতে তার মনে পড়লো সেই হাঁস-মুরগীর কথা। তিনি হারিয়ে গেলেন সেই হাঁস-মুরগীর ভীড়ে। তিনি দেখলেন তিনি যেন সেই মা মুরগীটার একটা বাচ্চা। মা মুরগীটা বলছে - " বাছারা, আল্লাহ পাক আমাদের খাবার যেখানে রেখেছেন সেখান থেকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁজে বের করে খেতে হবে। তোমার রিজিক আল্লাহ জমিনের মাঝেই রেখেছেন। কাজেই হতাশ হবার কিছু নেই। এরপর মা মুরগীটা তার দিকে তাকিয়ে বলছে, দ্যাখো বাছারা, মানব সন্তানেরা কতো বেকুব। তারা আমাদের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা নেয় না। আমরা মানব সন্তানদের মতো খাবারে ভেজাল দেই না। পরিশ্রম লব্দ হালাল খাবার খাই।"  কিভাবে খাবার খুঁজে খেতে হয়, আমার দিকে তাকাও। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। এই বলে সে তা দেখিয়ে দিল। সেটা অনুসরণ করে তিনিও খাবার খেতে লাগলেন।

- কি ব্যাপার, তুমি ওমন করে খাচ্ছ কেন? 

- সেটা তুমি বুঝবে না। তোমার কাজ তুমি করো।
স্ত্রীর প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে আবার তিনি আপন মনে খেতে লাগলেন। সেই ফাঁকে আবার হারিয়ে গেলেন মা হাঁসটির কাছে। মা হাঁসটি তাকে বলছে - "বাছা, দেখ তোমরা মানুষেরা কতো অসহায়। দুনিয়াতে নানান রংয়ে ঢংয়ে চলা ফেরা করো। স্রষ্টার নিয়ামত খাচ্ছ তার প্রতি শুকরিয়া আদায়তো করোই না উল্টা তারই বিরোধিতা করো। অথচ আখিরাতের জন্য একটি মুল্যবান একটি শিক্ষা তোমরা আমাদের কাছ থেকে নিতে পারে। দ্যাখো, আমরা সারাদিন কাদা-পানিতে ময়লা আবর্জনা ঘাটাঘাটি করি। পানিতে ভাসি। ডুবি। মাছ-পোকা মাকড় খাই। পুরোটাই দুনিয়ার মতোই। কিন্ত্তু আমরা যখন ঘরে ফিরি আমাদের গায়ে কিন্ত্তু একটুও ময়লা আবর্জনা থাকে না। ঝাড়া দিয়ে সব ফেলে দেই। আবার পরের দিনের জন্য আবার প্রস্তুত হই। আর তোমরা করো উল্টাটা। তোমরা সত্যিই স্বার্থপর।"

হটাৎ প্লেট ভেংগে যাওয়ার শব্দে সবাই তার দিকে তাকায়। সারা ঘরময় ভাত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিতু এবং তার ছানা-পোনারা সব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।  তিনি  অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। তার এ আচরণের হেতু তারা খুঁজে পেল না। করিম বক্স কেবল শুনতে পেল তারা বলছেঃ "আম্মু, বাবা হাঁসের মতো ওমন করছে কেন? কেমন যে গা ঝাড়া দিচ্ছে.....

শুক্রবার, ৮ মে, ২০১৫

একটি শোক সংবাদ

একটি শোক সংবাদ। অদ্য বিকাল ৫ ঘটিকায় রামপুরা নিবাসী.......ইন্তেকাল করিয়াছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া....রাজিউন। মরহুমের নামাযে জানাযা বাদ এশা .....অনুষ্ঠিত হবে।

মেয়ের জন্য ক্যাডবেরী এবং চকোবিন কিনে বাড়ী ফেরার পথে শফিক সাহেব মাসুমের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি একটি শোক সংবাদ শুনতে পেলেন।  মাইকে শোক সংবাদের খবর পেয়ে কিছুটা হলেও চমকে উঠলেন। কে মারা গেল তা শোনার জন্য আবারো খেয়াল করলেন। কিন্ত্তু ততক্ষণে দুরে চলে যাওয়ায় তা স্পষ্ট শুনতে পেলেন না। তিনি মাসুম কে জিগ্যেস করলেনঃ

- মাসুম কে মারা গেল?

