পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগত দর্শন- পর্ব ২৫

(পুর্ব প্রকাশের পর হতে)

যেমনঃ পরশুরামের কথাই ধরা যাক । পরশুরাম দশ অবতারের এক অবতার । অবতার বলতে আমরা বুঝি - দেহ ধারন করে জগতে ঈশ্বরের আবির্ভাব । জৈবিক দেহ ধারণ করলেও প্রাণীকূলের কাছে তিনি নমস্য । এই নমস্য হবার জন্য এমন কতগুলি গুণ তাঁর মধ্যে প্রকটিত হয়, যেগুলি শ্রদ্ধাযোগ্য । যেমনঃ পিতা মাতাকে শ্রদ্ধা, সত্য ভাষণ, অহিংসা মনোভাব, জীবে প্রেম ইত্যাদি । কিন্তু পরশুরামের কাহিনী যদি বিচার করি, তাহলে তাঁর মধ্যে এমন কোন শ্রদ্ধা করার মত গুণই নেই । তিনি মাতৃ হত্যা করেছিলেন। হিংসার বশবর্তী হয়ে একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রীয় করেছিলেন । 

একটা মানুষ যে গুণে দৈব সত্ত্বা প্রাপ্ত হয়, সে গুণও তাঁর ছিল না। যেমনঃ বশিষ্ট । বশিষ্ট ঠিক পরশুরামের বিপরীত মেরুর মানুষ । শত পুত্র নিহত হলেও তিনি বিশ্ব মিত্রের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করেননি । এইজন্য তিনি ব্রাক্ষণ শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ আত্মবশ । বশিষ্ট শব্দের অর্থ হল আত্মবশ। সেই বশিষ্টের উদাহরণের পাশে হিংসায় উন্মুক্ত পরশুরাম কি করে অবতার অর্থাৎ ঈশ্বরের গুণাবলী নিয়ে অবতার হিসাবে চিহ্নিত হতে পারেন ? 

আসলে এই গল্পটির একটি রূপকার্থ আছে । রূপকার্থ এইরকম --------- মাতা মানে 'Energy জগত' । শুণ্যতার বুকে সুপ্ত এই Energy বা শক্তি স্বভাব গুণে ফুটে উঠে গোলাকার জগতের রূপ নেয়। এই জগতকে হনন করে অর্থাৎ জয় করে অর্থাৎ নিষ্ক্রিয়য় করে সেই শূন্যতে যিনি ধ্যান মার্গে ফিরে যেতে পারেন, তিনিই ঈশ্বররূপে গ্রাহ্য হন । পরশুরাম এই জগতকে জয় করেন নির্গুণ শুণ্যতায় তিনি স্থিত হতে পারতেন । সুতরাং তিনি ছিলেন ঈশ্বরতূল্য। জগত অর্থাৎ শক্তিজয়ী হিসাবে তিনি মাতৃঘাতী । কারণ শক্তিকে স্ত্রীলিঙ্গ বা মাতারূপে কল্পনা করা হয় ।

ক্ষত্রিয় হলেন তিনি যার মধ্য সত্বঃ রজঃ ও তম গুণের মধ্য রজঃ ও তম গুণের প্রাধান্য বেশি থাকে । কোন সাধক একুশ দিন সমাধিস্থ থাকলে এই রজঃ ও তম গুণের সম্পূর্ণ নাশ হয় । তখন তিনি ঈশ্বরের নির্ভেজাল সত্বঃ গুণের অধিকারী হন । পরশুরাম একুশ দিন সমাধিস্থ থেকে জড় দুই গুণ অর্থাৎ রজঃ ও তম কে জয় করতে পেরেছিলেন বলেই একুশবার ক্ষত্রিয় নিধনকারী রূপে বর্ণিত হয়েছেন । তিনি কুঠারধারী। এ কুঠার নরহত্যার প্রয়োজনে ব্যবহৃত কুঠার নয়। এ হলো জ্ঞান কুঠার । যার দ্বারা অজ্ঞানরূপ অন্ধকারকে ছেদন করে সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় । সেইজন্য অদ্যবধি শৈব সাধকরা কুঠার প্রতীক ধারণ করে থাকেন । গল্পের এই রূপকার্থ খুঁজে পেলে পরশুরামের অবতার তত্ত্বের যুক্তিযুক্তকতা প্রমাণিত হয় । কিন্তু এই রূপকার্থ ধরা না গেলে তা কুসংস্কার ও অজ্ঞানতার তূল্য হয় । 

চলবে...
 

বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগত দর্শন- পর্ব ২৪

(পুর্ব প্রকাশের পর হতে)

একজন মানুষের নিজের সারা জীবন সে যদি সুবিচারকের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বিচার করে, তাহলে জীবনে ঘটনা প্রবাহের অন্তরালে সে এমন অনেক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে পারবে যা প্রকৃতপক্ষে কৌতূহলপ্রদ ও চমক সৃষ্টিকারী । অন্তত আমি মিঠু যদি আমার ফেলে আসা জীবনের দিকে তাকাই তাহলে এমনতর চিন্তা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না । 

জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে বাস্তববাদীর বিচারে যার কোন ব্যাখা চলে না, দেওয়াও সম্ভব নয় । সে সব ঘটনা কেমন করে কিভাবে ঘটলো পার্থিব বিচার বিশ্লেষণে অন্তত আমি নিজে তার কোন হদিস পাই না। এমনতর ঘটনার পেছনে নিয়তির কোন হাত আছে বলে ধরে নিই বা অনেকে মনে করেন এই নিয়তি কি? ''অদৃষ্ট''। সাধারণের ধারণা সব কিছু ঘটনার পেছনেই রয়েছে বিধাতা পুরুষের হাত বা অদৃষ্ট লিখন । অর্থাৎ জন্মকালে তিনি কার জীবনে কি ঘটবে তা লিখে দেন ------ সেই লেখা অনুযায়ীই মানুষের জীবন পরিচালিত হয় । কিন্তু এসব ধারণা অবশ্যই পৌরাণিক কাহিনী প্রসূত । 

পুরান, কোরআন, বেদ, গীতা এবং বিভিন্ন গ্রন্থে অনেক সত্যকে সাধারণের পাঠযোগ্য করে তোলার জন্য গল্পের আকারে পরিবেশন করে, গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয় অবশ্য রূপকের মাধ্যমে একটি সত্যকে বর্ণনা করা । কিন্তু কালক্রমে এই রূপকার্থ লোকে বিস্মৃত হয়ে যায় । তখন রূপক নামক বহিরাবরণরূপী যে গল্প, তা-ই সত্য হয়ে দাড়ায় । রূপকার্থ বর্জিত হয়ে গল্পগুলি যখন অবিশ্বাস্য ননসেন্সে পরিণত হয় । এই জগতে আধ্যাত্ম সাহিত্যে এইভাবেই প্রতিগ্রন্থের মাধ্যমে কলঙ্ক পড়েছে । 

পুরানের ইংরেজী প্রতিশব্দ Mythology--- যার অর্থ দাঁড়ায় 'অবিশ্বাস্য' । তাই সব পুরান সত্যি সত্যিই অবিশ্বাস্য হয়েছে । সভ্যজাতি অধ্যাত্মতার ক্ষেত্রে জগতবাসীকে বর্বর বলে ভাবতে শিখেছে । এই জগতের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও অধ্যাত্ম সত্য হারিয়ে গিয়ে কতকগুলি কুসংস্কারই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এবং জন্ম জন্ম ধরে তারা সেই কুসংস্কার অনুসরণ করে তাকেই সত্য বলে আকড়ে ধরেছে । 

রক্ষণশীল মানসিকতার জন্য কিছুতেই এর বাইরে সে যেতে চায় না। এমনি করে একদিন মানুষে মানুষে ভেদাভেদের প্রশ্নটাও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে জগতবাসীর মনে । নইলে স্থির মস্তিষ্কে বিচার করলে পুরানের বহু গল্পই আপাত অর্থে গ্রাহ্য হতে পারে না । যেমন, পরশুরামের কথাই ধরা যাক । 

চলবে............

