পৃষ্ঠাসমূহ

সোমবার, ১৬ মে, ২০১৬

একনাদীদ - প্রথম পর্ব



হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রহ:) বলেছেন-
" পীরেরা জাতে খোদা একনাদীদ
নেই মুরিদ ! নেই মুরিদ!! নেই মুরিদ !!!
অর্থাৎ পীরের জাত আল্লাহ পাকের জাত যে মুরিদ এটা দেখেনি অর্থাৎ একরুপে দেখেনি সে মুরিদ হয়নি সে মুরিদ হয়নি।। সে মুরিদ হয়নি।।।
প্রশ্ন হলো মাওলানা সাহেব কেন একথা বলেছেন ? পীরের জাত বলতে মাওলানা সাহেব কি বুঝাতে চেয়েছেন ? আর মুরিদদেরকে কেন তা বিশ্বাস করতে বলেছেন ? আর না করলে সে মুরিদ হয়নি বলে তিনবার উল্লেখ করেছেন তাহলে সে কি? আর মুরিদ বলতে কি  বুঝানো হয়েছে বা কাদের বুঝানো হয়েছে?
প্রসংগত উল্লেখ যে মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি ছিলেন তৎকালীন সময়ে একজন জগৎ বিখ্যাত মাওলানা তিনি শামশের তাব্রিজির হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে মসনবী শরীফ প্রনয়ণ করেন যাকে ফারসী ভাষায় মানব রচিত কোরআন বলা হয় উপরোক্ত আয়াতটি তারই কিতাব মসনবী শরীফ থেকে উদ্বৃত
খোদার জাত বা আল্লাহ পাকের জাত শব্দটির মাঝে লুকায়িত আছে গভীরতত্ত্ব জাত হচ্ছে বৈশিষ্ট্য বা উপাদান যা দ্বারা কোন কিছু সৃষ্টি হয় আর গুণ হচ্ছে তার চরিত্র খোদার জাত বলতে খোদা যে জাত বা উপাদানে সৃষ্ট তথা জাত নুর আর প্রত্যেকটি উপাদানের দ্বারা সৃষ্ট বস্তুুরই একটা চরিত্র বা গুণ থাকবেই খোদা খোদ বা নিজস্ব বা স্বয়ং শব্দজাত অর্থাৎ নিজস্ব বা স্বয়ং নুর মূল অর্থটি দাড়ায় নিজস্ব নুর ' তাখাল্লাখুবি আখল্লাকিল্লাহ ' আল্লাহর নুরে নুরাম্বিত হও - কথাটির অর্থই হচ্ছে আল্লাহর নুরে আল্লাহময় হয়ে যাওয়া অথবা ' ছেবগাতাললাহে ওয়া মান আহসানু মিনাললাহে ছেবগাতান' আল্লাহর রঙে রন্ঙিত হও - কথাটির মর্মার্থই এখানেই
প্রশ্ন হলো আল্লাহ  তাহলে কি? আল্লাহ শব্দটির অর্থ আল ইলাহ আল-সর্বজনীন বা সর্ব আর ইলাহ অর্থ উপাস্য আল্লাহ শব্দটির অর্থ হচ্ছে - সার্বজনীন উপাস্য আর হু শব্দটির অর্থ - তিনি বা যিনি সুতরাং আল্লাহু অর্থ - সার্বজনীন উপাস্য যিনি যিনি আল্লাহ তিনি সার্বজনীন উপাস্য উপাস্য অর্থ হচ্ছে যার উপাসনা করা হয় (উপাসনা - উপ+আসন উপ সম্নুখে বা নিকটে আর আসন অর্থ বসা অর্থাৎ উপাসনা - নিকটে বসা ) জগতে প্রতিটি সৃষ্টিই কোন না কোন বস্তুুর উপাসনা করছে অর্থাৎ ইবাদত করছে ইবাদত আবদ শব্দ হতে এসেছে আবদ অর্থ দাস আর ইবাদত অর্থ দাসত্ব করা সুতরাং কাল্পনিক হোক বা বাস্তব হোক কেউ না কেউ কারো না কারো ইবাদত করছে আর মূল কার্যটাই হচ্ছে বন্দেগী করা সুতরাং সর্বদিক হতে যার উপাসনা করা হোক না কেন তার একমাত্র প্রাপ্য হচ্ছেন যার উপাসনা করা হচ্ছে তার অর্থাৎ আল্লাহ পাকের যাকে বলা হয় প্রভূ (প্র - প্রকৃস্ট  আর ভূ - ভূত বা আত্না বা বীজ বা স্বত্ত্বা )