- কি জানি ভাই? আমিতো চা বানাতে ব্যস্ত ছিলাম। কি বলছে তা শুনতে পাইনি।

- তুমিওতো দেখছি আমার মতো। কোন দিকেই খেয়াল দেও না।

- কি করমু ভাই? সব দিকে খেয়াল দিলে কি চলে?

- একটা সিগারেট দাও। আর কতো হইছে?

- ষোলো টাকা।

শফিক সাহেব ষোলো টাকা দিয়ে তার বাড়ীর দিকে হাঁটা দিলেন। পথে যেতে যেতে ভাবলেন-কে মারা গেল। কিভাবে মারা গেল। কিছুইতো জানতে পারলাম না। জানা কি জরুরী ছিল না? একজন মানুষ এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। কি ভাবে যাচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে? কিছুই তার জানা যাবে না। কি বিচিত্র এই মৃত্যু। হাঁটতে হাঁটতে তিনি তার বাড়ীর কাছে পৌঁছে গেলেন। দরোজায় দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপলেন। বেলের শব্দ শুনে অর্থি দৌড়ে এসে দরোজাটা খুলে দিল। শফিক সাহেবকে দেখে অর্থি চিৎকার করে উঠলোঃ

- বাবা....সামিউল দেইখ্যা যা বাবায় আইছে।

কিন্ত্তু মেয়ের ডাক চিৎকারে শফিক সাহেব বিন্দুমাত্র উৎসাহবোধ করলেন না। তিনি সোজা ঘরের ভেতর ঢুকে গেলেন। তার এ আচরণে মিতু বেশ অবাক হলো। সে জানে তার স্বামী তার সন্তানদের কতোটা ভালোবাসেন। প্রতিদিন আসার সময় মেয়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। আজ এসেছেন একদম খালি হাতে। তার উপর ছেলে মেয়েদের প্রতি কোন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এমন অস্বাভাবিক আচরণে মিতু বেশ ঘাবড়ে গেল। কি হলো তার স্বামীর? মিতু উৎকন্ঠা নিয়ে জিগ্যেস করলোঃ

- কি ব্যাপার? তুমি মেয়ের ডাকে সাড়া দিলে না?

- কি? তুমি কি কিছু বললে?

- বললাম তুমি মেয়ের ডাকে কোন সাড়া শব্দ দিলে না? দ্যাখোতো ও কেমন মন মরা হয়ে গেছে? তোমার কি কিছু হয়েছে?

- না। তেমন কিছু না। রাস্তায় আসতে আসতে একটা মৃত্যুর সংবাদ শুনলাম। তাই একটু বিচলিত।

- কে মারা গেছে?

-জানি না।

- জানো না । অথচ না জেনেই কেমন আনমনা হয়ে গেছো?

- অর্থিকে ডাকো। অর্থি ...অর্থি...মা মণি..

বাবার স্নেহের ডাক শুনে অর্থি তার ছোট ভাই সামিউলকে সাথে নিয়ে আসছে। তিনি সামিউলকে কোলে তুলে নিলেন। আর অর্থির জন্য আনা চকোবিনের প্যাকেটটা হাতে দিলেন। ক্যাডবেরির প্যাকেটটাও দিলেন। সেগুলো পেয়ে অর্থি খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। সে তার ভাইকে রেখে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তিনি মিতুকে বললেন-এককাপ চা দাও। তিনি ছেলেকে কোলের থেকে নামিয়ে বাথরুমে গেলেন। মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি অযু করে নামায পড়ার জন্য জায়নামায চাইলেন। নামায পড়ে তিনি চা চাইলেন। চা খেতে খেতে তিনি ভাবছেন সেই শোক সংবাদের কথা। চা টা শেষ করে তিনি একটি বই নিয়ে পড়তে বসলেন। বিছানায় হেলান দিয়ে বই পড়ছেন। কবরের আযাব ও মৃত্যুর পর। বইটা পড়ার সময় তার মাথায় কি যেন একটা চিন্তা আসলো। তিনি বিছানা হতে নেমে কাগজ কলম নিয়ে বসলেন। ইন্টারনেট সার্চ করলেন। বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করলেন। তার পর লেখা শুরু করলেনঃ

মৃত্যু কি এবং কেন?

