পৃষ্ঠাসমূহ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ- পন্ঞ্চম পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)
যেমন ধর ইসলামের নবী (আঃ) এর কথা। তিনি কি করেছেন? তিনি কি সংসার ধর্ম পালন করেন নাই? করেছেন এবং তাঁর সন্তানাদিও ছিল। সে যদি সংসার ধর্ম পালন করে আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে পারে তাহলে কেন অন্য কেহ পারবে না? কিভাবে সংসার করে আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে হয় তাতো স্বয়ং রাসুল পাক(আঃ) নিজেই দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। যাতে করে তার উম্মতগণ সেই পথ অনুসরণ করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে। রাসুল(আঃ) বলেছেনঃ" লা রাহাবানিয়াত ইল্লাল ইসলাম।" ইসলামের মধ্যে কোন সন্ন্যাস নাই। তাঁকে অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য। আর তাঁকে মেনে চলার অর্থ তার সুন্নাতের মধ্যে সামিল থাকা। এরপরই আসে তরিকত। শরীয়ত হতে তরিকতকে এবং তরিকত হতে শরীয়তকে পৃথক জানাই পাপ। মারেফাত সকলের জন্যই প্রযোজ্য। মারেফত ব্যতীত কোন ইবাদতই হতে পারে না। শরীয়ত দেহ আর তরীকত তার রুহ। সুতরাং রুহ ব্যতীত দেহ যদ্রুপ অচল ও অকর্ম্মন্য তদ্রুপ তরিকত ব্যতীত শরীয়তও অচল এবং অপুর্ণ ও প্রাণহীন মৃতদেহ স্বরুপ। মুল কথা হলোঃ ইসলাম, ঈমান এবং এহসান (মারেফাতে এলাহী) - এই তিনটি মিলেই শরীয়ত গঠিত হয়েছে। এই তিনটি জিনিসের সমষ্টিগত বস্তুর নামই শরীয়ত। সুতরাং উক্ত তিনটি জিনিস হতে একটি বাদ পড়িলে শরীয়ত অপুর্ণ থাকবে। ইসলাম ও ঈমান লাভ করার ন্যায় ইলমে ইহসান অর্থাৎ মারেফাতে এলাহী হাসিল করাও ফরজ। অতএব আহলে মারেফাত না হলে আহলে শরীয়ত হওয়া যায় না এবং যিনিই আহলে শরীয়ত তিনিই আহলে মারেফাত। যারা বলে আহলে মারেফাত জানার প্রয়োজন নাই। তারা ভীষণ গলদের মধ্যে রয়েছে। তাদের দিলে মহব্বত ও আদব শুন্যতার দরুণ এবং রসুলে পাকের বিরুদ্ধাচরণ করায় এবং নুরে আকলের অভাবে খাবাছতে বাতেন ও ওয়াছ ওয়াছার দরুণ রহমতে এলাহীর অভাবে মরে গিয়েছে। তাদের থেকে দুরে থাকাই বান্ঞ্চনীয়।

 উপরোক্ত কথাগুলো বলে তিনি একটু বিরতি দিলেন। সেই ফাঁকে কবির সবার জন্য আদা দিয়ে লাল চা বানিয়ে নিয়ে এসেছে। সেই চা সবার মাঝে দেয়া হচ্ছে। সেই ফাঁকে ছলেমান বললোঃ

-হুজুর, আপনের কথায় বুঝা যাইতাছে যারা শরীয়ত পালন করতাছে তারাই মারফতের মধ্যেই আছে। যদি তারা মারফতের মধ্যেই থাকে তাইলে তারা তরীতকের লোকগো দেকতে পারে না কেন্?

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি ছলেমানের দিকে তাকিয়ে তার নাম জিগ্যেস করলেন। জবাবে ছলেমান তার নাম এবং পেশা বলে। তা শুনে শাহ্ সাহেব বললেনঃ

-শুন মিয়া। কেবলমাত্র শরীয়ত পালন করলেইতো হবে না। তাকেতো মারেফাত হাছিল করতে হবে। আর এলমে মারেফাত হাছিল করার জন্য তাকে তরীকতের মধ্যে অবশ্যই দাখিল হতে হবে। পবিত্র কুরআন পাকে এরশাদ হয়েছেঃ "ইয়া আইয়ুহাললাজিনা আমানুত্তাকুল্লাহা ইয়াবতাগু ইলাহিল অসিলাতা। ওয়া জাহিদু ফি সাবিলিল্লাহি লা আল্লাকুম তুফলিহুন।" (চলবে)

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ-চতুর্থ পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

কবিরদের ভেতর বাড়ীতে অতিথিরা সবাই অপেক্ষা করছে শাহ্ সাহেবের জন্য। তিনি নামায শেষ করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ভেতরে বেশ কয়েকজন মহিলা এবং পুরুষ অপেক্ষা করছে তার জন্য। তিনি আসছেন দেখে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। শাহ্ সাহেব একটি সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। পুরুষ এবং মহিলারা তার সাথে সাক্ষাত করে বের হয়ে গেল। রুমটিতে হাতে গোনা কয়েকজন রইল। কবির শাহ্ সাহেবের জন্য কিছু নাস্তা ট্রেতে করে নিয়ে আসলো। সেটা একটা টেবিলের উপর রাখলো। আরেকটি প্লেট নিচে মেহমান যারা বসেছিল তাদের মাঝে রাখল। শাহ্ সাহেব বললেনঃ

-বাবা কবির, সবাইকে দিয়েছো তো?

