৩৪.
মাথার চুল আলুথালু, ঘামতে ঘামতে নাজেহাল!
পেয়ালা হাতে গজল গায়, শরাবে আজ সে মাতাল।
মনের মধ্যে ফূর্তি খুব, কিন্তু ঠোঁটে হায় হায়!
মনে পড়ছে রাত দুপুরে এসেছিল সে গতকাল।
কানের কাছে মুখটি রেখে বলছিল সে বিষাদে-
জেগে থাকার কথাটি যার তার কিনা এ ঘুমের হাল!
এমনতর ঘুমটা যদি শরাব টানার কারণেই-
যে দিয়েছে শরাব তাকে বলবে তুমি- কী দজ্জাল!
পেয়ালা হেসে উঠল তখন, বলল আমার দোষটা কী!
হাফিজ, প্রেমে এই তো হয়! হয়নি তোমার গোস্তাকি!
৩৩.
কই সে আহ্বান? আমি শুনি কই! তাহলে তো উঠে দাঁড়াতাম
এই ধূলি থেকে আর স্বাগতমে হাত দুটি বাড়িয়ে দিতাম।
আমি সেই পাখি যার ডানায় আকাশ ছুঁয়ে দেখবার সাধ,
তীব্র সাধ মুক্ত সে হবেই হবে ফাঁকি দিয়ে দুনিয়ার ফাঁদ।
তুমি যদি মধুকণ্ঠে দাও ডাক, ডেকে নাও তোমার সেবায়-
এই যে বিষণ্ণ দিন, এই যে বিচ্ছেদে দিন দীর্ঘ বহে যায়-
এই জ্বালা যন্ত্রণার পাশ ছিন্ন করে আমি দাঁড়াতাম উঠে
প্রাচীন বীরের মতো, অস্ত্র নয়- কতিপয় পঙক্তি করপুটে।
প্রভু তুমি করুণার! শান্তির অপার বারি বরিষ ধরায়!
যেন সে ধারায়, প্রভু, দীন এই কবরের মাটি ভিজে যায়।
রাত্রিদিন এই যে পাগল হাওয়া আর এই মহা ধূলি ঝড়-
থেমে যাক তোমারই বর্ষণে, প্রভু। তুমি ছাড়া কে আছে নির্ভর!
যখন ঢালবে তুমি অমৃতের ধারা, তুমি বাজাবে সেতার-
যখন সে সুর এসে ছুঁয়ে যাবে ভাঁজে ভাঁজে কাফনে আমার-
তখন আমিও প্রাণ ফিরে পাবো, নৃত্য করে উঠব সে সুরে।
হাতখানি ধরো তার, শিঞ্জনেরও ধ্বনি রেখো পায়ের নূপুরে।
জগতে সবাই জানে- তোমাতেই সমাপন, আরম্ভ তুমিও।
হাফিজ, ওঠো তো জেগে! নেচে ওঠো! পরে তুমি কবরে ঘুমিও ॥
৩২.
নহরের তীরে বাগানে এসেছি, ফুলে ফুলে ভরা ডাল-
দেখেই হৃদয়ে ঠেলে ওঠে গান সেই তার উদ্দেশে-
সরাইখানার সাকি যার গাল গোলাপের চেয়ে লাল,
তাকেই আমার বন্ধু করেছি এতটাই ভালোবেসে।
ভাগ্যই মানো এবার তাহলে! দেখা পেয়েছিলে তার!