মৃত্যু (ইংরেজি: Death) বলতে জীবনের সমাপ্তি বুঝায়। জীববিজ্ঞানের ভাষায় প্রাণ আছে এমন কোন জৈব পদার্থের (বা জীবের) জীবনের সমাপ্তিকে মৃত্যু বলে। অন্য কথায়, মৃত্যু হচ্ছে এমন একটি অবস্থা (state, condition) যখন সকল শারিরীক কর্মকাণ্ড যেমন শ্বসন, খাদ্য গ্রহণ, পরিচলন, ইত্যাদি থেমে যায়। কোন জীবের মৃত্যু হলে তাকে মৃত বলা হয়।
মৃত্যু বিভিন্ন স্তরে ঘটে থাকে। সোমাটিক মৃত্যু হল সামগ্রিকভাবে কোন জীবের মৃত্যু। নির্দিষ্ট অঙ্গ, কোষ বা কোষাংশের মৃত্যুর আগেই এটি ঘটে। এতে হৃৎস্পন্দন, শ্বসন, চলন, নড়াচড়া, প্রতিবর্ত ক্রিয়া ও মস্তিষ্কের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। সোমাটিক মৃত্যু ঠিক কখন ঘটে তা নির্ণয় করা দুরূহ, কেননা কোমা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এবং ঘোর বা ট্রান্সের মধ্যে থাকা ব্যক্তিও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে থাকেন।

সোমাটিক মৃত্যুর পর অনেকগুলি পরিবর্তন ঘটে যা থেকে মৃত্যুর সময় ও কারণ নির্ণয় করা যায়। মারা যাবার পরপরই পার্শ্ববর্তী পরিবেশের প্রভাবে দেহ ঠান্ডা হয়ে যায়, যাকে বলে Algor mortis। মারা যাবার পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টা পরে কংকালের পেশীগুলি শক্ত হয়ে যায়, যাকে বলে Rigor mortis, এবং এটি তিন-চার দিন পরে শেষ হয়ে যায়। রেখে দেয়া দেহের নীচের অংশে যে লাল-নীল রঙ দেখা যায়, তাকে বলে Livor mortis; রক্ত জমা হবার কারণে এমন হয়। মৃত্যুর খানিক বাদেই রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে। আর তারপরে দেহের যে পচন শুরু হয়, তার জন্য দায়ী এনজাইম ও ব্যাক্টেরিয়া।

দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিভিন্ন হারে মারা যায়। সোমাটিক মৃত্যুর ৫ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলির মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের কোষগুলি ১৫ মিনিট এবং বৃক্কেরগুলি প্রায় ৩০ মিনিট বেঁচে থাকতে পারে। এই কারণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সদ্যমৃত দেহ থেকে সরিয়ে নিয়ে জীবিত ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।[সুত্রঃউইকিপিডিয়া]

বিষয়টি জানা ছিল না। বেশ ভালো একটি তথ্য পেলেন।
[চলবে]

ভবা পাগলার ঈশ্বর

পুরো গ্রামের লোকজন ভবা পাগলার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে- মুরতাদ ভবার ফাঁসি চাই। দিতে হবে। দিতে হবে। সারা বাংলায় মুরতাদ ভবার ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই। পুরো গ্রামের ধর্মানুসারীরা নির্বিশেষে ক্ষেপে গিয়েছে। কি হিন্দু, কি মুসলমান। কি বৌদ্ধ, কি খ্রীষ্টান। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবারই একটাই দাবী - অবিলম্বে ভবাকে গ্রেফতার করে ফাঁসি দিতে হবে। নতুন করে এই উৎপাত সৃষ্টি হওয়ায় গ্রামে শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার স্বার্থে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৪৪ ধারা জারী করতে হয়েছে।

সারা গ্রামের মানুষের মধ্যে একটাই কথা। পুলিশ যদি ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভবাকে গ্রেফতার না করে, তাহলে তারে যেখানে পাবে সেখানেই তাকে হত্যা করা হবে। গ্রামের লোকজন সবাই লাঠি সোঁটা নিয়ে পাহাড়া দিচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে গ্রামে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। ভবাকে গ্রেফতার করে থানায় আনা হয়েছে। ম্যাজিট্রেড রশিদ তালুকদার, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সোবহান সাহেব গ্রামের গণ্যমান্য সমস্ত ব্যক্তি বর্গকে থানায় আসার জন্য অনুরোধ করেছেন।