মঙ্গলবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগত দর্শন- পর্ব ২৩

(পুর্ব প্রকাশের পর হতে)

এই জন্য খুব কম সাধকই দীর্ঘক্ষণ ব্রহ্ম সান্নিধ্যে বা সমাধিতে নির্বিকল্প অবস্থায় থাকতে পারেন। অধিকাংশ সাধকই ব্রহ্মা সান্নিধ্যে থাকেন ততটুক সময়ই যতক্ষণ একটি সরষের দানা মশের শিঙের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই ব্যক্তি চেতনা অবলুপ্তি ভীতিকে লক্ষ্য করেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “ কেনরে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়, জয় অজানার জয়।” 

কিন্তু এইসব কি তিনি সচেতনভাবে লিখেছেন অথবা পূর্ব জন্মের সংস্কার বশে তন্ময় অবস্থাতে এসব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তা স্পষ্ট করে বলা খুবই দুষ্কর। কারণ সচেতনভাবে এ সম্পর্কে তার রচনা যেমন ‘ধর্ম’ নিবন্ধ সত্যি সত্যি অধ্যাত্ম জগতে বিচরণশীল ব্যাক্তিদের কাছে অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও দুর্বল বলে মনে হয়। ফলে ধারনা হয় যে, পূর্ব জন্মের সংস্কারই তার তন্ময় মুহূর্তে ফুটে উঠে তাকে এমন অতিন্দ্রিয় মরমিয়াভাবে রঞ্জিত করেছে। যোগীদের কাছে শোনা যায়, ষষ্ঠতলে এখনও রবীন্দ্রনাথ নিদ্রামগ্ন অবস্থায় সুক্ষ্মাদেহে বিরাজমান। 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ শুন্যতাবোধের অতীত। কিন্তু শুন্যতায় সমাধিস্থ হয়ে ফিরে এলে পরম প্রশান্তি অনুভুত হয়। এজন্য কবি অজানার (বোধাতীতের) জয়গান করেছেন। বিজ্ঞান কিন্তু শুন্যতা বোধের অতীত হলেও IR RESPONSIVE নয়। কারন VACUUM এ FIELD তৈরি হলে তার চারপাশে শুন্যতায়ও আলোড়িত হয়। SPACE এ বৃহদায়তন OBJECT থাকলে তার চতুর্দিকে শুন্যতা বেকে যায়। শ্রী শ্রী চণ্ডীর এই শ্লোকটিও এই অর্থে অত্যন্ত কৌতুহল উদ্দীপক। এর বাক্যার্থ সহজ হলেও ভাবার্থ নিতান্ত কঠিন। এবং এই ভাবার্থ বোঝা না গেলে এসব পাঠ করা নিরর্থক। 

চণ্ডীতে শুম্ভ যখন পার্বতীকে রমনীরত্ন হিসাবে তাকে অথবা তার অনুজ নিশুম্ভকে পতিত্বের বরন করতে বলেছেন তখন পার্বতী বা দুর্গা তার জবাবে বলেছেনঃ “যো মাং জয়তি সংগ্রামে যো মে দর্পং ব্যপোহতি যো মে প্রতিবলো লোকে স মে ভর্তা ভবিষ্যতি।” অর্থাৎ আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যে, যিনি আমাকে সংগ্রামে পরাজিত করতে পারবেন, তাকেই আমি পতিত্বে বরণ করব। এ কথার বাহ্যিক অর্থ এই যে, শুম্ভ- নিশুম্ভ তাকে সংগ্রামে পরাজিত করতে পারলে তাদের একজনকে তিনি পতিত্ব বরন করবেন। এই কাহিনীকে যারা যথার্থ অর্থে বিশ্বাস করেন তারা মূর্খ। তাদের চণ্ডী পাঠের কোন মুল্য নাই। অধ্যাত্ম জগতেও অনুপ্রবেশ ঘটেনি। এই ভাবার্থই হল সত্য।

চলবে.........

সোমবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগত দর্শন- পর্ব ২২

লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে সেই বিন্দু থেকে অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণু সদৃশ ফুলকি বেরিয়ে আসে। আসলে এই বিন্দু হল আত্মজগতের জ্যোতি সমুদ্রে শতদল পদ্মের মত। জ্যোতি সমুদ্রে চৈতন্য সত্তাকে ছড়িয়ে দিয়ে যে সাধক এই বিন্দু নির্গত পরমাণু কনাগুলি দেখতে পান তিনি অপার আনন্দে মুগ্ধ হন। এই বিন্দু জ্যোতি কণাই শতদল অনন্তদল পদ্মের মধু স্বরূপ। সেই অলৌকিক মধুর দৃশ্য দেখে বিহ্বল হওয়ার অর্থ হল- শতদল পদ্মের মধু পান করা।

