পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬

করিম সাহেবের চিন্তা-ধারা ও হাঁস-মুরগীর ছানাপোনা - পর্ব এক



শীতের কুয়াশা ভেদ করে যখন সোনালী সুর্যটা হেসে উঠলো ঠিক তক্ষুণী পুর্বাকাশের একচিলতে সোনালী রোদ্দুর সারা উঠোনময় সোনালী আলোয় উদ্ভাষিত হয়ে হেসে উঠলো। সারারাত ধরে যে কুয়াশার বিস্তৃত ছিল পাতায় পাতায় প্রকৃতির ছত্রচ্ছায়ায়, তা যেন মুহুর্তের মধ্যেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে কেবল সোনালী সুর্যের সংস্পর্শে। 

এমনি এক সকালে রহিমা ফজরের নামায আদায় করে খোয়ারে থাকা হাঁস-মুরগীগুলোকে উন্মুক্ত করে দিল খোয়ারের দ্বার খুলে। মুহুর্তের মধ্যেই সবকিছুই পাল্টে গেল। হাঁসগুলো প্যাক প্যাক করতে করতে হেলে দুলে খোয়ার হতে বের হয়ে এল। আর মুরগীগুলো ডানা ঝাঁপটে তার বাচ্চাগুলো নিয়ে খেলা করতে লাগলো। 

বড়ো মুরগীটা কিছুদিন পুর্বে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়েছে। ওমের গন্ধ তখনো মা মুরগীটার গা হতে যায়নি। মা মুরগীটা তার ছানাদের নিয়ে রাজকীয় ভংগীতে সারা উঠোনে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলো।

রহিমা একটা খাদাতে হাঁসদের জন্য কুঁড়োগুলিয়ে নিয়ে আসলো আর মুরগীদের জন্য নিয়ে আসলো খুদ-কুড়ো। সেই খুদ কুড়ো নিয়ে রহিমা যখন আয় আয় তি তি তি…..আয় আয় বলে ডাকছিলো তখন হাঁস-মুরগীর ছানা পোনা সহ সারা উঠানে হাঁস-মুরগীতে ছেয়ে গেল। রহিমা অত্যন্ত আগ্রহ চিত্তে তাদের আদার (খাদ্য)দিচ্ছিল। খানা পেয়ে হাঁসের দল প্যাক প্যাক করতে হেলে দুলে ছুটে আসছিল। আর মুরগীর দল কক কক রবে ডেকে উঠলো। দুর থেকে করিম সাহেব তা লক্ষ্য করছিলেন। 

তিনি একটি বিষয় নিয়ে লেখা লেখি করছেন। কিন্ত্তু লেখাটিতে পুরো পুরি মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। দু’চার লাইন লিখে আবার গভীর ভাবনায় পতিত হন। যেই আবার লিখতে যান, তক্ষুণি আগের লেখাটি কেটে দেন। আবার লিখেন। কিন্ত্তু তিনি লেখাটি সমাপ্ত করতে পারছেন না কোন মতেই। তার ভাবনার বিষয় হচ্ছে – ইনসানুল কামিল। তিনি ইবনুল আরাবীর  একটি বই পেয়েছেন। সেই বইটিতে লেখাঃ

"সুফী সাধনায় তিনি এত উন্নত হন যে তাঁর ভক্তরা তাঁকে “শায়খুল আকবার” বা শ্রেষ্ঠ শায়েখ উপাধিতে ভুষিত করেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে “আল ফতুহাতুল মক্কীয়া” বা মক্কার প্রত্যাদেশ সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গ্রন্থখানি বর্তমানে চারটি সুবৃহৎ খন্ডে ও পাঁচশত ষাটটি অধ্যায়ে বিভক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়। তাঁর মতে, এই গ্রন্থের প্রতিটি শব্দ তিনি অলৌকিকভাবে প্রত্যাদিষ্ট হন এবং তার মধ্যে ঐশীবাণী ছাড়া অন্য কিছুই নাই। “ফতুহাত” রচনা সম্পর্কে তিনি বলেন যে, তিনি যদি ফতুহাত রচনা না করতেন, তাহলে তিনি ঐশী অগ্নিতে ভষ্মীভুত হতেন।"

তিনি আরো বলেন যে, "মক্কায় অবস্থানকালে তিনি হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-কে ফেরেস্তাগণ, নবীগণ ও আউলিয়াসহ আলমে মাসুরে তখতে উপবিষ্ট দেখেন এবং তাঁর দ্বারা ঐশী রহস্য উদঘাটনের আদেশ প্রাপ্ত হন। এক সময়ে কাবা ঘর প্রদক্ষিণের সময় এক সুন্দর স্বাস্থ্যবান ও লাবন্যপুর্ণ যুবককে তাঁর সাথে কাবা প্রদক্ষিণ করতে দেখেন এবং এই যুবকই তাঁকে দৃশ্যাতীত রহস্যময় চির অনন্ত পরম সত্তা আল্লাহর আরশ দেখান এবং এই দৃশ্য অবলোকন করে তিনি মুর্ছা যান। মুর্ছা ভংগের পর ঐশী রহস্য গ্রন্থাকারে প্রকাশের আদেশ তিনি লাভ করেন।"

লেখাটি পড়ে তিনি বেশ চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিলেন। কারণ হিসেবে বের করলেনঃ

১. তিনি রসুল পাক (সাঃ)- কে ফেরেস্তাগণ, নবীগণ ও আউলিয়াসহ আলমে মাসুরে তখতে উপবিষ্ট দেখেন।
২. একটি সুদর্শন যুবক তাকে দৃশ্যাতীত রহস্যময় চির অনন্ত পরম সত্তা আল্লাহর আরশ দেখান।
৩. এবং মুর্ছা ভংগের পর তিনি ঐশী আদেশ লাভ করেন।