পীর শব্দটি ফারসী যার অর্থ বয়ো:বৃদ্ধ বা জ্ঞানী ব্যক্তি পবিত্র কোরআনে কোথাও পীর শব্দটি উল্লেখ নেই আছে মুর্শিদ শব্দটি ( "ওয়ামাইউদলিল ফালান তাজিলাহু ওয়ালিয়াম মুর্শিদা" সুরা কাহাফ ) মুর্শিদ শব্দটির মূল রশদ্ যার অর্থ পথ প্রদর্শক এই মুর্শিদই হচ্ছেন ফারসি ভাষায় পীর যিনি তার উম্মতদের (অনুসারীদের) পথ প্রদর্শন করে থাকেন হাদীরুপে (" লি কুল্লি কাওমিন হাদিন " ) আর এই উম্মতদেরকেই বলা হয় মুরিদ
সুতরাং মুরিদ যিনি তিনি তার মুর্শিদের অনুসারী তথা উম্মত কারণ এই মুর্শিদরাই খোদার জাত সমগ্র সৃষ্টিজগত হচ্ছে আল্লাহ পাকের পরিবার তিনি তার পরিবারের ভরণ-পোষন তথা যাবতীয় কর্ম পরিচালনা করেন খলিফাতুল আর্দ ( আল্লাহর প্রতিনিধি) দ্বারা তারাই আবার হাদীরুপে আর্বিভূত হয়ে সৃষ্টি কর্ম পরিচালনা করেন সুতরাং মুরিদের সামনে তার পীরই হচ্ছেন সাক্ষাৎ আল্লাহ তথা উপাস্য বা আরাধ্য বস্তুু তথা নারায়ণ (নর+আয়ন নর-পুরুষ আয়ন-চেহারা অর্থাৎ পুরুষের চেহারা তথা ফাছাম্মাওয়াজহুল্লাহ বা আল্লাহর চেহারা ) আল্লাহ তার সৃষ্টির ভারসাম্য রাখেন এই মুরিদুন ছেফাতের মাধ্যমে যে মুরিদ অভেদ্যচক্রটি বুঝতে পারেনি সে তার মুর্শিদ (তথা আল্লাহ) কেই চিনতে পারেনি তার নিগুঢ় রহস্য ধরতে পারেনি বাসারিয়াত সুরতের আড়ালে সে যে কে- তা সে বুঝতেই পারেনি  এজন্যই মাওলানা রুমী (রহ:) বলেছেন - সে মুরিদই হয়নি কথাটি একবার নয় তিনবার বলেছেন
এখন যারা মুরিদ হয়েছেন অথচ তার মুর্শিদের স্বরপটি ধরতে পারেননি তারা কি মুরিদ থাকতে পারেন বা তারা কি মুরিদ ? মাওলানা সাহেবের কথা মতোতো তারা মুরিদই না তাহলে তারা কি? ধর্ম মতে তারা কাফের কাফের কুফর হতে এসেছে যার অর্থ  ঢেকে রাখা বা গোপন করা অর্থাৎ যার অন্তরে সত্য ঢাকা পড়ে আছে কুফর যার অন্তরে আছে সেই কাফের আর মুনাফিক তারাই যারা মুরিদ হয়ে কাফের অন্তর নিয়ে গুরুবাদের বিরুদ্ধে গোপনে বিষোদাগার করে যাচ্ছেন মুনাফিক নিফাক হতে এসেছে নিফাক অর্থ ভন্ড,প্রতারক ফাসেক ফিসক হতে এসেছে যার অর্থ নিন্দনীয় কার্য যিনি নিন্দনীয় কার্যে লিপ্ত তিনি ফাসেকীতে আছেন সুতরাং দেখা যাচ্ছে কাফের থেকেও মুনাফিকরা অত্যন্ত ভয়াবহ তাদের স্বরুপ ধরাটা দু:সাধ্য যদিও মুর্শিদ জানেন কিন্ত্তু তিনি অনেক সময় তা প্রকাশ করেননা  সেটা তার বদ্যানতা