সবাই থানায় উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে একটি বিচারিক আদালত গঠন করা হয়েছে। ম্যজিট্রেড রশিদ সাহেব আদেশ দিলেন ভবার বিরুদ্ধে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কি কি অভিযোগ রয়েছে  তা দাখিল করুন। ম্যাজিট্রেডের আদেশ পেয়ে মসজিদের ইমাম সাহেব মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস তসতরী বললেনঃ

- হুজুর। ভবা মসজিদের মধ্যে ইমাম যেস্থানে দাঁড়ায় সেইখানে একটা মুর্তির গায়ে পান্ঞ্চাবী পড়াইয়্যা ইমাম বানাইছে আর  ট্যাকা দিয়া লেইপ্প্যা খাড়া কইর‌্যা সমস্ত মুসল্লিগো কইছে - অই মিয়ারা, তোমরা এহন থিক্কা এই  ইমামের পিছনে দাঁড়াইয়্যা নমাজ পড়ব্যা...

ইমাম সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই শ্রী শ্রী হরিকৃষ্ণ পাল দাঁড়িয়ে বললো

- হুজুর কি কমু? ঐ ভবা মোগো শ্রী কৃষ্ণর গায়ে টাহা পয়সা দিয়া এমনভাবে লেইপ্প্যা রাকছে সে হেইডারে আর চিননের উপায় নাই। আর নিচে লেইখ্যা রাখছে - " শ্রী শ্রী ট্যাকাষ্ণ।" আর বাবা লোকনাথের বাণীর মধ্যে লেইখ্যা রাখছে " জলে বনে রণে যেইখানেই যাও আমারে দরকার পড়িবে।" কত্তো বড়ো সাহস...

ম্যাজিট্রেড রশিদ তালুকদার দেখলেন - ভবা তার অভিযোগ শুনে মাথা নিচু করে মিটি মিটি হাসছে। তিনি সেই হাসির রহস্য ধরতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন আরো দুই জন ফরিয়াদি আছে। তাদের ফরিয়াদও শুনতে হবে। তাই তিনি তাকালেন বৌদ্ধ মন্দিরের জ্ঞানেশ্বর ভিক্ষুর দিকে।

ভিক্ষু জ্ঞানেশ্বর তার দিকে তাকাতে দেখে দাঁড়িয়ে সেই একই অভিযোগ আনলেন ভবার বিরুদ্ধে। তিনি বললেনঃ

- ধম্মাবতার, ঐ ভবা জ্ঞানের প্রতীক বিজ্ঞের প্রতীক ভগবান বুদ্ধকে অপমানিত করেছেন। ভগবান বুদ্ধের ধ্যানের মুর্তির মধ্যে ঐ জ্ঞানপাপী টাকা-পয়সা দিয়ে এমনভাবে লেপে দিয়েছেন যে সেটাকে আর চেনার উপায় নেই। ললাটের মুলস্থানে যেখানে আমরা ধ্যানের আকর বলি সেইখানে একটা এক টাকার কয়েন বসিয়ে দিয়েছেন। আর লিখেছেনঃ
"ওহে মুর্খের দল! তোমরা বসিয়া বসিয়া কেন অযথা সময় নষ্ট করিতেছো। শীঘ্র যাও টাকা-পয়সা কামাও। নচেৎ কোন কিছু করিতে পারিবা না। জায়গা-জমি করিতে পারিবা না। সব কিছু হারাইলে শেষে জংগলেও ঠাঁই পাইবা না।"

রশিদ সাহেব খ্রীষ্টান পাদ্রী নলেজ গোমেজের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

- ভবার বিরুদ্ধে আপনার কি অভিযোগ?