-জ্বি বাজান। 

-নিন। আপনারা শুরু করুন। বিসমিল্লাহ বলে তিনি খেতে শুরু করলেন। 
তাকে অনুসরণ করে বাকীরাও খাওয়া শুরু করলো। নাস্তার মধ্যে ছিল কাটা আপেল, আঙ্গুর আর বেদানা। সবাই বেশ আয়েশ করে ভাগ যোগ করে খেল। খাওয়া শেষ হতেই শাহ্ সাহেব ছলেমানের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

-তাহলে আমরা শুরু করতে পারি তো? কি বলেন আপনারা...

সবাই যেন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল সেই কথা শোনার জন্য। তারা সমস্বরে সায় দিলঃ

-জ্বি হুুজুর।

তিনি শুরু করলেন।

পরম করুণাময় আল্লাহ জাল্লাশানুহুর হিকমত বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। সাধারণ মানুষ বলতে সর্ব সাধারণ একেবারে আম লোককে বুঝানো হয়। সেই লোকগুলো সংখ্যাধিক্য বিধায় তারা জীবের পর্যায়ভুক্ত। তার মধ্যে তখনো ইনসানিয়াত প্রকাশ পায়নি। অর্থাৎ যে স্তরে সাধারণ জীব থেকে মানুষ বলা হয় সে তখনো সে স্তরে উপনীত হয়নি। সদ্য আসায় তার মধ্যে তখনো হায়ওয়ানী স্বভাব প্রবলভাবে বিরাজমান। সেই জীবদের উদ্ধারের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যুগে যুগে নবী-রসুল, অলী-আউলিয়া,গাউস-কুতুব প্রেরণ করেছেন কেবলমাত্র তাদের হেদায়েত করার জন্য। অার এই হেদায়েত কেবলমাত্র জীব পর্যায়ভুক্ত মানবদের জন্য। আর এজন্যই কুরআন পাকে বর্ণিত হয়েছেঃ "লি কুল্লি কাউমিন হাদিন।" প্রত্যেকটি সম্প্রদায়ে হাদিন অর্থাৎ পথ প্রদর্শক প্রেরণ করা হয়েছে।  তিনি আরো বলেছেনঃ লি কুল্লি জায়ালনা মিনকুম শিঁরাতাও ওয়া মিনহাজ।" শিঁরাতাও দ্বারা শরীয়ত এবং মিনহাজ দ্বারা একটি বিশেষ পথকে বুঝানো হয়। শরা হতে শরীয়ত তথা আইন-কানুন। কোন একটি রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে, সেজন্য রাষ্ট্র প্রধান কি করে? কিছু আইন-কানুন প্রণয়ন করেন। যাতে রাস্ট্রে বসবাসকারী নাগরিকগণ সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে। সেই আইন ভংগ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তাই না? ঠিক তদ্রুপ আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার সৃষ্টিরাজ্য পরিচালনা করার জন্য এই আইন কানুনের ব্যবস্থা সর্বসাধারণের জন্য প্রণয়ন করেছেন যাতে সেই আইন অনুযায়ী তার সৃষ্টিরাজ্যে বসবাসকারীগণ সকলেই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে। তদুপরি যারা বিশেষ লোক তথা সেই আইন মান্য করে আরো অধিক কিছু পাবার আশা রাখে তাদের জন্য তিনি এই বিশেষ পথটি অনুসরণ করার তাগিদ দিয়েছেন।

-আইচ্ছা হুজুর। আপনে যে কইলেন মিনহাজ মানি বিশেষ পথ। হেইডা কি? ছলেমান তার কৌতুহল নিরারণ করার জন্য জানতে চাইল।

-শুনেন। শরীয়ত সকলেরই জন্য প্রযোজ্য। এই আইন কেউ তরক করার ক্ষমতা রাখে না। তবে হ্যা যারা মজ্জুব অর্থাৎ আল্লাহ প্রেমে পাগল তাদের জন্যই কেবল সেই আইন শিথিলযোগ্য। অন্যথায় নয়। আর যে বিশেষ পথটির কথা বলা হয়েছে তাহলো তরীকত। তরীকত তরক হতে এসেছে। যার অর্থ রাস্তা। বিশেষ রাস্তা বা পথ। আর এই তরক ধাতুর সাথে শেষে আরবী হরফ "ত" যুক্ত থাকায় সেটাকে তৌহিদ তথা একত্ববাদ বলা হয়। সুতরাং তরীকত দ্বারা একত্ববাদের একটি বিশেষ পথকে বুঝাচ্ছে। সেটি কেবল তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা শরীয়তকে পুর্ণ পায়রবী পুর্বক হ্ক্ক পথে রয়েছে। শরীয়ত মেনেই তোমাকে তরীকতের পথে চলতে হবে। আর তার জন্য তাগিদও দেয়া হয়েছে।
(চলবে)

রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ-তৃতীয় পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আজ কবিরদের বাড়ীতে বিশেষ আয়োজন চলছে। সকাল হতেই নানাস্থান হতে লোকজন আসতে শুরু করেছে। প্রতি চন্দ্র মাসের ৬ তারিখে তাদের বাড়ীতে একটা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সুফী সাহেব আসেন। সুফী সাহেবকে অনেকেই শাহ্ সাহেব বলে সম্বোধন করে থাকেন। তিনি অনেকটাই অনাঅাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। সচরাচর কোথাও যান না। কিন্ত্তু কবিরদের বাড়ীতে আসেন। কবিরের বাবা আলী আশরাফ সিকদার বেশ নাম করা লোক এবং তিনি সর্ম্পকে তার পীর ভাই হন। সেই সুত্র ধরেই তিনি এইদিনে কবিরদের বাড়ীতে আসেন। ছলেমান সেই সুফী সাহেবের সাথে কথা বলার জন্য বেশ আগে ভাগেই উপস্থিত হয়েছে।