রবীন্দ্রনাথের আরেকটি গানের কলি " কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়, জয় অজানার জয়।" এও এক অদ্ভুত হেয়ালী ভরা গান। এ গান সম্পূর্ণ মরমিয়া, অদ্ভুত এক তন্ময় অবস্থা থেকে এ বোধ আসে অর্থাৎ TRANCE থেকে। দেহতত্ত্বে ষষ্ঠ চক্রের কথা বলেছি। এই ষষ্ঠ চক্র ভেদ করে সাধক যখন বিন্দুর জ্যোতির্মণ্ডল পার হন এবং চৈতন্যলোকের স্বচ্ছতা অতিক্রম করতে যান,তখন কেন্দ্রস্থিত শুন্যতা সমস্ত বোধ লুপ্ত করে দিয়ে অদ্ভুত এক নির্বিকল্প সমাধির মধ্যে টেনে নিয়ে যেতে চায়। দেহতত্ত্বের এই পর্যায় পর্যন্ত সাধকের এক সছেতন প্রয়াস থাকে অর্থাৎ তাঁর সুক্ষ্মা অহংতত্ত্ব এই পর্যন্ত কাজ করে। কিন্তু এরপর শুন্যতার টানে তাঁর বিচারবোধ হারিয়ে যেতে চায় তখনই সুক্ষ্মা অহংবোধ সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। পাছে তাঁর ব্যাক্তি সত্ত্বা হারিয়ে যায় এই ভয়ে সে নিঃশেষে নিজেকে সেই মহাশূন্যের টানের কাছে ছেড়ে দিতে পারেনা আবার ব্যাক্তি চেতনার ভিতর ফিরে আসে। 

এই অবস্থাকে 'মোক্ষভীতি' নাম দেওয়া হয়েছে। এজন্যই ব্রহ্মন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে ব্রহ্মন হলেন 'মহদ্ভয়ম' অর্থাৎ ব্রহ্মন হলেন বিরাট ভয়ের কারণ। কিন্তু ব্রহ্মন কাউকে ভয় করেন না। ব্রহ্মন ভয় করবেন কি? তাঁর তো কোন বোধই নেই। তিনি সমস্ত কিছু আত্মস্থ করে নির্বিকল্প ও নির্গুণ হয় আছেন। বস্তুত নির্গুণ হয়ে আছেন ব্রহ্মন নয় পরব্রহ্মন, ব্রহ্মন হলেন গতিশীল-EXPANDING. বৃ = To Grow থেকে বৃহমান = স্ফীত হওয়া ব্রহ্মন। এই নির্গুণ অবস্থায় ব্যক্তিসত্ত্বার সমস্ত বোধকে ছেড়ে দেওয়া সত্যি সত্যি বহুজনের কাছেই ভয়ের হয়ে ওঠে।

 চলবে...............

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগত দর্শন - পর্ব ২১

 (পুর্ব প্রকাশের পর হতে)

মানব জীবের জড় প্যাঁচ খুলে সে যখন অন্তরস্থ জ্যোতিতে প্রবেশ করে,বিশ্বও বিপরীত দিকে তার প্যাঁচগুলি খুলে তার অন্তরঃস্থ জ্যোতি প্রকাশ করে। সুক্ষ্মতম ব্যবধানের মধ্যে দিয়ে এক জ্যোতি অপর জ্যোতির সঙ্গে মিশে যায়। যেমনঃ কাঁচের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। ভগবত গীতার এই শ্লোকটির ভাবও যারা আত্মতত্ত্ব ও জগততত্ত্ব জানেন না, তাদের পক্ষে ভাষ্য পড়েও কোনদিন প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। সঙ্গে একটু বিজ্ঞান পরিচয় থাকাও প্রয়োজন। ভগবত গীতায় জগতের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে এইভাবেঃ- 

“এই সংসার রূপ মায়াময় বৃক্ষের মুল (কারণ) উর্ধ্বে মায়াশক্তি বিশিষ্ট ব্রহ্মে হিরন্য গর্ভাদি শাখা নিম্ন দিক। কর্ম কাণ্ডরূপ বেদসমুহ ইহার কাণ্ড।” অর্থাৎ সংসার রূপ জগত বৃক্ষের মুল উর্ধ্বে। শাখা প্রশাখা,কাণ্ড ইত্যাদি নিচের দিকে। 