- হুজুর আমারও ঐ একই অভিযোগ। ভবা আমাদের গীর্জার মধ্যে প্রবেশ করে পবিত্র যীশুকে অপমানিত করেছেন। মা ম্যারিকে অপমানিত করেছেন। ক্রুশের মধ্যে টাকা গাঁথিয়া রাখিয়াছেন। আর যেখানে মা ম্যারি যীশুকে কোলে তুলে বসেছিলেন সেইখানে যীশুর হাতে একটি টাকার কয়েন ধরিয়ে দিয়েছেন। আর বাণীর স্থানে লিখে রেখেছেনঃ
"টাকার জন্য প্রার্থনা করুন।"

সবশুনে ম্যাজিট্রেড রশিদ তালুকদার বেশ উৎসাহবোধ করছেন। চারটি ধর্মের কর্তা ব্যক্তিরা একজন পাগলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। কিন্ত্তু তারা কি জানে - যাকে পাগল বলা হচ্ছে সে যদি সত্যিই প্রমাণিত হয় যে বিকারগ্রন্থ তাহলে আইনে তার শাস্তি না-ও হতে পারে। কিন্ত্তু ভবাকে দেখে তার পাগল মনে হচ্ছে না। তার হাসিই বলে দিচ্ছে নিশ্চয়ই সে কোন একটা কারণে কার্য্যগুলো করেছে। কিন্ত্তু কি তার উদ্দেশ্য? সেটাতো জানা হলো না। তাই রশিদ সাহেব ভবাকে লক্ষ্য করে তার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

- আসামী ভবা পাগলা। আপনার বিরুদ্ধে ফরিয়াদীরা যে অভিযোগগুলো দাখিল করেছে তাতো আপনি শুনেছেন। আপনি ধর্মকে অবমাননা করেছেন। এ ব্যাপারে আপনার কি বলার আছে?

ভবা পাগলা কিছু না বলে কেবলই হাসছে। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে এক অভিনব পদ্ধতিতে কেবল হেসেই যাচ্ছে আর বলছে

" মান বাহর জামিয়াতে নাঁলানে শোদাম,
জুফতে খোশ হালানো বদ হালানে শোদাম।"

অর্থঃ আমার দুঃখ ও ক্রন্দনের অবস্থা কাহারও নিকট অপ্রকাশ্য নাই। ভাল-মন্দ প্রত্যেকের নিকট-ই আমার অবস্থা প্রকাশ হইয়া রহিয়াছে।

বুধবার, ৬ মে, ২০১৫

মাটির পুতলা - শেষ পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সামিউল দেখলো তাশরীফ সত্যিই বিষয়টা নিয়ে বেশ গভীর চিন্তায় নিপতিত হয়েছে। তাকে ঐ অবস্থায় দেখে সে গুণ গুণ করে আল্লামা ইকবালের একটি শায়ের আবৃত্তি করছিলঃ
Roshan To Woh Hoti Hai, Jahan Been Nahin Hoti
Jis Ankh Ke Pardon Mein Nahin Hai Nigah-E-Pak

An eye which in its vision does not imbibe pure virtue
Is capable of seeing, no doubt, but is not all‐seeing.

- কিরে কিছু ভেবে পেলি?

-হুম। দেখলাম পন্ঞ্চভুত ছাড়াও আরো কিছু উপাদানের প্রয়োজন আছে। নিজের দেহের সাথে মিলিয়ে দেখলাম।
-তাই? কি পেলি?
-তাহলে এইবার তুই শোন। তাশরীফ বলা শুরু করে
আমাদের দেহটি তিনটি অংশে বিভক্ত। আর তা হলো-
স্থুলদেহ (Physical Body), সূক্ষ্মদেহ (Etheric Body) এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মদেহ (Astral Body)। স্থূলদেহ হচ্ছে দেহের বাহ্যিক আবরণ। সূক্ষ্মদেহ হচ্ছে দেহের আভ্যন্তীণ উপকরণ সমুহ। আর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মদেহ হচ্ছে দেহের প্রাণশক্তি তথা ঈসায়ী শক্তি বা রুহ। যে পন্ঞ্চভুতের কথা বলেছিস তার মধ্যে আরো কিছু গুণাবলী রয়ে গেছে যা তুই বলিস নি। যেমন আমি দেখলাম পন্ঞ্চ ভুত হতে উদ্ভূত এই দেহে প্রত্যেক ভুত হতে পাঁচ পাঁচটি করে আরো পঁচিশটি বস্তুু ও গুণের সৃষ্টি হয়েছে। যথাঃ-
মাটি হতে-অস্থি, মাংস, নখ, চর্ম ও লোম।
পানি হতে-শুক্র, শোনিত,মজ্জা,মল ও মুত্র।
অগ্নি হতে-ক্ষুধা, পিপাসা, নিদ্রা, আলস্য ও ক্লান্তি।
বায়ু হতে-ধারণ, চলন, ক্ষেপন, সংকোচন ও প্রসারণ।
আকাশ হতে-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও লজ্জা।
তাছাড়া  আরো পন্ঞ্চবিংশতি গুণ ও বস্তুু আছে। তাঁদের সংমিশ্রণে দেহ সংক্রিয় হয়ে থাকে। যথাঃ- আত্না, প্রকৃতি, বুদ্ধি, আমিত্ব, মন, চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা, ত্বক, কফ, পানি, পাদ, পায়ু, উপস্থ, শব্দ,স্পর্শ, রুপ, রস, গন্ধ, ঈথার(আকাশ), বায়ু, অগ্নি, জল, মাটি ও আপ্ত। সর্বমোট পঁচিশটি।