সন্ধ্যা তখনো হয়নি।পাখ-পাখালিরা নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে। বিকেলের নরোম রোদ বেশ আয়েশ করেই কুয়াশার চাদর পরার প্রস্ততি নিচ্ছে। আর সুয্যিটা নিবু নিবু আলো দিয়ে প্রায়ই বিদায় নিতে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় পশ্চিম আকাশ হতে ভেসে এলো-আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার...আশ শাহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাহা... মুয়াজ্জিনের আজানের শব্দ। মাগরিবের ওয়াক্ত হওয়ায় সবাই অযু করতে ব্যস্ত। আযানের শব্দ শুনে শাহ্ সাহেব খানকাহ্ শরীফের ভেতরে প্রবেশ করলেন। আর তক্ষুণি ছলেমানের নযরে পড়ল শাহ্ সাহেবকে। দেখতে আহমরি তেমন কিছুই তার নযরে পড়লো না। হাল্কা পাতলা গঠন। গায়ের রং শ্যামলা। চুলগুলোতে পাক ধরেছে।কিন্ত্তু তাঁর চেহারা হতে যেন বিজলি বের হচ্ছে। একবারে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ছলেমান ভেবে পেল না এর কারণ কি? লোকটি দেখতে যত না উজ্জ্বল তার গায়ের রংয়ের চেয়ে চেহারাটা আরো বেশি উজ্জ্বল।

লোকজন লাইন ধরে জামাতে নামায পড়া আরম্ভ করেছে। ছলেমানও অযু করে জামাত ধরার জন্য তড়িঘড়ি করে খানকায় যায়। তাদের সাথে নামায পড়ে। নামায পড়া শেষ হতেই একে একে সবাই বের হয়ে যায়। শাহ্ সাহেব তখনো সেখানে জায় নামাযের উপর বসে বসে কি যেন পাঠ করছিলেন। ছলেমান অপেক্ষা করছিল কখন সে ঘুরে তাকাবে? একসময় তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়। শাহ্ সাহেব ঘুরে তাকালেন। আর ঠিক তখনই ছলেমানের দিকে তার নযর পড়লো। তার মনে হলোঃ সে যেন কিছু বলার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি দরদ মাখা গলায় জিগ্যেস করলেনঃ

- বাবা, তুমি কি কিছু বলতে চাও?

তার কন্ঠস্বর শুনে প্রথমে ছলেমান হতচকিত হয়ে যায়। সে ঠিক কি বলবে বুঝতে পারছে না। আবার মনেও করতে পারছে না - কি জিগ্যেস করবে? ছলেমান হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে শাহ্ সাহেবের দিকে। শাহ্ সাহেব আবারো জিগ্যেস করলেনঃ

- বাবা, তুমি কি কিছু জিগ্যেস করবে?

-জ্বি হুজুর। আমি আপনের অনেক কতা কবিরের কাছে হুনছি। কবির আমার বন্ধু।

-ওহ্। আচ্ছা । তা তুমি কি জানতে চাও?

ছলেমান ভালো করে খানকাহ শরীফের দিকে তাকিয়ে দেখলো খুব বেশি লোকজন নেই। জনা কয়েক লোকজন বসে আছে। আর কিছুলোক এখনো নামায শেষ করে নাই। তারা নামায পড়ছে। এটা মোক্ষম সময় মনে করে ছলেমান বলা শুরু করলোঃ

- আমাগো পুব পাড়ার মোতালেব ব্যাপারীর বাপ তালেব ব্যাপারী। হেয় মারা গেছে না অইলেও প্রায় পচিশ-ত্রিশ বছর অইব। এই যে হেই দিন নদী ভাংগনের সময় ওগো বাড়ীও নদাীতে ভাইংগ্যা যায়। ওর বাপেরে যেইখানে মাডি দিছিল সেই কবরও ভাইংগ্যা যায়। কিন্ত্তু আচানক ঘটনা অইলো সেই তালেব ব্যাপারীর লাশ একটুও কিছু অয় নাই। পচে নাই। কিচ্ছু না। দেকলে মনে অয় এইতো একটু আগে হেরে মাডি দিছে। হুজুর এইডা কেমতে সম্ভব অইলো-এইডা আমার মাতায় কিচ্ছুতেই ঢুকতাছে না। তাই আপনের কাছে আইছি বিষয়ডা একটু জাননের লাইগ্যা।

ছলেমানের কথা শেষ হতে না হতেই কবির শাহ্ সাহেবকে ভিতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলো। সেখানে হাল্কা কিছু চা-নাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শাহ্ সাহেব উঠতে উঠতে বললেনঃ

-ও এই ব্যাপার। ঠিক আছে তুমি আমার সাথে আসো।

শাহ্ সাহেব এবং তার জনাচারেক ভক্তবৃন্দসহ ছলেমান কবিরদের ভেতর বাড়ীতে প্রবেশ করলো।
(চলবে)

শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ-দ্বিতীয় পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)
ছলেমানের মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। সে ভেবে পাচ্ছে না - এটা কিভাবে সম্ভব? ত্রিশ বছর পর তালেব ব্যাপারীর লাশ কিভাবে অবিকৃত রইল? অথচ এই ত্রিশ বছরে তার কোন অস্তিত্বই থাকার কথা না। পন্ঞ্চ ভুতের উপাদানে তৈরী এ মানব দেহ মৃত্যু নামক বিষয়টির সাথে জড়িত। প্রতিটি ভুতের ভৌত উপাদানগুলো সেই ভুতের সাথে মিশে যাবার কথা। অথচ তা না হয়ে হলো উল্টাটা। সেই দেহটি রইল অবিকৃত। এটা কিভাবে সম্ভব হলো ?