তিনি শুনেছেন এবং জেনেছেন যে, কুল্লি নাফছিন জায়কাতুল মউত। প্রত্যেকটি নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। সেই সুত্র ধরে আবদুল্লাহ পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ) ও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছেন এবং তৎপুর্ব সমস্ত নবী-অলীগণ সকলেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন এবং এই নশ্বর ধরণী ত্যাগ করেছেন। তাহলে কিভাবে সম্ভব রসুল পাক (সাঃ)- কে ঘিরে ফেরেস্তাগণ, নবীগণ ও আউলিয়াসহ আলমে মাসুরে তখতে উপবিষ্ট হওয়া? তাছাড়া তাঁরা যদি এই নশ্বর ভুমি ত্যাগ করেন, তাহলে এই ধরাতেই কেন তাঁদের দেখতে পাওয়া যায়? আর কেনই বা তাঁরা এই নশ্বর ভুবনে ফিরে এসে দেখা দেন? ঐ পরপারের যে স্থানে তাঁদের থাকার কথা – সেখানে যদি তাঁরা থাকেন তাহলে যার সাথে দেখা দেন, তিনি যদি সেরুপ উপযুক্ত না হন, তাহলে তাঁদের সাথে দেখা হবার তো সম্ভাবনাই থাকে না। আর তিনি যদি উপযুক্ত হনই, তাহলে তিনিতো সেখানেই দেখা দিলেই পারতেন? কেন তাঁরা এই ধরাতেই দেখা দেন? তবে কি তাঁরা মরেননি? তারা কি অমর? নাহ…নাহ…তা কিভাবে সম্ভব?

করিম সাহবের ভ্রু কুঁচকে গেল। ভ্রু কুঁচকে তিনি বেশ বিরক্তভাব নিয়েই উঠানের দিকে তাকাতেই দেখলেন-রহিমা তি তি করে হাঁস মুরগীদের ডাকছে। তারা সেই ডাক শুনে দ্রুত ছুটে আসছে। একে অন্যের সাথে খাবার নিয়ে প্রতিযোগীতা শুরু করে দিয়েছে।

মাথা ক্ষাণিকক্ষণ চুলকে তিনি আবার লেখা শুরু করলেনঃ

আচ্ছা সুরা বাকারা আয়াত-১৫৪ তে বলা হয়েছেঃ “ওয়াতাকুলু মাইইয়াখতালু ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াত বাল আহহিয়া ওয়ালা কিলল্লাহ তাশউরুন” ওয়া(এবং) তাকুলু(কতল-কতল হওয়া) মাইইয়াখতালু ফি সাবিলিল্লাহি (আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন) বাল(বরং) আহহিয়া(হাইয়ুন-জীবিত) ওয়ালা কিলল্লাহ তাশউরুন(তাশুর – বুঝতে পারা)। যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে মৃত বলো না বরং তারা জীবিত। তোমরা তা বুঝতেই পারবে না। 
এছাড়া সুরা আলে-ইমরানের ১৬৯ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ ওয়ালা তাহসাবান্নাল্লাযীনা কুতিলু ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াতা বাল আহইয়াউন ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন।” অর্থঃ যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় কতল হয়েছে তাঁদেরকে মৃত মনে করো না। বরং তাঁরা জীবিত নিজের রবের নৈকট্যপ্রাপ্ত, নিজের রবের পক্ষ হতে রিজিকও প্রাপ্ত।

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, যারা আল্লাহর রাস্তায় কতল হয়েছেন-তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক। তাহলে শহীদরা অমর-এ কথাতো কোরআনেরই। যদি তাই হয় তাহলে যারা শহীদ হন, তাদের দেহ গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পড়িয়ে জানাজা দেয়া হয় কেন? জীবিত ব্যক্তির জন্যতো কোন জানাজার নামাজ জায়েজ নয়। তথা প্রযোজ্য নয়। তাহলে এই আনুষ্ঠানিকতা কেন? জীবিত ব্যক্তিকে কেউ কি কবর দেয়? কবরতো দেয় মৃত ব্যক্তিদের।

দ্বিতীয় আয়াতে দেখা যাচ্ছে আরো ভয়াবহ অবস্থা আর তাহলোঃ 
তাঁরা রবের নিকট হতে রিজিক প্রাপ্ত। রিযিক কি? রিযিক বলতে আমরা যা আহার করি তাই। সেটা যদি রিযিক হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তি কিভাবে রিযিক গ্রহণ করে? বাল আহইয়াউন ইন্দা রাব্বিহিম ইউরয়াকুন। বাল(বরং) আহইয়াউন(হাইয়ুন-হায়াত-জীবিত) ইন্দা রাব্বিহিম (রবের নিকট হতে প্রাপ্ত) ইউরযাকুন (রিযিক)।

এছাড়া অন্য একটি প্রশ্ন এসে যায় আর তাহলোঃ শহীদের মর্যাদা বড়ো না নবী-অলীদের মর্যাদা বড়ো? যদি শহীদের মর্যাদা বড়ো হয় তাহলে ভাষা আন্দোলনে যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছেন বা ভাষা সৈনিক শহীদ হয়েছেন, তাদের কেহ দেখেছেন বলে তো শুনিনি? তাছাড়া তারা তো কারোর উপর আদেশও করেননি। যত কাহিনী শুনি তার সিংহভাগই অলী-আউলিয়াদের শানেই। কি বলার আছে আর কি লিখবো? যদি মর্যাদার প্রশ্ন ধরি, তাহলে বলা হয়ঃ “বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র”। তাহলে কোরআন মতে বিদ্বানও শহীদের মর্যাদা পান না তথা জীবিত থাকার কোন প্রশ্নই উঠছে না। প্রশ্ন উঠছে - যারা শহীদ হয়েছে তাদেরকে মৃত বলা নিষেধ। কেবল তারাই জীবিত। আর বাকী যারা মারা যাবে তারা সবাই মৃত। বিষয়টি কেমন যেন চিন্তায় ফেলে দিল করিম সাহেবকে। কি কোন কুল কিনারা করতে পারছেন না।
(চলবে)

বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬

শ্বেতার ডায়রী-শেষ পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর)

আমাকে উঠতে দেখে দোকানী বলে উঠলোঃ

-মামা কি কট খাইছেন?

-মানেটা কি? কট খাইছেন?

-মামা আপনি ধরা খাইছিলেন না-কি? হেইডা জিগাইলাম?

-হুম।

-দেইক্ক্যাই বুইঝ্যালাইছি...

-কি ভাবে?

-আপনের চোখ দুডা লাল টকটকা হইয়্যা রইছে। মনে অয় হারা রাইত বহাইয়্যা রাকছিল..