তাশরিফের কথা শুনে সামিউল হা হয়ে গেল। সে জিগ্যেস করলোঃ

-তুই এত কিছু জানলি কিভাবে?

-আরে ব্যাটা। তুই কেবল নিজেকে পন্ডিত ভেবে বসে আছিস। নিজের পান্ডিত্য জাহির করার জন্য আমার সাথে তর্ক করতে আসছিস?

-তাই? না। ঠিক আছে। তোর কথার দৌড় কত দুর দেখি। আচ্ছা বলতো - অাদমকে আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন তার নিজ সুরতে। বলা হয় - খালাকাল আদামা আলা সুরাতিহি। তাহলে হাওয়া কার সুরতে সৃষ্টি? আল্লাহ আদমকে কাদা মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। কিন্ত্তু হাওয়াকে কিভাবে সৃজন করেছেন?

সামিউলের কথা শুনে তাশরীফ মাথা নীচু করে রইল। তা দেখে সামিউল বললোঃ

তাকা আমার দিকে। শোন আমরা পাল পাড়ায় দেখেছি কেউ মাটি আনছে। কেউ পানি আনছে। কেউ বা পুতুল তৈরীর ছকে ঢেলে সেটাকে আকৃতি দিচ্ছে। আবার কেউ সেই আকৃতিতে রং মেখে তাকে সাজাচ্ছে। তাইতো। এবার তুই চিন্তা করে দেখ - সৃষ্টির প্রারম্ভে সৃষ্টিকর্তা ঐ উপাদানসমুহ (পন্ঞ্চভুত) কোথায় পেলো?
আমরা জানি বা দেখি জীব জগতে মৈথুন প্রক্রিয়ায় মায়ের উদরে জীবের জন্মদান করা হয়। সেই জন্মদান করার সময় জীব তার আকৃতি নিয়ে বের হয়। তাহলে আদম কোন্ উদরে সৃষ্টি হলো? বল।
 নারী পুতুলটা দেখেই আমার মনে এই চিন্তার উদয় হয়। কারণ নারী ব্যতীত পুরুষের পক্ষে সৃষ্টি সম্ভব নয়। আবার শুধু নারী দিয়েও সৃষ্টি সম্ভব নয়। তাহলে আদম সৃষ্টির রহস্য বর্ণিত আছে। কিন্ত্তু হাওয়া সৃষ্টির রহস্য বর্ণিত হয়নি। কেন?
শোন হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ) তাঁর চিশতী উদ্যানে বলেছেনঃ
"একেতে বহুত হয় বহুতে এক হয় না।" এই কালামের রহস্যটা বুঝতে পারলে তুই প্রকৃত সত্যটা জানতে পারবি। শোন
তোকে একটা হিন্টস দিচ্ছি। এ সব কিছুর উত্তর পবিত্র কোরআন পাকে বর্ণিত আছে। তুই সেই আলোকে জবাব দে। দেখি তুই কতো বড় জানলেওয়ালা হয়ে গেছিস?