চিন্তায় বিভোর ছলেমান কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অথচ সে তার মাথা থেকে সম্পূর্ণ চিন্তাটি মুছে ফেলতে পারছে না। সে তার দোকান সাদিয়া জুয়েলার্স থেকে বের হয়ে পাশের টং দোকানে চা খেতে গেল। দোকানী রহিম ব্যাপারী জানে ছলেমান ভাই সবসময় হাসি খুশি মানুষ। দেখা হলেই সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করে। জানতে চায় সার্বিক অবস্থা। সেই ছলেমান ভাই আজকে কেমন যেন মন মরা লাগছে। কোন কথাই বলছে না। সে চা দিতে দিতে বললোঃ

- কি ব্যাপার ছলেমান ভাই? কেমুন জানি দেহাইতাছে আপনারে? কি হইছে? শরিলডা কি খারাপ?

- না রে ভাই। সেইরকম কিছু না। মনডা একটু খারাপ।

-মনের আবার কি অইলো?

-আরে ভাই সকালে নামাজ পইর‌্যা দোকানে আহনের সময় সুরুজ বাইয়ের লগে দেহা। হেয় কইলো মোতালেব ব্যাপারীর বাপ তালেব ব্যাপারীর লাশ নাকি বাইর অইছে। আর হেই লাশ নাকি একটু্ও পঁচে নাই।

-কও কি? ওর বাপতো মারা গেল না অইলেও বিশ পঁচিশ বৎসর অইলো। হেই লাশ পঁচে নাই-এইডা কেমুন কথা?

-আরে বাই আমিওতো হেই কতা ভাবতাছি। এইডা কেমতে সম্ভব?

-আরে আল্লাহয় চাইলে কি না অয়? মালিকের দয়া অইছে। হের লাইগ্গ্যা হয়তো অয় নাই...

-অইবার পারে। কিন্ত্তু..তারপরও 

-তুমি কি দেকছো?

-না। আমি দেহি নাই। তয় হুনছি গ্যারামের বেবাকতে দেকছে। 

-হুনছি সাংবাদিকও নাকি ঢাকা থিক্কা আইছিল। হেরা বেবাক খবর লইয়্যা গেছে। বিষয়ডা বড়ো আচানক ঠেকতাছে...এমুন একটা খবর আর আমি দেকতে পারি নাই?

তাদের কথা বার্তার মাঝে কবির সিকদার এসে উপস্থিত হয়। সে এসেই রহিমের কাছে পানি চায় আর একটা সিগারেট চায়। পানি পান করে সে সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলে

-ছলেমান রাইতে বারিত আহিস। আমাগো পীর সাহেব আসবো...

-তাইলে তো ভালয় অয়। একটা জিনিস জাননের আছে। হের কাছ থিক্কা জানতে পারমু।

-কি জানতে চাস?

-আরে ঐ যে হেই ঘটনাটা..

-কোনডা...

-মোতালেইপ্যার বাবার ঘটনাডা

-ও। আরে আমি গেছিলাম দেকতে..যাউগ্যা তুই রাইতে বারিত আহিস। কতা আছে তোর লগে... আমি যাইগ্যা। সবাইরে দাওয়াত দেওন লাগবো।

কবির সিকদার হন হন করে হেঁটে চলে যায়। ছলেমানের মনে কি যেন একটা চিন্তা আসে। সে বেশ খুশি হয়। তার মনে হয় সে তার চিন্তার একটা কুল কিনারা করতে পারছে..তার ভাবনার বিষয়টি হয়তো সে জানতে পারবে...এ আনন্দে তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

সোনার মানুষ-প্রথম পর্ব

কার্তিক মাসেই শীতের আগমণ ধ্বনি শুনা যাচ্ছে। চারিদিকে কুয়াশার একটা পাতলা চাদর ইতিমধ্যেই বিছিয়ে দিতে শুরু করেছে। গাছের ডগায় শিশির বিন্দু জমে জমে তা টিনের চালায় পড়ে বেশ আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। সবুজ ঘাসের উপর পড়ে তা বেশ মনোরম অবগাহন করে নিচ্ছে। শীতের আবহ তৈরী হওয়ার ছলোমান তার কাঁথাটি বেশ করে গায়ে জড়িয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকে। তার বৌ সকিনা তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে চেষ্টা করছে।

-এ্যাই হুনছো। আজান হইছে। ওঠো...ফজরের নামাজ পড়বা না? 

ছলেমান কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে আযান দিচ্ছে কি-না? সে কাঁথার ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছে দুরে কোথাও মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছে। "আস সালাতো খাইরাম মিনান নাউম।" ঘুম হতে সালাত উত্তম। সে উঠি উঠি করেও উঠছে না। তাকে মনে হয় আলসিতে পেয়ে বসেছে। সে শুনেছে - ভোর রাতে শয়তান মানুষের পা টিপে দেয়। যাতে সে আরামে ঘুমাতে পারে। ফজরের নামাজ যাতে না পড়তে পারে। মনে হচ্ছে তাকে সেই শয়তানই পেয়ে বসেছে। উঠি উঠি করেও উঠছে না। 

-কি অইলো? ওডো না ক্যান? নামায পড়বা না?