যোগদর্শনজাত গীতার এই জগত বর্ণনা যে কতটা সত্য অধুনা ASTRO PHYSICS ও তা অনুমোদন করেছে। কারণ ASTROPHYSICS এর ‘BIG BANG’ তত্ত্ব বা ‘STEADY STATE’ তত্ত্ব এ কথাই বলে যে, কোন কেন্দ্রস্থিত বস্তুকনা সমূহে শক্তির বিস্ফোরণের ফলেই গোলাকার জগতে সৃষ্টি। এই শক্তি ঘূর্ণায়মান হবার জন্য কিছুটা ‘ELLIPTICAL’ বা ‘OVAL’ মুলত গোলাকৃতি। যেখান থেকে জগত বিস্ফরিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে সেটাই তার কেন্দ্র। ছবিটি দাঁড়ায় এরকমঃ



এই গোলাকার জগতের যেদিক থেকেই কেন্দ্রের অভিমুখে যাওয়া যাক না কেন, কেন্দ্রকে উর্ধ্বমুখী মনে হবে। সুতরাং জগত (সম্প্রসারনশীল গোলক) এর মুল উর্ধ্বে ও ডালপালা অর্থাৎ সুক্ষ্মাংশ থেকে স্থুল অংশ নিচের দিকে। 

বস্তুবিজ্ঞান, আত্মজ্ঞান এবং অন্তর্জগতের স্বরূপবোধ হলে তবেই এই শ্লোকটি ব্যাখ্যা করা সম্ভবঃ “চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করবো কি?” গানটি বরং ভগবতগীতার উপরক্ত শ্লোকটি থেকেও দুরহ। কারণ দেহের অভ্যন্তরে কুল কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করে উর্ধ্বপর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারলেও গানের অন্তঃর্নিহিত রহস্য কারও পক্ষে ভেদ করা সম্ভব নয়। দেহতত্ত্ব অংশে মুলাধারস্থ শক্তির উর্ধ্বগতির ফলে অন্তর্দৃষ্টিতে কিভাবে নানা রঙের খেলা দেখা যায়,  সেটা পুর্বেই ব্যক্ত করেছি। 

প্রকৃতপক্ষে অন্তরসত্ত্বা রীতিমত উজ্বল হয়ে ওঠে চেতনা কে ‘মনিপুর’চক্র অবধি ওঠালেই অনাহত চক্রের নীল আকাশে চেতনা উঠলে প্রায়শই মনে হয়, আকাশ যেন সহস্র চন্দ্র কিরণে উদ্ভাসিত। সেই স্নিগ্ধ জ্যোতি অন্তর আকাশের চন্দ্র কিরণ দেখিলে প্রাণে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করা যায়। 

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় খোলা ছাদে দক্ষিণ সমুদ্রের ভেজা হাওয়া গায়ে লাগলে যেমন স্নিগ্ধ ও তৃপ্ত ভাব বোধ হয়, এই দর্শনজাত ভাব ও অনুভুতিও তেমনি। সাধক অন্তর আকাশে এই জ্যোৎস্নার লাবন্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তন্ত্রে এই জন্য এই আকাশকে বলা হয়েছেঃ  ‘কোটি চন্দ্র সুশীলতম’ অর্থাৎ কোটি চন্দ্র যেন এই আকাশকে সুশীতল করে রেখেছে। এই চন্দ্র কিরন ধৌত আকাশ দেখেই দেহতত্ত্ব কবি মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন- “চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করবো কি।” ‘

আমরা ভেবে করবো কি?” কথার অর্থ হলঃ বিচার বিশ্লেষণী বুদ্ধিতে এর কারণ ধরা পড়বার নয়। রবীন্দ্রনাথের “এই জ্যোতি সমুদ্রে মাঝে যে শতদল পদ্মরাজে তারই মধুপান করেছি ধন্য আমি তাই।” এর ব্যাখ্যাও কোন বাংলার অধ্যাপক করবেন? 

উপরে যে দেহতত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছি তাতে কোথায় জ্যোতিসমুদ্র তার কথা বলেছি। আসল জ্যোতিসমুদ্র হল ‘বিন্দু’। কিন্তু এই জ্যোতিদর্শন আরম্ভ হয় ‘মনিপুর চক্র’ থেকেই। মনিপুর চক্র থেকে সহস্রারের মুল জ্যোতি পর্যায় পর্যন্ত ওঠাকালে জ্যোতির মধ্যভাগে সাধকরা “বিন্দুর” অস্তিত্ব দেখতে পান। 

চলবে............

সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগৎ দর্শনঃ পর্ব - ২০

''যে রত্ন প্রাণের শান্তি, তাতে কি আসে ক্লান্তি ? 
একবার বললে বাবা, নিভে যায় দোজখ হাবা ।" 

মুলাধারে এসে স্থির হয়ে যাওয়া এই শক্তিকে যদি সুহ্মা বায়ু দ্বারা উত্তপ্ত করা যায় তাহলে ব্যারোমিটারের রন্ধ্রপথে ঊর্ধ্বমুখী পারার মত এই শক্তি উল্টো গতিতে উৎপত্তি স্থান অর্থাৎ ব্রহ্মারন্ধ্রের দিকে ফিরে চলে। ব্রহ্মারন্ধ্রের শূন্যতার মধ্যে তাকে লুপ্ত করে নিতে পারলেই জগৎলীলা শেষ। জগৎ মানেই মায়ার বাঁধন,জন্ম-মৃত্যু এবং সুখ দুঃখের বৃত্তাকার খেলা। শূন্যে এই শক্তি লয়প্রাপ্ত হলেই জগত লীলারও শেষ অর্থাৎ মুক্তি । মুলত যে সব যোগী ব্রহ্মারন্ধ্রের এই শূন্য তাদের চেতনাকে নিয়ে যেতে পারেন- তাঁরা পরম এক প্রশান্তি বোধ করেন। এরপর জীবদেহে বেচে থাকলেও সুখ-দুঃখ কোনটাই তাদের উদ্বেলিত করতে পারে না। 

ব্রহ্মারন্ধ্রের শূন্যতাকে বলা হয় “পরমান্তন” বা “আন্তন”। সেখানে শক্তি লুপ্ত হওয়া মানে আত্মস্থ হওয়া । এই আত্মস্থ করাকেই বলে খেয়ে ফেলা। যিনি শক্তিকে এইভাবে আত্মস্থ করতে পারেন তিনি পরম প্রশান্তি প্রাপ্ত হন। কারন এই আত্মার স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে “ শান্তো ইয়মাত্মা” অর্থাৎ এই আত্মা অত্যন্ত শান্ত, নিবিড় নিদ্রায় যে প্রশান্তি অনুভব করা যায় এই প্রশান্তি সেই রকম। চঞ্চলা শক্তিকে এইভাবে আত্মস্থ করা গেলেই তাকে খেয়ে ফেলা হয়। সাধকের মূল লক্ষ্য এই শক্তিকে আত্মস্থ করা। সুতরাং গভীরতর এক ভাববোধ থেকেই রামপ্রসাদ সেন এই গানটি রচনা করেছেন। 

মীরার- “ জ্যোতি যে জ্যোতি মিলাও”- এ দেহতত্ত্বের গভীরতর পর্যায়ের গান। মুলাধার শক্তিকে যখন বিন্দুর জ্যোতির্মণ্ডলে নিয়ে যাওয়া যায় তখন মানুষের চেতনাতে সঙ্গস্কারের স্থুল বন্ধন এতটাই সূক্ষ্ম হয়ে যায় যে, জ্যোতিপূর্ণ সুক্ষাতম কাঁচের মত হয়ে যায় তা। বিন্দু পর্যায়ে পৌঁছালে সেই সূক্ষ্ম জ্যোতির্ময় কাঁচস্বরূপ জীবাত্মার আত্মসত্তার বিশ্বের বিন্দুসত্তার জ্যোতি এসে মিশে যায়। ব্যবধান থাকে অথচ তাকে একাত্মা বলে বোধ হয়। তখন দ্বৈতে থেকে অদ্বৈত এক মিলনের বর্ণনাতীত আনন্দ উপলব্ধি হয়। যারা প্রেমিক সাধক তাঁরা এই আনন্দ ত্যাগ করে নির্বিকল্প প্রশান্তির মধ্যে সকল বোধ হারিয়ে ফেলতে চান না, সাধক বা সাধিকা তখন কেবল সেই ভাবমূখে থাকতে চান। এই জন্যই মীরা নিজে স্থুলসত্ত্বার বহু আবরণ খুলে ফেলে আত্মজ্যোতির মধ্যে বিশ্বজ্যোতির অনুপ্রবেশ উপলব্ধি করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেয়ে উঠেছিলেন- “জ্যোতি যে জ্যোতি মিলাও”। 