-তুমি তো দেখছি সবই বলে দিতে পারো...

-মামা অনেক দিন ধইর‌্যা চা বেচি। আপনেগো মতো মামারা মামীরা এইহানে চা খাইতে আহে। হেগো অনেক কতাও হুনি..

দোকানীর আলাপে কেমন যেন আনন্দ পেলাম। মনের গহীনে যে ব্যাথাটা টন টন করছিল তা যেন কিছুটা হলেও সান্তনার বাণী খুঁজে পেল। কে কি ধরণের আলাপচারিতা করে দোকানী তা আমাকে অকপটে বলে যাচ্ছিল। ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে অনেক সময় এসমস্ত টং দোকানীতে বসে আলাপচারিতা করে। তাদের আলাপের অনেক কথাই তারা না শোনার ভান করে শুনে ফেলে...তাছাড়া রিক্সাওয়ালা কিংবা সিএনজি চালক কিংবা প্রাইভেট কারের ড্রাইভারই হোক তারাও যে তাদের প্রাইভেট কথা শুনছে না..তারই বা কি গ্যারান্টি আছে? তাইতো সন্দেহের তালিকায় পুলিশ প্রথমেই জিগ্যাসা করে টং দোকানদারদের। কারা কারা আড্ডা মারে...কিংবা কোন দুঘর্টনায় প্রাইভেট কারের চালকদের এবং বাসার পরিচারিকাদের। দোকানীর কাছ থেকে অনেক কিছুই জানা হলো। এবার উঠতে হবে। আমি মানিব্যাগ বের করে দোকানীকে টাকা দিতে গিয়ে দেখলাম-সেখানে ভাঁজ করা শ্বেতার লেখা একটা চিঠি। চিঠিটা ডায়রীর সাথেই ছিল। আমার মনে পড়লোঃ গতদিন দুপুরে কুরিয়ার সার্ভিসে আমার কাছে একটা গিফট নিয়ে একজন সার্ভিসের লোক এসেছিল। আমার হাতে একটি গিফট বক্স দিয়ে দস্তখত নিয়ে গিয়েছিল। আমি গিফট বক্সটি খুলে দেখি সেখানে একটি ডায়রী এবং একটি চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিলঃ

প্রিয় সাজিদ,
যখন তোমার ঘুম ভাংগবে, যখন তোমার হাতে আমার ডায়রীটা থাকবে, তখন আমি থাকবো তোমার থেকে অনেক অনেক দুরে। আমি চলে যাচ্ছি আব্বুর সাথে ইংল্যান্ডে। সেখানে আমি আমার খালামণির সাথে থাকবো। সেখানেই স্থানীয় একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আমার ভর্তি কনফার্ম হয়ে আছে। তোমার সাথে আর এ জীবনে দেখা হবে কি-না জানি না। তবে জেনে নিও শিরিন সিকদারের বয়েতের উদ্ধৃতি দিয়েই বলছিঃ

মৃন্ময়ী মাটির মত্ত শিরীন শারেঙ্গী.
উতলা ভূতলা বুকে তার উন্মাদ ঝংকার: 
হায় পথ আছে আমার পাথেয় কই!

আমার পাথেয়তো তুমিই ছিলে। কিন্ত্তু জীবনের বাস্তবতায় আজ আমি আমার পাথেয় হারিয়ে ফেলছি। তবে জেনে নিও

ভালোবাসতে বাসতে আমি ভালোবাসা ছাড়া আর সব ভুলে গেছি, 
মৃত্যু যন্ত্রনায় জ্বলতে জ্বলতে আমি বাঁচতেই ভুলে গেছি। 
ফিরে যদি দেখো শিরীনের শবদেহ, অনিমেষ চোখ - বুঝে নিও, 
প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে আমি চোখ বুঝতেই ভুলে গেছি।

ইতি
তোমারই
শ্বেতা।

সেই চিঠিটা পড়ে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আমি শ্বেতাকে কখনো বলিনি যে - শ্বেতা, তোমাকে আমি খুঁজতে যখন তোমাদের বাড়ীতে যাই, তখন তোমার আম্মু আমাকে দেখে বলেছিল-এই ভিখিরীর ছেলে কি করে শ্বেতার ক্লাসমেট হয়? যত্তসব...সেই কষ্টের কথা তোমাকে কোনদিনও বুঝতে দেইনি। বুকের যন্ত্রণা চেপে কেবল তোমার স্মৃতিতে যেন চির জাগরুখ থাকি, সেই চেষ্টাটাই করেছি। আজ তোমার চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে আমার পাগলামিটা স্বার্থক হয়েছে। সেই পাগলটাই আজ তোমার অজান্তেই মির্জা গালিবের একটি শায়ের তোমার উদ্দেশ্যেই বলছেঃ

থা জিন্দেগী মে মর্গকা খটকা লাগা হুয়া
উড়নেছে পেশতর ভি মেরা রং জর্দ থা।।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। মিরপুরের বাস চলাচল করছে। বাসে চেপে আমাকে ফিরতে হবে আমার সেই চিরচেনা মেসে। তেল চিটচিটে বালিশ আর তালি দেয়া খ্যাতা যার সম্বল, তার ধনীর দুলারীদের সাথে প্রেম করতে নেই। কেবল স্বপ্ন দেখাই সার। মনে মনে আবৃত্তি করলাম আরেকটি শায়ের

কিতনা খফ হোতা হ্যায় শামকে অন্ধোরো মে,
পুছ উন পরিন্দো সে জিন কে ঘর নেহি হোতা।। 

আকাশের পানে তাকিয়ে দেখলাম সুর্যটা হাসছে। গোটা চারেক কাক ডাকাডাকি করছে। আর আমি ধীর পায়ে চলেছি আমার গন্তব্যে।

সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৬

শ্বেতার ডায়রী-অষ্টম পর্ব

(সপ্তম পর্বের পর)