মনা পাগলার মৌনতা.....এবং -তৃতীয় পর্ব

(পুর্ব প্রকাশের পর হতে)

মনা কতোক্ষণ এভাবে বসে ছিল ঠিক মনে করতে পারছে না। তার পা ধরে এল। শরীরটা বেশ ভারী মনে হচ্ছে। একসময় সে তাঁর মুর্শিদের স্বরণে বিভোর হয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লো। তারপর উঠে বসলো। বৃষ্টিটা থেমে গেছে। কিন্ত্তু চারদিকে রেখে গেছে একটা শীতল অনুভুতি। সন্ধ্যা হতে তখনো অনেক সময় বাকী। কিন্ত্তু পরিবেশটা এমন যেন এক্ষুণিই সন্ধ্যা গড়িয়ে আসবে। মনা মনে মনে চিন্তা করলো রাতে কোথায় থাকবে? আর কোথায়ই যাবে...আশে পাশে কাউকেই সে দেখতে পাচ্ছে না। স্কুল ঘরের দারোয়ানও নেই। অবশ্য যে স্কুল তাতে চোর আসলেও চোরের শুধু শুধু সময়ই নষ্ট হবে। নেয়া মতো কোন কিছুই নেই। কাজেই স্কুলে দারোয়ান রাখা হয়নি। ভাবলো-আজ রাতটা এখানে কাটালে কেমন হয়? কিন্ত্তু চেনা নেই জানা নেই এমন একটা পরিবেশে থাকাটা কি ঠিক হবে? ভাবতে ভাবতে মনা উঠে দাঁড়ালো। নাহ্ এখানে থাকা ঠিক হবে না। যেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই সেখানে থাকাও নিরাপদ নয়। মনা কোন দিকে না তাকিয়ে হাঁটা শুরু করলো।

রাস্তা-ঘাট কাদা পানিতে মাখামাখি। লোকজন বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে ছিল। বৃষ্টি তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিল। এখন আর সেই বাধা নেই। মেঘ কেটে গেছে। লোকজন দলে দলে বের হচ্ছে। মনা সে দিকটায় গেল। তারা একটা চায়ের দোকানে বসলো। মনাও তাদের সাথে বসলো। মনাকে দেখে সবাই ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো। তাকে তো এ অঞ্চলে কখনো কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। সবাই বার বার তার দিকে তাকাচ্ছে। মনাও তাদের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে মনা বললোঃ 

-ভাই আমারে কড়া দেইখ্যা একটা লিকার চা দেন। ডাইরেক্ট লিকার।

দোকানী অবাক হয়ে মনার দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-খাইতে পারবেন তো?

-একটু চিনি বাড়াইয়্যা দিয়েন। তাইলেই অইবো।

দোকানী চিনি দিতে দিতে জিগ্যেস করলোঃ

-আপনেরেতো আগে কহনো দেহি নাই..এইহানে থাহেন

-নারে ভাই..আমি কই থাকি কই খাই কিছুই জানি না। সে সব জানে...

-হেয় কেডা... 

-আরে মিয়া হেরে চিনলা না..হেয়ইতো সব। যব কুছভি না থা তব ম্যায় থা...যখন কোনকিছুই ছিল না তখন আমি ছিলাম।

দোকানী কি বুঝলো কে জানে কিন্ত্তু আশে পাশের লোকজন মনার দিকে তাকিয়ে রইল। সবাই মনাকে দেখছে...দোকানী মনাকে লক্ষ্য করে চা টা এগিয়ে দিল। মনা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললোঃ

তুহি হ্যায় হিন্দু তুহি মুসলমান
তুহি বুৎখানা তুহি হ্যায় কাবা
তোমহারা পুজন তোমহারা ভজন
সবার হৃদে তব সিংহাসন।।

তুমিই হিন্দু তুমিই মুসলমান। তুমিই বুৎখানা তুমিই কা'বা। সবাই তোমারই পুজা-আর্চনা করছে । তোমারই ভজনা করছে। তুমিই সবার হৃদয়েই আছো। তোমার সিংহাসন হচ্ছে এই মন-মন্দির। কুলুবুল মো'মেনিনা আরশু আল্লাহ। মোমিনের কলবেই আল্লার বাস। আল্লাহ মোমিনের কলবের মইদ্যেই থাহে...এইডা হাদিসের কথা।

মনার কথা শুনে পাশে বসা রমিজ মিয়া মনাকে জিগ্যেস করলঃ

-বাবা তোমারেতো এই গ্রামে কহনো দেহি নাই...কই থিক্ক্যা আইছো?