আত্ম ও বিশ্ব গঠনের দিক থেকে একই ধরনের। দুইই সুক্ষা থেকে স্থুলে এসেছে। দুইয়েরই সুক্ষা অংশ পরতে পরতে স্থুলতার আবরণে আবদ্ধ। কিন্তু দুইজনের অবস্থান ঘূর্ণনের দিক থেকে ঠিক বিপরীত মুখে, যেমন বিজ্ঞানে “ MATTER ও ANTI-MATTER”। MATTER এর চার্জ যদি POSITIVE হয় ANTI-MATTER এর চার্জ হয় NEGATIVE । MATTER যদি বায়ে ঘোরে ANTI-MATTER ঘোরে ডানে । জীবাত্মা ও বিশ্বের গতিও ঠিক সেইরকম । জীবাত্মা বা দিকে স্থুল আবরণের এক প্যাঁচ খুললে বিশ্বও ডান দিকে স্থুল আবরণের এক প্যাঁচ খুলে ফেলে । জীবাত্মা তার প্যাঁচ খুলে যখন আত্মস্থ জ্যোতিতে প্রবেশ করে বিশ্বও তখন তার প্যাঁচ খুলে নিজস্ব জ্যোতিতে প্রকাশ পেতে থাকে । তার উভয়ের শেষ প্যাঁচটুকু খুলে গেলে অন্তরস্থ দুই শূন্য এক হয়ে যায় । দ্বৈত অদ্বৈত হয়ে একাকার হয় । চিত্রটি নিম্নরুপঃ












 চলবে...............

শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭

ধ্যানে দেহ জগত দর্শন- পর্ব ১৯

(পুর্ব প্রকাশের পর হতে) 

“ এই সবই তো প্রহেলিকা,তবু মনে জোর আকাঙ্ক্ষা, 
সঙ্গে থাকো সর্বক্ষণ, তাই নমি অনুক্ষণ”। 

অন্তর্জগতের এই যে রহস্যময় ক্ষেত্র এটা শুধু রহস্যময় অনুভুতিই নয়, বাস্তব বিশ্লেষণী বুদ্ধিতেও এর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এ নিয়ে আজকাল রীতিমত রিসার্চ হচ্ছে প্যারাসাইকোলজী ডিপার্টমেন্টে। প্যারাসাইকোলজী বা অধিমনোবিজ্ঞানে একটি জিনিস ধরা পড়েছে যে, বহিরিন্দ্রিয় বন্ধ করলে মানসিক কার্যকলাপের ক্ষমতা বেড়ে যায়। মণি তখন ইন্দ্রিয়ের কাজগুলির দায়িত্ব গ্রহন করতে পারে। শুধু পারে তা নয়,এমন সব অদ্ভুত কাজ সে করতে পারে, যাকে বলা যায় অতিন্দ্রিয় দর্শন। 

প্যারাসাইকোলজীর ভাষায় E.S.P অর্থাৎ ‘EXTRA SENSORY PERCEPTION’। প্যারাসাইকোলজীতে সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে, বহিরিন্দ্রিয় বন্ধ হলে অতিন্দ্রিয় দর্শনের ক্ষমতা বেড়ে যায়। চর্মচক্ষে না দেখা গেলেও অনেক কিছুই দৃষ্টিগোচর হয়। অদ্ভুত ধরনের এক টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা জন্মে যায় মনের। কিন্তু কিভাবে এই ক্ষমতা জন্মে, কিভাবে এই অতিন্দ্রিয় দর্শন হয়, সে বিষয়ে এরা তেমন ওয়াকিবহাল হতে পারেন না। বহিরিন্দ্রিয় বন্ধ করে চোখ বুজে মনের মধ্যে যে ছবি তারা দেখেন, সে ছবি কোথায় কিভাবে প্রতিফলিত হয়,এ নিয়ে তারা তেমন বিচার বিশ্লেষণ করতে পারেননি। এই যোগ ধ্যানে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বিশ্লেষণ করে এর যথার্থ ব্যাখা দেওয়া যায়। 