বউয়ের ঠেলায় সে কাঁথা ছেড়ে ওঠে বসে। তারপর বউকে বলেঃ

-কি সন্দোর একটা ঘুম আইছিলো। দিলাতো সব মাটি কইর‌্যা। মাত্রতো আযান হইছে। নামাযের তো এখনো অনেক দেরী আছে। 

-কি কও। তাই বইল্যা কি ওঠবা না?

-উডুম না কেডা কইলো?  

-যাও। হাত মুখ ধুইয়্যা ওযু কইর‌্যা মসজিদে যাও। জমাতে নামায পর। জমাতে নামায পড়লে অনেক সোয়াব। 

বউয়ের প্যান প্যানানি শুনতে ইচ্ছে করছে না। তার চোখে মুখে এখনো ঘুমের ছোয়া লেগে আছে। সে আর দেরী করলো না। ঘর হতে বের হয়ে প্রাতঃরাশ সেরে ওযু করে মসজিদের দিকে রওনা দেয়। 

ইমাম সাহেব মুসল্লিদের বলছেনঃ আপনারা যারা সুন্নাত আদায় করেননি তারা তাড়াতাড়ি সুন্নাত পড়ে নিন। জামাতের আর মাত্র মিনিট পনের বাকী আছে। ছলেমান তাড়াতাড়ি করে সুন্নাত আদায় করে। যথারীতি ফরয নামাজ শেষ করে। মসজিদ হতে বের হতে গিয়ে দেখে - সবে মাত্র পুব আকাশে সুয্যিটা আলো ছাড়তে শুরু করছে। সে সে আলোয় নিজেকে অবোগাহন করার জন্য নদীর ধারে হাঁটতে বের হয়। নদীর পাড়ে উত্তুরি বাতাসে সে কিছুটা শীতের আবেশ পায়। কিন্ত্তু তার হাঁটতে বেশ লাগছে। 

পথে দেখা হয় সুরুজ মিয়ার সাথে। সুরুজ মিয়া পেশায় একজন বর্গাচাষী। চাষের কারণেই সে খুব ভোরে জমির ধারে যায়। সারাদিনমান কাজ করে। দুপুরে খেয়েই আবার ছোটে জমির ধারে। সন্ধ্যা নাগাদ আসে। ছলেমান একজন স্বর্ণকার। গঞ্জে তার সাদিয়া জুয়েলার্স নামক একটি স্বর্ণের দোকান আছে। সেই সুত্র ধরে সকলেই তাকে চেনে। সুরুজ মিয়া ছলেমানকে দেখে সালাম দেয়ঃ

-আসসালামু আলাইকুম ছলোমান ভাই।

-ওয়ালাইকুম আস সালাম।

-কি অবস্থা তোমার? ছলেমান জানতে চায়।

-অার অবস্থা। আছি কোন রকম। আপনের খবর কি?

-আর খবর? কেউ আর আগের মতো জিনিস পত্র বানাতে দেয় না। 

-খবর হুনছেন নি? 

-কি খবর?

-আরে ঐ পাড়ার মোতালেব ব্যাপারীর বাবা তালেব ব্যাপারী যে মারা গেছিল আজ থিক্ক্যা প্রায় ত্রিশ বচ্ছর আগে। হের লাশ নাকি বাহির হইছে। লাশের একটুও কিছু অয় নাই।

-কও কি? কেমতে বাইর অইলো?

-আরে অগো বাড়ীতো নদীর ধারেই। নদীতে ভাংগনের সুময় বাইর হইছে। হারা গেরামের বেবাকতে দেকতে গেছে।

-আরে কও কি? আর এই খবরডা আমি জানলাম না?

(চলবে)

আল হাক্কু মুরুনঃ মনা পাগলার ভাষণ

মনা পাগলা একটা করোল্লা হাতে নিয়ে বেশ চেঁচিয়ে বলছেঃ -আল হাক্কু মুরুন। আল হাক্কু মুরুন।। আল হাক্কু মুরুন।।। সত্য বড়ো তিতা। সত্য বড়ো তিতা। সত্য বড়ো তিতা।

তার হাঁক ডাক শুনে লোকজন জড়ো হতে আরম্ভ করলো। তারা এক পর্যায়ে সবাই মনাকে ঘিরে ফেললো। আর মনা সবাইকে সেই করোল্লা দেখিয়ে দেখিয়ে বলছেঃ আল হাক্কু মুরুন। সত্য বড়ো তিতা। করোল্লা তো তিতাই। সেটাকে এতো স্বরবে প্রচার প্রচারণা করার অর্থটা সাধারণ্যের কাছে কেমন যেন বোধগম্য হচ্ছে না। তারা বেশ উৎসুক্যবোধ করছে। দেখতে চাচ্ছে পাগলটা কি করে?