সামিউলের কথা শুনে তাশরীফ তার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। আর সেটা দেখে সামিউল মুচকি মুচকি হাসছে আর  মীর্যা গালিবের আরেকটি শায়ের আবৃত্তি করছেঃ

Hairat He Tum Ko Dekh Kar Misjid Main Ae! Insaan
Aaj Kya Baat Ho Gai Jo Khuda Yaad Aa Gaya

মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০১৫

মাটির পুতলা-দ্বিতীয় পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

সামিউল তাশরীফকে নিয়ে রমেশের বাড়ী থেকে বের হয়ে বাড়ীর পথ ধরে  গ্রামের মেঠো পথে হাঁটতে হাঁটতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে চৈত্রের খর রোদে হাঁটার ফলে দুজনেই বেশ ঘামিয়ে যায় পথের ধারে শিমুল গাছের নীচে তারা বিশ্রামের জন্য বসে পড়ে ঝির ঝির করে বাতাস বইছে বাতাসে রোদের তাপ স্পষ্ট হাল্কা গরম লাগলেও বেশ ভালো লাগছে তাশরীফ জিগ্যেস করে

- কিরে তোকে না বললাম তুই পুতুলটার দিকে কেমন যেন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলি। কারণটা বললি না?

- কারণটা কিছুটা রহস্যজনক মনে হলেও সেই সময় আমি অন্য একটি ভাবনায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। তাই সময় অনেকক্ষণ পুতুলটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কি ভাবছিলাম সেটা বুঝতে হলে তোকে বেশ মনোযোগ নিয়ে শুনতে হবে। আর বিষয়টির সাথে কিছুটা হলেও আধ্যাত্মবাদ জড়িয়ে আছে। আছে জ্ঞানের অনেক উপলক্ষ। সুতরাং তোকে বেশ মনোযোগ এবং ধৈর্য নিয়ে শুনতে হবে

- অারে ভনিতা বাদ দিয়ে তুই বলতো কেন তুই ঐভাবে তাকিয়ে ছিলি আর কি চিন্তা করছিলি?

- শোন আমি কি ভাবছিলাম আর কেন পুতুলটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম
আমাদের দেহটি পন্ঞ্চভুতে সৃষ্টি। তাইতো? সেই পন্ঞ্চভুতগুলো কি কি? ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ বোম। মাটি, পানি, আগুন, বাতাস, আকাশ। এগুলোকে আরবীতে বলা হয় খামছা আনাছের। তো যে পুতুলটি পাল পাড়ায় তৈরী করা হচ্ছে-সেইটির মধ্যে কি এই পন্ঞ্চ উপাদান বিদ্যমান নয়? যদি বিদ্যমান না থাকে তাহলে কোন্ উপাদানটির ঘাটতি আছে? অর্থাৎ কোন উপাদানটি নেই? পুতুলটি তৈরী করার জন্য মাটি দেখেছিলাম। সেই মাটিকে পানি দ্বারা মোথিত করতে দেখেছি। তারপর বাতাসের সংস্পর্শতো সর্বদায় পাচ্ছে। তারপর আগুন দিয়ে পোড়ানো হচ্ছিল। সেটাও দেখেছি। আর আকাশ ভুতের যে কথা উল্লেখ আছে তা হচ্ছে স্পেস অর্থাৎ আকাশ আকাশের উচ্চতা থাকায় সেটা বেড়ে উঠতে সাহায্য করছে। সেখানেও দেখেছি আকাশ ভুতের উপস্থিতি। পন্ঞ্চভুতের সংমিশ্রণে যদি আত্মা তৈরী হওয়ার কথা থাকে, তো আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি না কেন? তাহলে বুঝা যাচ্ছে - পন্ঞ্চ উপাদান কেবল খাঁচা বা ছকটাই তৈরী করতে পারে। আত্মা নয়। আত্মা অন্য জিনিস। কিংবা সেটি এমন একটি অজানা বিষয় যেটার সংস্পর্শে তা জীবিত হয়ে ওঠে। তাহলে সেটাকে আমরা কি বলতে পারি? যদি আত্মা বলি তাহলে আত্মা কিভাবে দেহে ক্রিয়া করে? কিংবা এই পন্ঞ্চভুতের সমষ্টি একীকৃত সমষ্টি চৈতন্য হওয়ার কথা থাকলে তো কুমারের তৈরী পুতুলের মধ্যে তা ক্রিয়া করার কথা। তা করছে না কেন?

- তুইতো ভালো জিনিসই চিন্তা করতেছিলি। আর আমিতো ভেবেছিলাম অন্য কিছু?