মনা রমিজ নামক বৃদ্ধলোকটির দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-কইথিক্ক্যা আইছি তা কইতে পারুম না। কেমতে কমু? আমি কি জানি আমি কই আছিলাম। আমি যেইহানে আছিলাম হেইজায়গাডা ছিল অন্ধকারে ঢাকা। অন্ধকারে কেমতে চক্ষে দেহুম...

-আরে মিয়া আমি তোমারে হেই কথা জিগাই নাই। আমি জিগাইছি তোমার বাসা কই?

-বাসা...পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই আমিতো সেই ঘরের মালিক নই...আমার কোন বাসা নাই। যেইহানে রাইত হেইহানেই কাইত।

-এই গরামে কেমতে আইল্যা..

-পাঠিয়ে দিয়েছ তাইতো এসেছি...আমি কিছুই জানি

-বাই এই পাগলের লগে কি কথা কন। বাদ দেনতো...পাশে থেকে রহিম বললো। রহিমের কথা শুনে রমিজ মিয়া একেবারেই থেমে গেল। থেমে গেলে কি হবে..সে আড় চোখে মনা দেখতে লাগলো। মনা নির্বিকার চিত্তে চুক চুক করে চা খাচ্ছে। সে কারো দিকেই আর কোন দৃষ্টিপাত করছে না।

লোকজন আস্তে আস্তে করে উঠে যেতে লাগলো। আরো কিছু লোকজন জড়ো হচ্ছে।  তারা কেউ চা খাচ্ছে। কেউ সিগারেট ধরিয়েছে। যারা আসছে তারাও মনাকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কিন্ত্তু তারা কেউ মনাকে কিছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। এর মধ্যে মনা দেখতে পেল একটা লোক অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে । অনেকক্ষণ ধরেই মনা তাকে দেখছিল। এবার তাদের মধ্যে দৃষ্টিপাত হলো। মনা তারে ইশারায় ডাকলো। লোকটি উঠে এসে মনার পাশে বসলো। মনা তাকে বললোঃ

-ভাই, আপনে আমার দিকে তাকাইয়্যা কি দেকতাছেন?

-দেখছি। আপনার ভেতর সেই ভাব আছে। যে ভাবটাকে বলা হয় প্রেমের ভাব। যা সহজেই কেউ রপ্ত করতে পারে না। আর আপনি কি সহজেই সেই ভাব নিয়ে বসে আছেন। আচ্ছা, আপনি যে একটু আগে একটা গান গাইছিলেন, সেটা কি আপনে লিখেছেন?

লোকটির কথা শুনে মনার বেশ ভালো লাগলো। মনা বুঝতে পারলো লোকটি বেশ শিক্ষিত এবং মার্জিত স্বভাবের। কতো সুন্দর করে কথা বলছে। একটুও তাকে ঘৃণা করছে না..মনা তার দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-না। গানের কথা লেকছে হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ)। আমি এই গানডা হুনছিলাম একটা ক্যাসেটে। হেইডাই মুখস্ত করইয়্যা গাইছি।

(চলবে)

রবিবার, ১৫ মে, ২০১৬

মনা পাগলার মৌনতা এবং.........দ্বিতীয় পর্ব

(প্রথম পর্বের পর হতে)