শ্বেতা তার ডায়রিতে লিখেছিলঃ

তারিখঃ২২শে এপ্রিল,২০১৪
বারঃমঙ্গলবার

প্রিয় সাজিদ,
তোমায় ভালোবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মেশে
জানি তুমি আমার কোনদিন মনের মতো হবে না। তোমাকে যতবারই আমি আমার মনের মতো সাজাতে চেয়েছি, ততই তোমার পাগলামি বেড়েছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, তুমি হয়তো আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই তোমার পাগলামির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছো। ওমন ভরদুপুরে কেউ হাঁটে না। অথচ তুমি আমাকে নিয়ে সেই চৈত্রের ভরদুপুরে হাঁটলে। বললে-সুর্য স্নান হবে। সুর্যের আলোয় আলোকিত হব। কিন্ত্তু বাস্তবে কি হলো? বাড়িতে গিয়ে আমাকে আম্মুর বকা শুনতে হলো। জ্বর হলো। ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। তুমি জানো যে, আমি রোদে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি না। কিন্ত্তু তোমার কথা আমি ফেলতে পারিনি। তোমার পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে হাঁটতে পারা আমার জন্য বেশ রোমান্টিক অনুভুতির জন্ম দিয়েছিল। সেই রোমান্টিক অনুভুতির ঘোর কাটলো ১০২ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে। আচ্ছা, আমার যখন জ্বর হয়েছিল, তোমারো কি জ্বর হয়েছিল?

আমি শ্বেতাকে বলতে পারিনি-আমার জ্বর হয়েছিল। সত্যিইতো আমার কোন জ্বর হয়নি। কারণ, আমি শ্বেতার মতো কোন ধনীর দুলারী নই। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমাকে রোদ বৃষ্টির কথা চিন্তা করলে চলে না। ব্যাঙের মতোন চলতে হয় আমাদের। আমাদের কোন রাজপ্রাসাদ নেই। ভাঙ্গা টিনের চালের উপর বৃষ্টির পানি যখন টুপ টুপ করে পড়ে তখন জীবনানন্দ দাসের মতোন ওমন উঁচু স্তরের কবিতা বের হয় না। প্রচন্ড খররৌদ্রে যখন টিনের চালা আগুন গরম হয়ে ওঠে, তখন ঠান্ডা এসির বাতাস কল্পনা করি না। ভোরের সোনালী সুর্যালোক যখন ভাঙ্গা টিনের চালা গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তার প্রখরতা জানান দেয়, তখন  জীবনের দর্শন আমরা লাভ করি বাস্তবতার নিরিখে। বাস্তবতাই আমাদের দর্শন শেখায়। আমরা দার্শনিক হই কেবল বেঁচে থাকার ন্যুনতম প্রয়াসে। যেটা গালিব বলেছিলঃ

মত পুছ কে ক্যা হাল হ্যায় মেরে তেরে পিছে
তু দেখ কে ক্যা রঙ্গ হ্যায় তেরে মেরে আগে।।

যে ভালোবাসা একসময় আমাকে স্বপ্ন দেখাতো, সেই স্বপ্নসাধটা ধুলিস্মাৎ হয়ে যাচ্ছে কেবল আমারই ভুলে। কিন্ত্তু ভুলটা কি সত্যিই আমার? আমি যা করি, তা কি সত্যিই ইচ্ছাকৃত? না-কি যে ইচ্ছাময় আমাকে চালাচ্ছে, তারই কোন গোপন ইচ্ছার অভিব্যক্তি? আমার মনে পড়লো মীর্যা গালিবের আরেকটি শায়েরঃ

হাজারো খোয়াইশে অ্যাসে কি হর খোয়াইশ পে দম নিকলে
বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফিরভি কম নিকলে।।

ভোরের আলোয় ফুটে ওঠার সাথে সাথে দেখলাম জনা দুয়েক মুসল্লি হাঁটা চলা করছে। ইব্রাহিম কর্ডিয়াক হাসপাতালের সামনে দেখলাম একটা এম্বুলেন্স পো পো করে বের হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন এ দুনিয়ার মায়া ছেড়ে ওপারে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে দেখলাম কান্নার রোল পড়ে গেছে। আর ডায়বেটিস হাসপাতালের সামনে দেখলাম আস্তে আস্তে ডায়বেটিস রোগীদের সিরিয়ালটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কি বিচিত্র দৃশ্য এটি। কি নির্মম অথচ কতো বড়ো সত্য। বেঁচে থাকার তাগিদে একদল আসছে হাসপাতালে আর ঐ হাসপাতালের অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে ওপারে। না ফেরার দেশে...অন্যদিকে যে পাশটায় আমি বসে আছি সেইপাশটা সম্পুর্ণ বিপরীত। নতুন করে জীবন সাজানোর বিলাশ বহুল প্রসাধন নিয়ে বসে আছে ফুল ক্রেতারা। 

একেতো সারাটা রাত একটা দুঃবির্ষ জার্নি করা তার উপর মন খারাপ করা একটা দৃশ্য..নির্মম বাস্তবতার দৃশ্য...উঠতে হবে আমাকে..যেতে হবে বহুদুর। এখনো অনেক পথ পাড়ি দেয়া বাকী। আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম।

(চলবে)

শুক্রবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৬

শ্বেতার ডায়রী-সপ্তম পর্ব

(ষষ্ঠ পর্বের পর)
সাত্তার ভাই আমাকে নিয়ে ওসির রুমে গেলেন। রুমে ঢুকেই জোড় কদমে বেশ কায়দা করে স্যালুট দিলেন। তারপর আমাকে দেখিয়ে বললেনঃ

-স্যার, একে ধরেছি স্যার। ধারা ৫৪। সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করছিল স্যার।

-হুম....কি কিছু পেয়েছেন?

-না স্যার। তেমন কিছুই পাইনি। কেবল এই ডায়রীটা পেয়েছি। 

-কোন জংগীর সাথে সম্পৃক্ততা কিংবা কোন তথ্য আছে কি?

-না স্যার। স্যার এই যে ডায়রী...

সাত্তার ডায়রীটা এগিয়ে দিল ওসির দিকে। আমি তাকিয়ে আছি ওসি সাহেবের দিকে। পাশের চার্ট টেবিলে লেখাঃ আব্দুল লতিফ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার মানে ওসি সাহেবের নাম আব্দুল লতিফ। দেখি লতিফ সাহেব কি করে? আমি তাকিয়ে থাকলাম ওসি সাহেবের দিকে। তিনি ডায়রীটা নাড়া চাড়া করে দেখে বললেনঃ

-ফালতু একটা জিনিস কেন আনছো? এইসব ছেলে পেলেরা প্রেম ভালোবাসা করে দেশটার বারো বাজিয়ে দিল। আজ অমুকে বিষ খায় তো কাল আরেকটা ফাঁসিতে ঝোলে..যত্তসব....এ্যাই কি নাম তোর?

