পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৮

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ- সৈয়দ শামসুল হক




















১৮.
এই দরজায় আমরা আসিনি খেতাব খেলাত আশাতে।
আশ্রয় পেতে এসেছি আমরা সময়ের ঝঞ্ঝাতে!

আমরা যাত্রী ভালোবাসবার সীমান্ত সব পেরিয়ে-
এই জীবনের একটি সড়কও আমরা যাইনি এড়িয়ে।

তোমার বাগানে আমরা দেখেছি ফোটে কত ফুল ভোরে-
আমরা এমন- হৃদয়কে রাখি সূর্যমুখীটি করে।

কই তুমি কই! আলো দাও আলো! দয়া করো একবার।
নুন দরিয়ায় ডুবে আছি দ্যাখো, করো তুমি উদ্ধার।

হাফিজ, তোমার দরবেশি ওই আলখাল্লাটি ছাড়ো।
ঢুকে পড়ো দেখি সরাইখানায়, পেয়ালাও আছে তোমারও ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















১৭.
সরাইখানায় টানছি মাল, মাতাল আমি টালমাটাল-
ভালোবাসার সাত কা-!- তবুও কী যে পোড়া কপাল!
ওই যে তার ভুরুর টান, ওতেই ফোটে তিরষ্কার
এক্কেবারে শুরুর থেকে- রক্ত ঝরে বুকে আমার।
গোলাপ তুমি ফুটলে ভোরে,
তুমিও দেখি রক্তলাল!

আচ্ছা খুব! শরাবে, সাকি, ভেজাল তুমি দিও না হে।
মাতাল যদি, আরো মাতাল হতে আমার প্রাণ চাহে।
শরাব যদি রঙিন লাল, তাকিয়ে দেখো এ হৃদয়-
সেটাও তারই রক্তলাল সিলমোহরের ছাপটা বয়।
হাফিজ, তুমি নীরব থেকো,
আজকে এবং চিরটা কাল ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















১৬.
তার কারণেই চোখের পানি, মুছিয়ে ফের সে-ই দেবে-
জীবন যদি সে নিয়েছে, জীবন ফিরে সে-ই দেবে।
বলছে যারা যা পেয়েছ- এর থেকেও তো ভালো আছে,
আমার ভালোবাসায় কিন্তু এ-ও আছে আর ও-ও আছে।

শুনলে মনে হতেই পারে এ সব কথা রহস্যের।
একবারটি বলার পরে বলব আমি দ্যাখো না ফের!
নিয়েছে যদি শূন্য করে, হাত ভরিয়ে সে-ই দেবে।

ইহকাল আর পরকালের ভরসা তো সেই একজনাই।
খুলেই বলি ঢেকেই বলি- বলার কিন্তু বিরাম নাই।
এ দুনিয়ার ধরনটিকে ভরসা করাই বাতুলতা-
তাকে পেলেই সবটা পাওয়া- কে চায় তবে অমরতা!

পেয়ালা দাও পূর্ণ করে, মিনতি রাখো ও সাকি।
মাতাল হলে প্রাণে আমার কি আর কারো ভয় রাখি!
হাফিজ, তুমি ভালোবাসার, ভালোবাসাটি সে-ই দেবে ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















১৫.
রাতের ইয়ার দোস্ত তুমি একটু মনে কোরো,
ভুলে যেয়ো না সরাইখানায় রাত-
মাতাল তুমি তবুও মনে পড়েছিল যে তাকে-
কেননা গান গাইছিল স্যাঙাত।

এমনটাই তো হবার কথা যখন পেয়ালায়
ঢালছে শরাব সাকি গোলাপ গাল!
দেখেই তাকে মনে পড়ে যায় আছে সে একজন-
যার জন্যে গোলাপ এত লাল।

তোমার হাত যখন খোঁজে ক্ষীণ সে কটি তার-
মনে তোমার জড়িয়ে ধরার সাধ-
তখন ওঠে মাতাল হাওয়া    স্মৃতির কন্দরে,
একদিন তো হয়নি বরবাদ।

এক পলকের দুঃখ ওসব,   মুহূর্তেরই শোক!
ভালোবাসায় অমন হয়ে থাকে।
আর এটিও জানবে তুমি    এই যে মহাকাল-
নিত্য ঘোরে চোরাপথের বাঁকে।