মনা দেখলো যে তার বাসস্থানের ঝামেলাটা মোটামুটি মিটেছে। কিন্ত্তু মনা জানে, তার জন্য যেটা নির্দিষ্ট করা হয়, তা কিছুদিন সত্য থাকে। তারপর সেটা হারিয়ে যায়। আজকে যেটা মনার জন্য নির্দিষ্ট। কালকের জন্য সেটা অনির্দিষ্ট। তারপরও মনা মনে মনে ভাবলোঃ ‍‍‌যা পাওয়া যায়, তা না পাওয়ার থেকে অনেক ভালো।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো। লোকজন যার যার গন্তব্যের দিকে চলে যেতে লাগলো। স্থানটা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত স্থানটিতে বেশ ভালোই লাগছিল মনার । মনা কেমন যেন তন্ময় হয়ে যাচ্ছে। তার ভেতর কে যেন জানান দিচ্ছেঃ তুমি যেটা করতে চাচ্ছ, সেটা তোমার জন্য নির্ধারণ করা হয়নি। তোমাকে যে কাজ দেয়া হয়েছে সেটাই তুমি কর। কেন তুমি অন্যের দাসত্ব করতে চাচ্ছ? তোমার প্রভুতো কারো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ নয়। তাহলে তুমি কেন সেই শৃংখলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছ? তোমার এই শৃংখলে আবদ্ধ হওয়া ঠিক হবে না।
কথাটা শুনে মনা চমকে উঠলো। সে তো ঠিকই বলছে। মুক্ত পাখিকে বন্ধী করা হলে সে যেমন দাপিয়ে বেড়ায়, ঠিক তদ্রুপ মনাও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর রশিদের দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-ভাইরে আমার লিগা তোর ছাপড়া ঘর বানানের দরকার নাই।

-কন কি দাদা? সব কিছু ঠিক কইর‌্যা হালাইছি আর আপনে চইল্যা যাইতে চাইতাছেন? কি হইছে?

-কি হইছে, হুনবি?

-না কইলে কেমতে হুনমু?

-তয় হোন...পাগলের জন্য কোন ঘর নির্দিষ্ট করা থাকে না। যেইডা থাকে হেইডা অইলো মাটির ঘর।  বুঝছস...

এ কথা বলেই মনা হন হন করে হাঁটা শুরু করলো। কারো দিকে সে তাকাচ্ছে না। সে হাঁটছে আপন মনে। তার হাঁটার ধরণ দেখে সবাই কেমন যেন হতভম্ভ হয়ে গেল। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। কি করবে...রশিদও কেমন যেন ম্রিয়মান হয়ে গেল। সেও অন্যদের মতো মনার হাঁটা দেখছে...

মনা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের ছায়ায় বসে পড়লো। আর ঐদিকে আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। যে কোন মুহুর্তে ভারি বর্ষণ হতে পারে। সেই বর্ষণে মনা কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। আশে পাশে কোথাও কোন লোকালয় দেখা যাচ্ছে না। মাঠের পর মাঠ। আর মাঠের দুপাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা। রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়। আকাশটা অণ্ধকার হয়ে যাওয়ায় কেমন যেন একটা ভুতুরে পরিবেশের সৃষ্টি হলো। মনা ভালো করে তাকিয়ে দেখতে লাগলো কি করা যায়...ঠিক সেই মুহুর্তে মেঘের ভারী গর্জন শোনা যাচ্ছে...বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে...মনা বৃষ্টিতে ভিজছে। ভিজে কাক হয়ে মনা হাঁটতে হাঁটতে একটা স্কুলের দেখা পেল। সে স্কুলের বারান্দায় উঠে বসলো। তারপর গায়ের ময়লা জামাটা খুলে ভালো করে চিপড়ালো। ঝাড়া দিয়ে সেটা দিয়ে মাথাটা মুছলো। লুঙ্গিটাও ভিজে গেছে। লুঙ্গিটির একটি কোণা ধরে সে সেটাকে নিংড়ালো। বেশ কিছু পানি বার করার পর সে সেটাকেও ঝাড়া দিল। স্কুলের টিনের চালে বৃষ্টির একটানা রিমিঝিমি শব্দ শোনা যেতে লাগলো। আর টিনের ছাদের কোণা ধরে পানি পড়ার শব্দ পাচ্ছে। দুরের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে তাকালো বাহিরের দিকে। ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। কোন কিছুই ষ্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মনা বারান্দার একটা কোণায় বসে পড়লো। হেলান দিলো একটা পিলারের গায়ে। তারপর আলতোভাবে চোখ বুঁজে ধ্যানের দিকে হারিয়ে যেতে লাগলো।