-সাজিদ হাসান।

-হুম। কোথায় থাকিস?

-স্যার মীরপুর এক নম্বরে। কলওয়ালাপাড়া মসজিদের সামনে।

-রাতে বের হয়েছিলি কেন?

-স্যার মাথা ধরেছিল। তাই ঔষধ কেনার জন্য বের হয়েছিলাম। আর সেই সময়...

-থাক্ আর বলতে হবে না। সেন্ট্রি....ওর বন্ড সই নিয়ে ছেড়ে দেন। যাতে আর কখনো অযথা যত্রতত্র ঘুরে না বেড়ায়...
 
আমি ওসি সাহেবের রুম হতে বের হতে পেরে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানালাম স্রষ্টার কাছে। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থটা যেন বুঝতে পারলাম। যখন চলে যেতে চাইলাম তখন সাত্তার নামক পুলিশটি ডায়রীটা ফেরত দিল। আমি ডায়রীটা নিয়ে থানা হতে বের হয়ে এলাম।

শাহবাগের মোড়ে একদিকে যাদুঘর অন্যদিকে হাসপাতাল। আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশটা ততক্ষণে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। ফুলের দোকানদাররা তাদের ফুলগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখছে। টং দোকানের মালিকরা তাদের দোকানের পশরা সাজাতে ব্যস্ত। কেউ চুলা জ্বালিয়ে পানি গরম করছে। চা বানানোর জন্য। আমি চা খাওয়ার জন্য একটি বেন্ঞ্চিতে বসলাম। বসা মাত্রই আমি লক্ষ্য করলাম যে, একটি পোষ্টারে লেখাঃ  "মাহবুবে খোদা ......মাহবুবে এলাহি...পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) -এর শুভেচ্ছা "।
একটি বিষয় বেশ আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুললো। আশেকে নবীগণ যাদের নবী প্রেমিক বলা হয়, তাদের নবীপ্রেম এবং পুর্ববর্তী যারা রসুলের জামানায় ছিলেন তাদের নবীপ্রেমে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়ঃ পনেরো শতকের ঘটনা। আল্লামা আবদুর রহমান জামী (রঃ) ছিলেন একজন মহান রসুল প্রেমিক। নবী প্রেমের কারণেই তিনি একজন কালোত্তীর্ণ মহাপুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। একদা তিনি রসুল পাকের শানে না'ত তথা কাসিদা লিখে রঁওজায়ে আকদাসের জেয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনায় গমণ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তার একান্ত ইচ্ছে-রঁওজা পাকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর বিখ্যাত না'ত-ই-রসুলটি পাঠ করা। যখন আল্লামা জামী (রঃ) নবী প্রেমে বিভোর হয়ে মদীনা পানে ছুটলেন, তখন মক্কার তৎকালীন গভর্ণরকে স্বপ্নে হুজুর পাক (সাঃ) এই বলে নির্দেশ প্রদান করেন যে, পারস্য হতে আগত যার নাম জামী (রঃ) তাকে যেন কোন মতেই মদীনায় যেতে দেয়া না হয়। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মক্কার গভর্ণর তাকে পাকড়াও করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। এরপর গভর্ণর আবার হুজুরে পাক (সঃ)-কে স্বপ্নে দেখেন। স্বপ্নে রাসুলে পাক (সঃ) বললেনঃ
"আবদুর রহমান জামী (রঃ) কোন অপরাধী নয়। বরং সে কিছু কবিতা রচনা করেছে। এখানে এসে সে এগুলো আমার রওজার পাশে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করতে চায়। যদি  এমন হয়, তাহলে শরীয়তের আইন ভংগ করে রঁওজা হতে আমার হাত মাসাফাহার (Hand Shake) জন্য বের হয়ে আসবে। তা ঠিক হবে না। তাই তাকে বলো-এখানে এসে সে যেন এই কবিতাটি পাঠ না করে "। স্বপ্নের মাধ্যমে এ সুসংবাদ শুনে গভর্ণর কারাগার হতে তাঁকে মুক্ত করেন এবং তাঁর প্রতি বিরাট সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করেন। (কাসিদা-ই-নু'মান, পৃষ্ঠা ৩১২-১৩)। সে বিখ্যাত কাসিদাটি ছিলঃ

তানাম ফারসুদা জা পারা, জে হিজরা ইয়া রাসুল আল্লাহ
দিলাম পাজ মুর্দা আওয়ারা জে ইসইয়া, ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
চুন সু.ইয়ে মান গুজার আরি, মানে মিসকীন জানা দারি
ফিদা.ই.নাকস.ই.নালাইনাত, কুনাম জা, ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
জে খারদা খাইশ হাইরা নাম, সিয়া সুদ রোজ ইসইয়ানাম
পাসেমা নাম, পাসেমা নাম, পাসেমা নাম ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
জে জামে হু্ব্ব তু মাস্তাম, বা জানজিরি তু দিল বাস্তাম
না'মি গুইয়াম কি মান বাস্তাম, সুকুন দা ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
চুন বাজু.ই শাফা'য়াত রা, খুশাই.ল বার গুনাগারা
মাকুন মাহ.রুমে জামে রা, দারা আন, ইয়া রাসুল আল্লাহ।
------------------------------------------------------
উল্লেখ্য যে, সেই নবীপ্রেমিকও মাহবুবে খোদা শব্দটি ব্যবহার করতে সাহস দেখাননি। এমনকি হযরত ওয়ায়েস কারণী (রাঃ) ও ব্যবহার করেননি। এমনকি হযরত মুসা (আঃ) ও যিনি আল্লাহ পাকের সাথে সরাসরি তুর পর্বতে কথোপকথন করতেন, তিনিও ব্যবহার করেননি । কিন্ত্তু হাল জামানায় এমন সব বিখ্যাত বিখ্যাত খেতাব যুক্ত পীর ফকির দরবেশ দেখা যায়, যারা অধিকাংশই পান্ডিত্যবহুল কেতাবীজ্ঞানে জ্ঞানী। কিন্ত্তু আধ্যাত্মিকতা তাদের জন্য সুদুর পরাহত। যদিও এসব বিষয়ে মাথা না ঘামালেও চলতো কিন্ত্তু বাহুল্যের কারণেই হোক কিংবা অন্যকোন কারণেই হোক, যে বা যারা এই শব্দটি ব্যবহার করছে, তার পক্ষে অবশ্যই কোন না কোন কারণ আছে। কারণটা কি, সেটা সেই ভালো জানে।