মনা তার স্বভাব সুলভ আচরণ করছে আর বলছেঃ আল হাক্কু মুরুন। সত্য বড়ো তিতা। যেমন করোল্লা। একথা বলেই সে করোল্লা দিব্যি চিবিয়ে খাচ্ছে আর উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে সকলের দিকে তাকাচ্ছে। একটা পাগলকে নিয়ে যে আগ্রহ সাধারণ্যের কাছে ছিল তা ধীরে ধীরে বেশ বড়ো হতে চলেছে। মনে হলো মনা পাগলা সেটাই চাইছিল। সে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললোঃ

-যে করোল্লা এত তিতা তার চাইতেও বেশি তিতা ইতিহাস। আর ইসলামের ইতিহাসতো আরো বেশি তিতা। আরো বেশি মর্মান্তিক। ইসলামের ইতিহাস রক্তাক্তের ইতিহাস। ইসলামের ইতিহাস বেদনার ইতিহাস।

একটা পাগলের মুখে ইসলামের ইতিহাস শোনার জন্য কেউ নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবে না। যারা একটু বেশি উৎসুক ধরণের তারাই থাকলো। আর যারা পাগলের ইতিহাস শোনার চেয়ে সময়ের মুল্য অনেক বেশি মনে করলো তারা কেটে পড়লো। আমি নেহায়েত গোবেচারা ধরণের। কোন কাম কাজ নেই। থাকলেও কেউ দেয় না। টোটো কোম্পানীর ম্যানেজারের চাকরিটাতো আছেই। কাজেই আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম পাগলের সেই করোল্লা মার্কা ইসলামের ইতিহাস শোনার জন্য। আমার মতো দুই চারজন লোকও সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছি মনা পাগলার সেই করোল্লা মার্কা ইতিহাস। মনা পাগলা সমানে বলেই চলেছেঃ

- আশ্চর্য ! দেড় হাজার বছর অতিক্রম হয়ে গেলো, তবু কারবালার মহাত্ম্যটাই নির্বোধ এ জাতির মাথায় ঢুকলো না। ওরা মনে করছে বছরে নির্দিষ্ট একদিন বা কয়েকদিন মর্সিয়া, মাতম, হা-হুতাশ আর ক্রন্দনের মাধ্যমে আশুরা উদযাপন করলেই বুঝি নবী-পরিবার খুশিতে গদগদ হয়ে উঠবে এবং তাতেই কারবালার সকল দায়-দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলো ।
আচ্ছা, হা-হুতাশ আর মাতম করলেই কি কারবালার প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেলো? এবং নবীবংশের এত বড় আত্মোৎসর্গ স্বার্থক হয়ে গেলো ? বোকারা বোঝে না যে, কারবালার এই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। তারপর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মোহাম্মদী ধর্মদর্শনকে পুণঃজাগরণের মাধ্যমে কারবালার প্রতিশোধ নিতে হবে । কেননা, মওলা হোসাইন (আঃ) যেটা চেয়েছিলেন, সেটাই যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা না গেলো এবং এজিদী ইসলামই যদি সমাজে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো, তাহলে মওলা হোসাইনের (আঃ) জীবন বিসর্জন দেয়ার কি মানে রইল? যদি আমরা এখনও ইয়াজিদেরই দাসত্বই করি, তাহলে কারবালায় এতগুলো জীবন বলিদানের তো কোন অর্থই রইল না। তারাও তো সেটা করলেই পারতো, যা এখন আমরা করছি !!

-বন্ধুগণ, কারবালার এ দুঃখকে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে লাগিয়ে গাদিরে খুমের সেই বেঈমানীর প্রতিশোধ নিতে হবে।

যে সকল সাহাবারা পাহাড়ের উপর থেকে পাথর নিক্ষেপে মহানবীকে মেরে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছিল, সেটারও তদন্ত করতে হবে। জানতে হবে কারা কারা এ কার্য্যটি করেছিল?

উম্মতের কপাল খাওয়া বৃহস্পতিবারের বদলা নিতে হবে। জানতে হবে ইয়াওমাল খামিস কি? কেন বৃহসপতিবার আসলেই ইবনে আব্বাস (রাঃ) আক্ষেপ করে বুক চাপড়িয়ে কাদতেন আর বলতেন ” হায় ইয়াওমাল খামিস?”

রসুলের লাশ অদাফনকৃত অবস্থায় তিন দিন পর্যন্ত কেন রেখে দেয়া হয়েছিল? সেটার জবাবদিহিতা করতে হবে। সে সময় রসুলের যে চারজন সাহাবারা ছিলেন তারা কে কোথায় কোন্ কোন্ স্থানে ছিলেন? তারা থাকতে কেন রাসুলের লাশ মোবারক অদাফনকৃত তিনদিন পর্যন্ত থাকবে? বাকী সাহাবারা কোথায় ছিলেন?

রসুলের মৃতলাশকে ফেলে রেখে বনি সাকিফায় সাহাবাদের অবৈধ নির্বাচনের বিচার চাইতে হবে। খিলাফতকে কেন্দ্র করে যে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে কে কে উপস্থিত ছিল? কার নেতৃত্বে সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল? এর উদ্দেশ্য কি ছিল? কেনই বা রাসুল সে সময় জীবদর্শায় থাকতে তার উত্তোরাধিকার নির্বাচিত করে যাননি?

মওলা আলীকে গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নেয়ার সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে। রাসুলের প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমা (আঃ) এর জামাতা আলী (আঃ) কে কেন অপমান অপদস্ত হতে হয়েছিল? কে এসবের নেতৃত্ব দিয়েছিল?