এমন মনে হচ্ছে যদি যাত্রাপথে তুমি
পথ হারালে অন্ধকার রাতে-
স্মরণ কোরো এমন সওয়ার অনেক ছিল যারা
আটকে গেছে ঘোড়ার চাবুকটাতে।

দিচ্ছি দোহাই তোমরা যারা অসীম করুণায়
পৌঁছে গেছো জ্যোতির্ময়ের মাঠ,
একবারটি তাকিয়ে দেখো    এই হাফিজের মুখ-
এবং সরাইখানার চৌকাঠ ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















১৪.
সে চুরি করেছে মন, মুখ তার লুকিয়ে রেখেছে।
তাহলে এ খেলা হবে কার সাথে? দোহাই বলো না!
ভোর হয়, হৃদয়ের রক্ত ঝরে বিজন বেলায়।
অথচ সে করুণারই বলে আমি করেছি কল্পনা।

সে যদি নিয়েছে তার অপরূপ মুখখানি ফিরে-
গোলাপের মতো কেন রক্তলাল হয়ে উঠবো না?
আমাকে মোমের মতো পুড়িয়েছে তার প্রেম- তাই
পেয়ালাও কেঁদে ওঠে, সংগীতেও শোকের মূর্চ্ছনা।

ভোরের হাওয়া কি মিঠে, ওগো হাওয়া তোমাকে মিনতি-
জুড়াও এ অঙ্গ তুমি, এনে দাও সন্তাপে সান্ত¦না।
শত্রুর অধিক তার আচরণ দেখেছো, হাফিজ,
কেবল ভ্রকুটি মাত্র- বিদ্ধতীরে দুঃসহ যাতনা ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ সৈয়দ শামসুল হক




















১৩.
কেউ কি বলেনি?- ওহে, ভালোমন্দ জানতে চেয়ো না,
অচেনা থেকেই যাও, কারো গল্প শুনতে যেয়ো না।
যদিও তোমার মন এতই কোমল আর এতটাই কাঁদে,
তবু তুমি কারো জন্যে কখনোই কাতর হয়ো না।

কেন যে বেদনা এত, প্রদীপের কাছে তুমি জিজ্ঞাসাটি রেখো-
ভোরের হাওয়ার কাছে জবাবটা জানতে যেয়ো না।
প্রেমের নিদান লেখা নেই কোনো চিকিৎসা শাস্ত্রেই-
অতএব কী ওষুধ কখনোই জানতে চেয়ো না।

মহাবীর সিকান্দার- তার যুদ্ধ ইতিহাস আমরা পড়িনি-
হৃদয়েরই যুদ্ধ যদি অন্য কিছু জানতে চেয়ো না।
হাফিজ, এসেছে দ্যাখো গোলাপের দিন, তাই বলি-
সুবাসে মাতাল হও, পূর্বাপর মোটেই ভেবো না ॥

হাফিজ সিরাজির কবিতাঃ অনুবাদ-সৈয়দ শামসুল হক




















১২.
বললাম- তুমিই আমার কষ্ট! বলল সে, কষ্ট শেষ হবে।
বললাম, ওঠো তুমি চাঁদ! বলল সে, রাত হলে- তবে!

বললাম, ভালো যারা বাসে তারা হৃদয়ের সততাকে বোঝে।
বলল সে, চাঁদের বুকেই তবু মানুষেরা কলংকটি খোঁজে!

বললাম, তবু আমি চাঁদটিকে হৃদয়ের অন্ধকারে চাই।
বলল সে, পারি যদি চোরের নিঃশব্দ পায়ে তবে এসে যাই।

বললাম, তোমার চুলের গন্ধে সব পথ আজ একাকার।
বলল সে, এ কেমন কথা আমি পথেরই তো নিশানা তোমার।

বললাম, তোমার রতেœর জ্যোতি, ওতেই তো অন্ধ এই চোখ।
বলল সে, প্রেমের চাওয়া তো এই- প্রেমিকেরা ক্রীতদাস হোক।

বললাম, তাহলে কি মুক্তি নেই আমার এ বন্ধন দশার?
বলল সে, যখন সময় হবে! ধৈর্য ধরো! মিনতি আমার।

বললাম, পলে পলে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, কবে আর তবে?
বলল সে, হাফিজ, নীরব থাকো! দুঃখ আর চিরস্থায়ী কবে?