দোকানী আমাকে চা দিল। শীতের এই আমেজে এককাপ গরম চা যে কি পরিমাণ আনন্দ দিতে পারে, তা কেবল প্রত্যক্ষদর্শীরাই বলতে পারবে। আমার সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হলো - শ্বেতার লেখাটি পড়ে।
(চলবে)

বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৫

শ্বেতার ডায়রী-পর্ব ষষ্ঠ

(পন্ঞ্চম পর্বের পর)

আমি যে বইটি তুলে নিলাম সেটা ছিল সুলতানুল হিন্দ শাহেন শাহে আওলিয়া হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ (রহঃ) কর্তৃক লিখিত কিছু মকতুবাদ। যা তিনি লিখেছিলেন তাঁর প্রিয় মুরিদ এবং খলিফা হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহঃ)-কে উদ্দেশ্য করে। সেই মকতুবাদের প্রথমটি হচ্ছেঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
মেরে দেলী মোহেব্ব । মেরে কালবী দোস্ত। মেরে ভাই খাজা কুতুবউদ্দিন দেহলবী - আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দোজাহানের ছায়াদাত বখশেষ করুন।

বান্দা মিছকিন মঈনউদ্দিনের ছালাম জানিবা। পর সমাচার এই যে, আছরারে এলাহী (খোদাতত্ত্ব) সমন্ধে যাহা কিছু লিখিতেছি তাহা স্বীয় সত্যিকার মুরিদগণকে এবং সত্যপথের অনুসন্ধানকারীগণকে বেশ ভালভাবে বুঝাইয়া দিবা। তাহারা যেন ভুল পথে না যায়।

আজীজে মান ! যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে চিনিতে সক্ষম হইয়াছে সে ব্যক্তি কখনও কোন ছোওয়াল, খায়েশ বা আরজু করিবে না। যে ব্যক্তি এ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালাকে জানিতে সক্ষম হয় নাই, সে ব্যক্তি ইহার ভেদ উপলব্দি করিতে পারিবে না। দ্বিতীয়তঃ হেরেছ ও হাওয়া সম্পুর্ণরুপে দুরীভুত কর। যে ব্যক্তি স্বীয় হেরেছ ও হাওয়াকে দুরীভুত করিতে সফলকাম হইয়াছে সে ব্যক্তি মন্ঞ্জিলে মকসুদে পৌছিঁয়াছে। এইরুপ ব্যক্তিগণের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা কোরআন মজিদে এরশাদ ফরমাইয়াছেন - "যে ব্যক্তি স্বীয় নফছকে যাবতীয় খাহেশাত হইতে নির্লিপ্ত করিয়াছে-সে তাহার স্থান বেহেস্তে করিয়া লইয়াছে "। যাহার দিলকে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় তরফ হইতে বিমুখ করিয়াছেন তাহাকে খাহেশে শাহওয়াতের নর্দমায় চির নিমজ্জিত করিয়াছেন। ছুলতানুল আরেফিন খাজা বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে তিনি একদা রজনীতে স্বপ্নযোগে আল্লাহ তায়ালার দীদার লাভ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তখন জিগ্যাসা করিয়াছিলেন " আয় বায়েজীদ ! তুমি কি চাও ? বায়েজীদ তখন উত্তর করিয়াছিলেন, "যাহা তুমি চাও হে খোদা।" তখন আল্লাহ তায়ালা বায়েজীদের কথায় সন্ত্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, আচ্ছা বায়েজীদ ! যেরুপভাবে তুমি আমার হইয়া গিয়াছ, আমিও তদ্রুপ তোমার হইয়া গেলাম।
যদি তাছাওয়াফের মহাজ্ঞানে জ্ঞানী হইতে চাও, তবে যাবতীয় বাহ্যিক সুখ-সম্পদের আশা পরিত্যাগ কর। সেই মহাসম্পদশালী চিরশান্তি ও আরাম প্রদাতা পরমসৃষ্টিকর্তার মোহব্বত লাভ করিবার উদ্দেশ্যে একাগ্রচিত্ত হইয়া অবিশ্রান্ত কোশেশ কর। যদি তুমি ইহা প্রতিপালন করিতে সমর্থ হও, তবে জানিও যে, তুমি তাছাওয়াফ বিদ্যায় আলেম হইয়াছ (সংক্ষিপ্ত)।

আমি যখন গভীর মনোযোগ সহকারে আমার মনের বাড়ীতে মকতুবাদে খাজা পড়ছিলাম তখন হটাৎ একটা বিকট ধাক্কায় আমার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো। আমি তাকিয়ে দেখলাম - পুলিশের ভ্যানটি একটি কাভার্ড ভ্যানকে সাইট দিতে গিয়ে একেবারে ফুটপাতের সাথে লেগে একধরণের ঘ্যষ ঘ্যষ শব্দ করে হার্ডব্রেক কষলো। তারপর ভ্যান হতে নেমে কাভার্ডভ্যান চালকের লাইসেন্স চাইলো এবং সেই ড্রাইভারের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর আবারো গাড়ী ছেড়ে দিল। আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখতে চাইলাম-কোথায় আসছি? দেখলাম হাইকোর্ট মাজারের কাছ দিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির দিকে যাচ্ছে। গাড়িটি যখন যাচ্ছে তখন হাইকোর্ট মাজারের সদর গেইটটি দেখতে পেলাম।