খলিফা ওমর-আবুবকর-উসমান এ তিন জনের একজনও কেন রসুলের লাশ দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন না, সেটার কৈফিয়ত চাইতে হবে।

খলিফা আবুবকর কেন নবী পরিবারের সম্পত্তি বাগে ফিদাক জোর করে কেড়ে নিয়ে নবী কন্যা মা ফাতেমার পরিবারকে না খাইয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল সেটার বিচার চাইতে হবে।

মা ফাতেমাকে পেটে লাথি মেরে গর্ভে সন্তান সহ হত্যার সেই প্রতিশোধ নিতে হবে।

ওয়ায়েছ করণীকে দান করা রসুলের জুব্বা মোবারক প্রদানে খলিফা ওমর কেন এত বছর বিলম্ব করলো- সেটার জবাবদিহিতাও করতে হবে।

সরকারী দল কর্তৃক মদীনার দশ হাজার কুমারী মেয়েদের ধর্ষণে গর্ভবতী করানোর বদলা নিতে হবে।

বিষপ্রয়োগ ও গুপ্তঘাতক দিয়ে যে সব ইমামদের হত্যা করা হয়েছে, সেটারও প্রতিশোধ নিতে হবে…!!!

সুতরাং শুধু ঘরে বসে বসে কাঁদলে আর রাস্তায় রাস্তায় হা-হুতাশ করলে চলবে না । কারবালার বেদনাকে বুকে লালন করে সমাজে হোসাইনী ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে । তবেই কারবালায় এতগুলো প্রাণের আত্মোৎসর্গ স্বার্থক হবে…!!!

আমি মনোযোগ সহকারে শুনছি সেই মনা পাগলার করোল্লা মার্কা ভাষণ। মন্ত্রমুগ্ধ ছিলাম। তাই কিছুই খেয়ালই করিনি। আশে পাশের মানুষ যে কখন সরে গেছে টেরই পাইনি। তাকিয়ে দেখি আমি আর মনা পাগলা ছাড়া আর কোথাও কেউ নেই।

মনে মনে ভাবলামঃ ইয়াজিদি ইসলাম যদি সত্যিই দুনিয়াতে এখনো জীবিত থেকেই থাকে তাহলে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর নানাজান অর্থাৎ ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) যে ইসলাম আল্লাহর তরফ হতে প্রচার করেছিলেন সেই ইসলাম কোথায় গেল? তাহলে কি ইমাম হোসাইন বিন আলী (আঃ) ইয়াজিদের সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে যে কথাটি বলেছিলেন “আলাম তাসমাও আলাইসা ফি কুম মুসলিম? আমার কথা কি শুনতে পাও না? তোমাদের মাঝে কি একটি মাত্র মুসলমানও নাই?” অথচ এজিদ সৈন্যবাহিনীতে একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদি অথবা অন্য কোনো ধর্মের লোক ছিলো না। সবাই ছিল মুসলমান। তাহলে তারা কেন তার ডাকে সাড়া দিল না? তারা কি কেবল সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান নামধারী লেবাসযুক্ত মোনাফেক ছিল?

একটা পাগলের মনের মধ্যে যে ইতিহাস খস খস করছে বিদ্যান জাহেরী লেবাসধারী মুসলমানের মধ্যে সেই বোধ কাজ করছে না। তারা সবাই সটকে পড়ছে যে যার মতো করে। পাগলের প্রলাপ কে শুনতে চায়? আমার মতো যাদের খেদে দেয়ে কোন কাজ নেই তারাই হয়তো পাগলদের ভক্ত হয়ে ভাবুকের মতো ভাবতে বসে। আমি চেয়ে রইলাম মনা পাগলার দিকে। আর মনা পাগলা আমার দিকে। সবাইকে চলে যেতে দেখে মনা আক্ষেপ করে বলছেঃ “ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ।”

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৫

লেজওয়ালা মানুষ-শেষ পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

-কিন্ত্তু জীবন ধারণের প্রয়োজনে আমাকে তো সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তাই না ?

-তাই বলে কি ঐ পশুর পথ ধরে? সালাতে তুই কি বলিস সুরা ফাতেহায়?
এহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম। মুস্তাকামাত তথা মস্তানী সাহায্য চাস। সহজ সরল সুন্দর পথে চলতে চাস। গায়রিল মাগদুবি আলাইহিম এর পথেতো চলতে চাস না। নাকি চাস?

-না তা চাই না।

-না চাইলে তোকে সিরাতুল মোস্তাকীমের পথ অনুসরণ করতে হবে।

-তা নাইলে করলাম। কিন্ত্তু লেজওয়ালা মানুষের কথা জানার জন্য তো আপনি আমাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসছিলেন। তো সেই লেজওয়ালা মানুষের কথাতো কিছুই বলছেন না?