আকাশে তারার ভীড় জমে ওঠে- দীপ্তিতে আঁকে মুখ
সেই তার যাকে ইচ্ছায় পেতে তুচ্ছ এ সংসার-
এবার তাহলে বেঁচে ওঠো তুমি- বেঁচে থাকাতেই সুখ।
যারা ভালোবেসে গিয়েছে শুধুই পায়নি তো ভালোবাসা-
আজীবন যারা বয়েছে শুধুই দুর্বিষহ এ ভার,
আজ তারা যেন ঠিকানাটি পায়, খুঁজে পেয়ে যায় বাসা-
এই যে হতাশা শুকনো সে ডাল- আগুনেই পোড়াবার।
আত্মা আমার যেন দুলহিন, কখন নওশা আসে-
তার পথ চেয়ে চোখ অপলক, কান নেই নহবতে-
মনিরত্নের পরেছে সে মালা, ভরে আছে উচ্ছ্বাসে-
বুঝি সে এখনি এসে যাবে ওই পুষ্প বিছানো পথে।
মনে করো সেই রাতগুলো তুমি কী ভালো কাটিয়েছিলে-
বন্ধুজনের সঙ্গটি ছিল মনোরম- মনে পড়ে?
আলো হয়ে ওঠে হৃদয়ের কালো ওই চাঁদ দেখা দিলে।
নহরের ধারে বাগানও তখন নিশ্চয় চোখে পড়ে।
যেন উজ্জ্বল সাকির ও চোখ শরাবের মতো উচ্ছ্বল-
কানায় কানায় ভরে আছে, কিছু উপচেও পড়ে যাচ্ছে-
দেখেই মাতাল হয়ে পড়ি আমি, হয়ে যাই টলমল।
চলে যদি যায়, সেই বেদনাও কত মিঠে হয়ে থাকছে।
হাফিজ, তোমার পরোয়া ছিল না জীবনের কোনো কালে-
অতএব এসো, তুমি আর আমি সরাইখানায় যাই।
না হয় ওখানে দস্যুরা বসে ছদ্মবেশের আড়ালে-
লুট হয়ে যাবে, তবুও জানবে- সম্পদ ছিল তাই!
৩১.
ফাল্গু ন এসেছে ফিরে, ফুলে ভরে গিয়েছে বাগান-
মাটির গভীর থেকে এরা সব পেয়েছে উত্থান।
তাহলে ধুলায় তুমি পড়ে আছো কেন হে হাফিজ?
শ্রাবণ মেঘের মতো বৃষ্টি তুমি ঝরাও চোখের।
ভেজাও কবরটিকে- কারাগার!- এই হৃদয়ের!
তুমিও উত্থান পাবে- অংকুরের জন্ম দেবে বীজ ॥
৩০.
ওঠো! তুলে ধরো পেয়ালা তোমার!
ভরে নাও লাল শরাবে!
কানায় কানায় ভরে নাও তুমি,
উপচালে উপচাবে!
পেয়ালা তো নয়- মাথার খুলিটি!
একদিন হবে কংকাল!
আজরাইলের পেয়ালা যেদিন
ওই হাতে এসে যাবে।
সেদিন যেতে তো হবেই তোমাকে-
আজ তুমি ভুলে থাকো।
আজ পেয়ালায় এ ঠোঁট তোমার
চুমুকে চুমুকে রাখো।
এসো উৎসাহে, পাখি গান গাহে,
বহে যায় শুভকাল-
রাত হলো ভোর- থাকবে কি বসে?-
ভোরের আলোটি মাখো।
ওহে দেবদারু! তোমার সবুজে
আমাকে সবুজ করো।
কী হবে আখেরে? তার জন্যে কি
ভয়ে হবো থরোথরো?
মাটি থেকে এসে মাটিতেই আমি
ফিরে যাবো সেটা জানি।
তাই বলে তাকে আজ সাধবো না!-
এ কথা কেমনতর?
এত সাধনেও পাইনি যে তাকে,
ভিজে ওঠে দুই চোখ।
অশ্রু বহাই, ধুয়ে যাক ধুলো,
এভাবেই তবে হোক
শুদ্ধ শরীর শুদ্ধ হৃদয়-
এ যে করুণার পানি!