আমার তখনই একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সেইটা হলো কিছুক্ষণ আগে যে সুলতানুল হিন্দ খাজা গরীর নেওয়াজের মকতুবাদ পড়ছিলাম, সেই খাজা গরীব নেওয়াজের দ্বিতীয় পুত্র যে, এ মাজারে শুয়ে আছে, সেটা কি সবাই জানে? তারা কি জানে - তার প্রকৃত নাম কি? কেন তাকে শরফ উদ্দিন চিশতী (রহঃ) বলা হয়? তিনি সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা গরীব উন নেওয়াজ (রহঃ) এর দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত ইসমত (রহঃ) -এর ঔরসে ৬২৮ হিজরী মোতাবেক ১২৩০ খ্রীস্টাব্দে আজমীরে জন্মগ্রহণ করেন। ওলী-এ-বাংলার পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল হযরত খাজা হুশামউদ্দিন আবু সালেহ চিশতী (রহঃ) এবং তিনি হযরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহঃ) এর হস্তে মুরিদ হন। তিনি হযরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া হতে অশেষ ফয়েজ বরকত লাভ করেন এবং হযরত শাহ্ জালাল (রহঃ)-এর সাথে বঙ্গে আসেন। সেই সময় তিনি তাঁর প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছিলেন। পরবর্তীতে যখন তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায়-তখন হযরত খাজা শাহ্ জালাল (রহঃ) তাকে "শরফ উদ্দিন" নামে ভুষিত করেন। যার আরবী অর্থ হয়- পাল্টানো বা বদলানো। তিনি হযরত শাহ্ জালাল (রহঃ)-এর সাথে দুই বছর অবস্থান করেন। পরবর্তীতে হযরত শাহ্ জালাল (রহঃ)-এর আদেশক্রমে তিনি বর্তমান হাইকোর্ট যা রমনা গ্রাম নামে পরিচিত ছিল, সেইখানে তার আস্তানা গাড়েন এবং ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। এই মহান অলী যিনি ওলী-এ-বাংলা নামে পরিচিত ছিলেন তিনি হিজরী ৭৩৮ মোতাবেক ১৩৪০ খ্রীষ্টাব্দে ১১০ বৎসর বয়সে আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যে গমণ করেন (ইন্নানিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।

আমি আবার চেষ্টা করলাম সেই মকতুবাদটি পড়ার জন্য। মনের বাড়ীতে যাবার চেষ্টা করলাম। কিন্ত্তু পারলাম কোথায়? গাড়ীটি থামলো শাহবাগের মোড়ের দিকে পুলিশ ক্যাম্প-এর সামনে। আকাশ ততক্ষণে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। আমাকে নামানো হলো। সাত্তার নামক পুলিশটি আমাকে ইশারা দিল তাকে অনুসরণ করার জন্য। আমি তার পিছু নিলাম।
(চলবে)

মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৫

শ্বেতার ডায়রী-পন্ঞ্চম পর্ব

তারিখঃ ১৭ই এপ্রিল, ২০১৪
বারঃ বৃহসপতিবার

আজকে আমাদের ক্লাসে জালাল স্যার পদার্থের ধর্ম পড়াচ্ছিলেন। স্যার বলছিলেন-পদার্থ কাকে বলে? পদার্থের ধর্ম কি? পদার্থ কতো প্রকার ও কি কি? স্যার পড়ানোর ফাঁকে লক্ষ্য করলেনঃ সাজিদ মাহিনের সাথে ফিস ফিস করে কথা বলছে। কি বলছিল ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্ত্তু তাদের কথোপকথন স্যারের দৃষ্টি এড়ালো না। স্যার কঠিন দৃষ্টি নিয়ে সাজিদের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেনঃ এ্যই ছোকরা, কি নাম?

-স্যার, সাজিদ।

-সাজিদ? আচ্ছা কি নিয়ে এত কথা বলছিলে?

-মাহিন জানতে চাইলো-ধর্ম কি?

-তা স্যাার আপনি কি বললেন? ব্যাঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে স্যার সাজিদকে প্রশ্ন করলেন।

-স্যার আমি বলেছি ধর্ম হলো যা ধরণ করে আছে। অর্থাৎ একটা বস্তু যে গুণাবলী ধারণ করে আছে তাই তার ধর্ম।

-হুম। তাহলে ধর্ম নিরপেক্ষতা কি?

-স্যার ধর্ম নিরপেক্ষতা হলোঃ যে কোন পদার্থের গুণাবলী নষ্ট না করে কিংবা অন্যের গুণাবলীকে প্রষ্ফুটিত করার জন্য বা  ত্বরান্তিত করার জন্য সহায়তা করে।যেমনঃ শয়তান।

জালাল স্যার রাগে গজ গজ করতে করতে বললেনঃ বেয়াদব। এক্ষুণি ক্লাস থেকে বের হ।
তোমার সেই দিনের খেয়ালীপনায় সমস্ত ক্লাসের ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা পিন পতন নীরবতা নেমে এসেছিল।সবার কাছে তুমি হাসির পাত্র বনে গেলে। কি লাভ হলো বলোতো? তোমাকে সেই দিন বের করে দেয়ায় আমার যে কি কষ্ট হচ্ছিল তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না। কিন্ত্তু কেন তুমি এমন কাজটা করলে তা কিন্ত্তু কোনদিন বলোনি।

রাত তখন আনুমানিক তিনটা। শীতের রাতগুলো মেরাথন প্রকৃতির হয়। আমার আজকের রাতটি আরো বেশি মেরাথন মনে হচ্ছে। আকাশের চাঁদ তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে গাড়িতে মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে তা পেটানোর চটোপৎঘাত পাওয়া যাচ্ছে। শুনেছি শীতে মশাদের বেশি প্রডাক্টিভিটি থাকে না। শীতের প্রকোপের কারণে মশাদের বংশবৃদ্ধি হয় না। প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। কিন্ত্তু মানবের ক্ষেত্রে কোন বাঁধই মানে না। কি করবো বুঝতে পারছি না। আর আমাকে নিয়ে কি করতে চায়, তাও স্পষ্ট হয়নি। কোর্টে চালান দেবে না-কি থানা হাজতে ঢুকিয়ে দেবে তাও বুঝতে পারছি না। কি যে করি? 