ধ্যান মুলতঃ কোন একটা বিষয়ের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে সেটার দিকে খেয়াল করা বা রাখা। ধ্যান ধৈ ধাতু হতে এসেছে। যার অর্থ চিত্তকে নিবন্ধ করা। যার দিকে চিত্তকে নিবন্ধ করা হয় সেটা হচ্ছে ধেয়্য আর যিনি ধ্যান করেন তিনি হচ্ছেন ধ্যেয়ী। আর পুরো বিষয়টা হলো ধ্যান বা মেডিটেশন । মোরাকাবা মোশাহেদা। পার্থক্য হলোঃ কে কোন্ বিষয় নিয়ে ধ্যান করবেন, সেটা তার নিজস্ব বিষয়। গুরু কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে অনেকেই ধ্যান করেন। মনাও করছে। মনা যেটা করছে সেটা হলো গুরুর প্রতিচ্ছবি তার অন্তরের মণিকোঠায় নিয়ে আসা। সে প্রথমে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল করছে। দেখলো শ্বাস খুব আস্তে আস্তে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ মন এখন শীতল অবস্থায় আছে। বিক্ষিপ্ত অবস্থায় নেই। অর্থাৎ অচন্ঞ্চল অবস্থায় আছে। সে আস্তে আস্তে দেখতে পেল তার গুরুর প্রতিচ্ছবি তার নিকট স্পষ্ট হয়ে আসছে। সেটা এতোটাই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে যে মনে হচ্ছে মনা হাত দিয়ে তার গুরুকে ধরতে পারবে। সে সেদিকে দৃষ্টি নিবন্ধিত করে অচন্ঞ্চলভাবে বসে রইলো।
(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

মনা পাগলার মৌনতা এবং.......প্রথম পর্ব

মনা পাগলাকে অাজ বেশ মলিন দেখাচ্ছে। তার মনটা ভালো নেই। কারো সাথে কথা বলছে না। সে কেমন যেন নির্জীব হয়ে ধুম মেরে বসে আছে। তাকে ও ভাবে বসে থাকতে দেখে অনেকেই বেশ অবাক হলো। কিন্ত্তু জানতে চাইলো না-কেন সে এভাবে বসে আছে?

মনা উঠে দাঁড়ালো। চারদিকটা একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলো। কড়া রোদ উঠেছে। রোদের তাপের কারণে রাস্তায় তেমন কোন লোকজন দেখা যাচ্ছে না। বাতাস নেই বললেই চলে। আর বাতাস থাকলেও তা বেশ হল্কা লাগছে। মনে হচ্ছে বাতাসটাও বেশ গরম হয়ে গেছে। মনা আকাশের দিকে তাকিয়ে হটাৎ বলে উঠলোঃ

- পাগলাটা এমুন খ্যাপছে ক্যা...গরমে কি আমাগো সিদ্ধ কইর‌্যা ফালাইবো? না-কি কাবাব বানাইবো?

মনার কথা শুনে আশে পাশের লোকদের মধ্যে বেশ হাসির রোল পড়ে গেল। তারা সমস্বরে হেসে উঠলো। তারা যেন তাদের পরিচিত মনাকে দেখতে পাচ্ছে। মনাও বেশ উৎফুল্ল হলো। মনাকে উৎফুল্ল দেখে রশিদ জিগ্যাসা করলোঃ

-দাদা, আপনে কারে কইলেন এই কথা?

-কারে আর কমুরে ভাই...ঐ যে দ্যাখ...আকাশের দিকে তাকাইয়্যা দ্যাখ। ঐ যে জগন্নাথরে দেখতাছস, ওরে কইলাম

রশিদ উম্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে তেতিয়ে থাকা গোলাকার সুর্যটা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। পরিস্কার আকাশ। মেঘের কোন লেশও নেই। কেবল সুর্য্যটার মধ্যে কেমন যেন একটা সোনালী বলয় খেলা করছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে না আবার চোখের সমস্যা হয়....সে জন্য রশিদ চোখ ফিরিয়ে আনলো। তারপর মনার দিকে তাকিয়ে বললোঃ

-হেয় কি জবাব দিল? 

-কি কইবো? যেই ধমক দিছি। দেহিস আউক্যা কেমনে মুইত্যা দেয়?

-কন কি দাদা? বৃষ্টি হইবো?

-হ....বৃষ্টিতে বেবাকরে ঠান্ডা কইর‌্যা দিব। যাউক গ্যা...এহন চা খাওয়া...