গোসল করো তো! সহনীয় হবে
প্রণয়ের দুর্ভোগ।
হাফিজ, জানো তো, যদি তার দিকে
দৃষ্টি রাখতে হয়-
তবে নির্মল অশ্রু ধোয়ানো
চোখেই তা নিশ্চয়!
সাপের মতো যে চুলে তার তুমি
হয়েছিলে দংশিত-
তারই তো চুমোর ছোঁয়ায় তোমার
এসে যাবে নিরাময়।
বইছে বাতাস তার দিক থেকে!
সুবাস এনেছে ওই তার!
হাফিজ, তোমার দরকার নেই
দরবেশি আলখাল্লার।
ছুঁড়ে ফেলে দাও, মজনুর বেশে
হও তুমি সজ্জিত-
কখন সে আসে- যদি আসে তাই
বিছাও গোলাপে পথ তার ॥
২৯.
তবে কি কবরে যাবে নষ্ট এ জীবন?
পুণ্যে যদি সাধুবাদ- তারও আশা কই?
বড়ো দীর্ঘ পথে আজও আমার ভ্রমণ।
এর শুরু কিংবা শেষ- অবগত নই।
মাতাল এই যে আমি শরাবে দৈনিক-
তবুও আমাকে পুণ্যবান বলা যায়?
হাদিসটি হুজুরেরা হাতে তুলে নিক-
কিন্তু কই? বিশারদবৃন্দ বা কোথায়?
সাধুর আস্তানা ছেড়ে দিয়েছি তো কবে-
খুলেও ফেলেছি আমি দরবেশের বেশ।
যাবো যে সরাইখানা- যেতেই তো হবে!-
কে আমাকে বলে দেবে পথের উদ্দেশ?
মিলনের দিনগুলো মনে পড়ে যায়-
মধুর স্বপ্নের ঘোরে আজও দুই চোখ।
কিন্তু সেই মুখখানি মিলালো কোথায়?
তবে আর আশা কই হবো যে অশোক!
পথের ধুলাটি তার সন্তাপে চন্দন-
কতকাল নত আমি গলিপথে তার-
কোথায় বা যাবো আর- এ বড়ো বন্ধন-
যেদিকেই যাই- পথ জুড়ে সে আমার।
হাফিজ, তুমি তো আছো সঠিক পথেই-
কেউ যেন ভুল পথে নেয় না তোমাকে।
আছো যদি থাকো তবে ধীরতা ধরেই-
ঘুমিয়ো না! চোখে যদি ঘুম এসে থাকে!
২৮.
এই যে তোমার পল্লবে ঘুম যেন আধফোটা গোলাপের
এই যে সোনালি বেণীর বন্যা- বেহেশতি সালসাবিলের,
মিছে নয় সেটি! মিছে নয়!
এই যে ঠোঁটের ওপরে এখনো এক ফোঁটা ওই দুধ,
এই যে শুকিয়ে গেলেই তা বিষ!- কান্ড কী অদ্ভুত!
মিছে নয় সেটি, মিছে নয়!
এই যে গজল ছিলো এতটাই ভাষাহীন এই ঠোঁটে,
এই যে এখন দেখো অক্ষর গোলাপের মতো ফোটে-
মিছে নয় সেটি, মিছে নয়!
এই যে হাফিজ, বেদনায় তুমি আজ পড়ে আছো ঘাসে-
এই যে এখনো আশা হয় যদি একবার ভালোবাসে-
মিছে নয় সেটি, মিছে নয়!
এই যে রাতের হাওয়া উঠে আসে তার পল্লীটি থেকে-
এই যে কোরক গোলাপের দ্যাখো দীর্ঘ এ রাত জেগে-
মিছে নয় সেটি, মিছে নয়!
এই যে হাফিজ, মরমেই মরে!- অথচ বইছে শ্বাস!
এই যে রাতের শেষ প্রহরেও শুকতারাটির উদ্ভাস-
মিছে নয় সেটি, মিছে নয়!