তারিখঃ ১৯শে এপ্রিল, ২০১৪ইং
বারঃ শনিবার
আজকে তুমি একটা অদ্ভুত কথা বললে। আমি তোমাকে বলেছিলাম-তোমার পাগলামির রহস্য কি? তুমি বললেঃ মনা পাগলা। যখন প্রশ্ন করি মনা পাগলাটাকে, তখন বললে-মনা পাগলা হলো মনের ভেতর যে পাগলের বাস, সেই পাগলই হচ্ছে মনা পাগলা। প্রত্যাকটি মানুষের মনের মধ্যে আরেকটা মানুষ থাকে। সেটা হলোঃ মনের মানুষ। আর আমারটা হলোঃ পাগল। তাই আমার পাগলামির রহস্যজনক ব্যক্তির নামঃ মনা পাগলা। 
তুমি যে পাগল হয়ে যাচ্ছ-তা কি তুমি বুঝতে পারছো? তোমাকে একজন মনোবিজ্ঞানের ডাক্তার দেখানো উচিত। সেদিন দেখলাম তুমি ঝুম বৃষ্টিতে কোট-প্যান্ট টাই গলায় ঝুলিয়ে হাঁটু সমান পানিতে ভিজতে ভিজতে যাচ্ছো। আবার হাতে একটি সিগারেট ধরাচ্ছ। ম্যাচটি ভিজে যাওয়ায় বার বার চেষ্টা করছো। কায়দা করে ধরিয়ে টানতে টানতে যাচ্ছো। আশে পাশের মানুষজন হা করে তাকিয়ে দেখছে। আমার কি যে খারাপ লাগছিল, তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না। প্লিজ সাজিদ, বুঝতে চেষ্টা করো-জীবনটা অনেক দামী। এটাকে এভাবে হেয়ালিপনা করে নষ্ট করে দিও না।

তারিখঃ ২৩শে এপ্রিল, ২০১৪ইং
বারঃ বুধবার
আমি ঠিক তোমাকে বুঝে উঠতে পারছি না। কখনো মনে হয় তুমি যা কিছু করছো, তা ইচ্ছাকৃত। অথবা আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার জন্য। কোন্ টা যে ঠিক, সেটাও পরিস্কার নয়। তোমাকে নিয়ে যেদিন আমি আমাদের বাড়ীতে গেলাম-আমার আব্বা-আম্মাকে সালামতো দাওনি, উল্টা তুমি আব্বার সাথে ধর্ম নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়লে? তার সাথে দর্শন কপচানো শুরু করে দিলে? দর্শন যদি তোমাকে বুঝানো হয়, তাহলে তুমি জিরো পাবে। যে মেয়েটা তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে তার দর্শন না বুঝে তুমি কি দর্শন করতে চাইছো? তুমি কি জানো-প্রেম ছাড়া কোন ইবাদত কবুল হয় না। প্রেম সমস্ত ইবাদতের মুল। ইশকে মাজিজি না বুঝলে ইশকে হাকিকি কিভাবে বুঝবে? 
তোমাকে একটা উদাহরণ দেই। নারী -বা জননী - এক মহাশক্তির রূপ ! এর বিশেষ এক অঙ্গ - শক্তির ভান্ডার ! আর পুরুষ -- নিজে স্বয়ং মহান সত্যের স্বরূপ ! এদের বিশেষ অঙ্গে সেই স্বরূপ বিরাজমান !!এর অনাচার ব্যাভিচার - তৃতীয় - এক অশুভ শক্তির সৃষ্টি !! সদগুরুর নিকট বসে শিখতে হয়- এর যৌগিক পদ্ধতি ! এই যৌগিক পদ্ধতিতেই - মহাতৃপ্তি বা মহাশান্ত - প্রশান্ত !!রতি + মতি-- গতি -(2) নিম্নগতি ; উর্ধগতি = জ্যোতি (গুরুর কৃপায় উর্ধগতিতে)। যেখানে সুর কেটেছে পুনরায় সেইখানে সুর জোড়া লাগলে - তবেই তৃপ্ত আত্মা !! তোমার মনা পাগলা কি সেটা জানে? ভেবে দ্যাখো-
আজলে (আদিতে) একটি নূর (জ্যোতি) ভেঙে দুটি হল - এরা মিলবে বা মিলছে কখন ? না আধখানা ই আছে ? তাহলে উপাসনা কি অর্ধেক ? আবার এক ছাড়া দ্বিতীয় নাই !! এর রহস্য কি ? তোমার মনা পাগলা কি জানে? যদি জানে তাহলে উত্তর দিও।

পুলিশটাকে দেখলাম মনোযোগ সহকারে ডায়রীটা পড়ছে। কোন ব্যাঙ্গাত্মক ভাষা ব্যবহার করছে না। বেশ মনোযোগ দিয়েই দেখলাম পড়ছে। কোন তারিখেরটা পড়ছে সেটা বুঝতে পারলাম না। কারণ সে আগের মতো শব্দ করে পড়ছে না। আমি চিন্তা করলাম বসে থেকে লাভ কি? তার চাইতে কোয়ান্টাম মেথড পদ্ধতিতে চলে যাই না কেন -আমার মনের বাড়ীতে। আমি কোয়ান্টাম পদ্ধতি অবলম্বন করে মনের বাড়ীতে চলে গেলাম। আমার মনের বাড়ীটি বেশ চমৎকার। বাড়িটির চর্তুপার্শ্বে দেবদারু আর শাল -সেগুণ গাছ পালা দিয়ে ঘেরা। সেই বাড়ীর সামনের সদর দরোজার পাশে দুটি ফুলের বাগান। ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলে পাওয়া যাবে দেয়ালে ঝুলছে বিখ্যাত বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি। পাশে দুটি আরাম কেদারা। পাশে সারি সারি বই। যেটা ইচ্ছা সেটা হাত বাড়িয়ে নেয়া যাবে। ক্যাসেট প্লেয়ার আছে। ইচ্ছে করলে গানও ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। গান শুনতে শুনতে বই পড়া যাবে। আমি সেই আরাম কেদারায় আরাম করে বসলাম। বইগুলো হতে একটি বই হাতে নিলাম। বইটির নামঃ আসরারে হাকিকি-মকতুবাতে খাজা। আমি হাল্কা মিউজিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সংগীত শুনছি আর বইটি পড়ছি।
(চলবে)