মনা চা খেতে চাইল। আর সবাই মনার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। একটা পাগলের জন্য এমন ভালোবাসা..এমন দরদ সচরাচর দেখা যায় না। কিন্ত্তু মনাকে সবাই বেশ ভালোবাসে। তার কথার একটা গুরুত্ব কম বেশি সকলেই দেয়। মনার সেটা পছন্দ না। মনা চায় তার মতো করে নিরিবিলিতে একা থাকতে। কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে। এমন একটা পরিবেশ এখন মনার জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে।

মনা চেয়ারে বসে চা খাচ্ছে। যে স্থানটিতে চা খাচ্ছে..তার পাশে একটা বড়ো অশ্বত্থ বৃক্ষ আছে । বয়স কতো হবে, অনুমান করা যায় না। তারপরও মনে হচ্ছে চল্লিশ পন্ঞ্চাশের কাছাকাছি। বেশ একটা এলাকা জুড়ে এর প্রকান্ড ডাল-পালা বিস্তৃত। চারদিকটা পাখ-পাখালির কলতানে মুখোরিত। পাখিদের চিকিরমিচির স্থানটাকে করে তুলেছে স্বপ্নের ভুবন। স্থানটা অনেক শীতল। তাই এখানে কিছু দোকান পাট বসেছে। ছোট ছোট মুদির দোকান। চা, বিস্কুট, সিগারেট  ইত্যাদি বিক্রি হয়। লোকজনের আনাগোনাও বেশ। গাছটির কান্ড বরাবর একটা পাকা বেদী তৈরী করা হয়েছে। অন্যন্ত মনোরম পরিবেশ। মনা মনে মনে এমন একটা নিরিবিলি পরিবেশই খুঁজছিল। মনে হলো সে যেন সেটা পেয়ে গেছে। চা খা্চ্চে আর চারপাশটা দেখছে। 

মনা লক্ষ্য করলো বেদীর উপর অনেকেই খালি গায়ে ঘুমিয়ে আছে। কাজেই তার চিন্তা নেই। সে ইচ্ছে করলেই এখানে থাকতে পারবে। কিন্ত্তু সে চায় না কেউ তাকে ডিষ্টার্ব করুক। সে সে উপায়টাই খুঁজছে। আর ভাবছে কি করা যায়...

চায়ের কাপটা দোকানে দিয়ে মনা সোজা গাছটির নিচে গেল এবং একটি স্থান দেখে বসে পড়লো। তারপর সে তার স্বভাব সুলভ আচরণ শুরু করে দিল। প্রথমেই সে সাধু সন্ন্যাসীরা যে ভংগীতে বসে ঠিক সে ভাবে বসে পড়লো। এরপর সে রশিদের দিকে তাকিয়ে বললোঃ 

-শোন হযরত খাজা শাহ্ পীর চিশতী (রহঃ) তাঁর চিশতী উদ্যানে কি বলেছেন

হৃদয় বনে অতি গোপনে একারও বাঁশি শুনেছি প্রাণে
মরমে মরি চাহি নেহারি সন্ধানে আমার পাইবে দেখা।।

আমি আমার হৃদয়ের বনে হের ডাক হুনছি। হের ডাকে সাড়া দিয়াই আমি এইহানে আইছি। হেই বাঁশির সুর হুনা যায় কলবের মইদ্যে । কলবেই হেয় বাস করে । হেয় কতা কয় বোবা ভাষায়। হের ভাষা বুঝনের লিগা নির্জন জায়গা লাগে। নির্জন ছাড়া হের ডাক হুনা যায় না....

-কন কি দাদা...এইহানে কেমনে নির্জন পাইবেন? দেহেন না চাইরদিকে কেমুন কইতরের লাহান মানুষ জন। হেরা আপনেরে কি হেই ডাক হুনতে দিব?

-কথাতো খারাপ কস নাই..তাইলে কি করন যায়

-দেহি আপনের লিগা কি করতে পারি? 