- তুই কি ভাবছিস আমি বুঝতে পারিনি?

- সেটাকি স্বাভাবিক না? শত হলেওতো সেটা একটা নারী পুতুল। একথা বলে তাসরীফ হাসিতে ফেটে পড়ে

- দ্যাখ, তোকেতো অামি প্রথমেই বলেছিলাম বিষয়টি হাসি ঠাট্টা না করে সিরিয়াসলি চিন্তা করতে। কারণ এর মধ্যে রয়েছে জ্ঞানের বিষয়। যা সৃষ্টি এবং স্রষ্টা সর্ম্পকে চিন্তা করতে সাহায্য করবে। কিন্ত্তু তুই বিষয়টাকে নিয়ে হাসি তামশায় পরিণত করছিস

-সরি দোস্ত। আর করবো না। যা প্রমিস। আর সিরিয়াসলি নিতে বলছিলি না-ঠিক আছে সিরিয়াসলি নিলাম। ক্যারি অন মাই ফেন্ড

-না। তুই কথা বলার রেশ কেটে দিয়েছিস। এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তুই থাক। অামি চললাম। 
কথা বলেই সামিউল চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আর অম্মনি তাশরীফ সামিউলের জামার আস্তিন ধরে টেনে বসিয়ে দিল। 

- সরি দোস্ত। একটু ঠাট্টা করছিলাম। মনে কিছু করিস না। সত্যি বলছি এখন থেকে তুই সিরিয়াসলি পাবি। এবং তোর সাখে অামার জানা বিষয়ও শেয়ার করবো। প্লীজ

তাশরীফের কথা শুনে সামিউল বসে পরে। তারপর সে আবার বলা শুরু করে

- আচ্ছা তোর কি জানা আছে এই পন্ঞ্চ ভুতের কার কি গুণ-কি রুপ এবং কোথায় স্থিতি?

- না। কিন্ত্তু তুইতো আত্মার কথা বলছিলি। সেটার কথা না হয় বল

- সেটা পরে আসবে। তার আগে পন্ঞ্চভুতের অারো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে তা জানা দরকার। সেটাই শোন আগে
পৃথিবী (ক্ষিতি) - গন্ধ গুণ শুক্লবর্ণ। স্থির রুপ। নাসিকায় স্থিতি
পানি ( অপ) - রস গুণ। কিন্ঞ্চিৎ গৌর বর্ণ। দ্রব্য রুপ জিহ্বায় স্থিতি
আগুন (তেজ) - রুপ গুণ। ভস্ম বর্ণ। সুন্দর রুপ। চক্ষে স্থিতি
বায়ু (মরুৎ) - স্পর্শ গুণ। শ্যামল বর্ণ শ্যামার্ত্তরুপ। চর্ম্মে স্থিতি
আকাশ  (ব্যোম) - শব্দ গুণ। ধুম্র বর্ণ। সূক্ষ্ম রুপ। কর্ণে স্থিতি
পুতুলটার দিকে খেয়াল করলে দেখবি ঐগুণগুলো উপস্থিতি আছে। কিংবা একটি প্রতিমার কথা চিন্ত্তা কর। দেখবি যে গুণগুলোর কথা বলা হয়েছে তার সবই উপস্থিত আছে

সামিউলের কথা শুনে তাসরীফ বেশ গভীরভাবে মেলাতে চেষ্টা করছে। একবার সে দেবী দুর্গা কিংবা কালী আবার যে পুতুলটা দেখেছিল সেটার দিকে খেয়াল করার চেষ্টা করলো। সত্যিইতো তাদের সবটিতেই রুপ,রস,গন্ধ সবই আছে। আচ্ছা রস তার মানে পানি। শুকালেতো পানি থাকার কথা না। তাছাড়া সেটা তো জিহ্বায় থাকার কথা এবং শরীরের অধিকাংশইতো পানি। অর্থাৎ রক্ত, শ্লেদ বা আরো কিছু। তাছাড়া  সেটা থাকলেতো জিহ্বা ভিজে থাকার কথা। ঠিক তখনই সে আবিস্কার করলো সে কেন নিজের দিকে তাকিয়ে দেখছে না? সে এবার বেশ সিরিয়াসলি ভাবনায় ডুবে গেল