-শোন লেজওয়ালা মানুষ চিনতে হলে তোকে তো কুরআন বুঝতে হবে। জানতে হবে। দর্শন করতে হবে। তবে তো চিনবি। দর্শন না হলে না চেনালে কিভাবে তুই চিনবি? শোন্ মানুষের জন্মবীজ যখন মাতৃজঠরে প্রবেশ করে তখন সেই বীজগুলো থাকে ব্যাঙাচির মতো লেজওয়ালা। সেগুলো সাঁতার কাটে। ভেসে বেড়ায়। সেখান থেকে সে একটি বীজ মাতৃবীজের মধ্যে প্রবেশ করে। প্রবেশ করার সাথে সাথেই তার লেজটি বিলীন হয়ে যায়। সে শুন্যের সাথে মিশে শুন্য তথা গোলাকার পিন্ডে পরিণত হয়। এরপর ধাপে ধাপে মানব আকারে পৃথিবীতে আসে। যে বীজটির কথা বলা হলো তা অনেক সাধনার পথ ধরে মানব আকার প্রাপ্ত হয়। সনাতন ধর্ম মতে চুরাশি লক্ষ যোনী ভ্রমণের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যোনী ভ্রমণ করার অর্থ হলো অধঃস্তন পথ হতে উর্ধ্ব স্তরে উত্তোরণ করা। জন্মান্তর মতবাদ প্রতিটি ধর্ম গ্রন্থের মধ্যেই উল্লেখ আছে। কোরআনে আছে প্রচ্ছন্নভাবে। কোরআনের ভাষা মাধুর্য্যে তা উদ্ধার করা সহজসাধ্য কাজ নয়। অনেক গভীর স্তরের চিন্তা ভাবনার কাজ। যেমন ধর বলা হয়েছেঃ “ফেতরাতাল্লাহিল্লাতি ফাতারান্নাসা আলায়হা” তার সেই স্বভাব বা প্রকৃতির উপর – এখানে তার সেই স্বভাব কথাটি দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত কোন কার্য যা অতীত কালে সংঘটিত হইয়াছে সেই কথাটিই পুণঃব্যক্ত করা হয়েছে এবং সেই স্বভাবেই তাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। অর্থাৎ তার কর্ম যদি সৎকার্য হয় সেটিই তাকে প্রতিদান রুপে দেয়া হবে। এজন্যই পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে “লাতাবাদিলা লিখালক্বিল্লাহ” অর্থাৎ তার কোন পরিবর্তন বা রদ নেই। অর্থাৎ যেমন কর্ম তেমন ফল। তার জন্যই সৎগুণাবলী অর্জনের উপদেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “তাখালল্লাখু বি আখলাখিল্লাহ” অর্থঃ আল্লাহর গুণে গুণাম্বিত হও। আর রাসুল বলছেনঃ ইন্নামা বুইছতু লি-উতামমিমা মা কারিমাল আখলাখ। “নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি স্বভাবের উৎকৃষ্ট গুণসমুহকে ফুটিয়ে তোলার জন্য।

যারা আল্লাহর গুণে গুণে গুণাম্বিত নয় তারা কার গুণ অর্জন করেছে? তারা নিঃসন্দেহে খারাপ গুণগুলোই অর্জন করেছে। অার অসৎগুণের কারণে তারা তাদের স্বীয়রুপে সৃষ্টি হবে। এইটাই সৃষ্টির বিধান। এর কোন ব্যত্যয় নেই( লাতাবাদিলা লিখালক্বিল্লাহ )। কারণ সৎ এবং অসৎ গুণ উভয়ই মানবের মধ্যে দেখা যায়। অসৎ গুণের কারণেই তাকে পশুতুল্য বিবেচনা করা হয়। আকারে প্রকারে মানুষ। কিন্ত্তু আচার আচরণে পশু। তার কাঠামো ফি আহসানে তাকবীম হলেও সে মুলতঃ অদৃশ্যলেজওয়ালা একটি পশুসদৃশ্য মানব। এরাই সমাজে বিশৃংখলার সৃষ্টি করে। সমাজকে কলুষিত করে। মানবতাকে হত্যা করে। তাদের অদৃশ্য লেজ থাকায় মানব সমাজে বিচরণ করা থাকা সত্ত্বেও তাদের ধরা যায় না। তাদের ধরতে হয় আচার আচরণ দেখে। কারণ তার আচার আচরণই পশুবৎতুল্য।

একটা পাগলগোছের মানুষ। যিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফেরেন। তাড়া খান কোন লেজওয়ালা মানুষের। যিনি খুঁজে ফেরেন কোন অচেনা অজানা কোন একটা কিছুকে। যিনি কাছের কোন প্রিয় মানুষকে পেলে মেলে ধরেন তার দর্শন, তার চিন্তা-চেতনা। সভ্যসমাজ যাকে আদর করে ডাকেন পাগলের প্রলাপ বলে। অথচ সেই পাগলই আজকে পরিচয় করিয়ে দিল একটা অচেনা অদৃশ্য লেজওয়ালা মানব সমাজের। কি বিচিত্র তার সৃষ্টি রহস্য।

হে জগদীশ!
এ বিশ্বে তোমার, মানুষই সৃষ্টির মাঝে সার।
আছে তার জ্ঞানের অপার ভান্ডার।

ওমর খৈয়ামের কবিতাটি পাঠ করে ভবার দিকে তাকালাম। বেলা পড়ে আসছে। নিলীমার নীল বিলীন হতে চলেছে। পাখিরাও নীড়ে ফেরতে শুরু করেছে। আমাদের ফিরতে হবে। বললামঃ

-চলুন ওঠা যাক।

ভবা তার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে চটের ছালাটি কাঁধে চড়িয়ে চলা শুরু করলো। যেতে যেতে বললোঃ

রাতি জাগেঁ তে শেখ সদা ওয়েঁ
পর রাত নু জাগন কুত্তে তেঁ থি উতহে।
রাতি ভোকন বাস না করদে
ফ্যয়র যা লারান ভিচ সুতে, তেঁ থি উতহে।
য়ার দা বুহা মুল না ছাড়-দে
পাওয়েঁ মারো সও সও জুতে, তেঁ থি উতহে।
বুল্লে শাহ উঠ য়ার মানা লে
নাই তো বাযি লে গ্যায়ে কুত্তে তেঁ থি উতহে।