মনার শিশু সুলভ আচরণের সাথে অনেকেই পরিচিত। তাছাড়া এই এলাকার অনেকেই মনাকে ভালোবাসে। মনা চাইলে তার জন্য স্থান ঠিক করে দেয়া কোন ব্যাপার না। কিন্ত্তু মনাতো কোন স্থানেই থাকতে চায় না। হুট করে আসে আবার চলে যায়। কিভাবে আসে কিভাবে যায়, সেটা সেই ভালো জানে। রশিদ অবশ্য তার জন্য জায়গা আগেই ঠিক করে রেখেছে। এখন যেহেতু মনা বলছে, তাহলে তার জন্য কাজটা সহজ হয়ে গেছে। সে মনাকে বললোঃ

-দাদা আপনের জন্য ঐ জায়গাটা ঠিক কইর‌্যা দেই?

রশিদ আঙ্গুল তুলে দেখায়। মনাও ঐ দিকটা দেখে। সে দেখতে পায়, গাছটির ঠিক উত্তর দিকে ক্ষাণিকটা খালি জায়গা পড়ে আছে। সেই জায়গাটাও খারাপ না। মনা বেশ খুশি হয়। বলে

-জায়গাটাতো ভালো। থাকতে দিব?

-হেইডা আপনে আমার উপর ছাইড়্যা দেন। আমি ব্যবস্থা করতে পারমু।

আশে পাশের লোকজনও রশিদের কথায় সায় দেয়। কারণ তারা জানে রশিদ হচ্ছে চেয়ারম্যানের ছেলে। সে তার বাবার কাছে যেয়ে যদি বলে তাহলে কোন ঝামেলাই থাকে না। তারা রশিদকে বলে মনা ভাইরে আমরা ঐ জায়গাতেই একটা ছোট ছাপড়া ঘর তুইল্যা দেই। ভাই ঐহানেই থাকবো নে। রশিদ হ্যা বলতেই তখন তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। মনার জন্য ছোট একটা ছাপড়া ঘরের ব্যবস্থা হয়ে যায়।

(চলবে)

স্রষ্টা দর্শনের শর্তাবলী

 
#বোবা, #কালা এবং #কানা হলেই কেবল স্রষ্টাকে দেখা সস্ভব।
---------------------------------------------------------------
একজন গুরুর কাছে একজন শিষ্য যেয়ে বললোঃ

-বাবা আমি স্রষ্টাকে দেথতে চাই।
-তাই? গুরু বললেন।
-হ্যাঁ বাবা।
-আমি যা বলব তা তুমি মানতে পারবে?
-পারবো।
-তাহলে তোমাকে বোবা, কালা এবং কানা হতে হবে।
-কিভাবে?
-তোমার জিহ্বা কেটে ফেলা হবে। তোমার কানে গরম শিশা ঢেলে দেয়া হবে। এবং তোমার চোখ উপড়ে ফেলা হবে।
গুরুর কথা শুনে শিষ্য দিল ভোঁ দৌড়। ব্যাটা বলে কি? আমার জিহ্বা কেটে ফেলা হবে। আমার কানে গরম শিশা ঢেলে দেয়া হবে। আর আমার চোখ উপড়ে ফেলা হবে। দরকার নেই এমন গুরুর।
শিষ্যকে চলে যেতে দেখে গুরু হাসলেন। বললেনঃ

"যে শিষ্য বোবা, কালা এবং অন্ধ তিনিই কেবল স্রষ্টাকে দর্শন করতে পারেন।"
-স্বপন চিশতী

ব্যাখ্যাঃ
-------
প্রশ্ন হতে পারে কিভাবে? বোবাতো কথা বলতে পারে না। কালা তো কথা কানে শুনে না। আর কানা হলে তো চোখে দেখবে না। তাহলে কিভাবে সে স্রষ্টাকে দর্শন করবে? অাসুন দেখিঃ

#বোবাঃ যারা কথা বলতে পারে না.তারা বোবা। শিক্ষা হলো তুমি কুতর্কে জড়িও না। বোবার মতো চুপ করে থাকো।

#কালাঃ যারা কথা কানে শুনতে পারে না তারা কালা। শিক্ষা হলো তুমি অশ্লীল কথা শোনা থেকে বিরত থাকো।

#কানাঃ কানা তাদেরকেই বলা হয় যারা চোখে দেখে না। শিক্ষা হলো তুমি কানার মতো চোথ বুজে থাকো। ধ্যানে খেয়ালে রাখো আপনা মুর্শিদকে। তাহলেই তুমি আল্লাহকে দর্শন করতে পারবে।

#স্বপনচিশতী