এই অতিন্দ্রিয় দর্শন হয়ত দেহের ভিতরে যে স্বচ্ছ অবস্থা আছে সেই স্বচ্ছ দর্পণ থেকে হয়, যাকে লালন বাবা ‘আরশী নগর’ বলে উল্লেখ করেছেন। পশ্চিমী অধিমনোবিজ্ঞানে এই অতিন্দ্রিয় দর্শন সম্পর্কে সমীক্ষা করা হয় ‘টেলিপ্যাথির’ আকারে। যেমন একটি SOUND PROOF ঘরে কাউকে বসিয়ে দেওয়া হল- তাঁর চোখ এবং কান বন্ধ করে দেওয়া হল, পাশের ঘরে একজন কতগুলি ছবির উপর মনোনিবেশ করলেন। তিনি যে বিশেষ ছবিটির উপর মনোনিবেশ করলেন রুদ্ধকক্ষে চোখ কান বন্ধ অবস্থায় পরীক্ষার্থী ব্যক্তিটিকে দেখা গেল ঠিক সেই ছবিটির বর্ণনাই দিচ্ছেন। পরে যখন তাকে অনেকগুলি ছবি দেখানো হল তার মধ্যে থেকে ঠিক সেই ছবিটিই তিনি নির্ভুলভাবে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলেন। এধরনের দর্শনকে প্যারাসাইকোলজীতে ‘টেলিপ্যাথি’ বলে অর্থাৎ একজনের চিন্তা তরঙ্গ আরেকজনের মস্তিষ্কে আঘাত করে অনুরূপ ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। পশ্চিম জগত একে মনের একটি বিশেষ ক্ষমতা বলে ধরে নিয়েছে। মনের এই বিশেষ ক্ষমতা প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে। তবে বিষয়ের দর্শন যে সবসময় যথাযথ হয়,তা নয়। অনেক সময় প্রতীকের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থী নিরীক্ষামূলক বিষয়টিকে দেখতে পান, বস্তুত অতিন্দ্রিয় দর্শন কখনও কখনও প্রতীকের মধ্যে দিয়ে সেকথা বলে। ঐশ্বরিক জগতের ভাষা এই প্রতীকময়তা দিয়েই তৈরি, যেকথা পরে বলব। 

এবার আমরা রামপ্রসাদ সেনের গানটির যথার্থ স্বরূপ ব্যাখ্যা করছি যা তথাকথিত পণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষে বিশ্লেষণ দ্বারা ধরা সম্পূর্ণ অসম্ভব। রামপ্রসাদ লিখেছেন ‘এবার কালী তমায় খাবো।” বাহ্য অর্থে এতো একটি রাক্ষুসে ক্ষুধার পর্যায়ে পড়ে। এ যেন আফ্রিকার নরখাদক কোন কবির লেখা গান। অন্তর্জগতে যার প্রবেশাধিকার নেই এমন পশ্চিমী বিদ্যায় শিক্ষিত ব্যক্তির কাছে এই গানটি ‘NONSENSE VERSE’ এর চাইতেও Absurd প্রমানিত হতে পারে। কিন্তু দেহতত্ত্ব জ্ঞাত হবার পর এ গানের লাইনটির দিকে একটু যদি বিশ্লেষণী মানসিকতা নিয়ে তাকানো যায় তাহলে গভীরতর এক দর্শন এর মধ্য থেকে আত্মপ্রকাশ করে। ‘মা কালী হলেন আদি শক্তি,যাকে বলে আদ্যাশক্তি PRIMAL ENERGY KINETIC IN NATURE’। শূন্যে সুপ্তাকারে স্থিত এই শক্তি স্বভাব গুনে নড়ে চড়ে ওঠা মাত্র সময় বা কালের (TIME)উদ্ভব হয়েছে। কালের জন্মদাত্রী বলেই তিনি ‘মা কালী’। এই শক্তিই গোলাকার ব্রহ্মাণ্ডরূপে জগত হয়েছেন। কিছুটা শক্তির ঘূর্ণনের ফলে ‘ELLIPTICAL’ কিংবা ‘OVAL’।মানুষের দেহের মধ্যে এই জগতের ক্ষুদ্র সংস্করণ কাজ করছে ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে মুলাধার পর্যন্ত। চলবে............